২০১৬ সাল। ধারাভাষ্যে ভেসে আসছিল—“গেম ওভার, গেম ওভার! ওয়েস্ট ইন্ডিজ আপসেট ইন্ডিয়া অ্যান্ড ওয়েন্ট টু ফাইনাল’’- আন্দ্রে রাসেল বলটা উড়িয়ে দিলেন ছক্কায়, আর ভারতকে হতাশায় ডুবিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ উঠে গেল ফাইনালে। পরে কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের সেই ঐতিহাসিক চার বলে চার ছক্কায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নেয় ক্যারিবীয়ানরা। সেই ক্ষত এতদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে ভারতকে।
এক দশক পর অবশেষে সেই হারের প্রতিশোধ নিল ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ষোলোর দুঃখ মুছে দিল ছাব্বিশে। একই সঙ্গে ষষ্ঠবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল তারা।
এই জয়ের নায়ক ওপেনার সানজু স্যামসন। ৯৭ রানের অনবদ্য, অপরাজিত ইনিংস খেলেই দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন তিনি। যদিও শেষ দিকে ম্যাচে কিছুটা নাটকীয়তা ছিল, তবে সব হিসাব মিলিয়ে দেন স্যামসনই। শেষ ওভারে দরকার ছিল ৭ রান—শেফার্ডের প্রথম বলেই স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা হাঁকান তিনি। সেই ছক্কাতেই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় জয়, ভারতীয় ড্রেসিংরুমে শুরু হয় উল্লাস। পরের বলেই মিড-অফ দিয়ে চার মেরে আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলেন।
স্যামসনের ইনিংসে মুগ্ধ হয়ে রবি শাস্ত্রী বলে ওঠেন, “সানজু, সুপার স্যামসন!” ৫০ বলে ৯৭ রানের ইনিংস খেলে জয় নিশ্চিত করার পর হেলমেট খুলে হাঁটু গেড়ে বসে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়ার সময় টুপি খুলে তাকে কুর্নিশ করলেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। আর গম্ভীরের আলিঙ্গনে মেলে ‘স্পেশাল নক’-এর স্বীকৃতি।
ভারতের জন্য এই জয় নিছক আরেকটি জয় নয়—এটি প্রতিশোধের, মুক্তির। ২০১৬ সালের সেই হার দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়িয়েছে দলটি। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, মহেন্দ্র সিং ধোনি, জাসপ্রিত বুমরাহ, হার্দিক পান্ডিয়ারা নানা সময়ে স্বীকার করেছেন সেই আক্ষেপের কথা। ইডেন গার্ডেনে এবার উপস্থিত ছিলেন বুমরাহ ও হার্দিক—তাদের চোখের কোণের আনন্দাশ্রুই যেন বলে দিল, অবশেষে ভরেছে সেই পুরোনো ক্ষত।
ইডেনে নীল সমুদ্রে (ভারতীয় জার্সির নীল রঙ) আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেটে ১৯৫ রান করে। জবাবে ভারত ৪ বল আগে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে।
ভারতের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল বেশ নড়বড়ে। ওপেনার অভিষেক শর্মা ১১ বলে ১০ রান করে স্পিনার আকিল হোসেনের শিকার হন। আর ইশান কিষান ৬ বলে ১০ রান করে জেসন হোল্ডারের বলে শিমরন হেটমায়ারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন।
চাপে পড়া দলকে তখন সামাল দেন সানজু স্যামসন ও সূর্যকুমার যাদব। সূর্যকুমার শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে খেললেও স্যামসন ছিলেন আক্রমণাত্মক। একপ্রান্ত আগলে রেখে উইকেটের চারপাশে দারুণ সব শটে রান তুলতে থাকেন তিনি। মাত্র ২৬ বলেই তুলে নেন নিজের ফিফটি, আর তাতেই জবাব দিতে থাকে ভারত।
১০ ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৯৮ রান। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ছিল আরও ৯৮ রান—যা টি-টোয়েন্টিতে মোটেও অসম্ভব নয়।
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এত সহজে ম্যাচ ছাড়েনি। ১১তম ওভারে পেসার শামার জোসেফ ফিরিয়ে দেন সূর্যকুমার যাদবকে। জীবন পেয়েও ইনিংস বড় করতে পারেননি ভারত অধিনায়ক, ১৬ বলে ১৮ রানেই থেমে যান।
এরপর সানজু স্যামসন ও তিলক ভার্মার ২৬ বলে ৪২ রানের জুটি আবারও ম্যাচে ফেরায় ভারতকে। তিলক ১৫ বলে ২৭ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন। তবে তার ইনিংসের ইতি ঘটে হেটমায়ারের দারুণ এক ক্যাচে, যা ম্যাচে নতুন উত্তেজনা যোগ করে। কিন্তু সেই উত্তেজনায় কেবল ছিল স্যামসন ও হার্দিকের দাপট দেখানো ব্যাটিংয়ে।
সাবলীল ব্যাটিংয়ে, কোনো ঝুঁকি না নিয়েও কীভাবে বল ও রানের ব্যবধান কমিয়ে অনায়েসে জয় তোলা যায় তা তারা দেখিয়ে দিয়েছেন। ইনিংসের শুরু থেকে ধ্রুপদী ব্যাটিং করে আসা স্যামসন সেঞ্চুরির দিকে আগাননি, বরং দলকে কতটা সহজে জেতাতে পারবেন সেই মানসিকতায় ব্যাটিং করেছেন। ৫০ বলে ৯৭ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ১২টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজিয়েছেন নিজের ইনিংস। হার্দিক অবশ্য ম্যাচ শেষ করে আসতে পারেননি। সামারের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন। এর আগে ১৪ বলে ১৭ রান করেন।
এর আগে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং নেওয়া ভারতের বিপক্ষে ব্যাট করতে নেমে ভালো সূচনা এনে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার শেই হোপ ও রোস্টন চেজ। পাওয়ার প্লেতে তারা তুলেন ৪৫ রান। এরপরও ধারাবাহিক আক্রমণে এগোতে থাকে স্কোরবোর্ড।
প্রথম সাফল্যের জন্য ভারতকে অপেক্ষা করতে হয় নবম ওভার পর্যন্ত। ওই ওভারের পঞ্চম বলে হোপকে বোল্ড করেন বরুণ। ক্যারিবীয়ান অধিনায়ক ৩৩ বলে ৩২ রান করেন, যেখানে ছিল ৩টি চার ও ১টি ছক্কা। তিন নম্বরে নেমে শিমরন হেটমায়ার স্বভাবসুলভ আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে রান তোলার গতি বাড়ান। মাত্র ১২ বলে ১ চার ও ২ ছক্কায় ২৭ রান করে ফেলেন তিনি।
এক সময় মনে হচ্ছিল বড় ইনিংস খেলবেন, কিন্তু বুমরাহর বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। আউটের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রিভিউ নিলেও রিপ্লেতে দেখা যায় ব্যাটের হালকা ছোঁয়া লেগেই বল উইকেটকিপারের হাতে গেছে। এরপরও নিজের আউট নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন হেটমায়ার, কোচ স্যামিও ছিলেন অসন্তুষ্ট।
এরপর দ্রুত আরও দুই উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চেজ ৪০ রান করে বুমরাহর শিকার হন, আর রাদারফোর্ডকে ফেরান হার্দিক পান্ডিয়া। ১০২ থেকে ১১৯ রানে যেতে গিয়ে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দলটি।
তবে সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন রোভমান পাওয়েল ও জেসন হোল্ডার। পঞ্চম উইকেটে তাদের ৩৫ বলে ৭৬ রানের জুটি ম্যাচে নতুন গতি আনে। থিতু হওয়ার পর দুজনই পাল্টা আক্রমণে ভারতীয় বোলারদের চাপে ফেলেন। চার-ছক্কার বন্যায় দ্রুত বাড়তে থাকে স্কোর।
পাওয়েল ১৯ বলে ৩৪ রান করেন (৩ চার, ২ ছক্কা), আর হোল্ডার ২২ বলে ৩৭ রান করেন (২ চার, ৩ ছক্কা) । তাদের দুজনের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৬০-এর বেশি, যা শেষ দিকে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা নড়বড়ে করে দেয়।
ভারতের হয়ে বুমরাহ ৩৬ রানে ২ উইকেট নিয়ে ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার। এছাড়া একটি করে উইকেট পান হার্দিক পান্ডিয়া ও বরুণ।
ভারতীয় দলে স্যামসনের জায়গা কখনোই থিতু হয় না। আসা-যাওয়ার ভেতরেই থাকেন। আজকের ইতিহাস গড়া রান তাড়ায় নিশ্চিতভাবেই কেরালার তারকার পায়ের নিচের মাটি শক্ত হয়ে গেল।