মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে কাঁপল পাকিস্তান। মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৫ উইকেট শিকার করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দেন বাংলাদেশের হাতে। তার নিখুঁত লাইন-লেংথ আর ধারালো স্পিনে একের পর এক ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফিরলে চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান। বাংলাদেশ পেয়ে যায় লিড।
পাকিস্তানের বিপক্ষে তার দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৪তম ফাইফার পেয়েছেন। দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মিরাজ।
মিরাজ, উইকেটটা আসলে কেমন ছিল? আর আপনারা মূলত কোন বিষয়ে বেশি ফোকাস করেছেন? লাইন-লেন্থে বেশি গুরুত্ব ছিল? মিরাজ: উইকেটটা অনেক ভালো ছিল। দেখেছেন, শুরুতে ওরা খুব ভালো ব্যাটিং করেছে এবং বড় পার্টনারশিপও হয়েছে। তবে আমরা ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করেছি। কারণ প্রথম দিন ওরা অনেক ভালো ব্যাটিং করেছে, আর আমাদের মানসিকতা ছিল, যেহেতু প্রথম সেশনটা আমরা ভালো করতে পারিনি এবং অনেক রান দিয়ে ফেলেছি, তাই কীভাবে রান আটকানো যায় সেটাই ছিল মূল ফোকাস।
স্পিন কি বেশি হচ্ছিল? মিরাজ: খুব বেশি স্পিন হচ্ছিল না। তবে আমি চেষ্টা করেছি ভালো জায়গায় বল করতে। একই সঙ্গে কিছুটা সুবিধাও পেয়েছি। সব বল স্পিন করেনি, কিছু কিছু বল টার্ন করেছে। এতে হয়তো ব্যাটসম্যানদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, আর সে কারণেই উইকেট পাওয়া কিছুটা সহজ হয়েছে।
গতকালের বোলিং পরিকল্পনা আর আজকের পরিকল্পনার মধ্যে কী পরিবর্তন ছিল, যার কারণে আজ বেশি সাফল্য পেয়েছেন? মিরাজ: আমাদের বোলারদের পরিকল্পনা একটাই ছিল, কীভাবে রান আটকানো যায় এবং সঠিক জায়গায় বল করা যায়। আমরা মিরপুর সম্পর্কে ভালো জানি, এখানে অনেক খেলেছি বলে অভিজ্ঞতাও আছে। তাই সবাই একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে বল করার চেষ্টা করেছি। দলের বার্তাও ছিল একটাই, যদি আমরা ভালো জায়গায় টানা বল করতে পারি, তাহলে সুযোগ আসবেই। আমরা সেটাই করেছি।
গতকাল সালাউদ্দিন ভাই বলছিলেন উইকেটে স্পিনারদের জন্য খুব বেশি সাহায্য নেই, পেসারদেরই কাজ করতে হবে। কিন্তু আজ আপনিই পরপর উইকেট পেলেন। তাহলে কি উইকেট পরে আপনাদের পক্ষে চলে এসেছে, নাকি ব্যাটসম্যানরা ভুল করেছে? মিরাজ: উইকেট খুব বেশি স্পিন করছিল না। তবে আমি আর তাসকিন দুই প্রান্ত থেকে খুব ভালো পার্টনারশিপ বোলিং করেছি। আমরা চাপ তৈরি করতে পেরেছি, আর সেখান থেকেই ব্যাটসম্যানরা ভুল করেছে। টেস্ট ক্রিকেটে আপনি যতক্ষণ ভালো জায়গায় বল করবেন এবং ব্যাটসম্যানকে রান করতে দেবেন না, ততক্ষণ সুযোগ আসবেই। আমি এক প্রান্ত থেকে টাইট বোলিং করেছি, তাসকিন উইকেট পেয়েছে। আবার তাসকিন টাইট বল করেছে, আমি উইকেট পেয়েছি। আমাদের বোলিং পার্টনারশিপটা খুব ভালো ছিল।
একসময় পাকিস্তানের চার উইকেট দ্রুত পড়ে যায়, কিন্তু এরপর আবার একটা পার্টনারশিপ হয়। তখন কি আপনাদের মনোযোগে ঘাটতি ছিল? আর কত রান নিরাপদ হতে পারে বলে মনে করছেন? মিরাজ: পার্টনারশিপ ক্রিকেটেরই অংশ। যেকোনো সময় হতে পারে। তবে আমার মনে হয়, আমরা তখনও ওদের চাপে রেখেছিলাম এবং সুযোগও এসেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আউটটা নিতে পারিনি।নো বল হয়েছিল। সেটা হলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। এরপর ব্যাটসম্যান জীবন পাওয়ার পর মানসিকতাও বদলে যায়। তবে আমরা ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি এবং পুরো বোলিং ইউনিটই দারুণ করেছে।
আর এখনো দুই দিন বাকি। ম্যাচের ফলাফল এখনো ৫০-৫০ অবস্থায় আছে। আমরা খুব বেশি লিড পাইনি, তাই দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করতে হবে। মিরপুরে কত রান নিরাপদ, সেটা বলা কঠিন। তবে এমন একটা স্কোর করতে হবে যেটা বোলাররা ডিফেন্ড করতে পারে। আমার মতে, ২৯০-৩০০ রান এই উইকেটে ভালো স্কোর হতে পারে। কারণ চতুর্থ-পঞ্চম দিনে ব্যাটিং আরও কঠিন হবে।
আপনি বোলিং নিয়ে অনেক কাজ করেছেন, মুশতাক আহমেদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। এখন নিজের আত্মবিশ্বাসটা কোন পর্যায়ে আছে? মিরাজ: আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক দিন ধরেই নিজের বোলিং নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজ, নিউজিল্যান্ড সিরিজ এবং এই সিরিজে হয়তো কিছুটা আত্মবিশ্বাস কমে গিয়েছিল। কিন্তু আমাকে নিয়ে অনেক কাজ করা হয়েছে, আর সেই কাজের কারণেই আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। হয়তো সবসময় অনেক উইকেট পাইনি, কিন্তু দলের প্রয়োজনে কার্যকর ছিলাম। টেস্ট ক্রিকেটে সময় বেশি থাকে, তাই নিজেকে ধরে রাখারও সুযোগ থাকে। আমি সেভাবেই চেষ্টা করছি।
বৃষ্টি কি আপনাদের ম্যাচে কোনো টার্নিং পয়েন্ট এনে দিয়েছে? মিরাজ: টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো- কখনো আপনি ভালো করবেন, কখনো খারাপ করবেন, আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও থাকবে। আমরা যেমন একসময় ব্যাটিংয়ে ভালো করছিলাম, পরে দ্রুত উইকেট হারিয়েছি। আবার ওরা ২০০ রান পর্যন্ত এক উইকেটে ছিল, পরে দ্রুত চার উইকেট হারিয়েছে। আবার পার্টনারশিপও করেছে। টেস্ট ক্রিকেট এমনই। যারা কম ভুল করবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। আমাদেরও কিছু ভুল ছিল, তবে আমরা মানসিকভাবে সেটা ভালোভাবে সামলেছি।
পেসারদের কাছ থেকে বেশি প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু দুই স্পিনারই সাত উইকেট নিয়েছেন। তাসকিন দীর্ঘদিন পর ফিরে এসেও ভালো করেছে। ওর বোলিং নিয়ে কী বলবেন? মিরাজ: আমার কাছে মনে হয় তাসকিন যেভাবে বোলিং করেছে, সেটাই বড় কারণ যে আমরা ওদের কম রানে আটকাতে পেরেছি। ও যখন দুইটা উইকেট নিয়েছে, আমিও দুইটা নিয়েছি। আমাদের পার্টনারশিপটা খুব ভালো ছিল। টেস্ট ক্রিকেটে যদি এক প্রান্ত থেকে রান হয় আর অন্য প্রান্ত থেকে চাপ থাকে, তাহলে উইকেট পাওয়া কঠিন। কিন্তু দুই প্রান্ত থেকেই যদি টাইট বোলিং হয়, তখন ব্যাটসম্যান রান করার উপায় খুঁজতে গিয়ে ভুল করে। আমরা সেভাবেই পরিকল্পনা করেছি।
তাসকিন অনেক দিন পর টেস্ট খেলেছে, তাই ওর জন্য কিছুটা কঠিন ছিল। কিন্তু ওর বোলিং আমার খুব ভালো লেগেছে। রানা ভালো করেছে, ইবাদতও ভালো বল করেছে। আমার মনে হয় না আমাদের বোলিং ইউনিট খারাপ করেছে। কারণ আমরা ওদের লিড নিতে দিইনি, লিডের আগেই আটকে দিয়েছি। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক।