খেলাধুলা

আনন্দের সঙ্গে সঙ্গী আফসোসও

আর কতো? প্রশ্নটা মুমিনুল হককে সরাসরিই করা উচিৎ? শেষ চারটি পঞ্চাশ ছাড়ানো ইনিংসের স্কোর যথাক্রমে ৮২, ৬৩, ৮৭ ও ৯১। সবশেষ ৯১ রানের ইনিংসের ক্ষত তো এখনও দগদগে! ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে নিদারুণ ভালো ব্যাটিং করতে করতে উইকেট বিলিয়ে এলেন স্পিনার নোমান আলীকে। যার ৬ নো বল নিয়ে ফিসফাস হচ্ছে প্রবলভাবে।

মুমিনুলের আক্ষেপের দিনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সেঞ্চুরির ডানা মেলে ধরলেন। সেঞ্চুরি নাম্বার নাইন। যেই ইনিংসটিকে ব্যাখ্যা করা যায় দুই শব্দে, টপ ক্লাস।’ নাজমুল দেখালেন ধারাবাহিকতা। শেষ আট ইনিংসের চারটি সেঞ্চুরি।

বিপরীতমুখি মুমিনুলকে নিয়ে নাজমুল মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাড়ি দিলেন লম্বা পথ। তাতে শুরুর ধাক্কার পর মধ্য দুপুর পেরিয়ে শেষ বিকেলেও হাসি ফুটেছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। ১৭০ রানের জুটি পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় উইকেটে সর্বোচ্চ। দায়িত্বশীল ইনিংস শেষে নাজমুল থামলেন ১০১ রানে। মুমিনুলের ৯ রানের আক্ষেপের দিনে মুশফিকুরের ব্যাট থেকে এলো ঝলমলে ৪৮। তাতে ৪ উইকেটে ৩০১ রানে বাংলাদেশ প্রথম দিনটা হাসিমুখেই শেষ করেছে।

ছয় মাস পর টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশের দিনটা কেমন যায় তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ছিল। বিশেষ করে মিরপুরের সবুজাভ উইকেট স্বাগতিকদের কাছেও খুব একটা পরিচিত না। টসটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যা পক্ষে আসেনি নাজমুলের। শান মাসুদ টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠালে চিন্তার ভাজ ছিল। তা আরও বাড়িয়ে দেন দুই ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদমান ইসলাম।  নতুন বলে ৪ রানে জীবন পাওয়ার পর ৮ রানে আউট হন মাহমুদুল। উইকেটের পেছনে আফ্রিদির বলে রিজওয়ানের গ্লাভসবন্দী হন। হাসান আলী বল হাতে নিয়ে প্রথম বলে সাদমানকে আউট করেন দ্বিতীয় স্লিপে তালুবন্দি করিয়ে। প্রথম ঘণ্টার আগেই ৩১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে।

সেখান থেকে শুরু হয় নাজমুল ও মুমিনুলের লড়াই। আত্মবিশ্বাসে টইটুম্বুর নাজমুল শুরু থেকে ছিলেন ছন্দময়। পায়ের ব্যবহারে দেখিয়েছেন কার্যকারিতা। পেসারদের বিপক্ষে ছিলেন একেবারে সাবলীল। ছিল না জড়তা। ছিল না সংশয়, ভয়। বরং ক্রিজ থেকে অনেকটা এগিয়ে পেসারদের লেন্থ এলোমেলো করে দিতে ভিন্ন কিছুর চেষ্টা ছিলেন তিনি। তাতে সফল হয়েছেন।

পেসার আব্বাসের বল অন ড্রাইভ করেছেন মুগ্ধতা ছড়িয়ে। আফ্রিদিকে কাভার ড্রাইভ করেছেন মুখে চওড়া হাসি নিয়ে। তার এই আত্মবিশ্বাসের রেণু ছড়িয়ে যায় মুমিনুলের ব্যাটে। রান পেতে শুরুতে একটু ভুগছিলেন। শান্ত প্রতিপক্ষের বোলারদের এলোমেলো করে দিয়ে মুমিনুলকে হাত খুলে খেলার সুযোগ করে দেন। দেখতে দেখতে দুজনের ব্যাটেই তখন হয়ে উঠে ধারালো।

শান্ত ফিফটি ছোঁয়ার পর সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যান। আব্বাস কিংবা আফ্রিদি বা হাসান যাকে পাচ্ছেন তাকেই শাসন করছিলেন। নব্বইয়ের ঘরে যেতে খেলেছেন দিনের সবচেয়ে সুন্দর শট। আব্বাসের ফুলার লেন্থ বল মাথার ওপর দিয়ে সোজা ছক্কা হাঁকান। ৮৯ থেকে তার রান চলে যায় ৯৫ এ। এরপর এক ওভার পর তাকে চার মেরে ৯৭ থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান।

দৃষ্টিনন্দন সব পুল, কাট, অন ড্রাইভ, কাভার ড্রাইভে শান্তর এই সেঞ্চুরি চোখে লেগে ছিল গোটা সময়। প্রতিপক্ষকে এক মুহূর্তের জন্য থিতু হতে দেননি। রান তুলেছেন অনায়েসে। অধিনায়ক হিসেবে এটি তার পঞ্চম সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে এতোদিন চার সেঞ্চুরি ছিল কেবল মুশফিকুর রহিমের।

নিজের চিরচেনা উদযাপনে সেঞ্চুরির পূর্ণতা দিয়েছেন। শূন্যে লাফিয়ে ওঠা, ব্যাট উঁচিয়ে চুম্বন ছুড়ে দেওয়া, স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন….। তবে সেই উদযাপনে মনোযোগ হয়েছে বোঝা গেছে স্পষ্ট। আব্বাসের করা পরের বলেই এলবিডব্লিউ নাজমুল। রিভিউ নিয়ে তাকে ফিরিয়ে পাকিস্তান শিবিরে ফিরে আসে স্বস্তি।

নাজমুলের ফেরার পর মুমিনুলের জন্য কেবল অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষা বাড়ছিল মুমিনুলের অতি সাবধানী ব্যাটিংয়ে। আগের তিন ইনিংসে সেঞ্চুরি নেই। ২০২৪ সালের পর কোনো তিন অঙ্কের দেখা নেই। নিজের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুমিনুল চেয়েছিলেন আজ ম্যাজিকাল তিন অঙ্কের ঘরে যেতে। কিন্তু পারলেন না এবারও। নোমান আলীর বল জোড়া পায়ে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন। প্রথমবার নার্ভাস নাইন্টিজে গিয়ে গেলেন আটকে।

বাংলাদেশ এখন তাকিয়ে মুশফিকুর ও লিটনের ব্যাটে। মুশফিকুর ৪৮ ও লিটন ৮ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন। দারুণ ব্যাটিংয়ে দিনটা নিজের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আক্ষেপও আছে। নাজমুলের ইনিংস বড় না হওয়ার, মুমিনুলের সেঞ্চুরি না হওয়ার।