আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রান্সজেন্ডার নারী অ্যাথলেটদের আর নারীদের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হবে না। যা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক থেকে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নিয়ম পরিবর্তন নয়, বরং আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানে “ন্যায়বিচার বনাম অন্তর্ভুক্তি” বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নীতির মূল বিষয় কী? নতুন নীতির অধীনে নারীদের বিভাগে অংশ নিতে হলে জৈবিক নারী (বায়োলোজিকাল ফিমেল) হতে হবে। সকল নারী অ্যাথলেটকে এসআরওয়াই জিন টেস্ট (ডিএনএ-ভিত্তিক পরীক্ষা) দিতে হবে। যাদের শরীরে পুরুষ-সম্পর্কিত জিন বা বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে, তারা নারী বিভাগে খেলতে পারবেন না। আইওসি বলছে, এই পদক্ষেপ “ন্যায্য প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা এবং ক্রীড়ার অখণ্ডতা” রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। আইওসি প্রেসিডেন্ট কির্স্টি কোভেন্ট্রি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, “নারীদের ক্রীড়ায় ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
কেন এই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে? গবেষণা অনুযায়ী, পুরুষদের শারীরিক সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ১০–২০% বেশি, কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি। যারা পুরুষ হিসেবে বয়ঃসন্ধি পার করেছে, তাদের শরীরে শক্তি, গতি ও সহনশীলতায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকে। অনেক নারী অ্যাথলেট মনে করেন, এতে তাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” নিশ্চিত হবে। বিশ্বজুড়ে অনেক নারী ক্রীড়াবিদ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে “নারীদের বিভাগ রক্ষা করা জরুরি” এবং “দীর্ঘদিন ধরে অন্যায্য প্রতিযোগিতার আশঙ্কা ছিল।” সেটা এবার দূর হতে যাচ্ছে।
নেতিবাচক দিক: “বৈষম্য ও মানবাধিকার প্রশ্ন” এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠন ও ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়। তাদের মতে, এটি ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স অ্যাথলেটদের বাদ দেওয়া, বাধ্যতামূলক জেনেটিক টেস্টিংকে “অমানবিক” বলা হচ্ছে। অতীতে এমন পরীক্ষা মানসিক আঘাত সৃষ্টি করেছিল। একাধিক সংগঠন বলছে, “এটি নারী ক্রীড়াকে রক্ষা নয়, বরং নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে।”
ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের মতে, এই সিদ্ধান্ত তাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়কে অস্বীকার করছে। অনেকেই বলছেন, তারা কঠোর পরিশ্রম করে এখানে পৌঁছেছেন এবং তাদের “খেলার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে” এমন অভিযোগ উঠেছে। তাদের একটি বড় উদ্বেগ হলো- ভবিষ্যতে তারা কোন বিভাগে খেলবেন? “ওপেন ক্যাটাগরি” বাস্তবসম্মত হবে কি না?
আইওসি বলছে, এটি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘ গবেষণা ও আলোচনার ফল। যেটার লক্ষ্য হচ্ছে ‘‘স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভূক্তির মধ্যে ভারসাম্য আনায়ন। এই নীতি শুধু এলিট লেভেলের প্রতিযোগিতার জন্য, সাধারণ খেলাধুলায় নয়।
এর আগে আইওসি সরাসরি কোনো একক নিয়ম দেয়নি; প্রতিটি খেলার ফেডারেশন নিজস্ব নিয়ম বানাতো। কিন্তু নতুন এই সিদ্ধান্ত- প্রথমবারের মতো একটি একক ও কঠোর বৈশ্বিক নীতি। যা বিশ্ব ক্রীড়ানীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এই সিদ্ধান্ত ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একদিকে নারী ক্রীড়াবিদদের ন্যায্যতার দাবি, অন্যদিকে অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। ফলে স্পষ্ট এটি শুধু ক্রীড়া নয়, বরং বিজ্ঞান, সমাজ ও রাজনীতির মিলিত বিতর্ক।