রাইজিংবিডি স্পেশাল

‘জুলাই সনদ’ রক্ষায় বিএনপির কর্মসূচি: কেন্দ্রে তৎপরতা, মাঠপর্যায়ে ধীরগতি

‘জুলাই সনদ’ এবং সরকারের বিভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধী শিবিরের চলমান অপপ্রচার মোকাবিলায় মাসব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে, কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা ও লিফলেট পাঠানোর পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। অনেক জেলা ও মহানগরে এখনো দৃশ্যমান কোনো গণসংযোগ বা রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।

নির্দেশনার পরও স্থবির মাঠপর্যায় দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ এবং ‘জুলাই সনদ’ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে গত ১০ মে সারা দেশের জেলা ও মহানগর ইউনিটে বিশেষ চিঠি পাঠায় বিএনপির হাইকমান্ড। একইসঙ্গে বিরোধীদের প্রচারণার জবাব দিতে তৈরি করা বিশেষ লিফলেটও পাঠানো হয় তৃণমূল পর্যায়ে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে উঠোন বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা ও সরাসরি গণসংযোগের মতো কর্মসূচি ঠিক করতে স্ব-স্ব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

তবে, বেশ কয়েকটি জেলা ও মহানগরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্র থেকে পাঠানো চিঠি ও লিফলেট হাতে পেলেও মাঠপর্যায়ে তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। বিএনপি সরকারে যাওয়ার পর বেশিরভাগ জেলা-মহানগরের শীর্ষ নেতারা সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়ায় তারা এখন রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানেই বেশি ব্যস্ত সময় পার করছেন। ফলে, তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাবে ছাত্রদল ও যুবদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনগুলোর কর্মপরিকল্পনা ঘরোয়া বৈঠকেই আটকে আছে। এমনকি, অনেক নেতাকর্মী এই কর্মসূচির বিষয়ে এখনো অন্ধকারেই আছেন।

কী আছে বিএনপির সেই লিফলেটে? বিরোধীদের অপপ্রচারের জবাবে তৈরি করা বিএনপির এই লিফলেটে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতিগত সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করা হয়েছে।

গণভোটের ‘খ’ প্রশ্নের বিরোধিতা: লিফলেটে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং তা স্পষ্টতই ‘প্রতারণামূলক’।

উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান: জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ কক্ষ (Upper House) প্রতিষ্ঠার পক্ষে নিজেদের জোরালো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে বিএনপি।

সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার: সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ‘ অক্ষরে অক্ষরে মানতে বিএনপি বদ্ধপরিকর বলে লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গণভোটের ‘ঘ’ প্রশ্নে বর্ণিত অপরাপর সংস্কারও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বিরোধী দলের সমালোচনা: সংসদে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনসহ যেসব প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে বিরোধী দল লঙ্ঘন করেছে, তা-ও এই লিফলেটে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছে বিএনপি।

‘হানিমুন পিরিয়ড’ ও নেতাদের বক্তব্য ঢাকা মহানগরের বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটে গত ১০ মে লিফলেট পাঠানো হলেও তা এখনো জনসাধারণের মাঝে পৌঁছায়নি। একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, লালমনিরহাট ও চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলাতেও।

কর্মসূচির এই ধীরগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “এটি মাসব্যাপী কর্মসূচি। সারা দেশে নেতাকর্মীরা যার যার মতো করে পরিকল্পনা সাজিয়ে কাজ করবেন। কেন্দ্র থেকে চিঠি দেওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হতে চার-পাঁচ দিন সময় লাগা স্বাভাবিক। তাছাড়া, সবাই তো এখন একটা ‘হানিমুন পিরিয়ডে’ আছে। এখান থেকে মূল কর্মসূচির ধারায় ফিরতে তাদের একটু সময় লাগবেই। সামনে ঈদ চলে আসছে; ঈদের আগে যতটুকু সম্ভব করবে, বাকিটা ঈদের পরে শেষ করার জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে।”

তবে, ধীরগতির কথা অস্বীকার করে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি হারুনুর রশিদ হারুন বলেছেন,“একটা নির্বাচন গেল, স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন সবাইকে আবার সংগঠিত করার কাজ চলছে। আমরা চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে কর্মীসভার মাধ্যমে কাজ শুরু করেছি। ঈদের আগেই এটি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন জানিয়েছেন, মহানগরের সব থানায় লিফলেট পাঠানো হয়েছে এবং কর্মীসভা চলছে। 

লালমনিরহাট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর খান ও চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মমিন মালিতা জানিয়েছেন, কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা যৌথভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং কর্মসূচিতে কিছুটা নতুনত্ব যোগ করার পরিকল্পনা করছেন।