ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শিল্প সৃষ্টির অনুধ্যানে উচ্চ মার্গের সুর ছন্দ

কামালুদ্দিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২০ ৪:৫০:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২০ ৪:৫৩:৪৩ পিএম

শিল্প হলো প্রকৃতির আদর্শায়িত রূপ। শিল্পকলার ভাষা অভিন্ন ও সর্বজনীন। শিল্প মানুষের প্রাণ শক্তিকে উজ্জীবিত করে। শিল্প মানুষের সম্যক জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছায়া। শিল্পের সৌকুমার্য হচ্ছে আলোর উৎস; যে আলোয় প্রাণ আছে, আছে আনন্দলোক। শিল্প মানুষের মনে আশা জাগায়; মানুষের মনন, রুচির পথ তৈরি করে। যে পথে আছে নান্দনিকতা, মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদ্ভাবন। শিল্প সৃষ্টির অনুধ্যান উচ্চ মার্গের সুর ছন্দের মহিমা প্রকাশ করে। শিল্প অন্তরের রূপ বহিরঙে পৌঁছে দেয়।

‘Odds And ends’ শিরোনামে দলীয় প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া চিত্রগুলো শিল্পীর অন্তরের রূপকে বহিরঙে চিত্রকর্ষণ করেছে চিত্রভূমির উপর দিয়ে। প্রদর্শনীতে সাত তরুণ শিল্পী অংশ নিয়েছেন। এখানে যেমন আছে সদ্য চারুকলা উত্তীর্ণ শিল্পী, তেমনি আছে যারা এখনও চারুকলার শিক্ষার্থী। এমন তরুণ শিল্পীদের রূপ চিন্তার অনুজ্ঞায় প্রকাশ পেয়েছে সমকালীন সমাজ সচেতনতার ক্রোড়পত্র; কঠিন বাস্তবতা, সেইসঙ্গে অতি চেনা জগত। ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার জুম গ্যালারিতে ২১টি ছবি নিয়ে গতকাল ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী। চলবে আগামী  ২৯ নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত।

শিল্পী ফকরুল ইসলামের শিল্পকর্মে হাজির হয়েছে পর্দাপ্রথার বিশ্লেষণ। কয়েক বছর ধরে এদেশে ধর্ষণ, হত্যা উপর্যপুরি বেড়ে যাচ্ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল- সব দোষ মেয়েদের পর্দার। যেন যত দোষ পর্দাঘোষ! যারা পৈশাচিক আচরণ করছেন তাদের নিজেদের চোখের পর্দায় কোন ত্রুটি ছিল না- এমন ভাব! অথচ যারা শরীরজুড়ে কাপড়ে আবৃত তারাও ধর্ষণ থেকে রেহায় পাইনি, এমনকি শিশুরাও। তাঁর ছাপচিত্রের শৈলীতে কাপড়ের ভাঁজগুলো ছুটছে দিগ্বিদিক। প্রদশর্নীর তিনটি কাজই উটকাটে করা। রং হিসেবে বেছে নিয়েছেন উষ্ণ হলুদ ও মনোক্রমিক। সেই উষ্ণ বর্ণে নারীর অস্ফুট উত্তপ্ত প্রতিবাদের বুনন রয়েছে। শিল্পী এখানে নারীবাদী শিল্পীর তাৎপর্য দেখাননি বরং মানবতাবাদী চিত্রীরূপে নুরন ধরেছেন উড কাটেরর উপর।

শিল্পী আফিয়া অরিনের স্বচ্ছ কাঁচের বোতলে আছে অস্বচ্ছ জীবনাচরণ। একটি চিত্রে দেখা যাচ্ছে দুই রঙের দুটি বোতলের জোড়া লাগানো দৈতআত্মা। সেফটিপিনের জোড়ার ক্ষত এখনো সেরে ওঠেনি। এমনকি সে জীবনের স্বপ্নের লাল পাপড়িগুলো পড়ে আছে শূণ্য সাদা বিবর্ণ অনাবাদি ভূমিতে। তবে এই ছবির কম্পোজিশনের পূর্ণতায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। চিত্রের কম্পোজিশন হচ্ছে ছবির প্রাণ। কম্পোজিশন হচ্ছে চারিত্রিক উপাদানসমুহকে একত্র করে রচনা বা গঠন করার কৌশল। আরেকটি বোতলের গায়ে জড়িয়ে আছে কাগজ, যে কাগজ স্বচ্ছ জীবনেকে ঢেকে রেখেছে, স্বচ্ছতাকে হারিয়ে দিয়েছে অস্বচ্ছ কাগজ মুড়িয়ে । এটা অনেকটা দুর্নীতির অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। শিল্পী এসব বোতলের চিত্রগুলি প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন । আমাদের সমাজ ব্যবস্থার যে স্খলন,বা নৈতিকতার অবক্ষয়ে স্বচ্ছতার নিজের চরিত্র হারিয়েছেন, তা চিত্রিত করেছেন। দিন দিন আমাদের দেশে যা হচ্ছে তা অনিবর্চনীয়।

লোকারণ্যের এদেশ। জায়গার অপ্রতুলতা সর্বত্র বিদ্যমান। এক শ্রেণির মানুষের বৈশ্বয়িক আচরণ এদেশকে তাড়িত ক্লিষ্ট করেছে। শিল্পী অজয় সান্ন্যালের চিত্রে এদেশের চিরচেনা জগত অধিক জনসংখ্যাকে এঁকেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, দেশকে ভালোবাসিবার প্রথম লক্ষণ ও প্রথম কর্তব্য দেশকে জানা। শিল্পী এখানে দেশকে জানবার ইচ্ছা পোষণ করেছেন চিত্রে। একটি চিত্রে দেখা যাচ্ছে শিল্পী একা একা দাবা খেলছেন, পেছনে দেখা যাচ্ছে অজস্র জনসংখ্যা, তবু তিনি আরেকজন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় খুঁজে পাচ্ছেন না। যদিও চিত্রে শিল্পীর স্বীয় প্রতিকৃতি অঙ্কনে আরো পারঙ্গমতা দেখানো উচিত ছিল। উপরন্তু আমাদের দেশের জনসংখ্যা বোঝা হিসেবে অনুমেয়, সম্পদ নয়। তাঁর চিত্রাঙ্গনে নিজের জাতিকে তুলে ধরেছেন স্বমহিমায়। অজয়ের কলাবিদ্যা চিত্রান্তর্গতে আপন জাতিসত্তার গায়ে তুলি বুলিয়েছে।

শিল্প আর ধর্মের মধ্যে বিরোধ নেই। ধর্মীয় উপাসনালয়ও এক সময় শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শিল্পী শিপ্রা বিশ্বাস ধর্মীয় অনুষঙ্গ নিজের অগত্যা তুলিকায় উপজীব্য করেছেন। তাঁর পূজা অর্চনার জায়গা চিত্রপট, মন্দির। শিল্পী দেবতাকে মন্দিরের বাইরেও খুঁজতে চেয়েছেন। পূজার থালা,ঘটি,বাটি, ফুল, ফল, সিঁদুর, নানা প্রসাদ ইত্যাদি হচ্ছে তাঁর প্রধান বিষয়। শিপ্রার শিল্পকর্মে উষ্ণ রঙের বৈভবের আধিক্য বেশী। প্রতিটি উপাদানে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। তাঁর তুলি দেবতার পূজা করে, এমনকি শিপ্রাকে ধার্মিক শিল্পী বললেও অতুক্তি হবে না। পূর্বে ভারতের শিল্পী অন্নদাপ্রাসাদ, শিল্পী রাজা রবি বর্মার বিখ্যাত ওলিওগ্রাফে হিন্দু দেবদেবীর সাথে জড় জীবনের মতো নানা অনুষঙ্গ চলে এসেছিল। তেমনি শিপ্রার ছবিতেও এসব অনুষঙ্গ নবরূপে এসেছে।

শিল্প হচ্ছে সমাজের আয়না। শিল্পী পূর্ণিয়া মৃত্তিকার ছবিতে সমাজের কিছু অসংগতির চিত্রবিন্যাস আছে। তাঁর তিনটি ছবি স্কোয়ার সাইজের। তাঁর সমতল চিত্রভূমিগুলোতে সংশ্রিত পেয়েছে তেলরঙের অনুরণন। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে কুকুর জেব্রা ক্রসিংয়ের উপর দিয়ে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছে ট্রাফিক নিয়ম মেনে, যে নিয়ম বাংলাদেশের নির্বোধ মানুষগুলো মানছেন না। চিত্রে কুকুরের পেছনের দুই পায়ের আঙুলের ড্রইঙে আরো সূক্ষ্মতার প্রয়োজন ছিল। তাতে কুকুরটা পূর্ণতা পেত। পশুর যে বোধ আছে সেটি শিল্পীর প্রত্যক্ষনে ফুটে উঠছে। আরেকটি ছবিতে তুলির লেপনে এসেছে শিশু নির্যাতনের পাশবিকতা। মানুষ মনুষ্যত্ব কবর দিয়ে পশুত্বকে হৃদয়াঙ্গম করেছে। এখানে মেয়ে পুতুলটি প্রতীকী হলেও চিত্রমোদীদের বুঝতে অসুবিধা হবে না। চিত্রতলটি দাবা খেলার বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেয়া।

এবার অন্য খেলা, খেলারাম খেলে যাচ্ছে। ইদানীং আমাদের দেশে ক্যাসিনো শব্দটা আমাদের সকলের কান দখল করে রেখেছে। অন্য কোনো শব্দই কারো কানে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। যদিও এসব অপ সংস্কৃতি পৃথিবীজুড়ে বিরল। শিল্পী রনি মন্ডল এখানে ক্যাসিনো খেলাকে এঁকেছেন এক্রেলিক মাধ্যমে। একটি চিত্রের ভূমি উডেন প্যানেল গোলাকার করে কেটে নিয়েছেন তাতে অক্ষরগুলো রিলিফ করে বসিয়ে দেয়া। আরেকটি চিত্রে গ্রাম্য শিশুদের খেলনাতে ক্যাসিনোর বোর্ড আঁকা। যদিও এই চিত্রটিতে চিত্রশৈলীর দক্ষতার ছাপ উপস্থিত নেই। সমাজ সচেতন শিল্পী রনি মন্ডল তাঁর দুটি চিত্রনে ক্যাসিনোর মতো জুয়া খেলাকে ক্যানভাসের উপর তুলি চালিয়ে বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। কারণ জুয়াখেলায় কারো উন্নতি আসে না। যদিও রাশিয়ার লেখক ফিওদর দস্তয়ভস্কি জীবনের অন্যতম উপন্যাস ‘জুয়াড়ি’। তিনি জুয়া খেলতে খেলতে এটি সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে সাধারণেরা জুয়া খেলতে খেলতে সর্বস্ব হারান।

শিল্পী আনিকা তাসনিম অনুপ এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে অনুজ। এখনো শিল্প শিক্ষার্থী হিসেবে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তাঁর শিল্পকর্মের বিষয় হচ্ছে মানুষের মেটামরফোসিস। শিল্পী এখানে ডারউইনের রূপান্তরের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি বাগ্মীরূপে বিধৃত করেছেন মানুষের ক্ষণে ক্ষণে রঙ, রূপ পাল্টানোর কথা । মানুষ প্রতিনিয়ত পশুত্বকে গ্রহণ করছে। মানবিকতাকে শীর্ণকায় করে মুড়িয়ে রেখেছেন অসভ্য সমাজ ব্যবস্থা। এখানে প্রদর্শনীর তিনটি ছবি মিশ্রমাধ্যমের আঁকা, চিত্রে আছে প্রজাপতি, টিকটিকি এবং নানা উদ্ভিদের সমন্বয় আছে। প্রজাপতিকে শিল্পী আত্মান্বেষণ দেখিয়েছেন, প্রজাতির মতো উড়ে যাওয়াকে তাঁর কাছে মনে হয়েছে নিজেকে নিখোঁজ করে রাখা; তথাকথিত পশু মিশ্রিত ক্ষীয়মান মানব সমাজ থেকে। আসলেই মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় দার্শনিকদের মতে ‘মানুষ স্বভাবতই এক সামাজিক পশু’। 

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন