ঘড়ির কাঁটায় তখন ৫টা ২৫ মিনিট। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম ছোঁয়ায় মিরপুরের সবুজ গালিচা যেন সোনালি স্বপ্নে মোড়া এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর। যেখানে সেঞ্চুরির ফুল ফোটানোর অপেক্ষায় আজান আওয়াইস। সঙ্গী আব্দুল্লাহ ফজলও দ্যুতি ছড়িয়ে চমকে দেওয়ার অপেক্ষায়। দুই অভিষিক্তের স্বপ্ন পূরণের মঞ্চে পাকিস্তানের জন্য দিনটা হয়ে উঠল রঙিন। বাংলাদেশ জন্য বিবর্ণ, ধূসর।
৪১৩ রানে বাংলাদেশকে আটকে রেখে ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনে পাকিস্তান ১ উইকেটে তুলল ১৭৯ রান। ২৩৪ রানে অতিথিরা পিছিয়ে থাকলেও শুরুর ব্যাটিং পরীক্ষায় উতরে গিয়ে আনন্দে আত্মহারা অতিথিরা। বিশেষ করে দুই অভিষিক্তের নান্দনিক নিদর্শনে।
আজান ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন। ১২ চারে সাজানো তার ইনিংসটি এতোদূর আসতো কিনা সেটাও ভাবনার। নাহিদ রানার ১৪১ গতির বাউন্সার তার হেলমেটে আঘাত করে দিনের শুরুতেই। এরপর চিকিৎসা নিয়ে ২২ গজে রানের ফুলঝুরি ছোটান। দারুণ সব শটে ২১ বছর বয়সী ছড়ান মুগ্ধতা।
১০৬ রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙে পাকিস্তানের। মিরাজ বোলিংয়ে এসে ৪৫ রান করা ইমাম-উল-হককে এলবিডব্লিউল করেন। তিনে নেমে আব্দুল্লাহ ফজল সময় নেন। ১৯তম বল পর্যন্ত নিজের প্রথম রানের জন্য অপেক্ষা করেন। এরপর নাহিদ রানার বাউন্সার স্কয়ার কাট করে পাঠান বাউন্ডারিতে। মনোযোগে নূন্যতম চিড় ধরতে না দিয়ে আব্দুল্লাহ দিনের বাকিটা সময় কাটিয়ে দেন আপন ছন্দে। জমা করেছেন ৩৭ রান। যেখানে সুর তাল ও লয়ের কোনো ত্রুটি নেই। তাতেই ব্যাকফুটে চলে গেছে বাংলাদেশ।
এর আগে বাংলাদেশের জন্য দিনের শুরুতে প্রথম ঘণ্টাটা ছিল কঠিন পরীক্ষার মতো। সেই চ্যালেঞ্জ ভালোভাবেই সামলেছেন মুশফিকুর রহিম। তবে লিটন দাস শেষ পর্যন্ত হতাশই করেছেন। যদিও তার শুরুটা ছিল দারুণ আত্মবিশ্বাসী। দিনের দ্বিতীয় ওভারেই শাহীন শাহ আফ্রিদিকে টানা তিনটি চার মেরে দারুণ বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল, লিটন বেশ ছন্দে আছেন।
কিন্তু সেই ছন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। মোহাম্মদ আব্বাসের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়েও জীবন পান লিটন। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ৩৩ রান করেই থামতে হয় তাকে। আব্বাসের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে আউট হন এই ব্যাটসম্যান।
মুশফিকুরের সঙ্গে লিটনের ৬২ রানের জুটি ভাঙতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। এরপর আর কাউকেই ভরসা জোগাতে দেখা যায়নি। মেহেদী হাসান মিরাজ ১০ ও তাইজুল ইসলাম ১৭ রান করে ফিরলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দুটি উইকেটই তুলে নেন আব্বাস। প্রথম সেশনেই ৩ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে যায় বাংলাদেশ।
দলের আশা-ভরসার কেন্দ্র হয়ে ছিলেন শুধু মুশফিকুর। টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৯তম ফিফটির পর তিনি এগোচ্ছিলেন বড় ইনিংসের দিকেই। কিন্তু ৭১ রানে পৌঁছে বিপদে পড়েন তিনি। লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই তাকে বোল্ড করেন শাহীন আফ্রিদি। তখন বাংলাদেশের স্কোর ৪০০ ছুঁতে আর মাত্র ২০ রান দূরে।
এরপর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাসকিন আহমেদ। ব্যাট হাতে খেলেন ঝকঝকে এক ক্যামিও ইনিংস। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণের প্রায় সব শটই দেখা গেছে তার ব্যাটে। মাত্র ১৯ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কায় করেন ২৮ রান। তাতেই বাংলাদেশের সংগ্রহ পৌঁছে যায় ৪১৩ রানে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। চা-বিরতির প্রায় এক ঘণ্টা আগে অলআউট হয় বাংলাদেশ।
স্কোরবোর্ডে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকলেও বোলিংয়ে কাঙ্খিত লড়াই হয়নি। বল কয়েকটা নিচু হলেও বাকিটা সময়ে ব্যাটসম্যানরা আনন্দেই কাটিয়েছেন। উইকেটে বোলারদের জন্য তেমন কিছু নেই। ব্যাটসম্যানরা ভুল না করলে আউট করা কঠিনই হয়ে যাবে।