RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল: অ্যাটউডের ডেসটোপিয়ান উপন্যাস

মোজাফ্ফর হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:১০, ১৬ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল: অ্যাটউডের ডেসটোপিয়ান উপন্যাস

‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’ হলো বিংশ শতকের উল্লেখযোগ্য নারীবাদী উপন্যাস। উপন্যাসটির রচয়িতা কানাডার কবি ও কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড। অ্যাটউড বর্তমান বিশ্বের জীবিত লেখকদের মধ্যে প্রথম সারির লেখক হিসেবে গণ্য। গত কয়েক বছর থেকেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য উচ্চারিত হয়ে আসছে তাঁর নাম। অ্যাটউডের ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’ উপন্যাসটির প্রকাশকাল ১৯৮৫। এটি হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’, অরওয়েলের ‘১৯৮৪’, সুইফটের ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেলস’ উপন্যাসগুলোর মতো ডিসটোপিয়ান উপন্যাস। ডিসটোপিয়ান হলো ইউটোপিয়ান বা আদর্শ সমাজব্যবস্থার ঠিক উলটো অবস্থা।

উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু হতাশা, নৈরাজ্য, শোষণ, অভাব-অনটন ও কট্টর ধর্মীয় অনুশাসন। সেই অর্থে উপন্যাসটিকে পলিটিক্যাল স্যাটায়ার বা এলিগরিক্যাল উপন্যাসও বলা চলে। উপন্যাসটি আবার আরেক অর্থে কল্পকাহিনিও বটে। কেননা যে সমাজব্যবস্থার কথা এখানে বলা হচ্ছে, সেটি অদূর ভবিষ্যতের। কাল্পনিক রাষ্ট্রটির নাম ‘রিপাবলিক অব গিলেড’। একসময় রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। রাষ্ট্রটি এখন কনজারভেটিভ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি জনগণ। জনগণ মানে আরো নির্দিষ্ট করে বললে নারী।

উপন্যাসে দেখা যায়: কল্পিতরাজ্য রিপাবলিক অব গিলেডে যুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। দূষণে সেখানকার অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সাধারণ নারীদের ধরে ধরে সেনাপুরুষদের রক্ষিতা বানানো হয়। যারা সন্তানদানে সক্ষম তাদের রাখা হয় গৃহে- হ্যান্ডমেইড করে, আর যারা সন্তানদানে অক্ষম তাদের রাখা হয় রাষ্ট্রের সম্পত্তি বানিয়ে পতিতাপল্লীতে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কেট তার স্বামী ও কন্যাশিশুকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ঘটনাস্থলেই স্বামীকে মেরে ফেলা হয়, অপহরণ করা হয় মেয়েকে। কেটকে তুলে এনে আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো পরীক্ষা করা হয় সে সন্তান ধারণে সক্ষম কিনা। পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল এলে তাকে ‘হ্যান্ডমেইড’ বা রক্ষিতা হিসেবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণে আছে এমন এক সেনা কর্মকর্তার নিকট পাঠানো হয়, যার স্ত্রী বন্ধ্যা। কেটকে পাঠানো হয় কমান্ডো ফ্রেড ও তার রুক্ষ স্বভাবের স্ত্রী সেরেনা জয়ের বাড়িতে। সেখানে তার নতুন নাম হয় ‘অফফ্রেড’ (অফফ্রেড মানে ফ্রেডের সম্পত্তি; ফ্রেড কমান্ডারের নাম)। কেটকে সেরেনা জয়ের হাঁটুর মাঝে রেখে ধর্ষণ করে কমান্ডার- বাইবেলের উক্তি টেনে এ সময় বলা হয়, এভাবে কেট গর্ভবতী হলে সেই সন্তান হবে সেরেনার। রীতি অনুযায়ী সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে কেটের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। কেটকে পরবর্তী সন্তান উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হবে অথবা তাকে অন্য কোনো কমান্ডারের কাছে হস্তান্তরিত করা হবে।

প্রতিদিন রুটিনমাফিক ধর্ষণ করা হয় কেটকে। তাকে চেকআপের জন্য নিয়ম করে ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে তার সঙ্গে অন্য হ্যান্ডমেইড নারীদের সাক্ষাৎ ঘটে। কেটকে চেকআপের সময় কর্তব্যরত ডাক্তার জানায়, নারীদের মতো অধিকাংশ পুরুষই বন্ধ্যা হয়ে গেছে। কমান্ডার ফ্রেড নিজেও বন্ধ্যা পুরুষ। কিন্তু গিলেডের মানুষ বিশ্বাস করে পুরুষ কখনো বন্ধ্যা হয় না। বিধায় সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীদের ওপর। ডাক্তার জানায়, এখন সন্তান না হওয়ার কারণে আগের রক্ষিতাদের মতো কেটকে মেরে ফেলা হবে অথবা পতিতা-কলোনিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ডাক্তার তার সঙ্গে গোপনে মিলিত হওয়ার জন্য কেটকে বলে। কেট তার প্রস্তাবে রাজি হয় না।

এত কিছুর পরও কেট বাঁচার স্বপ্ন দেখে, বিশ্বাস করে তার মেয়েকে সে একদিন ফিরে পাবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক গড়ে তুলে সে অন্তঃসত্ত্বা হবে। সে জানে, অবৈধ সম্পর্কে ধরা পড়লে রাষ্ট্রের বিধানমতো তাকে খোলা রাস্তায় ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তবু সে মেয়ের জন্য ঝুঁকি নিতে রাজি হয়। এরই মাঝে কমান্ডারের ড্রাইভার নিকের সঙ্গে কেটের পরিচয় ঘটে। তাদের ভেতর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিকের মাধ্যমে অন্তঃসত্ত্বা হয় কেট।

উপন্যাসের শেষের দিকে বিদ্রোহী দলের অনুপ্রেরণায় কেট কমান্ডারকে হত্যা করে। তাকে একদল লোক সরকারি সৈন্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়, তারা আসলে ছিল বিদ্রোহীশক্তি। নিক নিজেও সে দলের একজন। কেটকে অস্থায়ী তাঁবুতে একাকী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় রেখে বিদ্রোহীরা চলে যায় ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল সরকারের পতন ঘটাতে। কেট অপেক্ষায় থাকে নিক ও তার হারানো মেয়েকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।

‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’ উপন্যাসে একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেখানো হয়েছে, যেখানে নির্মমতার চূড়ান্ত বলি হয় নারী ও শিশুরা। সুবিধাভোগী নারীদের শত্রু হিসেবে গড়ে তোলা হয় সুবিধাবঞ্চিত নারীদের। সমাজে অবস্থানগতভাবে নারীদের কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। ‘আন্টস’ বলে ডাকা হয় যাদের, তাদের কাজ হলো নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা। এদের পোশাক বাদামি রঙের। ‘মার্থাস’ বলে যাদের ডাকা হয় তাদের কাজ হলো গৃহকর্মের কাজ পরিচালনা করা। এদের পোশাক ধূসর নীল রঙের। ‘হ্যান্ডমেইড’ বলে যাদের ডাকা হয় তাদের কাজ হলো শুধুমাত্র বংশবিস্তার করা। এদের পোশাক লাল রঙের। এদের আশপাশে আত্মহত্যা করা যায় এমন কোনো মাধ্যম রাখা হয় না। আর ‘ওয়াইভস’ নামের নারীরা এসব নারীর ওপর অবস্থান করে। আপাতদৃষ্টিতে তারা বাড়ির মালকিন। এদের পোশাক নীল রঙের। এভাবেই নারীদের আলাদা আলাদা শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। আলাদা করে নিজস্ব কোনো পরিচয় তাদের দেওয়া হয় না। পাপ বলে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা, পর্নো ম্যাগাজিন পুড়িয়ে ফেলা ও বেশ্যালয় গুঁড়িয়ে ফেলা হলেও গোপনে এসবের সবই বহাল তবিয়তে চালু থাকে, তবে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য। সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে এ জগৎ। যারা রক্ষিতার কাজে থাকে তাদের কানে সবসময় তুলে দেওয়া হয়, ‘তারা ঈশ্বর-সেবা করছে’। কেউ এসব নিয়মের প্রতিবাদ তুললে ‘টেচারি’ বা ‘যৌনপাপ’ বলে তাদের প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয় নারীকেও। এভাবেই ধর্ম ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নারীর জন্য নরকতুল্য এক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় গিলেডে।

এস্ট্রিম শাসনব্যবস্থার গিলেড রাষ্ট্রটি আপাতদৃষ্টিতে কাল্পনিক মনে হলেও এটি আসলে প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রকাঠামোরই এলিগরিক্যাল উপস্থাপন। লেখক মার্গারেট অ্যাটউড কাল্পনিক এক রাজ্যের গল্প ফেঁদে স্যাটায়ার করেছেন শ্রেণিভিত্তিক শাসনব্যবস্থার। অ্যাটউড উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন আশির দশকে, এর কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে জয়যুক্ত হন রোনাল্ড রিগ্যান ও ব্রিটেনে মার্গারেট থ্যাচার। এভাবে পশ্চিমে সংস্কারবিরোধীরা ক্ষমতায় আসাতে ষাট ও সত্তরের দশকব্যাপী উজ্জীবিত হয়ে ওঠা নারীবাদী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ‘রিলিজিয়াস রাইট’ মাথাচাড়া দেওয়াই ‘সেক্সুয়াল রেভল্যুশন’ নিয়ে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তৎকালীন নারীবাদীরা। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট অ্যাটউডও ছিলেন। তিনি আলোচ্য উপন্যাসে নারী-অধিকারের ঠিক উলটো চিত্র উপস্থাপন করে ইউরোপবাসীকে আগাম সতর্ক করে দিলেন। গিলেডের নারীরা শুধু ভোটাধিকারই না, লিখতে ও পড়তে পারার অধিকারও হারাল। সেইসঙ্গে আশির দশকে নিউক্লিয়ার শক্তির ফলে পরিবেশ নষ্ট ও মানুষের জন্মদানের ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্বসহকারে এই উপন্যাসে উঠিয়ে আনলেন। ফলে উপন্যাসটি একদিকে যেমন হলো নারীবাদী ও মানবতাবাদী, অন্যদিকে তেমন পরিবেশবাদীও।

উপন্যাসটির অন্য একটি উল্লেখযোগ্য থিম হলো, সম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। এই সম্পর্ক যেমন নারী-পুরুষে, তেমনি নারীতে-নারীতে এবং পুরুষে-পুরুষে। একদিকে থাকে কেটের সঙ্গে সেরেনা জয়, ময়রা, আন্ট লিডিয়া, জেনিন ও রিটার সম্পর্ক; অন্যদিকে থাকে কমান্ডার, লুক, ডাক্তার ও স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক। সব সম্পর্ক একরকম নয়। ময়রা নারীবাদী-সমকামী নারী। সেরেনা আবার পুরুষবাদী। এই দুই নারীর সঙ্গে কেটের দুরকম সম্পর্ক। একইভাবে, লুক প্রেমিক  পুরুষ- সে লড়ছে মুক্তির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। আর কমান্ডার প্রেমিক পুরুষ হয়েও তার সংগ্রাম অন্যখানে, সে মানবিক বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলা মানুষ। কাজেই এই দুই পুরুষের সঙ্গে কেটের দুই ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একাকিত্ব বোধ। কেট প্রতি মুহূর্তে নস্টালজিক হয়ে পড়ে। কখনো কখনো মনে হয়, সে বর্তমানের চেয়ে অতীত জীবনে বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এজন্যে সে তার সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা মানুষ হয়ে ওঠে।

প্রথম প্রকাশের পরপরই উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বেস্ট সেলার খেতাব অর্জন করে। এর মূল কারণ হলো, অ্যাটউডের পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি, যা বলতে চাচ্ছেন অনায়াসে বলে ফেলার ক্ষমতা। ভাষার ভেতর হাস্যরসের উপস্থিতি তাঁর লেখা সুখপাঠ্য করে। অনেক কঠিন কথা সহজ করে বলতে জানেন বলেই তিনি জনপ্রিয় ধারার কথাসাহিত্যিক না হয়েও এতটা জনপ্রিয়। উল্লেখ্য, ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’ থেকে একই নামে ১৯৯০ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ছবিটি পরিচালনা করেন বিখ্যাত পরিচালক ভলকার স্কলনডোর্ফ এবং চিত্রনাট্য লেখক নোবেলজয়ী নাট্যকার হারল্ড পিন্টার। এছাড়া উপন্যাসটি অবলম্বনে নির্মিত অপেরাও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে। বর্তমানে এর কাহিনি অবলম্বনে একটি টিভি সিরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে।

 

বি.দ্র.: কানাডীয় লেখক মার্গারেট অ্যাটউড বিংশ শতকের আলোচিত নারীবাদী উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’-এর সিক্যুয়েল ‘দ্য টেস্টামেন্টস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এবছর যৌথভাবে এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন অ্যাংলো-নাইজেরীয় লেখক বার্নাডিন এভারিস্তো- ‘গার্ল, উইমেন, আদার’ বইটির জন্য। এখানে ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’-এর উপর আলোচনা প্রকাশিত হলো। পরবর্তী সময়ে ‘দ্য টেস্টামেন্টস’ এবং ‘গার্ল, উইমেন, আদার’ বইয়ের রিভিউ প্রকাশ করা হবে- সাহিত্য সম্পাদক


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়