প্রশ্নটা শুনে খানিকটা চমকেই গেলেন বিসিবির একজন পরিচালক। ফোনের ওপাশে হাসির শব্দও পাওয়া যাচ্ছিল। কথা বলবেন না আগেই বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্নটাই এমন ছিল যে দুয়েকটা কথা বলাই যায়! কিন্তু ক্রান্তিকাল পার করা বিসিবির দায়িত্বশীল কেউ প্রকাশ্যে কথা বলবেন না আগেই শর্ত জুড়ে দেওয়া।
‘‘বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচ বয়কট করতে নাকি পাকিস্তান নিজ থেকেই বাংলাদেশের পাশে থাকতে এমন সিদ্ধান্ত নিল?’’ - এমন প্রশ্ন বিসিবির একজন পরিচালকের কোর্টে যাবে তা ভাবেননি।
তাইতো সময় নিয়ে উত্তর দিলেন এভাবে, ‘‘তাতে আমাদের (বাংলাদেশের) লাভটা কী? আমাদের তো বরং ক্ষতি। ধরুণ ম্যাচটা হলো না। আইসিসির যে বিরাট ক্ষতি হবে সেটা তো অংশগ্রহণকারী সব দলের আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। খুব সহজ হিসাব। আইসিসির আর্থিক লাভ মানে বিসিবির লাভ। আইসিসির ক্ষতি বিসিবির ক্ষতি। বাংলাদেশ তাহলে কেন পাকিস্তানকে ম্যাচ না খেলতে বলবে।’’
সাদা চোখে বিষয়টা যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলেও ততটা সহজ কী? পাকিস্তানকে বাংলাদেশ সরাসরি খেলতে মানা করেনি নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বারবার অনুরোধের পরও বিশ্বকাপ বয়কটের যে সাহস দেখিয়েছে তাতে পাকিস্তান বেশ ভালোভাবেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ায় গণমাধ্যমে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড থেকে বারবারই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যায় করেছে আইসিসি।
পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি গত ২৪ জানুয়ারি বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা হয়নি। তার মতে, আইসিসির নীতিতে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যাচ্ছে। একটি দেশকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও অন্য দেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে। যা গ্রহণযোগ্য নয়।’’
আবার পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ মোহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশের দর্শকসংখ্যা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১০ দেশের সমান।’’
শুরুতে পাকিস্তান বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। পরবর্তীতে শুধু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান জানায়নি, কেন তারা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে?
পাকিস্তান সরকারের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়, ‘‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের সরকার ২০২৬ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য ক্রিকেট দলকে অনুমোদন দিচ্ছে। তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচটিতে পাকিস্তান দল মাঠে নামবে না।’’
বিসিবির ওই পরিচালক বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বাদ পড়ার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং সাবেক ক্রিকেটারদের কড়া সমালোচনায়, দুয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্যই পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করছে এমনটা মনে করছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো প্রভাব যে নেই তা স্পষ্ট করেছেন। সঙ্গে এ-ও নিশ্চিত করে বলেছেন, বিশ্বকাপ ইস্যুতে পিসিবি-বিসিবি কোনো যোগাযোগ হয়নি।
‘‘পাকিস্তান পাকিস্তানের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিবির এখানে কোনো প্রভাব নেই। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আমাদের তরফ থেকে কোনো যোগাযোগ হয়নি পিসিবির সঙ্গে। এটা হতে পারেও না। বাংলাদেশ নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বকাপে যাচ্ছে না। পাকিস্তানের বিষয়টা তাদের অভ্যন্তরীণ নিশ্চিতভাবেই।’’
জানিয়ে রাখা ভালো, আইসিসিরি বোর্ড সভায় বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর ভেন্যু সরিয়ে নিতে বিসিবির অনুরোধ খারিজ হয়ে যায় সদস্যগুলোর ভোটাভুটিতে। বাংলাদেশ নিজের ভোট বাদে মাত্র একটি দেশের ভোট পেয়েছে। সেটা কেবল পাকিস্তানের। মোট ১৬টি দেশের ভোটের ১৪টিই বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে।
পাকিস্তান বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিলেও বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে নিরুৎসাহিত করবে কিংবা পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে এমনটা ভাবতেই নারাজ বিসিবির সাবেক এক পরিচালক, ‘‘এটা বাংলাদেশ কোনোভাবেই করবে না। পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে সেটা এক বিষয়। শুধু পাকিস্তান কেন, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই তো অবাক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই বলে। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বকাপে থাকবে না বলে পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে তা হতে পারে না। এখানে যদি বাংলাদেশকে টেনে আনা হয় তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যায় করা হবে। কারণ ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতি এবং সীমান্তে তাদের উত্তপ্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতির কথা সবাই জানা। দুই দল হাত মেলায় না। ট্রফি নিয়ে ঝামেলা হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ ঝামেলারই তো শেষ নেই। এখানে বাংলাদেশ আসবে কোথা থেকে।’’
উপমহাদেশের ভূরাজনীতির প্রভাব ক্রিকেট বিশ্বে ছড়িয়েছে প্রবলভাবে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই যা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্টভাবেই।