২০২৫ সালের মে মাসের ঘটনা। পারিবারিক কারণে বাংলাদেশে এসেছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তার সামনে খুলে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়ার দুয়ার। তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রভাব খাটিয়ে, গঠনতন্ত্রের ম্যাড়প্যাচে ফারুক আহমেদকে সরিয়ে আমিনুলকে রাতারাতি ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি বানিয়ে দেন।
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল কেবল নির্বাচনটা ঠিকঠাক পরিচালনা করবেন। টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলে নতুন বোর্ডের হাতে দায়িত্ব দিয়ে আমিনুল চলে যাবেন। কিন্তু আইসিসির উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে আসা আমিনুলের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। পরবর্তীতে নির্বাচনেও অংশ নেন এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাকাপাকিভাবে বিসিবির চেয়ার দখল করে নেন।
এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেটের নাটকীয় সব পরিবর্তন। ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিশ্বকাপ খেলতে না পারা, ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের দূরত্বসহ কতকিছু হয়ে গেল। নতুন বোর্ডের মেয়াদ ছয় মাসও হয়নি। অথচ সেই বোর্ড ভেঙে গেল সেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সিদ্ধান্তে। আমিনুল হারালেন নিজের গদি।
দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে হারানো পর্যন্ত আমিনুল কী কী করেছিলেন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক-
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা: আমিনুর ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ প্রথম খেলেছিল ৯৯’র বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ খেলার ওজন, মাহাত্ব তার থেকে বেশি বোঝার কথা আর কার? অথচ তার অধীনেই যখন বোর্ড তখন বাংলাদেশ খেলতে পারল না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তার অধীনস্ত বোর্ড যখন বলে একটা বিশ্বকাপ না খেললে কিছু যায় আসে না তখন সেটা ব্যর্থতারই শামিল হয়ে যায়। সরকারের সিদ্ধান্ত হাসিমুখে বোর্ড মেনে নেয়। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার মতো নুন্যতম সাহসটা দেখাতে পারেননি আমিনুল।
ঘরোয়া ক্রিকেট আতুড়ঘরে! নিজের খেলোয়াড়ী জীবনে মাঠে ক্রিকেট চালু করা নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন আমিনুল ইসলাম। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তাদের আন্দোলনের খবর মোটামুটি সবারই জানা। অথচ আমিনুল যখন ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান, তখন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট চলে যায় আতুড়ঘরে। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগের খেলা চালাতে পারেননি। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। যা শুরু করতে কোনো উদ্যোগই নেননি তিনি। খেলোয়াড়দের আয়ের প্রধান উৎস ঢাকা লিগ। যেখানে ১২ দলে ১৮০ জনের মতো ক্রিকেটার থাকে। অথচ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ফয়সালা করেননি আমিনুল।
বিতর্কিতদের পুরস্কৃত করা: সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে ভারতীয় দালাল এবং ক্রিকেটারদের পেছনে অহেতুক অর্থ খরচ নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে বিতর্কিত হয়ে উঠেছিলেন পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। তার কথায় প্রতিবাদ করে বিপিএলের খেলা বন্ধও রেখেছিলেন ক্রিকেটাররা। তার পদত্যাগ চেয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু এম নাজমুলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি আমিনুল। সাময়িক সময়ের জন্য তার পদ থেকে সরিয়ে রাখা হলেও পরবর্তীতে তাকে ফিরিয়ে এনে লাইমলাইটে নিয়ে আসেন। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে এম নাজমুলের প্রশংসাতেই মত্ত্ব ছিলেন বিসিবির সাবেক সভাপতি।
ক্রিকেটারদের সঙ্গে দূরত্ব: ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) হচ্ছে ক্রিকেটারদের সংগঠন। ক্রিকেটারদের ভালো-মন্দর রূপরেখা তারাই তৈরি করেন। অথচ এই সংগঠনের সদস্য হয়েও আমিনুল বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে চরম দূরত্ব তৈরি করেন। মাঠে ক্রিকেট চালু নিয়ে কোয়াবের প্রতিনিধি দল বারবার আমিনুলের দ্বারস্থ হতে চেয়েছে। কিন্তু তাদেরকে কোনো পাত্তাই দেননি আমিনুল। এছাড়া খেলা বাদেও নানা উটকো ঝামেলায় কোয়াব পাশে পেতে চেয়েছে বোর্ড সভাপতিকে। বরং তারা হতাশ হয়েছে প্রতিবারই।
ক্ষমতার অপব্যবহার, পরিচালকদের অনাস্থা: লম্বা পরিচালনা পরিষদ ছিল আমিনুল ইসলামের। কিন্তু একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ছিল তার। তাতে ক্রমেই বাড়ছিল সমালোচনা। সর্বশেষ তিনি বোর্ড নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ গঠিত তদন্তে কমিটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নির্বাচিত বোর্ডে বাইরের হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে সতর্ক করেন। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এছাড়া বেশ কিছু নিয়োগ, তাদের বেতন বাড়ানো নিয়েও কড়া সমালোচনা হয়েছে। তার একক সিদ্ধান্তে পরিচালকরা নিজেদেরকে ‘পুতুলই’ ভাবছিলেন। তাইতো একাধিক পরিচালক ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
গণমাধ্যমের সঙ্গে যুদ্ধ: ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন শেষে দায়িত্ব গ্রহণের দিনই আমিনুল ইসলামকে বলা হয়েছিল, গণমাধ্যমের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে। কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। সুসম্পর্ক নষ্ট করার পাশাপাশি পছন্দ না হলেই নাম্বার ব্লক করে রাখার কাজ করতেন। এছাড়া মাঠে গণমাধ্যম প্রবেশাধিকার সংরক্ষণের মতো কাজও করেছেন। গণমাধ্যমের কাজের পরিবেশ, গণমাধ্যমের কাজ নিয়ে সমালোচনা করার কাজ করেছেন হরহামেশা। তার এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে অদম্য টি-টোয়েন্টি কাপের ফাইনাল বর্জন করেছিল গণমাধ্যমকর্মীরা। তাতেও তার কোনো হেলদোল ছিল না।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবিতে আসার আগে ছিলেন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় নাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার থেকে প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বি। কিন্তু নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে তিনি যেতে পারেননি। বরং বিতর্কিত কাজ করে প্রবল সমালোচিত হয়েছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় নিশ্চিতভাবেই, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যারপরনাই চেষ্টা করা। তাতে তার জনপ্রিয়তা নিশ্চিতভাবেই ভাটা পড়ল।