টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই। নিরাপত্তা ইস্যুতে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে বিশ্বকাপে খেলার জন্য যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করেছিল বাংলাদেশ সেটা ভোটাভুটির মাধ্যমে অযৌক্তিক প্রমাণ করে বাদ দেয় আইসিসি। তবে আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আদ্রিয়ান মেরেডিথ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিকে পরিকল্পিত, বিভ্রান্তিকর এবং আর্থিকভাবে অযৌক্তিক বলেছেন। আইসিসি ও ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই) কীভাবে সম্মিলিতভাবে একটি “নীল নকশা” বাস্তবায়ন করেছে তার বিশদ বিশ্লেষণই উঠে এসেছে তার লেখায়।
মেরেডিথের বিশ্লেষণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘নিরাপত্তা ইস্যু’। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত নয়, শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলার যে আবেদন করা হয়েছিল, সেটি তিনি পুরোপুরি যৌক্তিক বলে প্রমাণ করেন। বিসিসিআইয়ের নিজস্ব বক্তব্য ও কার্যক্রম উদ্ধৃত করে তিনি দেখান, মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরানোর সময় যে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল, সেটাই বাংলাদেশের উদ্বেগের ভিত্তি। ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শঙ্কাকে “অবাস্তব” বলা আইসিসির জন্য সত্যের অপমান ছাড়া কিছু নয়।
দ্বিতীয়ত, আইসিসির দাবি ছিল ‘বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের’ গ্রুপ বদল অত্যন্ত জটিল। মেরেডিথ এটিকে সরাসরি ভুল প্রমাণ করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, এই গ্রুপ পরিবর্তন করতে আইসিসির সর্বোচ্চ খরচ হতো ‘৫১ থেকে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার’। এমনকি আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজেই এই খরচ বহন করতেও প্রস্তুত ছিল। অথচ এই সহজ পথ না বেছে আইসিসি ইচ্ছাকৃতভাবে তা এড়িয়ে যায়।
এরপর আসে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য ‘স্কটল্যান্ডকে’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত। আইসিসি দ্রুত ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মেরেডিথের হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইসিসির খরচ হবে প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ডলার, যা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ বদলের খরচের প্রায় ছয় গুণ। তাছাড়া স্কটল্যান্ড খেললেও তাদের আর্থিক লাভ হবে মাত্র ৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা সামগ্রিকভাবে খুবই নগণ্য।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে রাজস্ব বিশ্লেষণে। মেরেডিথ দেখান, বাংলাদেশ না খেলায় আইসিসির সম্ভাব্য ক্ষতি হবে প্রায় ‘২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার’। অর্থাৎ আইসিসি জেনেশুনেই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের নিজের আর্থিক স্বার্থেরও বিরুদ্ধে যায়। এতে প্রশ্ন ওঠে যদি সিদ্ধান্তটি যুক্তিসংগত ও নিরপেক্ষ হতো, তবে এমন বিপুল ক্ষতির পথ তারা কেন বেছে নিল?
মেরেডিথ আরও সমালোচনা করেন ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের বয়কটের উদাহরণ টেনে আনার বিষয়টি। তার মতে, সেই বয়কট পুরো টুর্নামেন্টের ভারসাম্য নষ্ট করেছিল, যেখানে অযোগ্য দল সুপার সিক্স ও সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল। আর বর্তমান ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ বাংলাদেশ শুধু পয়েন্ট হারাচ্ছে না তাদের পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছেঁটে ফেলা হচ্ছে।
সবশেষে, আদ্রিয়ান মেরেডিথের উপসংহার স্পষ্ট এই সিদ্ধান্তে একমাত্র “ন্যায্য” বিষয় ছিল ভোটাভুটি। কিন্তু সেই ভোটও হয়েছে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ও অসম্পূর্ণ বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে। তার মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরানোর ঘটনায় বিসিসিআইকে বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচানোর একটি প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা। সহজ, সস্তা ও ন্যায্য সমাধান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’