সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সকালটা যেন ছিল নিখাদ টেস্ট ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত এক থ্রিলার। মাত্র ৬৫ মিনিটেই মিলেছে মধুর সমাপ্তি, ৬৮ বলেই তৈরি হয়েছে রোমাঞ্চের নতুন গল্প।
৪৩ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটে সামান্য রোমাঞ্চ আর একটু উত্তেজনাই কখনও সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।
চোখে চোখ রেখে লড়াই শুরু করা এই দল ঘামের প্রতিটি বিন্দু ঝরিয়েছে জয়ের জন্য। আর সেই পরিশ্রমের প্রতিদান মিলেছে দারুণ এক সাফল্যে। ইতিহাসের অক্ষয় পাতায় নতুন অর্জনের গল্প লিখে বাংলাদেশ আবারও হয়ে উঠেছে অনন্য, অসাধারণ ও অনবদ্য।
‘সিলেটে উইকেট নয়, কন্ডিশন হবে চ্যালেঞ্জিং’- টেস্ট শুরুর আগে বলেছিলেন মুশফিকুর। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে শুধু মুশফিকুরই নয়, বাকি সবাই মনে করেছিল বৃষ্টি বাগড়া দেবে দুটি পাতা একটি কুড়ির শহরের দেশের টেস্ট ক্রিকেটে। কিন্তু কীসের কি!
সিলেটে প্রতিদিন মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা। কখনো কালো মেঘ আকাশ ভরে দেয়। কখনো সোনাফলা রোদ ছড়ায় কড়া তাপে। কিন্তু খেলা বন্ধ হয় না। চারদিন খেলা হয়েছে পুরো ওভার। কিন্তু ফল নির্ধারণ যেদিন হবে, বুধবার পঞ্চম দিন সেদিনই কিনা সকাল থেকে আকাশের মন খারাপ।
ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। সকালেও তা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের মাথায় দুঃশ্চিন্তা ভর করে। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ক্রিকেটাররা আসেন মাঠে। এরপর বৃষ্টি থামে। কভার তোলা হয়। মাঠের উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থায় খেলার আশা জেগে উঠে নিমিষেই। মাঠ পর্যবেক্ষণ করে আম্পায়ারার খেলা শুরুর সময় মাত্র ১৫ মিনিট পিছিয়ে দেয়।
তাতে বাংলাদেশের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠে। ওভারকাস্ট কন্ডিশনে চেপে ধরা যাবে রিজওয়ান, সাজিদকে। কিন্তু আবার পূর্বের আকাশ থেকে সূর্য উঁকি দেওয়ায় রান প্রসবা উইকেট ব্যাটিং স্বর্গ হয়ে উঠে। সেখানে নাহিদ রানাকে পরপর দুই চার মারেন রিজওয়ান। তাসকিনকে শাসন করেন সাজিদ। ১২১ থেকে লক্ষ্য নেমে আসে আশির ঘরে।
তাতে কিছুটা দুঃশ্চিন্তা ছড়ায়। দুটি সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় শরীরী ভাষাতেও নেমে আসে। কিন্তু এই বাংলাদেশ হাল ছাড়ে না। হাল ছাড়ে না বলেই আক্রমণের জবাব আক্রমণে দেয়। পানি পান বিরতির পর নতুন উদ্যোগে লড়াই শুরু করে দ্বিতীয় বলেই আসে সাফল্য। তার বাক খাওয়া বলে স্লিপে ক্যাচ দেন সাজিদ। শান্ত ক্যাচ লুফে আনন্দে আত্মহারা।
পরের ওভারে প্রথমবার আসেন শরিফুল। বাঁহাতি পেসার ধারালো পেসে রিজওয়ান গালিতে ক্যাচ দেন। দিনের শুরুতে মিরাজ ক্যাচ ছেড়ে কষ্ট বাড়িয়েছিলেন। এবার মিরাজের হাতেই ধরা ৯৪ রান করা রিজওয়ান। পাকিস্তানের সব আশা শেষ হয়ে যায় সেখানেই।
বাংলাদেশের প্রত্যাশিত জয় মুঠোয় ধরা দেয় এই ফরম্যাটের ক্রিকেটের নবীনতম সদস্য তানজিদের হাত ধরে। তাইজুলের বল উড়াতে গিয়ে খুররাম ক্যাচ দেন ডিপ মিড উইকেটে। তানজিদ কোনো ভুল না করেই বাংলাদেশকে ভাসান আনন্দে, উল্লাস, উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেন টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া। ৭৮ রানের বিশাল জয় বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে সিরিজ জয়ের স্বর্গে।
যেটা শুরু হয়েছিল ঠিক দুই বছর আগে রাওয়ালপিণ্ডিতে। পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে প্রথমবার হারানোর পর হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। দুই বছর পরও সেই পারফরম্যান্সের ধার একটুও কমেনি, আত্মবিশ্বাসেও ধরেনি কোনো চিড়। বরং চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আরও তীক্ষ্ণ, আরও পরিণত। আর সেই ধারালো সমীকরণেই মিলেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐশ্বরিক ৪-০ ফলাফল।
প্রথম ইনিংসে ১২৬ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৯ করে ম্যাচ সেরা লিটন। ২৫৩ রান করে সিরিজ সেরা মুশফিকুর।