ভ্রমণ

মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো 

ডাইনিং হল থেকে দেখতে পাচ্ছি, বাইরে ক্যাম্প ফায়ারের প্রস্তুতি চলছে। সবাই গিয়ে জড়ো হলাম সেখানে। বাদ্যযন্ত্র এলো একে একে। শিল্পীরাও প্রস্তুত। শিল্পীদের মাঝে আমি মোস্তফা আর ইব্রাহিমকে দেখতে পেলাম। ভিন্ন পোশাকে সেজেছে তারা। দুটি ঢোলের মতো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে দুজন, আরও দুজনের হাতে-পায়ে ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্র। এরা দেখছি সব কিছুতেই পারদর্শী!

এরকম বৈরি পরিবেশে কত কষ্ট করে আয় উপার্জন করছে পর্যটনের মাধ্যমে। বেশ কয়েকটি বারবার সংগীত পরিবেশন করা হলো। মরক্কোর সংস্কৃতিতে বারবার সম্প্রদায়ের বেশ প্রভাব লক্ষ্য করেছি। ঘণ্টাখানেক গানবাজনা, গল্প চললো। আমি ছাড়া আরও পর্যটক এসেছে ফ্রান্স আর ইতালি থেকে। সেখানে একজন চাইনীজ আছেন, তিনি আমাকে দেখে অবাক হলেন, বাংলাদেশ থেকে এসে আমি একা ভ্রমণ করছি শুনে। বললেন, Don’t you feel insecure or afraid? আমি উত্তর দিলাম Yes I do, but I don’t show. 

সবাই যারযার তাঁবুতে ফিরে গেলাম। বিছানায় গা এলিয়ে আমি আসলে ভাবছিলাম এই গ্রহের সব থেকে উষ্ণতম স্থান রহস্যময় সাহারা মরুভূমির কথা। কয়েক কোটি বছর আগে এই মরুভূমির জায়গায় ছিল টেথিস সাগর। একটি সাগর কি করে সব থেকে বড় মরুভূমিতে পরিণত হলো? পৃথিবীর মাঝ বরাবর একটি বড় অংশ মরুভূমি। চীনের গোবি মরুভূমি থেকে শুরু করে আমেরিকার চিহুয়াহান মরুভূমি পর্যন্ত বিরাজমান এই অংশকে বলা হয় ডেজার্ট বেল্ট। এই ডেজার্ট বেল্টেই অবস্থিত সাহারা। যার আয়তন ভারতের তিন গুন। সাহারা ১২টি দেশজুড়ে বিস্তৃত, দেশগুলো হলো মিশর, মরক্কো, লিবিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া, চাঁদ,  ইরিত্রিয়া, নাইজার, সুদান, তিউনিশিয়া ও পশ্চিম সাহারা। অতীতি আফ্রিকা ও ইউরোপের মাঝে ছিল টেথিস সাগর। গবেষকেরা বলছেন, ভৌগলিক কারণে সাগর মরুভূমিতে পরিণত হয়। 

পাড়ে দাঁড়িয়ে অতলান্তিক দেখা

এই সাহারাকে এখন দেখলে মনে হয় পৃথিবীতে সবুজের লেশমাত্র নেই। সাহারায় যত বালি রয়েছে সেই বালি দিয়ে পুরো পৃথিবীকে ৮ ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে ফেলা যাবে। এই সব চিন্তা করতে করতে কখন চোখ বুজে গেছে টের পাইনি। এক ঘুমে রাত পার করেছি। সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম ভাঙল। সকালের সাহারা দেখবো বলে বের হলাম। বেশ উষ্ণ আবহাওয়া। চারদিকে একটু হেঁটে বেড়ালাম। সকালে জানলাম মোস্তফা এখানকার ছয়টি তাঁবুর মালিক। এই ক্যাম্প মোস্তফার নিজের। প্রথমে সে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতো, ১২ বছর কাজ করার পর এই ক্যাম্প তৈরি করেছে। পাশের গ্রামে আরব মুসলিম, বেদুইন মুসলিমেরা বসবাস করে। মোস্তফা বেশ গর্ব করে বলছিল, আমি আদিবাসি বারবার সম্প্রদায়ের। মোস্তফার ভাষায় ‘মরক্কোর সম্প্রদায় বারবার, আরবরা পরে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছে’। 

আমি এখানকার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলাম। সে জানালো, মাঝেমাঝে একটানা চারদিন মরু ঝড় হয়, তখন নড়াচড়ার উপায় থাকে না। সাহারার আরও ভেতরে গেলে দেখা মিলবে উঁচু বালির ঢিবি, যেগুলোর উচ্চতা ১৫তলা বিল্ডিংয়ের সমান। যখন মরু ঝড় হয়, তখন লাল গালিচাগুলো গুটিয়ে রাখা হয়, আবার ঝড় থেমে গেলে বিছানো হয়। জীবন আসলেই দারুণ ভীতিকর এখানে। শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি বললেই চলে। পর্যটনই আয়ের একমাত্র পথ। গল্প করতে করতে এরাবিক পাগরীর কথা জানতে চাইলাম। নিজের পাগড়ী খুলে দেখালো মোস্তফা। এর নাম তুরবান। ৮ থেকে ১০ মিটার কাপড়ের হয় তুরবান। হায় আল্লাহ! আমাদের শাড়ির থেকেও বড়। ৩০ সেকেন্ডে মাথায় বেঁধে দিলো মোস্তফা। তুরবান হলো মরুভূমির হ্যাট/ক্যাপ/পাগড়ী যাই বলি না কেন! 

ডাইনিং হল রেডি হলো। সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। নানা পদের রুটি, ডিম, মধু, অলিভ ওয়েল, দই আর ফল। খাবার শেষে পুদিনা চা অবধারিত। রুটি দিয়ে অলিভ ওয়েল খেতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। 

বাক্সপেটরা সব গাড়িতে উঠলো। এবার বিদায় জানাবার পালা। তরল সোনা আর গেছো ছাগলের মারাকেশ ‘লা গ্র্যান্ড ব্যালকন দ্য ক্যাফে গ্ল্যাশিয়ার,’ ‘ফ্র্যান্স দ্য ক্যাফে’ মারাকেশ শহরের সিটি সেন্টারের দারুন জনপ্রিয় দুটি রেস্তরাঁর নাম দেখে আমি অবাক। এখনও ফ্রেন্স নাম চলছে! ফ্রেন্স শাসন শেষ হয়েছে সেই ১৯৫৬ অব্দে। এই ভূখণ্ডের উত্তরে দেখেছি স্প্যানিশ সংস্কৃতির প্রভাব আর দক্ষিণে ফ্রেঞ্চ।  

ফেজ শহরের রঙিন গলি

মারাকেশ, মরক্কোর ভীষণ জনপ্রিয় একটি শহর বিশ্ব পর্যটকদের কাছে। মারাকেশ শহরে পৌঁছানো পর্যন্ত মরক্কোর ৭টি শহরে ঘুরে, মরক্কোর মিশ্র সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক একটি ধারণা জন্মেছিল আগেই। তবে মারাকেশে এসে সেই ধারণা অনেকটা প্রকট হলো। মারাকেশ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে ঐতিহ্য সমৃদ্ধ মারাকেশ শহরেরই এক বন্দর নগরী এসা-ওয়েরা, সেখানেই দেখেছি গেছো ছাগল আর জেনেছি তরল সোনার কথা।  

মারাকেশ শহর থেকেই অনলাইনে একটি ট্যুর প্যাকেজ ঠিক করে নিয়েছিলাম। গ্রুপ ট্যুর। দশ জনের একটি গ্রুপের প্যাকেজ কিনেছি। কথা মত সকাল ৭টার কিছু আগে গিয়ে  হাজির হলাম ‘জালি এল ফানা’ স্কয়ারের ‘ক্যাফে ডে ফ্রান্স’ রেস্তরাঁর সামনে। একটিই সিটি সেন্টার। ওমা! হাজার হাজার পর্যটক আর শ খানেক গাড়ি হবে। বুঝলাম শহরের মিটিং পয়েন্ট এটিই। এখান থেকেই পর্যটকরা বিভিন্ন গন্তব্যে যায়।  ভিন্ন ভিন্ন দেশের ১০জন পর্যটকের আজকের গন্তব্য ঐতিহাসিক এসা-ওয়েরা শহর। ড্রাইভারের সাথে একজন গাইড আছে। একে একে সবাই সবার সাথে পরিচিত হলাম। আমাদের ট্যুরটির আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে দেয়া হলো। যেতে যেতে পথে চারটি স্থানে বিরতি রয়েছে। একটি কফি বিরতি, অন্য দুটি প্যানোরমিক ভিউ, আর্গন তেলের ফ্যাক্টরি আর একটি বিশেষ স্থান। সেটি গাইড উল্লেখ করলেন না। বুঝলাম পর্যটকদের জন্য সারপ্রাইজ রাখছেন। মূল আকর্ষণ তো হলো বন্দরনগরী। সেখানকার গেটে পৌঁছে দেবার পর, আমরা ৪ ঘণ্টা নিজের মত ঘুরে বেড়াতে পারবো। তারপর আবার শহরের প্রবেশমুখে গাড়ির কাছে দেখা হবে সবার।    

গাড়ি ছুটছে আপন গতিতে। মরক্কোর সড়ক বেশ উন্নত। আমাদের মত খানাখন্দ নেই। ট্রাফিক রুলও দারুণ কড়া। সিট বেল্ট বাঁধার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। গাড়িতে বারবার সংগীত বাজছে। সপ্তাহব্যাপী বেশ ধকল গেছে, গাড়িতে তাই চোখ বুজে এসেছিল অল্প সময়ের জন্য। চোখ খুললো গাইডের ডাকে। আমরা ওরগান তেল বানানোর কারখানায় এসে উপস্থিত হয়েছি। পৌঁছাবার পর গাড়ির কাছে চারজন নারী এলেন। ইংরেজি, ফ্রান্স, স্প্যানীশ ও আরবী ভাষা জানা চারজন নারীর সঙ্গে কারখানা ঘুরে দেখবো, পর্যটকরা যে ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আমি ও দুজন পর্যটক গেলাম ইংরাজী ভাষার গাইডের সাথে। এই কারখানাটি বিভিন্ন বয়সের নারীদের দ্বারা পরিচালিত। মূলত আরগান তেল কারখানায় নারীরাই বেশি কাজ করে। নারীদের স্বাবলম্বী করবার জন্য এরকম সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সরকারী ও বেসরকারীভাবে। 

গেছো ছাগলের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখা

এই ফ্যাক্টরির নাম ফরাসি ভাষায় লেখা, গাইড মেয়েটি বলল দ্য নেম অফ আওয়ার ফ্যাক্টরি ইজ মারজানা। প্রথমে আমাদের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে নারীরা ফল থেকে তেল তোলার প্রক্রিয়ার পদক্ষেপ প্রদর্শন করছিলেন। কর্মরত সব নারী মধ্যবয়সী। নারীদের জনশক্তিতে রূপান্তরিত করবার দারুন একটি পদ্ধতি মনে হয়েছে আমার কাছে। 

হয়তো অনেকেই জানেন, তারপরও আর্গন ফলের পরিচয় দেই একটু। আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো। এ দেশেই মেলে আর্গন গাছ। এটি  মরোক্কান চিরহরিৎ গাছ বা গুল্ম। এ গাছের ফলের শক্ত খোলস ভাঙলেই পাওয়া যায় বাদামজাতীয় দানা। তারই শাঁস থেকে তেল বার করে যুগ যুগ ধরে রান্না ও রূপচর্চায় ব্যবহার করছেন মরক্কোবাসী। শুধু মরক্কোবাসী নয়, এই তেল ব্যবহার করে পুরো বিশ্ব। কেউ একে বলে ম্যাজিক ওয়েল, কেউ বলে তরল সোনা। 

আর্গন তেল, আর্গন গাছে জন্মানো কার্নেল থেকে তৈরি করা হয়। প্রথমে খোসা থেকে বাদাম অপসারণ এবং তারপর বাদাম থেকে কার্নেল অপসারণ, অর্থাৎ ফলের শক্ত শাঁসটি বের করা হয়। তারপর একটি হাতচালিত পাথর পেষকদণ্ড ব্যবহার করে কার্নেলের পেস্ট তৈরি করা হয়। ধীরে ধীরে এই পেস্ট থেকেই তেল জাতীয় পদার্থ বের হয়।  

প্রদর্শনের পরে আমাদের ভিজিটর সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলো। যেখানে আর্গন তেলের তৈরি প্রসাধনী ও রন্ধনপণ্য রয়েছে। সেখানে আমরা রন্ধনসম্পর্কীয় পণ্যের স্বাদও পেয়েছি। আরগন ফল থেকে মাখন, মধু ও খাবার তেল তৈরি হয়। রুটির সাথে পর্যটকদের স্বাদ গ্রহণ করবার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আর্গন থেকে তৈরি বিশাল বিউটি প্রডাক্টের সমারোহ তো রয়েছেই।   

আমাদের দেশে পাটকে যেমন একসময় মনে করা হতো গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ, তেমনি মরক্কোর গোল্ডেন ফ্রুট হলো আর্গন। আমাদের দেশের অর্থকরী ফসলকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। কিন্তু মরক্কোর অর্থকরী এই ফলের তৈরি পণ্য সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। গোটা মরক্কোর অর্থনীতিতে অর্গান, অলিভ আর পর্যটন বিরাট ভূমিকা পালন করছে। জানা হলো, চেনা হলো তরল সোনা। 

আমরা দশ জন এবার দশ দিকে ছড়িয়ে পড়লাম মেদীনার গলি ও তস্যগলীতে। চার ঘণ্টা পর মারাকেশমুখো হলাম। গাইড মনে করিয়ে দিল, পথে আমাদের থামতে হবে। যথারীতি সেই স্থানে এসে গাড়ি থামলো। পথের ওপাশে তাকিয়ে আমি থ! সবারই এক অবস্থা। সবাই হুলুস্থুল করে গাড়ি থেকে নামলাম। কি দেখলাম? গাছের মগডালে ছাগল। গাছজুড়ে ছাগল! মনে হচ্ছে এটি ছাগলের গাছ, মানে এই বৃক্ষ ছাগল উৎপাদন করে। 

আবার ফিরছি অর্গান তেলের কথায়। বাংলাদেশী টাকায় ১ লিটার অর্গান অয়েলের দাম প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আমাদের গাইড এমনটিই বলল। এই মহামূল্য অর্গান অয়েল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এক বিশেষ প্রজাতির গেছো ছাগল’। দেখতে ডিম্বাকার এই ফল অবশ্য কিছুটা তেতো। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আরাগান গাছ চাষ করে। অর্গান ফলের বীজ থেকে পাওয়া তেল ত্বক ও চুলের পরিচর্যায় ব্যবহার হয়। এই তেলের বিশেষ ‘অ্যান্টি এজিং’ কার্যকারিতার জন্যই গোটা বিশ্বে এর চাহিদা তুঙ্গে। 

সাহারায় উটের পিঠে ভ্রমণ

অর্গান তেল প্রস্তুতে এই সব ছাগলের ভূমিকা কী? এই ছাগলগুলি গাছে চড়ে বীজসমেত পাকা ফল খেয়ে ফেলে। কিন্তু বীজগুলি হজম না হওয়ায় সেগুলি তাদের মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা সেই বীজ শুকিয়ে তেল বের করে। মরক্কো ছাড়াও পশ্চিম আলজেরিয়ায় এই ‘গেছো ছাগল’ দেখতে পাওয়া যায়।

সারাদিনের ক্লান্তি চলে গেলো গেছো ছাগলের কার্যকলাপ দেখে। আরও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে, কিন্তু ফিরতে হবে। মনে হচ্ছিল ঠায় বসে থেকে ছাগলের অর্গান ফল খাওয়া থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া দেখি। গরু-ছাগলের মল দিয়ে জ্বালানী তৈরি হয় আমাদের দেশে, সার হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু মরক্কোর ছাগলের মল দিয়ে তো তরল সোনা তৈরি হয়। 

মরক্কো এমন এক দেশ, যেখানে প্রতিটি শহর এক একটি গল্প বলে। মেদিনার গোলকধাঁধা, পাহাড়ের নীল শহর, আর মরুভূমির নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে এটি এক বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। বাকি গল্প তোলা রইলো, বলবো অন্য কোন অবসরে। (শেষ)  

পড়ুন তৃতীয় পর্ব : মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো