ঢাকা, সোমবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিদেশি ভাষার গল্প || কাজ চলছে

মিলন আশরাফ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৭ ৫:৫০:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০৭ ৫:৫৪:৩৪ পিএম
বিদেশি ভাষার গল্প || কাজ চলছে
অলঙ্করণ : অপূর্ব খন্দকার

মূল: মাওরো লিবারটেল্লা
ভাষান্তর: মিলন আশরাফ

 

শহরের ভয়ের গল্প এটি। গল্পটিতে দেখা মেলে এক সরল দম্পতির। ঝলমলে রোদে ভরা ছিল সেদিন। দেয়াল ঢাকার সোনালি রঙের পর্দা বুনতে বুনতে তাদের মাথায় একটি চিন্তা আসে। হঠাৎ তারা বলল, ‘চলো একটি ঘর বানাই’। ওই মুহূর্তের উদ্দীপনাটা ছিল একেবারে বিচারবুদ্ধিহীন। একমুহূর্তে ভবিষ্যত তাদের সামনে এলো জ্বলজ্বলে আলো হয়ে। ঘর তৈরির জন্য যা কিছু দরকার, সব দেয়ালের গায়ে ছবির ফ্রেমে ভেসে উঠল। যেন চোখের সামনে একটি সিঁড়ি, রান্নাঘরের পাশে বাথরুম এবং সদর দরোজায় ঝুলছে চমৎকার পেইন্টিং!

কখনো সখনো এরকম একটি আদর্শ বাড়ি বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। একতলা বাড়ি মনে হয় যেন দুই সার্বভৌম সরকারের যুগ্ম শাসন। লম্বা বারান্দা নিচে প্রসারিত হয়ে সোজা চলে গেছে বুয়েনস আইরেস (আর্জেন্টিনার রাজধানী) অর্থাৎ শহরের প্রাণকেন্দ্রের দিকে। শহরটি চোখের সামনে এমন একটি বস্তু হয়ে ওঠে যেন তার প্রতি সবার চিরকালীন আসক্তি জন্মায়। মানুষ হুমড়ি খেয়ে সেখানে টাকা উড়ায়। প্রায় সকলে অধঃপতিত হয়। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সেখানে অন্ধকার, অপরিচ্ছন্ন ও শ্বাসরোধকারী অবস্থা। একসময় তাদের ছিল পূর্বের বৈভবের গৌরব। প্রাচুর্যের মধ্যে একই ঘরে থাকতো তারা। কিন্তু একদিন অধিক জনসংখ্যার চাপে জায়গাগুলো ব্যবহারের সার্মথ্য হচ্ছিল না তাদের। এরপর নাটকীয়ভাবে তারা হয়ে গেল আলাদা।

এই ধরনের বিল্ডিংয়ের একটা অস্বাভাবিকতা আছে। বিল্ডিংয়ে সিঁড়ির খুব কাছে থাকে বারান্দা। রান্নাঘর তৈরি সেখানে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়। তবুও বিল্ডিংয়ের যৌথ মালিকানার বিচিত্র পরিবর্তন তাদের প্রভাবিত করে নিয়ে যায় অপরিবর্তনীয় সাজানোগোছানোর দিকে। যৌথ মালিকানা সবসময় পরিবর্তনে ভোগে। শহুরে অনেকগুলো মিথের মধ্যে এটি একটি। যেটিতে আমরা বিশ্বাস করতে পারি। এই বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা অনুসন্ধান শুরু করলাম। কিছু নির্দিষ্ট বিশ্বাস তো আগে থেকে সঙ্গে তৈরি ছিল। যেমন বাজেট, এলাকা, মাপ। প্রস্তাবের স্তিতিমাপও সেট করা ছিল। আমরা দেখলাম আবাসন মার্কেটের সম্পদের মালিকদের নামে একশো’র মতো মানহানি মামলা রয়েছে। কোথা থেকে শুরু করবো? প্রথমে ওয়েবসাইটের ছবিগুলো দেখলাম। সেগুলো অস্পষ্ট ও খুব ছোট, যেন হিমায়িত কাচের ছায়া। সম্পত্তির ছবিগুলো যেন আলোকচিত্র শিল্পের বেজন্মা সন্তান। প্রতিমার ইতিহাসে এক প্রতারক। কিন্তু এগুলো কোনকিছুই আমাদের থামাতে পারবে না। যে বাড়িটি আমাদের মনের গহীনে আছে সেটি এই স্বপ্নের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসবেই।

অদ্ভুত ধরনের ঘরের ভেতরে ঢোকা আইন করে নিষিদ্ধ করা উচিত। আমরা এই ধরনের বাড়িতে বসবাস করতে চাই না। বিস্তারিত অনুসন্ধানে এটা বের করা হলো। অভ্যন্তরীণ এই আন্তরিকতা খুব নিষ্ঠুর। গন্ধ, বস্তুর বিশৃঙ্খল বিন্যাস, প্রকাশকের সাজসজ্জা সবই টিভিতে দৃশ্যমান। অনাহুতরা কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারে না। নিষিদ্ধ প্রেমপত্র পড়ার মতো অবিস্মরণীয় ছিল সেইসব অভিজ্ঞতা। আমি মনে করি অচেনা বাড়িতে হামলে পড়া হঠাৎ বজ্রপাতের মতো। অবশ্য আমাদের নতুন বিল্ডিংয়ের প্রোজেক্ট সম্পূর্ণ করতে এটা প্রধান অভিজ্ঞতা হিসাবে কাজে দেবে। প্রথমে বাড়ির ভেতরটা ভালো করে দেখে নিতে হবে। সময়সাপেক্ষ অনুসন্ধান এটি। এক সন্ধ্যায় ঠিক যখন সবকিছু অদরকারি দেখাবে তখন আমাদের শুরুর গ্লানিকর আশাগুলো ভরে যাবে তিক্ততায়। কপাল রেখায় ভেসে উঠবে বিরক্তিভাব। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দৃশ্য আমরা দেখতে যাবো সুযোগ মতো। কারণ তখনো আমরা ওই এলাকাতেই। এখানে ঢুকে আমরা আলো দেখতে পেয়েছিলাম। প্রশস্ত রাস্তায় সুন্দর গাছের সারিগুলো যথেষ্ট কঠিন মনে হচ্ছিল। এটার অবস্থান ভালো ছিল না। অন্ততপক্ষে এটা বলা যায় যে, রুমের নকশাটা ছিল তর্কসাপেক্ষ। তবে যৌথ মালিকানায় ব্যবস্থায় এটা পরিবর্তনযোগ্য। ভাবাদর্শগত ব্যানারের নিশ্চয়তায় আমরা এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমরা প্রত্যাখ্যাত হয়ে পতিত হলাম। চার চারবার প্রদক্ষিণ করেছিলাম বাড়িটি। বৃদ্ধ পিতামাতার মতো আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যৌথ মালিকরা সিদ্ধান্ত নিলেন দীর্ঘ মেয়াদি মুনাফার জন্য কোনকিছু বানাবেন না। শুধুমাত্র অল্প পরিমাণে কিছু সঞ্চয় করবেন। আমরা পরস্পরকে বললাম, ‘আমরা কিছু ছোট পরিবর্তন আনবো।’ কথাটা এমনভাবে বললাম যেন কিছু লাভজনক কাজ হবে। পরবর্তীতে রাজমিস্ত্রিদের বিশৃঙ্খলা, দুর্বল সিদ্ধান্ত অভাবনীয় সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাদের। এইসব বিস্ময়কর মুহূর্তগুলো কারোর সঙ্গে শেয়ার করা রীতিমতন যন্ত্রণাদায়ক।

আমরা পরস্পরকে একের অধিকবার জিজ্ঞেস করেছি, ‘নিজেদেরকে এটার ভেতর রেখে কী পেলাম?’ মনে হলো এটার মধ্যেই যেন আমরা আমাদের জীবনের মানে খুঁজছিলাম। আমি যখনি অতীতের একটা বাক্য লিখছি তৎক্ষণাৎ সেটা হয়ে যাচ্ছে বর্তমান। বাড়ি তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি এবং তার সম্ভাবনাও নাই। এক্ষেত্রে কাল বিভ্রান্তি সমর্থনযোগ্য। নির্মাণাধীন বাড়ি যদি জীবনের কিছু ধ্বংস করে দেয় তবে ধারণা করলাম এটার ভেতর বিস্তৃত ও গভীরতম একটা অর্থ লুকিয়ে রয়েছে নিশ্চয়। বাড়ি তৈরির কাজটি মিথ্যা দিয়ে শুরু হয়। যখন স্থপতি বলবেন বাড়ি সম্পন্ন করতে সময় লাগবে তিন মাস। সেখানে ধরে নিতে হবে ছয় মাস। কেন যে এমন হয় একমাত্র পাগলই এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবে। আপনি অবশ্যই এখানে অন্য মানুষের সময় বেঁধে দিতে পারবেন না। এটা বড় থেকে বড় ও আরো বড় হবে।

প্রশ্ন এখন ‘কেন এমন হতে হবে?’ আসল ব্যাপারটি হলো বস্তুর অপ্রত্যাশিত সমস্যাগুলো। এটা তার নিজের সময় মতো চলবে। দৌড়ে চলতে এটা অস্বীকার করে। সিমেন্ট ধীরে ধীরে শুকায়। লোহা কাটাও ওতো সহজ নয়। টাইলসগুলো খাড়াভাবে বাথরুমের দেয়ালে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করবে। মালপত্রগুলো কারখানা থেকে যেমন বাক্সবন্দি হয়ে এসেছে সেই গর্ভ থেকে তারা যেন বের হতে চায় না। আর যারা নির্মাণ ভূমিতে কাজ করতে আসে তারা সময়ের মৌলিক ধারণা চিরতরে ভুলে যায়। যখন তারা বলে ‘তিন মাস’। একেবারে যে অকারণে তারা মিথ্যাটা বলে ঠিক তা নয়। কারণ সত্যিই তারা বিশ্বাস করতে চায় তিন মাসের ভেতরেই কাজটি শেষ করবে। কিন্তু বস্তুগুলো অর্থাৎ যেটা কিনা সবকিছুর জননী যা দিয়ে তৈরি হবে বিল্ডিং সেটা বাগড়া বাধায়। সুযোগ বুঝে সময় সেখানে নিজের শাসন চাপিয়ে দেয়। মানুষ ভাবে হবে, আর বস্তু দেখায় উল্টো।

আগেই বলা হয়েছে এটি একটি হরর গল্প। দুইজন লোক যখন একটি বাড়ি করার জন্য টাকা খাটায় তখন একেবারে সরলভাবে প্রাচীরের প্রথম ফাটল খুলে যায়। উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতরের বস্তু দেখা শুরু করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মেঝের নিচে কী? প্রাচীর আর রাস্তার ভেতর ফারাক কী? পানি, আলো, গ্যাস এরকম অদৃশ্য জিনিসগুলো কোথা থেকে আসে? এ সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ধারণা ছিল না আমার। আমি শুধু কাঠামো সম্পন্ন করতে যেসব জিনিসপত্র লাগে সেগুলোর যোগান দিয়েছিলাম। আমার কাছে সিঁড়ি ও রেলিংয়ের প্রতিটি ধাপ একেকটি উত্তরাধিকারের পরিচয় বহন করে। রান্নাঘরে ছিল একটি টেবিল, একটি বেসিন এবং ওভেন। পুরো ঘরে একটি মেঝে ও একটি ছাদ এবং চারটা প্রাচীর ছিল। কী অদ্ভুত! একটি ঘরই সবকিছু- তাই না? একইভাবে যেমন একটি বই-ই সব, কাভার কিংবা লেখকের ফটো নয়। মনে পড়ে আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন আমার এক স্কুলের বন্ধু মাথা কামিয়েছিল। মাথা কামানোর পরদিন সকালে স্কুলে এলে তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোথায় তার মাথার খুলি? তার খুলি ছিল সাদা। চামড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছিল। ওই বয়সে টাক মাথা দেখে আমি ভাবতাম মাথা বুঝি পেকে গেছে।

বন্ধুটি তার মাথা দেখিয়ে আমাকে বলল, ‘এই হলো আমার মাথার খুলি। এটার নিচে কিছুই নাই।’ আমি ভয় পেয়ে সরে পড়লাম। বাড়ি তৈরির কাজের অগ্রগতির সঙ্গে এর হুবহু মিল। সবকিছুর ভেতর থেকে দেখাটা আমাদের কাছে ধ্যানের মতো হয়ে গিয়েছিল। এক সন্ধ্যায় আমি আর আমার স্ত্রী রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী টয়লেট থেকে ফিরে এসে আমাকে বলল, ‘যাও, মেয়েদের টয়লেটটা দেখে এসো।’ আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম অকেজো একটি ফ্যান আয়নার পেছনে ফেলা এবং বামপাশে দরজার কাছে একটি পাথর খণ্ড রাখা ছিল যাতে পানি লিক আউট না হয়ে ভেতরে আসে। সত্যিই এই অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছিল তাদের স্থাপত্যের একটি ডিগ্রি সনদ হস্তান্তর করি। ‘কর্ম’ শব্দটির অনেকগুলো মানে আছে। কোনো বস্তুকে শৈল্পিক ডাকাকে আমি মনে করি না, এটা কোনো কাকতালীয় কাণ্ড। যখন সাহিত্য সমালোচকরা একটি পাঠ্য সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করে তখন তারা বলে, ‘এটি একমুখী কিংবা অন্যভাবে নির্মিত।’ প্রত্যেক বইয়ের একটি নিজস্ব গঠন ও শৈলি আছে। এই ধারণাগুলো স্থপত্যশিল্প থেকে ধার করা। দেখা যায় যে কল্পনাগুলো করা হচ্ছে সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই পৃথিবীতে। তবুও সেগুলো আনা হচ্ছে। আমাদের স্থপত্যবিদরা বারবার একটি বিষয় সতর্কবার্তা দেন যে, কখনো হালকা কাজের উপর ভারি কাজ করা যাবে না। প্রথমে আপনাকে ভীত নির্মাণ করতে সেটার উপর একের পর এক কাজ করে সমাপ্তির দিকে এগোতে হবে। বইয়ের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা প্রযোজ্য। আপনি প্রথম খসড়াটা এমন করবেন না, যা তাৎক্ষণিক ও অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। তারপর এটাকে কি আপনি পুনরায় সাজাবেন নাকি মসৃণ করবেন অথবা বিশদ বিবরণটি সুসংহত করবেন? সেটা আপনার ব্যাপার। নির্মাণাধীন বাড়ির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপখ্যান হলো সিঁড়ি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া। কঠোর বিবেচনার পর আকৃতি ও কোথায় রাখা উচিত এগুলো এক সপ্তাহে সম্পন্ন করতে হবে। সিঁড়ি বানানোর শেষে প্রত্যেকের কাছে ‘খাড়া’ নির্মাণটি ভুল ছিল এটা স্পষ্ট হয়ে গেলেও করার কিছুই থাকবে না। সোনালি অনুপাত ভাঙা হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের কোণে আবদ্ধ অবস্থায় অট্টহাসি দেয়। পর্বতের কিনার ধরে গাড়ি চালানোর মতো হাঁটা এটা। সেখানে ছিল অতল গহ্বর। পথটিও ছিল প্রলোভনসঙ্কুল ও ভয়ানক। ক্রমশ চাকা ক্ষয় হচ্ছিল। স্থপত্যবিদ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শান্তির ভান করলেও প্রকৃতপক্ষে সেটার অধিকারী ছিলেন না তিনি। আমাদের তিনি বললেন, এটার সংশোধন করা দরকার। আমার পেশা নিয়েও তৈরি বুলি ব্যবহার করলেন তিনি। সেই বিকালে দুই পেশার ভেতর শাব্দিক সমতা এনে সাধারণ বন্ধন সৃষ্টি করাতে তাকে ধন্যবাদ দিলাম।

অন্যদিকে প্রাচীর পেইন্ট করতে যে কেউ তার স্বপ্নের রঙের নাম বলতে পারে। মানুষটি হতে পারে প্রতিভাবান কিংবা ধর্ষকামী। ধরুন বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে হলুদ রং। ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমানভাবে সেগুলো বিমূর্ত হবে। মূল রং নির্ধারণ না করা সম্ভব হওয়া পর্যন্ত চলবে এমনটি। সূর্যাস্ত হলুদ, ঘূর্ণায়মান হলুদ, কোলাহলে হলুদ, প্রাচুর্যে হলুদ, ডিমের খোসায় হলুদ। শুধু হলুদ আর হলুদ। এ বিষয়ে বোর্হেসের একটি কথা মনে পড়ছে আমার। যখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তখন তিনি বলেন, সবকিছুর উপর সবচেয়ে বেশি লাল রং অনুভব করছেন। তাঁর কাছে লাল শব্দটি চমৎকারভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা প্রকাশ করতো। যেমন জার্মানিতে যে শব্দটা শেরল্যাচ, ইংরেজিতে সেটা স্কারলেট। স্প্যানিশ ভাষায় সেটা এসক্ররলাটা। ওই একই শব্দ ফরাসিতে এসক্ররলেট। সকল শব্দই একইরকম মূল্যবান। যেন সব চমৎকার রং। স্পেনিশে অ্যামারিল্লো (হলুদ) শব্দটি দুর্বল। ইংরেজিতে হলুদ শব্দটি অ্যামারিল্লোর খুব কাছাকাছি। আমি মনে করি প্রাচীন স্পেনিশে এটি ছিল অ্যামারিয়েল্লো। চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আমরা কী ধরনের ভাষা গ্রহণ করেছি? যখন কিনা আমরা বহিঃপ্রাঙ্গণে কী রকম কমলা রং পছন্দ করেছিলাম সেটার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজছি। এটা একটি পূর্ব নির্ধারিত ব্যর্থ কথোপকথন। দায়িত্ব নিয়ে আমরা একজন অনুবাদক বানাবো। কেউ কেউ সবচেয়ে উন্নত স্কুলে প্রশিক্ষিত। তারা হয়তো অবিকল রঙের বর্ণনা করতে সক্ষম। আমাদের বহিঃপ্রাঙ্গণের জন্য কী ধরনের কমলা রঙের প্রলেপ চাই, এটার সূত্র ধরে চিত্রশিল্পীকে ‘মিশ্রিত বিপ্লবী কমলা’ রঙের কথা বলি।

সবকিছু শুরু হতে মাস থেকে বছর পার হয়ে গিয়েছিল। এই সময়টাতে আমি এবং আমার স্ত্রী লেটিসিয়া একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছিলাম। আমাদের কিছু বন্ধু শহরের এক কোণে উক্ত বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিল। আমরা শান্ত পরিবেশে সুস্থির একটা জীবন যাপন করতে থাকি। প্রতিদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ পড়ি। মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখতে যাই। আমরা দুজনার প্রায়ই স্মরণে আসতো আমরা একটি দালান করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম এবং সে বিষয়ে আমরা ছিলাম দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তারপর বাড়িটি দেখার জন্য আমরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করি একদিন। সেখানে গিয়ে দেখি মিস্ত্রিরা কাজ করছে। তাদের সংখ্যা আগের মতোই আছে। বাড়েনি একটিও। আমরা আবার পুনর্গঠন করে কাজ শুরুর কথা ভাবছিলাম। তাদের কেউই জানে না তারা কী করছে, কেন করছে? আসল পরিকল্পনা হারিয়ে গেছে। এই কাজের মানুষেরা শুধুমাত্র পুনরায় পালিশ করছে। এটা দেখতে বিশাল গবেষণাগারের মতো মনে হলেও আদতে এটা কোনো মানে দাঁড় করায় নি। যখন কেউ কোনো কাজ শেষ করে (যেমন: বাথরুম, সজ্জিত ওয়ারড্রব, একটি উপযোগী রুম) অন্যকেউ সেখানে এসে সেটা ধ্বংস করে। পরিবর্তন করে পুনঃনকশা করে সাজায়। তাই হয়তো কাজের ক্রমাগত অগ্রগতি হচ্ছে কিন্তু শেষ হচ্ছে না। অন্য একদিন আসার পথে আমরা এক জায়গায় বসে কফি পান করেছিলাম। কফিশপে বসে অতীতের পরিকল্পনাগুলোর কথা ভেবে হাসছিলাম আমরা। হঠাৎ লেটিসিয়া আত্মমগ্ন হয়ে জানালার বাইরে একদৃষ্টিতে তাকাল। অর্থ ও শক্তির অপচয় করে যা কিছু একপাশে ছেড়ে ছুঁড়ে এসেছি, কল্পনা করি সেগুলো নিয়েই লেটিসিয়া চিন্তায় মগ্ন। আমাদের জীবনকে আবর্তিত করে এ সবকিছুই ছিল। সেখানে অর্থের অংকটাও মোটেই অল্প পরিমাণে ছিল না।

সে আমাকে বলল, আগের জানালার ফ্রেমটা ভালোভাবে তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের এখনকার কাজেও ওই একই ধরনের কিছু একটা ব্যবহার করার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

 

লেখক পরিচিতি:
মাওরো লিবারটেল্লা আর্জেন্টাইন লেখক। জন্ম মেক্সিকো সিটিতে ১৯৮৩ সালে। পড়াশোনা করেছেন সাহিত্য নিয়ে। সাংস্কৃতিক সাংবাদিক হিসেবে লেখালিখি করছেন আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও চিলির বিভিন্ন  পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থ; উপন্যাস ‘My Buried Book’ বইটিতে তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। বিশ শতকের বুয়েনস আইরেসের একদল বন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন ‘Winter With My Generation’ গল্পগ্রন্থটি। ‘কাজ চলছে’ গল্পটি সেখান থেকেই নেয়া। ২০১৬ সালে ডিসেম্বর মাসে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত গুয়াডালাজারা বুক ফেয়ার-এ আশির দশকে সেরা বিশ ল্যাটিন আমেরিকান লেখক হিসেবে তাকে নির্বাচিত করা হয়। মে, ২০১৭ সালে হে ফেস্টিভালে বোগোতা-৩৯ তালিকায় তিনি অন্তর্ভুক্ত হন। এটা ল্যাটিন আমেরিকার সেরা ৩৯ লেখকের তালিকা, যাদের বয়স ৩৯-এর ভেতরে।
গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন নিক কাইস্টোর। স্পেনিশ ও পর্তুগিজ সাহিত্য অনুবাদক হিসেবে বেশি পরিচিত তিনি।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন