ভাঙা হৃদয় ‘জোড়া’ লাগবে এবার- এমন প্রশ্নই যেন ভেসে বেড়াচ্ছে চারদিকে। সময়, দূরত্ব আর নীরবতার দীর্ঘ দেয়াল পেরিয়ে কি আবারও খুঁজে পাওয়া যাবে হারিয়ে ফেলা সেই হৃদয়? সেই অনুভূতিগুলো?
বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে বেদনাময় গল্পগুলোর একটি যেন নিউ জিল্যান্ডের। স্বপ্নের এত কাছে গিয়ে বারবার ফিরে আসার কষ্ট তারা বহুবার অনুভব করেছে। সাদা বলের ক্রিকেটে একটি শিরোপার খোঁজে তারা বছরের পর বছর আইসিসির প্রতিটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে যাচ্ছে। দুইটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল, একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল ও দুইটি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল হারে নিউ জিল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে স্রেফ চূর্ণবিচূর্ণ।
ছক কষা ক্রিকেট খেলে ফাইনালে উঠে যায় ক্রিকেটাররা। আলোচনায় থাকে না…লাইমলাইটেও তেমন দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু ২২ গজে নিজেদের কাজটা শতভাগ পেশাদারিত্ব দিয়ে করে নিউ জিল্যান্ড বরাবরই দুর্বার, অনন্য, অনবদ্য। কিন্তু ফাইনালে উঠেও ট্রফি ছুঁতে পারে না কিউইরা- প্রতিবারই শেষ ধাপে এসে ভেঙেছে তাদের হৃদয়। তবু হাল ছাড়েনি দলটি।
হতাশার ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে আবারও তারা দাঁড়িয়ে গেছে আরেকটি ফাইনালের দোরগোড়ায়। ইতিহাসের সেই না-পাওয়ার বেদনা বুকে নিয়েই নতুন স্বপ্ন বুনছে নিউ জিল্যান্ড। আগামীকাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ভারত। প্রশ্নটা তাই আবারও সামনে- এবার কি জোড়া লাগবে নিউ জিল্যান্ডের ভাঙা হৃদয়? নাকি ট্রফির ঠিক আগে এসে আবারও থেমে যাবে তাদের স্বপ্ন?
নিউ জিল্যান্ড এমন না যে ট্রফি জেতেনি। ২০২১ সালে ভারতকে হারিয়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০০০ সালে সেই ভারতেই হারিয়ে আইসিসি নক আউট টুর্নামেন্ট জেতে। এরপরই এই প্রতিযোগিতা নতুন করে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নামকরণ করা হয়। এরপর দুইবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল খেলে নিউ জিল্যান্ড।
২০০৯ ও ২০২৫ সালে। প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে শিরোপা হাতছাড়া করে। পরেরবার দুবাইয়ে ভারতের কাছে। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিশ্চিতভাবেই নিউ জিল্যান্ডকে সবচেয়ে বেশি পুড়িয়েছে। লর্ডসে সেবার ইংল্যান্ডকে বাগে পেয়েও হারাতে পারেনি তারা। গাপটিলের সেই ঐতিহাসিক থ্রোতে বেন স্টোকসের ব্যাটে লেগে বাই ৫ রান…পুরো ম্যাচটাকেই তালগোল বানিয়ে ফেলে। পরে ম্যাচ হয়ে যায় টাই। এরপর সুপার ওভারও টাই হলে বাউন্ডারির হিসেবে নিউ জিল্যান্ড হেরে যায়। ইংল্যান্ড জেতে শিরোপা।
চার বছর আগে সেই একই চিত্র। ২০১৫ সালে মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার দাপটে টিকতে পারেনি কিউইরা। অথচ পুরো বিশ্বকাপ কী অসাধারণ খেলেছিল তারা। ফাইনালে গিয়ে সব হারায় তারা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা এর আগে একবারই ফাইনাল খেলেছে, ২০২১ সালে। কোভিডের পরপরই অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বেশ গোছানো ক্রিকেট খেলে নিউ জিল্যান্ড চলে যায় ফাইনালে। প্রতিপক্ষ তাসমান পাড়ের আরেক দেশ অস্ট্রেলিয়া। সেবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে ধরাশয়ী কিউইরা। মার্শ, ওয়ার্নাররা অতি সহজেই জিতে নেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।
৫ বছর পর আরেকটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ জিল্যান্ড। এবার বেশ উঠা-নামায় গেছে তাদের বিশ্বকাপের সফর। কিন্তু সেমিফাইনালে প্রতাপশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে তারা পাত্তাই দেয়নি। ফিন অ্যালেনের রেকর্ডময় সেঞ্চুরিতে উঠে যায় ফাইনালে। শিরোপা থেকে তারা এখন পা দূরে।
একবিংশ শতাব্দীতে ৬টি আইসিসি ইভেন্টের ফাইনাল খেলেছে নিউ জিল্যান্ড, ৫টিতেই হৃদয় ভেঙেছে তাদের। আহমেদাবাদের সবরমতী নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এবার কী তাদের ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগবে?
প্রশ্নটা বাতাসে ভাসছে। উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা থাক।