রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের ধারণা, প্রতিবেশীর বিকৃত যৌনলালসার শিকার হয়েছিল শিশুটি। নির্যাতন বা রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর একটি বাসার খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে একই ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়। নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
ঘটনার পর অভিযুক্ত স্বপ্নাকে ফ্ল্যাট থেকেই আটক করা হয়। তবে তার স্বামী জাকির হোসেন সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে, জাকির নারায়ণগঞ্জে একটি বিকাশের দোকানে বন্ধুর পাঠানো টাকা তুলতে গেছে। স্থানীয় পুলিশ ও দোকানদারের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে অভিযুক্ত সোহেল রানা ধর্ষণ-হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পল্লবীতে রামিসাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেল রানা বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে
পুলিশ জানিয়েছে, সোহেল রানা ও সহযোগী স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতেই অবুঝ এ শিশুটির সঙ্গে ঘটনার সময় কি যে ঘটেছিল তার লোমহর্ষক বিস্তারিত বেরিয়ে এসেছে।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবুল কালাম আজাদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, আসামিদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন সোহেল রানা। জবানবন্দি গ্রহণ করে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
সোহেল রানার স্ত্রী যা জানান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না বলেছেন, “রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।”
এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন এদিকে, রামিসা হত্যার ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার (২১ মে) ডিএমপি কমিশনারকে আইনমন্ত্রী এই নির্দেশ দেন।
রামিসার পরিবার যা বলল রামিসা চাচাতো ভাই ফেরদৌস সুলতান বলেন, “মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে পারিবারিক কবরস্থানে যখন রামিসাকে দাফন করা হচ্ছিল, তখন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একদম পশুর মতো একটা ঘটনা। ছবিটা দেখে আমার ভেতরটা কেমন করতেছে। ঘাতক সোহেলের ফাঁসি চাই আমরা।”
রামিসাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেল রানা
চোখের পানি মুছতে মুছতে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, “আমার মেয়ে ছিল আমার হৃদপিণ্ড। নিজের ছেঁড়া স্যান্ডেল পইড়াও মেয়েদের কখনো কোনো কিছুর কমতি রাখি নাই। দুই দিন আগে মেয়েটা একটা বোরকা কিনে দিতে বলছিল। নিউমার্কেট থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে বোরকাটা কিনেও আনলাম।” এ কথা বলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
পল্লবীর পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল রামিসা। প্লে ও কেজিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পর প্রথম শ্রেণিতে রোল হয় এক। এমন ভালো ফলাফলের কারণে স্কুল থেকে পাওয়া ট্রফিগুলো ঘরে সাজানো, কিন্তু নেই রামিসা দেখিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে চরম ক্ষোভ আর অভিমানে বলেন, “আমার এই কলিজার টুকরাটাকে কীভাবে নৃশংসভাবে কষ্ট দিয়ে মারল পাষাণরা। আমি আর কারো কাছে কিছু চাই না, কারো কাছে বিচারও চাই না।”
রামিসার শিক্ষকের বক্তব্য পপুলার মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন,“রামিসা প্লে থেকে এ স্কুলে পড়াশোনা করছিল। সে কেজি ও নার্সারিতে দ্বিতীয় স্থান এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিল। তাকে তার মা স্কুলে নিয়ে আসতেন ও আবার নিয়ে যেতেন। এ ধরনের ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ।”
তদন্তে যা জানা গেছে তদন্তে জানা গেছে, রামিসার পরিবার পল্লবীর ওই ভবনে প্রায় ১৭ বছর ধরে বসবাস করলেও অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া ওঠেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে গিয়ে তার মা অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির স্যান্ডেল দেখতে পান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রামিসার মা যখন দরজায় নক করছিলেন, তখন ফ্ল্যাটের ভেতরেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছিল। মূল আসামি জাকিরকে পালানোর সুযোগ করে দিতেই স্বপ্না দীর্ঘ সময় দরজা খোলেননি। জাকির পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তিনি দরজা খোলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডে স্বপ্নাও সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার রাতে শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার এজাহারে শিশুটির বাবা উল্লেখ করেন, তার ধারণা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।