হাবিবুর রহমান স্বপন ||
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের উদাহরণ রয়েছে। বর্তমানে এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইরান ও কিউবা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে গত এক বছরে দেশে ৬৭ জন সাংবাদিক পীড়নের শিকার হয়েছেন। বিশ্বে গত এক দশকে নিহত হয়েছেন সাতশ সাংবাদিক। ২০১২ সালে বিশ্বে আনুমানিক নিহত হয়েছেন ১২৩ জন সাংবাদিক। ২০১৩ সালে নিহত হয়েছেন ৯১ জন। এরা সকলেই নিহত হয়েছেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)’- এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান ও কিউবা এই দুটি দেশে গত ১২ মাসে ১৮ জন সাংবাদিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। উক্ত সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, যে সব দেশে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি তেমন সুবিধার নয় সেই সব দেশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে প্রকাশিত উক্ত রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ২২জন সাংবাদিককে তাদের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এশিয়া থেকে ৬ জন এবং মধ্য এশিয়া থেকে ১ জন সাংবাদিককে নির্বাসন দেয়া হয়েছে। উক্ত সংগঠনের কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, গত এক বছরে ৬৭ জন সাংবাদিকের যাবতীয় তথ্য তাদের কাছে থাকলেও আসলে নির্যাতিত এবং দেশ ত্যাগী সাংবাদিকের সংখ্যা আরও বেশি। যে সব সাংবাদিক দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা বহু চেষ্টা করেও দেশে ফিরতে পারেননি। বাড়ি-ঘর, দেশ ও চাকরি ছেড়ে বিদেশ গিয়ে অধিকাংশ সাংবাদিক চরম বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন- বিষয়টি ওই রিপোর্টে উঠে এসেছে বিস্তারিত। সেসব দেশে সরকার কিংবা প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম বা রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় অনেক সাংবাদিককে কারাবন্দি করা হয়েছিল। পরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্র তাদের কয়েক জনকে দেশ থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এসব সাংবাদিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এদের অনেককে সপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। অনেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে শুধুমাত্র প্রশাসনিক চাপে দেশ ছেড়েছেন। শুধু যে সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছেন তাই নয়, সরকারের রোষানলে পরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গণমাধ্যম। বাংলাদেশেও টেলিভিশন ও খবরের কাগজ বন্ধ হওয়ার নজির রয়েছে। পাকিস্তানের সাংবাদিক সালিম শাহজাদকে হত্যায় পাকিস্তানের ‘সম্মতি’ ছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এডমিরাল মাইক মুলেন। ইসলামাবাদে তার বাড়ির কাছ থেকে সালিম শাহজাদকে অপহরণ করা হয়। দুদিন পর পাঞ্জাব প্রদেশে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো এই হত্যাকান্ডের জন্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করেছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা সম্পর্কে পেশাদারি লেখালেখি করেছেন শাহজাদ।শুধু যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হচ্ছেন তাই নয়, স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদদের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী চরমপন্থিদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, এমনকি খুন হচ্ছেন সাংবাদিকরা। ‘সমকাল’-এর ফরিদপুর জেলা সাংবাদিক গৌতম দাস ২০০৫-এর ১৭ নভেম্বর তার কার্যালয়ে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। ২০০৪-এর ১৫ জানুয়ারি ‘সংবাদ’-এর খুলনা প্রতিনিধি মাণিক সাহা আততায়ীর বোমার আঘাতে নিহত হন। একই বছর ২৭ জুন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক জন্মভূমি’ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু এবং ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর খুলনা ব্যুরো চিফ শেখ বেলাল উদ্দিন নিহত হন। বগুড়া থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দুর্জয় বাংলা’র বার্তা সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী বাড়ির সামনে দুবৃত্তের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন ২০০৪-এর ৩ অক্টোবর। ‘দৈনিক আজকের কাগজ’-এর মাণিকছড়ি প্রতিনিধি কামাল হোসেন খুন হন ২০০৪-এর ২২ আগস্ট। শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূবালী বার্তা’র সম্পাদক সৈয়দ ফারুক আহমেদ ২০০২-এর ৩ আগস্ট নিহত হন। খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূর্বাচল’ এর সাংবাদিক হারুনুর রশিদ খোকন নিহত হন ২০০২-এর ২মার্চ। একই বছর খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’-এর সাংবাদিক সরদার শুকুর হোসেন নিহত হন। ২০০১-এর ২০ জুলাই ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আহসান আলী নিহত হন। ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এর বিশেষ প্রতিনিধি শামসুর রহমান যশোরে নিজ কার্যালয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ২০০০-এর ১৬ জুলাই। ১৯৯৯-এর ১৩ মার্চ নিহত হন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক লোকসমাজ’-এর রফিকুল ইসলাম রফিক। যশোর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক রাণার’ সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল নিহত হন ১৯৯৮-এর ১২ জুন। একই বছর একই দিনে নিহত হন চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দিনবদল’-এর স্টাফ রিপোর্টার বজলুর রহমান এবং সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সাংবাদিক খন্দকার রেজাউল করিম। উল্লেখ্য ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সম্পাদক এসএম আলাউদ্দিনও আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। সম্প্রতি কুষ্টিয়া, রংপুর, বরিশাল, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজশাহীর ‘সংবাদ’ প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম আকাশ নির্যাতিত হয়েছেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক। তিনি ক্ষোভে দুঃখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে প্রহৃত হন সাংবাদিক আনিস আলমগীরসহ বেশ কজন সাংবাদিক। ইউএনবি’র ফেনী প্রতিনিধি সাংবাদিক টিপু সুলতান, ফরিদপুরের ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ প্রতিনিধি প্রবীর শিকদার শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন। অতি সম্প্রতি রংপুরে ‘একুশে টিভি’র সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদল, জেমসন মাহবুব ও কুষ্টিয়ায় জহুরুল ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রহৃত হয়েছেন। এভাবেই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন ও হচ্ছেন। বিগত ১০ বছরের মধ্যে প্রতিবছরই বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় নিহত হয়েছেন ২৭ জন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬৬ জন। সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন বস্তুনিষ্ঠতার শপথ নিয়েই। রাজনীতিবিদদের নষ্ট মানসিকতা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্প্রসারণ সাংবাদিক পেশাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিবিসি’র সাংবাদিক উইলিয়াম ক্রলি ও মার্ক টালিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বহিষ্কার করা হয়েছিল। যে সব দেশে গণতন্ত্র নেই যেমন মধ্যপ্রাচ্য, চীন, লিবিয়া, মিয়ানমার,পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নেই। গণমাধ্যমগুলো জনগণের চাহিদানুযায়ী খবর পরিবেশন করতে পারে না। আবার কিছু দেশে গণতন্ত্র থাকলেও স্বাধীন সাংবাদিকতা মেনে নিতে পারেন না সে সব দেশের নোংরা রাজনীতিবিদরা। অবস্থাটা এমন যে তথ্য গোপন করে তারা যুগের পর যুগ ক্ষমতা আকড়ে থাকবেন । একুশ শতকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে তথ্য গোপন রাখার কোনো সুযোগ যে নেই সেটা তারা বুঝতে চান না। তারপরও যখন তারা সে চেষ্টা করেন এবং সাংবাদিকরা সেই অপচেষ্টা রোধ করে তখন তাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে সাংবাদিকদের ওপর। স্বাধীন সাংবাদিকতা খুবই জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব কিছুতেই ব্যবসার মানসিকতা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও অথবা ইলেকট্রনিক্স সংবাদপত্রের মালিকদের বাণিজ্যিক স্বার্থজনিত কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতার এই যুগে গণমাধ্যমগুলোর কোনো খবর গোপন করার সুযোগ নেই বললেই চলে। কোনো প্রচার মাধ্যম তথ্য গোপন করলে অন্যরা তা প্রকাশ করে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশেও গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক রিপোর্টে জানিয়েছে ২০১৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকরা রোষানলের শিকার হয়েছেন। নিহত ও আহত বেশির ভাগ সাংবাদিকের পরিবার অর্থ সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ সাংবাদিকদের পরিবার-পরিজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা কমই পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের পোষ্যরা নির্যাতনের ভয়ে প্রতিকার চান না। অনেকে আবার মামলা করে চরম আতঙ্কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদে আছেন। তবুও এত কিছুর পর সৎ সংবাদকর্মীর বিশ্বাস অটুট থেকে যায়। বন্দুকের নল কিংবা কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী হচ্ছে কলম। সব নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে সাংবাদিকরা তাদের মহান পেশার পবিত্র কলম চালিয়ে যাবেন। লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্টরাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ নভেম্বর ২০১৪/তাপস রায়