বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ হিসেবে ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছেন বিতর্কিত মার্কিন প্রযুক্তি ধনকুবের ইলন মাস্ক। শুক্রবার (১২ জুন) মার্কিন পুঁজিবাজার ‘ওয়াল স্ট্রিটে’ তার রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’-এর আনুষ্ঠানিক অভিষেকের মাধ্যমেই এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি। খবর আল-জাজিরার।
ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেস্ক অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার স্পেসএক্সের আইপিও ঘোষণার আগে থেকেই মাস্ক প্রায় ৬৯৬ বিলিয়ন সম্পদ নিয়ে বিশ্বর সবচেয়ে ধনীর মুকুট ধরে রেখেছেন। তবে স্পেসএক্সে তার ৪২ শতাংশ অংশীদারিত্বের কারণে শুক্রবার পুঁজিবাজারে লেনদেন শেষ হওয়ার আগেই তিনি অফিসিয়ালি ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ ক্লাবে প্রবেশ করবেন।
নাসদাক স্টক এক্সচেঞ্জে স্পেসএক্স ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য নিয়ে লেনদেন শুরু করতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ ডলার। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্পেসএক্সে মাস্কের শেয়ারের আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৪৩ বিলিয়ন থেকে ৮৬৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
কল্পনাতীত সম্পদের পাহাড়
১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের এই বিশাল অংক সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। দাতব্য সংস্থা অক্সফামের একটি হিসাব অনুযায়ী, মাস্ক যদি প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ডলার করেও খরচ করেন, তাও এই ১ ট্রিলিয়ন ডলার শেষ করতে তার সময় লাগবে ২ হাজার ৭৪০ বছর! বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ও গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের (৩০৪ ডলার বিলিয়ন) চেয়ে মাস্ক প্রায় তিন গুণ বেশি ধনী হবেন।
সর্বকালের সেরা ধনী ব্যক্তি হবেন মাস্ক
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের মতে, নতুন এই অর্জনের মাধ্যমে মাস্ক শুধু সমসাময়িকদেরই নন, বরং ইতিহাসের সব ধনকুবেরদের ছাড়িয়ে যাবেন। ১৯ শতকের আমেরিকার শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত জন জ্যাকব অ্যাস্টর (মৃত্যু ১৮৪৮) বা ইস্পাত মোগল অ্যান্ড্রু কার্নেগি (মৃত্যু ১৯১৯) কেউই তাদের জীবদ্দশায় দেশের জিডিপির ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি সম্পদের মালিক হতে পারেননি। সেখানে ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে মাস্ক একাই মার্কিন জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবেন।
ইতালির বোকোনি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গুইডো আলফানি আল-জাজিরাকে জানান, প্রাচীন আমলের সম্রাট বা শাসকদের বাদ দিলে ইলন মাস্কই হতে যাচ্ছেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
বিতর্ক ও রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা
১৯ শতকের আমেরিকার ধনী শিল্পপতিদের যেমন একচেটিয়া ব্যবসা ও নিষ্ঠুর আচরণের জন্য ‘লুটেরা জমিদার’ বলা হতো, মাস্কের বর্তমান অবস্থানও ঠিক ততটাই মেরুকরণ বা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড হোয়াইট আল-জাজিরাকে বলেন, ইতিহাসের সেই ধনীরা যেমন নিজেদের সম্পদ রক্ষায় রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করতেন, মাস্কের ক্ষেত্রেও তার মিল রয়েছে।
২০২২ সালে ৪০ বিলিয়ন ডলারে টুইটার (বর্তমানে ‘এক্স’) কিনে নেওয়ার পর থেকে মাস্ক এটিকে নিজের ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম বানিয়েছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করার পর বর্তমানে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি অপচয় রোধ সংক্রান্ত একটি বিশেষ অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
দাতব্য কাজে অনীহা ও অনিশ্চয়তা
অ্যান্ড্রু কার্নেগি বা বর্তমান যুগের বিল গেটসের মতো ধনীরা যেখানে নিজেদের সম্পদের সিংহভাগ জনকল্যাণে দান করার জন্য ‘দ্য গিভিং প্লেজ’-এ স্বাক্ষর করেছেন, মাস্ক ২০১২ সালে এই অঙ্গীকারে যুক্ত হলেও তার দাতব্য কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ক্যাপিটাল রিসার্চ সেন্টারের মতে, মাস্কের অনুদানের বড় অংশই তার নিজস্ব ব্যবসার স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে বা নির্দিষ্ট মধ্যস্থতাকারী ফান্ডের মাধ্যমে করা হয়েছে।
সুইডেনের স্টকহোমের রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক্সের অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল ওয়াল্ডেনস্ট্রম আল-জাজিরাকে জানান, মাস্কের এই বিশাল সম্পদ কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। পুঁজিবাজারের ওঠানামার ওপর এটি নির্ভরশীল। যেমনটা ২০২২ সালের মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ঘটেছিল, যখন তার গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এক ধাক্কায় ৬০ শতাংশ বাজারমূল্য হারিয়েছিল। তাই ইতিহাস গড়লেও তীব্র বাজার প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মাস্ককে এই মুকুট ধরে রাখতে হবে।