তিনি প্রশ্ন করেন। অভিজ্ঞ যাকে পান, তার কাছেই জানতে চান এটা-সেটা। আর সেই প্রশ্নগুলো কেবল শব্দ হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায় না। ধাক্কা দেয় অভ্যাসে, অস্বস্তি তোলে নীরবতায়। সংকোচহীন উচ্চারণে, অবদমিত কৌতূহলকে সামনে এনে নাহিদ রানা যেন তৈরি করেছেন এক নতুন ভাষা। যেখানে প্রশ্ন করা দুর্বলতা নয়, বরং সাহসের আরেক নাম।
সময়ের প্রচলিত ভদ্র নীরবতা ভেঙে তিনি উঠে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশংসায় ভাসছেন, আলো ছড়াচ্ছেন নিজের মতো করে। এই অদম্য কৌতূহলই তৈরি করেছে তার ‘উত্থান’-এর গল্প। এক তরুণ কণ্ঠের গল্প, যে থেমে থাকতে শেখেনি।
বল হাতেও। এখন নাহিদ যেন এক ঔদ্ধত্যের নাম। আগুনঝরা গতির গোলায় ছারখার করে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষকে। প্রাপ্তির ডালায় জমছে সাফল্য, অর্জনের মালায় জুড়ছে নতুন নতুন কীর্তি।
নাহিদ যে একদিন এমন কিছু করে দেখাবেন, তা অনেক আগেই বুঝেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। ১০১ টেস্ট খেলা এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার প্রথম নাহিদকে দেখেছিলেন রাজশাহীতে। এক মৌসুম খেলেছেনও একসঙ্গে। পরে মুশফিকুর সিলেটের হয়ে খেললেও নাহিদকে চোখের আড়াল করেননি। ধাপে ধাপে নাহিদের পথচলা পৌঁছে গেছে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে। যেখানে মুশফিকুরের কাছাকাছিই এখন তার অবস্থান।
নাহিদকে প্রথম দেখা থেকে শুরু করে তার এগিয়ে চলার প্রতিটি ধাপই নজর কেড়েছিল মুশফিকুরের। সিলেটে বসে সেই গল্পই শুনিয়েছেন তিনি,
‘‘ওকে আমি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকেই চিনি। আমি রাজশাহীর হয়ে যখন শেষ খেলেছিলাম, চারটা ফোর ডের ম্যাচ খেলেছি। তখনই আমি নাহিদ রানাকে দেখেছি এবং কাছ থেকে ওকে দেখা এবং ওর সাথে খেলা। তখন থেকে আমার একটা জিনিস খুবই ভালো লেগেছিল ওর এবং আমি জানতাম যে ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হয়ে খেলবে।’’
‘‘তখন থেকে ওর শেখার আগ্রহ অনেক বেশি ওর নিজের উন্নতি করার যে ইচ্ছাটা সেটা তরুণ খেলোয়াড়ের মধ্যে খুব কম থাকে। আবার কারোর হয়তো বা থাকে কিন্তু সে হয়তো বা নিজে থেকে ওটা বলতে চায় না। একটু সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আমি নাহিদকে দেখেছি, কখনো সংকোচবোধ করতো না। ও আমাকে বলেন বা ওখানে তখন ফরহাদ ভাই ছিল, ফরহাদ হোসেন ছিল, জুনায়েদ সিদ্দিকী ছিল, অমি ভাই ছিল। অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় ছিল যাদেরকে ধারাবাহিক পুশ করে ও জানতে চাইতো, ‘ভাই আমি আরেকটু কি করলে কিংবা লাইফস্টাইল কেমন হলে উন্নতি করা যাবে।’ এরকম আর কী।’’ – অনর্গল বলে যান মুশফিকুর।
১৯ ইনিংসে ৩৩ উইকেট নেওয়া নাহিদের এই গুনটিই মুশফিকুর রহিমের মনে ধরেছিল সবচেয়ে বেশি, ‘‘তরুণ একজন খেলোয়াড়কে দেখে অবাকই হয়েছিলাম। সঙ্গে খুশিও ছিলাম। তারপরের দুই বছর আমি খেলিনি রাজশাহীতে। কিন্তু ওর যে গ্রোথটা হয়েছে তো, এটা দেখে আমি কখনোই অবাক হইনি কারণ ওকে দেখেই আমি বুঝিলাম, ওর যে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, এখনো আছে এবং ভালো করার পরও যেভাবে নির্দিষ্ট ব্যাটসম্যানকে নিয়ে বা ওর ওয়ার্ক এথিক্স নিয়ে কাজ করা, এটা খুবই ভালো দিক। যদি কোনো তরুণ ক্রিকেটার এরকম না হয় তাহলে দলের পরিবেশও ভিন্ন হয়।’’
মুশফিকুরের বিশ্বাস আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সময়, মাঠ আর মানুষের মনে। তার দেখা সম্ভাবনার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ছায়া দিচ্ছে ভবিষ্যতের ক্রিকেটে। এই আস্থা কেবল একজন খেলোয়াড়ের মূল্যায়ন নয়, বরং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক নীরব ভবিষ্যদ্বাণী। যা ধীরে ধীরে বাস্তবতার রূপ নিতে শুরু করেছে।