ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিস্ময়কর একজন গল্পকার!

সাখাওয়াত টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৮ ৪:০৩:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৮ ৪:০৩:৩৫ পিএম

বাংলা ভাষার বিস্ময়কর লেখক হুমায়ূন আহমেদ। বিস্ময়কর কারণ, জীবনের আধাআধি সময়ে এসে তিনি সাহিত্যকে আশ্রয় করে জীবন ধারণ করেছেন। আমাদের দেশে নিছক সাহিত্য করে জীবন পার করেছেন এমন লেখক হাতে গোনা। সাহিত্যে ফেরার পর সেটাই তার কর্ম জীবনের দিশা আকারে থেকেছে। সাহিত্য যেমন হুমায়ূনকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল, আবার তিনিও সাহিত্য কম সৃষ্টি করেননি! মোটাদাগে সৃষ্টির কথা বিবেচনা করলে হুমায়ূন রচনা করেছেন গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন আর নাটক। তার বাইরেও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ আর শেষ জীবনে ছবি এঁকেছেন। নাটক আর চলচ্চিত্রের সংখ্যা গল্প কিংবা উপন্যাসের চেয়ে কম। কিন্তু এই সৃষ্টিশীলতার দিকে তাকালে দুটো দিক প্রধান হয়ে ওঠে। প্রথমত তাঁর লেখা গল্প, আর দ্বিতীয়ত উপন্যাস। দুটোই আলাদা আলাদাভাবে বিচার্যের বিষয় বটে। তারপরও বলা যায়, উপন্যাসের চেয়ে তাঁর গল্প তুলনামূলক ভালো। গল্প ভালো কেনো?

প্রথমত হুমায়ূন প্রচলিত ছকেই গল্প লিখেছেন। কিন্তু নিছক গল্পকার হলেও সাহিত্যের অবস্থানগত দিক দিয়ে তাঁর অন্যলেখার দর কমতো না। সংখ্যা বিচারে তিনি গল্প লিখেছেন নাটক কিংবা উপন্যাসের কম নয়! তাঁর গল্পে কোনো নিরীক্ষা নেই, সত্য। কিন্তু সত্য সত্য কাহিনী আছে। এটা দর্শনের সত্য নয়, গল্পের সত্য। কল্পনা আর ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস হুমায়ূনের গল্পে এন্তার দেখা যায়। তাঁর গল্প মানে নিরেট গল্প। নিরেট গল্প কি জিনিস? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, ‘ছোট প্রাণ, ছোট কথা’। হুমায়ূনের গল্পে দুটো জিনিস গুরুত্বপূর্ণ- একটা হলো মুহূর্ত যাপন। আরেকটি হলো, সত্য কিংবা মিথ্যা যাই হোক, গল্পের কাহিনী আর কল্পনা পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। ফলে সত্য সত্য পাঠক গল্পপাঠ শুরু করলে শেষ না-করা পর্যন্ত নিস্তার নেই। পাঠক গল্পের ভেতরের রসায়নে মগ্ন হতে বাধ্য!

দ্বিতীয়ত হুমায়ূনের উপন্যাসকে কি বাজার শাসন করেছে? পাঠকের দিকে তাকিয়ে, মানে বাজার যেভাবে চায় হুমায়ূন সেভাবে লিখেছেন? দুয়েক ক্ষেত্রে ঠিক হলেও কথাটি সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। কেননা পাঠক লেখকের রুচি নির্ধারণ করেন না, প্রচলিত বাজার ব্যবস্থা হয়তো কিছুটা লেখককে নিয়তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে তা একক বাজার নয়। সেখানে অনেককিছুই নির্ভর করে। প্রথাগত ক্ষমতা-কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতির ভেদাভেদ ও রাজনৈতিক অর্থনীতিও কাজ করে। সবকিছু নিয়ে, এমনকি, লেখকের গতিপথও নির্ধারণ করে দিতে পারে গোটা উৎপাদন সম্পর্ক। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি সাহিত্যিক দৃশ্যমান ডামাডোল থেকে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। অবশ্য হুমায়ূন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি গুহাবাসী। আমরা ধরে নিতে পারি, সমাজ, ক্ষমতা আর সাহিত্যকে তিনি তৃতীয় নয়নে পর্যবেক্ষণ করতেন। আধুনিক জগতে কোনোকিছু রাজনৈতিক উৎপাদন সম্পর্কের বাইরে নয়। সেই ক্ষেত্রে হুমায়ূনেও দু’আনা প্রভাব পড়তে পারে। তার বেশ কিছু উপন্যাসে এই দায় বর্তালেও গল্পের বেলায় সেই কথা আদৌ সত্য নয়।

তৃতীয়ত, উপন্যাসের ক্ষেত্রে হুমায়ূন কোনো কোনো বেলায় শুধু কাহিনীকে টেনে নিয়েছেন। যা অনেকাংশে কার্যকারণহীন। কাহিনীর পর কাহিনীর গাট-ছাড়া ভাবের বিস্তার ঘটিয়েছেন। নিছক কাহিনীকে উপন্যাসে রূপান্তরের জন্য বাড়বাড়ন্ত রূপ দিয়েছেন। তাত্ত্বিক দিকটি খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, কাহিনীর প্রয়োজনেই কোনো কোনো ঘটনা উপন্যাসে সৃষ্টি হয়। কাহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত রূপই উপন্যাসের নিয়তি নির্মাণ করে। এই ক্ষেত্রে যিনি সিদ্ধহস্ত, তার হাতেই কাহিনী উপন্যাস আকারে ধরা দেয়। তবে হুমায়ূনের কোনো কোনো উপন্যাসের ক্ষেত্রে এর অভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে হুমায়ূন এমনই সহজ কাহিনী নির্মাণ করেছেন, যা সৃষ্টিশীলতার আকরে পরিণত হয়েছে। কাহিনীর পরিমিতি বোধ, ভাষার সরল বিস্তার, চিন্তার সঙ্গে কল্পনার সুষম সম্মিলন আর আনন্দদায়ক কিংবা কৌতুক রসবোধের সংশ্লেষে তিনি গল্পের শরীর নির্মাণ করেছেন। এই নির্মাণ সৃষ্টিশীলতর নির্মাণ। মনে রাখা প্রয়োজন, নিছক কাহিনীর শরীর নির্মাণ গল্প নয়। সেটা তো প্রচলিত কাহিনীই বলা। তিনি এই ক্ষেত্রে নিয়মের অতিক্রম।

আমরা হুমায়ূন আহমেদের গল্পের কয়েকটি দিক খতিয়ে দেখতে চাই। বলে নেয়া ভালো, যে কোনো গল্পের পাঁচটি প্রাথমিক দিক আছে। গল্পের সূচনা, কাহিনী, ভাষা, নন্দনতত্ত্ব আর সমাপ্তি। প্রাথমিক দিক বিবেচনায় নিলে তাঁর অন্তর্নিহিত রূপের দেখা মেলে। সূচনা বলতে একটা গল্প কীভাবে শুরু হয় হুমায়ূনের হাতে। পাঠককে তিনি প্রস্তুত করিয়ে গল্পের কাহিনী শুরু করেন না। তার যে কোন গল্প শুরু হয় চলমান ঘটনার কোন টুকরো থেকে কিংবা মনে হতে পারে ঘটনা চলছিল যেখানে পাঠক এসে ঢুকে পড়েছেন। যেন পাঠক কাহিনী শোনার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। হুমায়ূন মূলত পূর্বাপর ঘটনার মাঝামাঝি কিংবা কোন এক সময়ে এসে গল্পের সূচনা করেন। ফলে গল্পের কাহিনী শুরুর আগের ঘটনা কী ছিল কিংবা জানা কাহিনীর ভেতর দিয়ে অজানা কাহিনীতে প্রবেশের একটা চমক থাকে। যেন ঘটনাই বাস্তব। বস্তুত গল্পের সূচনায় তিনি মুহূর্ত যাপনকেই প্রবেশদ্বার হিসেবে নেন। যেন আচমকা বাক্য। ঘটনা আচমকা নয়। সেটা যেন প্রাত্যহিকতায় ভরা। কেন?

কাহিনীর বয়ান বা নির্মাণে হুমায়ূন আহমেদ সিদ্ধ। ভাষা সরল হলেও কাহিনীকে তিনি সরল পথে আগাতে দেন না।  কল্পনা আর কৌতূহল জিইয়ে রেখে তিনি জটিল ঘটনা বুনেন। এমন নয় যে, আধুনিকতা বিবর্জিত ঘটনাকে তিনি জটিল করে তোলেন। বস্তুত আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার জটিল ঘটনাকে তিনি সরল করে তোলেন। আবার তাঁর গল্পের কাহিনীকে এও বলা যায়, জটিল ঘটনা প্রবাহ সহজ রূপে রূপান্তর করেন। হুমায়ূন আহমেদ অপর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাস্তব জীবনের অচেনা জগত বা কালো পর্দা ভেদ করবার কথা। তাই মনুষ্য সমাজের চেনা জগতের ভেতর যে অচেনা পর্দা ভেদ কিংবা উন্মোচন করার এক প্রয়াস বলা চলে তাঁর গল্পকে। ফলে তিনি সরল অর্থে সংবেদনশীল অনুভূতির আশ্রয় নেন। সহজ অর্থে, ব্যক্তি মানুষের আবেগ আর বেদনার্ত নিয়তির সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলে ফেলে দেন পাঠককে। ফলে রহস্যময় কাহিনী পাঠকের কাছে আবেদনময় হয়ে ওঠে। এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুমায়ূনের গল্প কৌতুককর হয়ে ওঠে। আনন্দই তার উৎস সার! রগরগে যৌনতা নেই, প্রেম আছে। তবে সেটা প্লেটোনিক, বাৎসল্যময়! কাহিনীর ভেতর তত্ত্বের কচকচানি নেই, অথচ কত না সহজ হয়ে আছে গণিত আর বিজ্ঞান।

ভাষার ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে কাব্যিকতা বর্জন করেছেন হুমায়ূন। অলঙ্কারহীন আর নিরাভরণ ভাষা। প্রতীকের বাহুল্য নেই। সংস্কৃতাশ্রিত শব্দ কম। ছোট ছোট বাক্যে গল্পের শরীর বুনেছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রথম দিককার কিছু লেখাপত্র ছাড়া তিনি কেন ভাষার কারুকাজকে আমলে নেননি? বস্তুত তিনি কাহিনী কিংবা আখ্যানকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। হুমায়ূন পাঠে একটা বিশ্বাস যে কোনো সমালোচকের জন্মাতে পারে, কাহিনী বা আখ্যানের চলন যুতসই না হলে ভাষা দাঁড়াবে না। ফলে তিনি ভাষাকে আখ্যানের প্রচলিত কাঠামো আকারে নিয়েছেন। কাহিনীর তরঙ্গে ভাষা আগায়। তার গল্পের ভাষা কাব্যের সুষমা নয়, আছে কাহিনীর সুষমা। কাহিনীর সৌন্দর্য তিনি ভাষার সৌন্দর্য আকারে নিয়েছেন। ফলে হুমায়ূনের গল্পের কাহিনী নিয়ন্ত্রিত গল্পের ভাষা। তবে জটিল কথা সহজ করে বলার ক্ষেত্রে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই অনুসারী। 

আচমকা কাহিনী দিয়ে শুরু করলেও হুমায়ূনের প্রায় গল্পের সমাপ্তিতে কখনো জনসংস্কৃতির বিশ্বাস, কখনো ব্যক্তির নৈতিকতা, কখনো কল্পনার ভবিষ্যতমুখিতা, কখনো বেদনাদায়ক অনুভূতি, কখনো আনন্দের জজবা, কখনো আশা-আকাঙ্ক্ষার দোলাচল- এমন নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বস্তুত তিনি গল্পকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছেন কিংবা নিয়ে যেতে চেয়েছেন। এই বেলায় খানিকটা নিস্তরঙ্গ ভাষার মতো একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। যেন গল্প শেষের পরে আর কোন গল্প নেই। হুমায়ূনের প্রায় উপন্যাস পাঠক একবার পড়লে দ্বিতীয়বার পড়ার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। গল্পের ক্ষেত্রে সেটা বলা মুশকিল! দুয়েকটা গল্পে শুরুর মতো আচমকা সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। সেই গল্পগুলো নিয়ে পাঠক কল্পনাবিলাসি হতে পারেন। তবে এমন অসমাপ্ত পরিণতি তিনি চাইতেন কিনা সেটাও একটা বড় প্রশ্ন বটে! সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদের গল্প এক নতুন বাস্তবতার আবরণহীন সৌন্দর্যেরই গল্প।  


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন