ঢাকা, রবিবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নিরুদ্দেশ হাওয়ার পাখি

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১২ ১:৪০:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১২ ১:৪৪:৩৪ পিএম
বেলাল চৌধুরী (১৯৩৮-২০১৮)

একদিন ভাবতাম, ক্ষয়িষ্ণু কুমার নদের পাড় থেকে দূরে চলে যাব। সেই দূরের শহরেও হয়ত কোনো নদী থাকবে, নদীর ধারে সন্ধ্যেবেলা হাঁটব আমি। সেই নদীর নাম কী? দূরের শহরের সেই নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বহুদিন পর তখন কি ফের আমার মনে পড়বে না কুমার নদকে? কুমার কি আমাকে চিনতে পারবে? হাফপ্যান্ট ডাঙায় খুলে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়া কুমারের জলেই আমার শৈশবের পাণ্ডুলিপি গুম হয়ে গেছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে আমি বড় হচ্ছিলাম কুমার নদের পাড়ে। কুমারকে আমার সবসময় মনে হতো এক চিরকুমার। তিতাস নদীর পাড়ের কবি আল মাহমুদ তাঁর একটি কবিতায় কুমারকে চিত্রিত করেছেন। আমাদের গাড়াগঞ্জ বাজারের পাঁজর ঘেঁষে কুমার বয়ে গেছে শৈলকুপা-শ্রীপুর-মাগুরার মধুমতির দিকে। দুপাড়ে সারি সারি গ্রাম, আমাদের গ্রাম মধুপুর। গাড়াগঞ্জ বাজারলগ্ন এই ছোট্ট গ্রাম মধুপুর। বাজারে আমাদের হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল আর একটি পোস্ট অফিস ছিল। সেই পোস্ট অফিসে যখন প্রত্যেকদিন যশোর-ঝিনাইদহ হয়ে দুপুরবেলা ডাক আসত, পোস্টমাস্টার ডাকের চিঠিপত্র, খাম সবকিছু বুঝে নিতেন। আমি বসে দেখতাম। প্রত্যেকদিন দুপুরেই ডাক যখন আসত, আমি হয়ত তখন অষ্টম-নবম কি দশম শ্রেণি। টিফিন আওয়ার ও একটি ক্লাস মার দিয়ে পুরো সময়টা পোস্ট অফিসে বসে অপেক্ষা করতাম কখন ডাক আসবে?

খাকি রঙের ডাকের ব্যাগ ঝেড়ে হরকরা ঐ অফিসে জমা পড়া চিঠিপত্র নিয়ে চলে যেতেন। সেই ছিল তার কাজ। তারপর পোস্টমাস্টার হরকরার কাছ থেকে পাওয়া চিঠিপত্র, মানিঅর্ডার, ক্যালেন্ডার, ম্যাগাজিনসহ নানান পার্সেলে সিল মেরে বাছাই করতে বসতেন। আমি সোভিয়েত ঢাকা মৈত্রী সমিতির ঝকঝকে প্রকাশনা উদয়ন এর গ্রাহক ছিলাম। এছাড়াও রেডিও পেইচিঙ, রেডিও তেহরান, বিবিসি লন্ডন-এর বাংলা বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে চিঠিপত্রে কানেক্টেড ছিলাম। ওসব জায়গা থেকেই বাৎসরিক ক্যালেন্ডারসহ নানা রং-বেরঙের ছবিওয়ালা চিঠি আসত আমার নামে। এছাড়াও আমি দু’একটা ম্যাগাজিন পোস্টমাস্টারের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেরে দিতে চাইতাম, অনেকটা সে কারণেই ডাক ব্যাগ খোলার সময়টা শিকারির মতো বসে থাকতাম।

এখন ভাবলে মজাই লাগে, গত শতাব্দীর আর্লি এইটিজের এক গ্রামবালক হাইস্কুলে থাকতেই কীভাবে কানেক্টেড ছিল দুনিয়ার সঙ্গে। তো পোস্টমাস্টারের টেবিলে পড়ে থাকত ‘ভারত বিচিত্রা’। পোস্টমাস্টারের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেরে দিতাম। ভারতীয় হাইকমিশন থেকে বিনামূল্যে প্রচারিত শিল্প সাহিত্যের ম্যাগাজিন। গাড়াগঞ্জ পোস্ট অফিসে ‘ভারত বিচিত্রা’ যেত প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নামে। পড়তে খুব ভালো লাগত। গল্প, কবিতা, শিল্পসাহিত্যের নানান ঘর-বারান্দা, ভ্রমণকাহিনীসহ ভারতীয় হরেক প্রসঙ্গে ঠাসা থাকত। এমন একটি জার্নালের জন্য চোর হয়েছি তখন। এই ‘ভারত বিচিত্রা’র সম্পাদক ছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী। আমার সেই কাঁচা বয়সের ততোধিক কাঁচা কাঁচা কবিতাগুলো ডাকযোগে পাঠাতাম, ছাপা হতো না। আবার কবিতাসহ চিঠি লিখলাম ‘ভারত বিচিত্রা’র ঠিকানায়, কবি বেলাল চৌধুরীকে। যথারীতি ছাপা না হওয়া।

‘ভারত বিচিত্রা’য় পড়তাম সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, সমরেশ বসু, অরুণ মিত্র, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুনীল-শক্তি, কৃত্তিবাস, দিবেন্দু পালিত, ভইকম মুহাম্মদ বশিরের অনুবাদ, হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ হালুই, গনেশ পাইন, বাঘাবাইন, সত্যজিৎ, হীরক রাজার দেশ, আনন্দ বাজার, সাগরময় ঘোষ, কমলকুমার মজুমদার, গৌর কিশোর ঘোষ, কবিতা সিংহ, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শরৎ কুমার মুখোপাধ্যায়, রবি শঙ্কর, বিসমিল্লাহ খাঁ- ‘ভারত বিচিত্রা’ এদের দিয়ে সাজাতেন সম্পাদক বেলাল চৌধুরী। এদের পাশে আমার লেখা তখন কি করে ছাপা হবে? লিখছি, আর লেখা পাঠাচ্ছি, সবকাগজেই পাঠাচ্ছি। হঠাৎ দু’একটা ছাপাও হয়ে যাচ্ছে কোথাও, কোথাও।

গাড়াগঞ্জ বহুমুখি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করার পর ঝিনাইদহ শহরের সরকারি কে সি কলেজে ইন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম। শহরে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি, বেসরকারী পাবলিক লাইব্রেরি এবং কে সি কলেজ লাইব্রেরির ভূমিকা আমার জীবনে অসীম। হঠাৎ একদিন একটি চিঠি পাই ঝিনাইদহে বসেই। চিঠি লিখেছেন বেলাল চৌধুরী। চিঠির বক্তব্য, ‘তোমার একটি কবিতা আগামী সংখ্যা ভারত বিচিত্রায় প্রকাশিত হবে। আপাতত তোমার আর লেখা পাঠানোর দরকার নেই, কিছুদিন পর আবার পাঠিও।’

এরপর চলে গেছি খুলনায়। খুলনা আর্ট কলেজের পেছনেই ছিল মন্নুজান বালিকা বিদ্যালয়। স্কুল যখন ছুটি হতো আমরা আর্ট কলেজের ছাত্ররা জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম শতশত কমলা রঙের কিশোরী রাস্তা ধরে যাচ্ছে। ‘কমলা কম্পজিশন’ নামে একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল তখন ‘ভারত বিচিত্রা’য়। তারপর তো ঢাকায় চলে আসলাম। চারুকলার ছাত্র হলাম। ইউনিভার্সিটি হলে থাকতাম। অনেক কাগজেই আমার লেখা বেরুচ্ছে নিয়মিত। একদিন ভাবলাম ভারতীয় হাই কমিশনের সাংস্কৃতিক দপ্তরে গিয়ে সম্পাদক বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করি। সেটি তখন ছিল ধানমন্ডির ৩ নাম্বার রোডে। কবি ও সম্পাদক বেলাল চৌধুরীকে নিয়ে সেই ঘটনাটি লিখতে লিখতেই এই রচনার ইতি টানা যাবে, কী বলেন?

ঢাকায় সিনিয়র সব কবি সাহিত্যিকের সঙ্গেই আলাপ পরিচয়, বোঝাপড়া, বাহাস, বিহার, সমবিহার, বাতচিৎ হয়েছে, হচ্ছে। কবি বেলাল চৌধুরীর অনেক স্নেহ পেয়েছি। কবি রফিক আজাদেরও অনেক স্নেহ পেয়েছি। একদিন ‘ভারত বিচিত্রা’ অফিসে বসেই বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। কথায় কথায় আমি বেলালদাকে বললাম, ‘অনেক বছর আগে যখন আমি ইন্টার মিডিয়েটে পড়তাম, আপনি ঝিনাইদহের ঠিকানায় আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, মনে আছে?’

বেলাল চৌধুরী বললেন, ‘ও হ্যাঁ, তোমার ডাকে পাঠানো কবিতা পড়ে আমি রফিক আজাদকে পড়তে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন রফিকই আমার হয়ে তোমাকে চিঠিটা লিখেছিল। এর দু’একদিন পরেই ধানমন্ডির ১ নাম্বার রোডে রাত ১০টার দিকে হঠাৎ দেখা হলো রফিক আজাদের সঙ্গে। তখন রাস্তা টলছিল, রাস্তা আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, রাস্তাকে মনে হচ্ছিল একটি খাল, আমরা খালের জলের ওপরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম, আমরা মনে হয় বকপাখি হয়ে পড়েছিলাম, কারণ, রাস্তা হয়ত ভীষণ ভদকা খেয়েছিল। আমি মাতাল রাস্তাকে কোনো প্রশ্ন না করে প্রশ্ন করি কবি রফিক আজাদকে। বলি, ‘রফিক ভাই, আপনি কি বহু বছর আগে ‘ভারত বিচিত্রা’ অফিসে বসে সম্পাদক বেলাল চৌধুরীর নামে আমাকে ঝিনাইদহের ঠিকানায় চিঠি লিখেছিলেন?

‘হ্যাঁ, লিখেছিলাম।’

‘বেলাল চৌধুরীর হয়ে আপনি কেন চিঠি লিখলেন আমাকে?’

ভদকার ঝুলনমায়ায় রফিক আজাদ যা বোঝালেন, ‘তোর কবিতা ভালো লেগেছিল বলে। তোকে আমি পুত্রজ্ঞান করি।’ বলেই রফিক ভাই আমার কাঁধে হাত দিয়ে এতক্ষণ যে পথে এলেন উল্টো সে পথেই ঠেলতে লাগলেন। বললাম, ‘কোথায় যাবেন এত রাতে?’

‘সাকুরায়। তুই মদ খাওয়াবি। তোকে আমি পুত্রজ্ঞান করি।’

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন