অবিশ্বাস্য-অকল্পনীয়-অবিস্মরণীয়। ক্রিকেট কত রং দেখায়, কত রং ছড়ায়। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সব রং ছিটিয়ে দিয়ে গেল। রোমাঞ্চ দোলা খেল। রুদ্ধশ্বাস, রুদ্ধদ্বার, নখ কামড়ানো এক ম্যাচের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের এমিলিনেটর ম্যাচ।
লিগ পর্ব পেরিয়ে রংপুর ও সিলেটের ম্যাচ। যারা জিতবে টুর্নামেন্টে টিকে থাকবে। হারলেই বিদায়। সেই ম্যাচের ফয়সালা হলো ইনিংসের শেষ বলে। সেটাও বিশাল এক ছক্কায়। রংপুরের দেওয়া ১১২ রানের লক্ষ্য ছুঁতে সিলেটের শেষ বলে লাগত ৬ রান।
প্রথমববার বিপিএল খেলতে আসা ক্রিস ওকসের মাথায় তখন রাজ্যের চাপ। ফাহিম আশরাফ নিয়মিত বিপিএলে ভালো করেছেন। কিন্তু এদিন আর পারলেন না তিনি। তার হাফ ভলি বল এক্সট্রা কাভার দিয়ে উড়িয়ে সিলেটকে ৩ উইকেটের জয় এনে দেন ওকস। শেষ বলে ছক্কায় রংপুরকে বিদায় করে সিলেট উঠে গেল কোয়ালিফায়ারে।
ফাহিমের বলে শট খেলার পরপরই ওকস বুঝে গিয়েছিলেন জয় নিশ্চিত। তাইতো ডানহাত সীমানায় ইশারা করে বুঝিয়ে দেন, ‘ওই যে দেখ ছক্কা।’ সিলেটের ড্রেসিংরুমে তখন বাধনহারা উৎসব। মিরাজ দৌড়ে মাঠে ঢুকে ওকসের কোলে উঠে যান। বাকিরাও দৌড়ে প্রবেশ করে মাঠে। ক্রিজের অপরপ্রান্তে থাকা খালেদ দৌড়ে পুরো মাঠে চিৎকার করেন। তাকেও ঘিরে ধরে সতীর্থরা।
অন্যচিত্র রংপুর শিবিরে। হতাশায়, হৃদয় ভেঙে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাদের পরিচালক, সমর্থকরা। মাঠে আলিসকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। হাঁটু মুড়ে বসে থাকেন সোহান। মুখ লুকাতে দেখা যায় লিটন, মোস্তাফিজুর, তাওহীদদের। এক বলের সমীকরণে সব ওলটপালট হয়ে বিপিএল থেকে ছিটকে গেল তারা।
সিলেটের ভাগ্য খুলে যায় টস জয়ে। সতেজ উইকেটে নতুন বল বেশ ভালোভাবে কাজে লাগায় দুই পেসার ক্রিস ওকস ও খালেদ আহমেদ। গতি ও সুইংয়ের মিশেলে দুজনের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে প্রথম ৫ ওভারে ১৯ রানে ৩ উইকেট তুলে নেয় সিলেট। ওকস ৩ ওভারে ১০ রানে ১ উইকেট নেন। খালেদ ২ ওভারে ৯ রানে শিকার করেন ২ উইকেট।
খালেদ নিজের প্রথম ওভারে তাওহীদকে উইকেটের পেছনে তালুবন্দি করান। এক ওভার পর অধিনায়ক লিটনকে দারুণ সুইং ডেলিভারীতে আউট করেন। ওকস স্বদেশি মালানকেও ফেরান ইমনের গ্লাভসবন্দী করে। ৬ ওভারে রংপুর তুলতে পারে ২৯ রান। চতুর্থ উইকেটে মায়ার্স ও খুশদীল প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হন। পেসার সালমান এরশাদ বোলিংয়ে এসে মায়ার্সকে ফেরান ৮ রানে।
ছয়ে নামা মাহমুদউল্লাহ সঙ্গ দেন খুশীলদকে। ২৯ রান থেকে দুজন দলকে টেনে নেন ৬৩ রান পর্যন্ত। প্রত্যাশামিফ রান আসেনি। তবে দুজন দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। ২৯ বলে ৩৪ রান করেন দুজন। থিতু হওয়ার আক্রমণ বাড়ানো শুরু করেন খুশদিল। কিন্তু তার ব্যাটও থেমে যায় নাসুমের ঘূর্ণিতে। ১৯ বলে ৩ ছক্কায় ৩০ রান করেন খুশদীল।
এরপর মাহমুদউল্লাহ ও সোহান আবার লড়াই শুরু করেন। মাহমুদউল্লাহ হাত খুলে ব্যাটিং করলেও সোহান ছিলেন আঁটসাঁট। ২৭ বলে ৩১ রান যোগ করেন দুজন। তাদের জুটি ভাঙার পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় রংপুরের শেষের ব্যাটিং। উইকেট থেকে সরে নাসুমের বল কাট করতে গিয়ে মাহমুদউল্লাহ আউট হন ৩৩ রানে। ২৬ বলে ২টি করে ছক্কায় রংপুরের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন তিনি।
খালেদ নিজের তৃতীয় ওভার করতে এসে ফাহিম ও সোহানকে একই ওভারে ফেরান। শেষ ওভারে উইকেট পেলে তার ফাইফার পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ৪ উইকেটে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। ক্যারিয়ার সেরা ১৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে সিলেটের এই ম্যাচের নায়ক তিনি। ২টি করে উইকেট নেন ওকস ও নাসুম।
স্বল্প পুঁজি নিয়ে লড়াইয়ের জন্য রংপুরের শুরুতেই প্রয়োজন ছিল উইকেটের। প্রথম ওভারে মোস্তাফিজুর তৌফিক খানকে ফিরিয়ে দলকে সাফল্যে ভাসান। কিন্তু দ্বিতীয় উইকেটে আরিফুল ও পারভেজ ৩৬ রানের জুটি গড়ে সেই ধাক্কা সামলে নেন। দুজনই দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারিতে পরিস্থিতি সামলে নেন। কিন্তু থিতু হওয়ার পর দুজনই ফেরেন হতাশ করে।
পারভেজ ১২ বলে ১৮ রান করে আলিসের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। আরিফুল নাহিদের শর্ট বল টাইমিং মেলাতে না পেরে মাহমুদউল্লাহর হাতে ক্যাচ দেন। হতাশা বাড়ান আফিফ। আলিসের বলে বোল্ড হন ৯ বলে ৩ রান করে।
৬ রানে ৩ উইকেট তুলে সিলেটকে প্রবল চাপে ফেলে রংপুর। ম্যাচে তখন উত্তেজনা ছড়ায়। রোমাঞ্চের সৃষ্টি হয়। যা টিকে থাকে শেষ ওভার পর্যন্ত। পঞ্চম উইকেটে মেহেদী ও স্যাম বিলিংস ৫০ রানের জুটি গড়ে সিলেটের কাজটা সহজ করে দেন। কিন্তু রংপুর হার মানেনি সহজে। উইকেট না পেলেও দ্রুত রান পেতে দেয়নি ব্যাটসম্যানদের। বিলিংস ৪০ বলে ২৯ রান করে মোস্তাফিজুরের দ্বিতীয় শিকার হন। মিরাজ ২৩ বলে ১৮ রান করে খুশদিলের বলে বোল্ড হন।
ম্যাচ তখন অনেকটাই রংপুরের নিয়ন্ত্রণে। ১২ বলে ১৫ রানের পর ৬ বলে সিলেটের প্রয়োজন ৯ রান। ফাহিম শেষ ওভারে স্নায়ু স্থির রেখে সেই চাপ সামলে নেন। মঈন আলী প্রথম বলে ২ রান নিলেও পরের দুই বল ডট খেলেন। চতুর্থ বল তুলে মারতে গিয়ে শর্ট থার্ড ম্যান অঞ্চলে ক্যাচ দেন। ২ বলে দরকার ৭ রান। খালেদ পঞ্চম বলে ১ রান নিলেও ষষ্ঠ বলে এক ছক্কার প্রয়োজন হয় সিলেটের। ওকস সেই সমীকরণ মিলিয়ে দেন চোখের পলকে। কোনো চাপ না নিয়েই দলকে বিজয়ের বন্দরে নিয়ে যান।
যেই ছক্কায় সিলেট রংপুরের হৃদয় ভেঙে চলে গেল দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে। ফাইনাল থেকে তারা এক পা দূরে। রংপুর এক আকাশ অভিমান জমিয়ে বিদায় নিল টুর্নামেন্ট থেকে।