একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী আর বিখ্যাত রাজনীতিক। আরেকজন ছিলেন ফুটবল খেলোয়াড়, এই খেলার লিজেন্ড। ফুটবল আর রাজনীতি সম্পূর্ণ আলাদা, আজকের বিশ্বে অন্তত এই দুই প্রান্তের মানুষের গাঢ় বন্ধুত্ব ভাবা কল্পনাতীত। কিন্তু ফিদেল কাস্ত্রো আর ডিয়েগো ম্যারাডোনার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু। কিউবান নেতাকে বলতেন ‘দ্বিতীয় বাবা’। দুজনের মধ্যে এতটা মিল যে, চিরপ্রস্থানও হলো একই তারিখে- ২৫ নভেম্বর।
ফুটবলের মতো ম্যারাডোনার জীবনে রাজনীতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশে কখনও সংকোচবোধ করেননি, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী রাজনীতিকদের সমর্থন করতেন একেবারে প্রকাশ্যে। কাস্ত্রোর প্রশংসা করতেন রাখঢাক না করে। কিউবান নেতাকে আদর্শ মেনে বাঁ পায়ে এঁকেছিলেন ফিদেলের ট্যাটু, আর ডানহাতে বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার ট্যাটু।
কাস্ত্রোর সঙ্গে ম্যারাডোনার প্রথম দেখা ১৯৮৭ সালে, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেওয়ার এক বছর পর। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয় ২০০০ সালের শুরুর দিকে, যখন মাদকাসক্তি কাটাতে কিউবায় যান ফুটবল লিজেন্ড। কোকেইনের কারণে হার্টের সমস্যায় মরতে বসেছিলেন ম্যারাডোনা, তখন কিউবায় ওই চার বছর কাস্ত্রো কীভাবে তাকে সহায়তা করেছিলেন, প্রায় সময় বলতেন তিনি।
ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমার জন্য তিনি (কাস্ত্রো) কিউবার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, যখন আর্জেন্টিনা তাদের সব ক্লিনিকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ তারা চায়নি তাদের হাতে মারা যাক ম্যারাডোনা।’ শক্তিশালী কিউবান নেতা প্রায় সময় তাকে সকালে হাঁটতে নিয়ে যেতেন এবং রাজনীতি ও খেলা নিয়ে কথা বলতেন।
২০০৫ সালে একবার টেলিভিশনে কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকারও নেন ম্যারাডোনা। তাতে দুজনের মধ্যে বিপ্লবী আবেগ ফুটে ওঠে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত জর্জ বুশকে কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘প্রতারক। মিয়ামির সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী মাফিয়া।’ ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আমেরিকান বিদ্বেষ ফুটে উঠেছিল ম্যারাডোনার কণ্ঠেও, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে যা আসে, তার সবই আমি ঘৃণা করি। আমার সর্বশক্তি দিয়ে ঘৃণা করি।’
২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর যখন কাস্ত্রো মারা যান, তখন একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন ম্যারাডোনা, ‘আমি কাঁদছিলাম আর কাঁদছিলাম। নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর ওইবার সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম।’
ঠিক চার বছর পর ম্যারাডোনা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করে চলে গেলেন অন্তরের এক কোণায় ঠাঁই দেওয়া কাস্ত্রোর কাছে।