ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

রকিব হাসানের থ্রিলার || জলোচ্ছ্বাস

রকিব হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৮ ১:১০:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৮ ১:১৬:০৩ পিএম

আমেরিকার মেইন উপকূল। ১৯৯৯ সাল।

শামুকে আবৃত চিংড়ি ধরার একটা ফাঁদ বোটে টেনে তুললেন শহীদুজ্জামান। সাবধানে ফাঁদ থেকে দুটো ক্রুদ্ধ চিংড়ি বের করে ওগুলোর দাঁড়া বেঁধে একটা হোলডিং ট্যাঙ্কে রেখে দিলেন। ফাঁদে আবার মাছের মাথার টোপ রেখে, বোটের কিনার দিয়ে খাঁচাটা পানিতে ঠেলে ফেললেন। তারপর দড়ি টেনে আরেকটা ফাঁদ তোলায় ব্যস্ত হলেন।

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী তিনি। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব মেইনে শিক্ষকতা করেন, মহাসমুদ্রবিদ্যা পড়ান। বর্তমানে গ্রীষ্মের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুদান নিয়ে গভীর সমুদ্রে গলদা চিংড়ির ওপর গবেষণা করতে এসেছেন। সমুদ্রের এই বিশেষ জায়গাটা একটা উপকূলীয় ছোট্ট শহর রকি কোভ-এর কাছে। প্রতি বছরই এখানে আসেন তিনি। সমুদ্রের ওপর কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

লম্বা, ছিপছিপে গড়নের শক্তপোক্ত মানুষ তিনি, বয়েস চল্লিশের শেষ দিকে। শেষ খাঁচাটা তোলার সময় তাঁর রোদে পোড়া বাদামি মুখে হালকা হাসির আভাস দেখা গেল। খুব ভালো একটা দিন আজ তাঁর জন্য। কয়েক দিন আগে কাকতালীয়ভাবেই এই ‘হানি হোলটা’ (তাঁর নিজের দেয়া নাম) আবিষ্কার করেন তিনি। জায়গাটা সীমাহীনভাবে তাঁকে চিংড়ি সরবরাহ করে চলেছে- নানা প্রজাতির, নানা আকারের চিংড়ি, যদিও এ জন্য ডাঙা থেকে বহুদূরে আসতে হয়। চিংড়ি কিংবা অন্যান্য মাছ শিকারি জেলেরা সাধারণত এত দূরে আসে না। যে বোটে এখানে আসেন তিনি, ওটা ছত্রিশ ফুট লম্বা একটা কাঠের বোট। নাম ‘গোল্ডেন ডলফিন’। খুবই ভালো বোট। সামর্থের অতিরিক্ত মাল বোঝাই করেও গভীর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে চলাচল করতে পারে। ডাঙার দিকে কোর্স সেট করে, অটোপাইলট দিয়ে, নিচে নেমে এলেন তিনি একটা স্যান্ডউইচ দিয়ে নিজেকে পুরষ্কৃত করার জন্য। রুটির টুকরোয় মাখন মাখাচ্ছেন, এ সময় চাপা একটা গুরুগম্ভীর গুমগুম শব্দ কানে এলো তাঁর। বজ্রের শব্দের মতো হলেও শব্দটা আকাশ থেকে নয়, এলো পানির নিচ থেকে। এত জোরে দুলে উঠল বোটটা, মাস্টার্ড আর মেয়ানেজের বয়ামগুলো কাউন্টারে কাত হয়ে পড়ে গড়াগড়ি শুরু করল!

হাতের ছুরিটা সিংকে ছুঁড়ে ফেলে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডেকের দিকে দৌড় দিলেন শহীদুজ্জামান। দুশ্চিন্তা হলো তাঁর। প্রপেলার ভাঙল, নাকি ভাসমান গাছের সঙ্গে বাড়ি খেল বোট? কিন্তু ওগুলোর কোনোটাই হওয়ার কথা নয় এখানে। কারণ সাগর একেবারে শান্ত। ঢেউয়ের তেমন চাপ নেই, যে প্রপেলার ভাঙবে। আর ঝড়ে উপড়ানো ভাসমান গাছ থাকে কিনারের কাছে, এত গভীর পানিতে আসে না।

কাঁপুনি থেমেছে বোটের। চারপাশে বিস্মিত দৃষ্টি বোলালেন তিনি। পরীক্ষা করে দেখলেন, প্রপেলার ভাঙেনি। কোনো গাছও দেখলেন না। চিন্তিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিচে রওনা হলেন। স্যান্ডউইচ বানিয়ে ওপরে চললেন খাওয়ার জন্য। গোটা দুই চিংড়ির খাঁচা জায়গা থেকে সামান্য সরে গেছে। দড়ি দিয়ে বাঁধলেন সেগুলো যাতে আর নড়াচড়া না করে। ফিরে এলেন হুইলহাউসে। পেটের ভিতর এক ধরনের শূন্য অনুভূতি হলো, দ্রুতগতির লিফট আচমকা ওপরে ওঠার মতো। শক্ত করে হুইল চেপে ধরে নিজেকে সামলালেন। ঝপ করে আবার নিচে নেমে গেল বোট। আবার ঝাঁকি দিয়ে ওপরে উঠল। এবার আগেরবারের চেয়ে উঁচুতে। আবার নিচে নেমে গেল। ভয়ানকভাবে দুলতে শুরু করল এপাশ থেকে ওপাশে। কয়েক মিনিট পর দুলুনি থামল। স্থির হলো জাহাজ। দূরে অস্পষ্ট একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল। হুইলহাউস থেকে আবার দূরবীনটা এনে, সাগরের দিকে তাকালেন শহীদুজ্জামান। রিং ঘুরিয়ে ফোকাস ঠিক করছেন, এ সময় উত্তর থেকে দক্ষিণে লম্বালম্বি তিনটে কালো গভীর দাগ চোখে পড়ল। লম্বা ঢেউয়ের সারি ওগুলো, উপকূলের দিকে ছুটে চলেছে। মাথার ভিতর বিপদের ঘণ্টা বাজতে শুরু করল তাঁর- এ হতে পারে না।

১৯৯৮-এর জুলাইয়ের একদিন পাপুয়া নিউগিনির উপকূলে ঘটা একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। জাহাজে ছিলেন তিনি, সাগরতলের ভূমি জরিপ করছিলেন, হঠাৎ রহস্যময় একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, ভূকম্পন মাপার যন্ত্রপাতিগুলো যেন পাগল হয়ে গেল, সাগরতলের একটা বিশৃঙ্খলার সংকেত দিচ্ছিল। সুনামির লক্ষণ চিনতে অসুবিধে হয়নি তাঁর। তিনি এবং তাঁর সহকর্মী বিজ্ঞানীরা উপকূলীয় এলাকার মানুষদের সাবধান করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। দানবীয় স্টিমরোলারের মতো সাগরপাড়ের গ্রামগুলোকে চ্যাপ্টা করে দিয়েছিল মস্ত ঢেউ। ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ! ম্যানগ্রোভ গাছের ডালে মানুষের লাশ ঝুলে থাকার দৃশ্যটা ভুলতে পারবেন না তিনি, কুমিরে টেনে ছিঁড়ে খাচ্ছিল ওগুলো।

রেডিওর শব্দে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলেন শহীদুজ্জামান। প্রথমে খড়খড় করে উঠল রেডিও। তারপর ফেটে পড়ল যেন গুঞ্জন, একসঙ্গে কথা বলতে লাগল উপকূলীয় জেলেরা। বোট থেকে রেডিওতে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে। ‘ওয়াও!’ একটা কণ্ঠ চিনতে পারলেন শহীদুজ্জামান। তাঁর প্রতিবেশী ডেভিড হোমার। ‘ওই গুমগুম শব্দটা শুনলে?’

‘জেট ফাইটারের শব্দের মতো লাগল, তবে পানির নিচ থেকে এসেছে,’ জবাব দিল আরেকজন জেলে।

‘সাগরের ঢেউ যে বড় হয়ে গেছে, টের পাচ্ছ?’ জিজ্ঞেস করল তৃতীয় আরেকজন।

‘ইয়াপ,’ বলল চতুর্থজন। এই কণ্ঠটাও চিনতে পারলেন শহীদুজ্জামান, তাঁরই মতো আরেকজন চিংড়ি শিকারি, নাম কার্জন মিগ। ‘এমন দোলান দুলিয়ে দিয়ে গেল, মনে হচ্ছিল রোলার কোস্টারে চড়েছি।’

পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে সাগরে মাছ ধরতে থাকা জেলেরা।

পরের কণ্ঠগুলো কানে ঢুকলেও মনোযোগ দিলেন না শহীদুজ্জামান। ড্রয়ার থেকে একটা পকেট ক্যালকুলেটর বের করে, ঢেউগুলো কত সময়ে কতখানি উঁচু হয়েছে এবং আরো কিছু জিনিস হিসাব করে, ক্যালকুলেটরের সংখ্যাটার দিকে অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সেল ফোনটা বের করে কয়েকটা নম্বর টিপলেন।

রকি কোভ-এর পুলিশ চিফ হেনরি মরগানের ভারি কণ্ঠ ভেসে এলো ফোনে।

‘হেনরি, থ্যাংক গড, তোমাকে পেয়ে গেলাম।’

‘আমরা পেট্রোল কারে রয়েছি এখন, স্টেশনে ফিরছি, শহীদ। গতরাতে আমাকে যে দাবায় হারালে, সেটা নিয়ে রসিকতা করতে ফোন করলে নাকি?’

‘আরে ধ্যাত্তোর, তোমার দাবা,’ জবাব দিলেন শহীদুজ্জামান। ‘শোনো, আমি এখন রকি কোভের পূর্ব দিকে রয়েছি। হেনরি, আমাদের হাতে একদম সময় নেই। মস্ত একটা ঢেউয়ের দানব শহরের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।’

শুকনো হাসি শোনা গেল অন্যপাশ থেকে। ‘হেল, শহীদ,’ চিফ বললেন, ‘আমাদের শহরের মতো শহরকে সারা বছর ধরে বহু ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে হয়।’

‘এই ঢেউটার মতো নয়। তুমি তাড়াতাড়ি বন্দর থেকে লোক সরানোর ব্যবস্থা করো, বিশেষ করে নতুন মোটেলটা থেকে।’

শহীদুজ্জামানের মনে হলো ডেড হয়ে গেছে ফোনটা। তারপর হঠাৎ করেই ভেসে এলো হেনরি মরগানের বিখ্যাত অট্টহাসি। ‘শহীদ শোনো, আমার মনে ছিল না আজকে এপ্রিল ফুল।’

‘হেনরি, আমি ঠাট্টা করছি না,’ গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন শহীদুজ্জামান। ‘বন্দরে আঘাত হানবে ওই ঢেউটা। আমি এখনো জানি না ওটা কতখানি শক্তিশালী, কারণ এখনো অনেক কিছুই অজানা, তবে মোটেলটা ঢেউয়ের একেবারে সামনে পড়বে এবং ওটা যাবেই এটুকু বলতে পারি।’

আবার হাসলেন চিফ। ‘হেল, মোটেলটাকে সাগরে ধুয়ে চলে যেতে দেখলে অনেকেই খুশি হবে।’

সোজা বন্দরের দিকে এগিয়ে যাওয়া খুঁটিতে বসানো লম্বা দুইতলা বিল্ডিংটা গত কয়েক মাস ধরে বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিক্ত লড়াই, আদালতে দামি মামলা, আর প্রচুর ঘুষের বিনিময়ে অবশেষে বাড়িটাকে জায়গামতো রাখতে সক্ষম হয়েছে ডেভেলপাররা।

‘কর্তৃপক্ষ নড়তে চাইবে না, তবে প্রথমে গেস্টদের সরিয়ে নেয়ার বন্দোবস্ত করতেই হবে তোমাকে।’

‘হেল, শহীদ, কম করে হলেও শ’খানেক লোক রয়েছে মোটেলে। কোনো কারণ না দেখিয়ে শুধু চেঁচামেচি করে ওদের সরাতে পারব না আমি। চাকরি চলে যাবে আমার। তারচেয়েও খারাপ যেটা হবে, সেটা হলো আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে সবাই।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বললেন শহীদুজ্জামান। চিফকে আতঙ্কিত করতে চান না। তবে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।

‘গডড্যামইট, ইউ ওল্ড ফুল! তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, এই ভয়ে একশো লোকের জীবনের ঝুঁকি নেবে?’

‘তুমি সত্যি রসিকতা করছ না, তাই না, শহীদ?’

‘আমি কোথায় কী কাজ করি, তোমার জানা আছে।’

‘আছে, ইউনিভার্সিটি অব মেইনের প্রফেসর।’

‘হ্যাঁ। মহাসমুদ্রবিদ্যা বিভাগের প্রধান। সাগরের ঢেউ গবেষণা আমার প্রধান কাজগুলোর একটা। পারফেক্ট স্টর্মের নাম শুনেছ? সেই প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস এখন ধেয়ে যাচ্ছে তোমার দিকে। আমি হিসাব করে দেখেছি আগামী পঁচিশ মিনিটের মধ্যে উপকূলে আঘাত হানবে ওটা। মোটেলের লোকগুলোকে কী বলে বোঝাবে আমি জানি না, সেটা তোমার ব্যাপার। গ্যাস লিক হয়ে বাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার ভয় দেখাতে পারো, সন্ত্রাসীরা টাইম বোমা রেখে গেছে বলতে পারো, যা খুশি বলো, শুধু ওদেরকে বের করে উঁচু জায়গায় নিয়ে যাও। এখুনি কাজ শুরু করো।’

‘ও-কে, শহীদ, ও-কে।’

‘মেইন স্ট্রিটে কোনো দোকানপাট খোলা আছে?’

‘কফি শপটা খোলা। নাইট শিফটে কাজ করছে জনসনের ছেলে। ওকে ভাগাচ্ছি। তারপর ফিশ পিয়ারে যাব।’

‘পনেরো মিনিটের মধ্যে সবাইকে সরাও। তুমিও বসে থেকো না বলে দিলাম, সবার সঙ্গে চলে যেয়ো।’

‘যাব। থ্যাংক ইউ, শহীদ। বাই।’

উত্তেজনায় রীতিমতো মাথা ঘুরছে শহীদুজ্জামানের। রকি কোভ-এর দৃশ্যটা কী হবে কল্পনা করলেন। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা অ্যামফিথিয়েটারের মতো তৈরি হয়েছে বারোশ মানুষের এই শহরটা। বন্দরের দিকে মুখ করা চন্দ্রবিন্দুর মতো বেঁকে থাকা ছোট একটা পাহাড়ের গায়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক গুচ্ছ বাড়ি। বন্দরটা মোটামুটি নিরাপদ জায়গাতেই রয়েছে, কিন্তু গোটা দুই ভয়ঙ্কর হারিকেন ঝড়ের হামলার পর শহরবাসী বুঝে গেছে পানির কাছ থেকে যতটা সম্ভব ওপরে আর দূরে বাস করাটা অনেক বেশি নিরাপদ। বন্দরের কিনারে মেইন রোডের ধারে কতগুলো পুরোনো ইটের বাড়ি, তার পাশে কিছু দোকানপাট আর রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়েছে, টুরিস্টদের জন্য। তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে যেন বন্দরে কর্তৃত্ব করছে ফিশ পিয়ার আর মোটেলটা। ইঞ্জিনের থ্রটল ঘুরিয়ে বোটের গতি বাড়িয়ে দিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকলেন শহীদুজ্জামান, যেন তাঁর হিসাব ভুল না হয়, শহরবাসীকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর আগেই যাতে আঘাত না হেনে বসে ঢেউটা।

 

দুই

রেডিওর লাইন কেটে দেয়ার পর মুহূর্তেই শহীদুজ্জামানের জরুরি অনুরোধে কান দেয়ার জন্য পস্তাতে শুরু করলেন চিফ মরগান। অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা কেমন ভোঁতা করে দিচ্ছে তাঁর অনুভূতি। বুঝতে পারছেন, কাজটা করলেও বিপদ, না করলেও বিপদ। দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব শহীদুজ্জামানের সঙ্গে। মস্ত বড় বিজ্ঞানী। এ পর্যন্ত কোনোদিন তাঁকে ভুল করতে দেখেননি। ওহ্ হেল, কী বিপদেই না পড়লাম, অস্বস্তি বোধ করছেন চিফ। শহীদুজ্জামানের কথা শুনে যদি ভুল করেন, তাহলে হাসাহাসি করবে সবাই। আর বড়জোর ছেলেমানুষী করার অপরাধে চাকরি হারাতে হতে পারে। কিন্তু যদি না শুনে ভুল করেন, চাকরি তো যাবেই, আদালতে আসামীর কাঠগড়াতেও দাঁড়াতে হবে, আর তারচেয়েও বড় কথা, অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর দায় নিতে হবে তাঁকে। তার জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না কোনোদিন। নাহ্, এত বড় ঝুঁকি তিনি নিতে পারবেন না।

সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তিনি, শহীদুজ্জামানের কথাই শুনবেন। তারপর আর একটা সেকেন্ড দেরি করলেন না। সুইচ টিপে ফ্ল্যাশার অন করে দিয়ে, অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরলেন, রাস্তায় টায়ার ঘষে রবার পুড়িয়ে গাড়ি ঘোরালেন, ইঞ্জিনের গর্জন তুলে ছুটে চললেন সাগরের দিকে। দূরত্ব খুব অল্পই, এটুকু পেরোনোর সময়ই রেডিওতে তাঁর ডেপুটির সঙ্গে কথা বলে সব বুঝিয়ে দিলেন, প্রথমে কফি শপটা খালি করে, মাইকে মানুষকে সাবধান করে দিয়ে ওদেরকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উঁচু জায়গার দিকে চলে যেতে বলতে বললেন। এ সময় শহরের কে কী করছে, সব তাঁর জানা; কে ঘুম থেকে উঠল, কে কুকুর নিয়ে বেড়াতে বেরোল, সব মুখস্ত। ভাগ্যিস, বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেনি এখনো, দশটার আগে খুলবে না।

এই মোটেলটা হলো এখানকার আরেক যন্ত্রণা। ভাবতেই মুখে বিরক্তির ছাপ পড়ল চিফের। স্কুলের বাচ্চাদের তুলে নিতে যাচ্ছে দুটো খালি স্কুল বাস, ওগুলোর ড্রাইভারদের তাঁকে অনুসরণ করতে বললেন। মোটেলের গাড়ি থামার ছাউনির নিচে এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলেন। গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে সামনের দরজার দিকে দৌড় দিলেন। এখানে মোটেল তোলার ব্যাপারটা শহরবাসী আরো অনেকের মতো তিনিও মেনে নিতে পারেননি। বন্দরের শুদ্ধতা নষ্ট করেছে এই বাড়িটা। তবে এখানকার বহু মানুষের কর্মসংস্থান করেছে, এটাও ঠিক। শহরের সবাই জেলে হতে চায় না। তবে যে উপায়ে বাড়িটা তোলার অনুমতি আদায় করা হয়েছে, সেই ব্যবস্থাটাও তাঁর পছন্দ নয়। তিনি নিশ্চিত, টাউন হল কর্তৃপক্ষকে সবার চোখের আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দেয়া হয়েছে।

ডেভেলপার এখানকার একজন স্থানীয় লোক, জেকব ওরাম। একজন নীতিহীন ভূমি ধর্ষণকারী। সহজে স্থানীয় লোকদের কাজ দিতে চায় না ওরাম, বিদেশিদের ডেকে আনে যাদের দিয়ে অনেক কম টাকায় অনেক বেশি কাজ করিয়ে নিতে পারে।

ডেস্ক ক্লার্ক, একজন তরুণ জ্যামাইকান, মুখ তুলে তাকিয়ে চিফকে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে দেখে চমকে গেল। লবিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করলেন চিফ, ‘মোটেল থেকে বেরোতে বলো সবাইকে! অবস্থা খুব খারাপ!’

‘সমস্যাটা কী, ম্যান?’

‘আমাকে বলা হয়েছে, এখানে বোমা লুকানো রয়েছে।’

ঢোক গিলল ক্লার্ক। তারপর সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে রুমে রুমে খবর দিতে লাগল।

‘দশ মিনিট সময় পাবে,’ তাগাদা দিলেন মরগান। ‘বাইরে বাস অপেক্ষা করছে। সবাইকে বের করো, তোমাকেসহ। বলো, যে না বেরোবে, পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করবে।’

গটগট করে হেঁটে এলেন কাছের হলওয়েটাতে। দরজায় দরজায় কিল মেরে বলতে লাগলেন, ‘পুলিশ! জলদি বেরোন! দশ মিনিট সময় দিলাম!’ তাঁর চিৎকারে দরজা খুলে উঁকি দিতে থাকল ঘুমজড়ানো মুখগুলো। ‘বোমা পেতে রাখা হয়েছে বিল্ডিংয়ে। এখনই বের হতে হবে। আপনাদের জিনিসপত্র নেবারও সময় দিতে পারব না।’

একই কথা বারবার বলতে বলতে গলার ভিতরটা খসখসে হয়ে গেল তাঁর। বাথরোব আর পাজামা পরা, কিংবা চাদর জড়ানো মানুষের ভিড় জমে গেল তাঁকে ঘিরে। কালো চামড়ার একজন মানুষ একটা রুম থেকে বেরিয়ে এসে রাগতস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী, হয়েছেটা কী?’

ঢোক গিললেন মরগান। ‘বোমা পেতে রাখা হয়েছে, জেকব। তোমাকেও বেরোতে হবে।’

সোনালি চুলের একজন অল্পবয়েসি মহিলা উঁকি দিল একই ঘর থেকে। ‘কী হয়েছে, চিফ?’

‘মোটেলে বোমা পেতে রাখা হয়েছে,’ জবাব দিলেন চিফ, মিথ্যে বলতে গলা কাঁপছে না এখন আর।

ফ্যাকাশে হয়ে গেল মহিলার মুখ। তাড়াতাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে এলো। পরনে এখনো সিল্কের পাতলা বাথরোব। হাত ধরে ওকে টেনে থামানোর চেষ্টা করল জেকব, কিন্তু ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল মহিলা।

‘আমি এখানে থাকব না,’ মহিলা বলল।

‘তোমার ইচ্ছে। তবে আমি এখান থেকে যাব না,’ ওরাম বলল। ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিল।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মরগান। তারপর মহিলার হাত ধরে নিয়ে চললেন, লোকের ভিড়ে মিশে বেরিয়ে এলেন সামনের দরজা দিয়ে। দেখলেন, বাস দুটো প্রায় ভর্তি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি সরে যাওয়ার জন্য ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে চেঁচাচ্ছে যাত্রীরা।

‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভাগো। সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টায় উঠে যাবে।’ বলে নিজের গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে বসলেন চিফ। দ্রুত সরে এলেন ফিশ পিয়ারের কাছ থেকে।

তিনজন জেলের সঙ্গে তর্ক করছে ডেপুটি। জানালা দিয়ে মুখ বের করে চেঁচালেন চিফ, ‘এই, জলদি গিয়ে ট্রাকে ওঠো তোমরা। এখুনি যদি ঊর্দ্ধশ্বাসে হিল স্ট্রিটের দিকে না ছোটো, সোজা অ্যারেস্ট করে হাজতে ভরব।’

‘ঘটনাটা কী, হেনরি?’ একজন জিজ্ঞেস করল।

রুক্ষস্বরে চিফ জবাব দিলেন, ‘শোনো, হ্যারি, আমাকে তুমি চেনো। যা বলছি, করো, পরে সব বলব।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল জেলেরা। আর কিছু না বলে যার যার ট্রাকে গিয়ে চড়ল। ডেপুটিকে ওদের অনুসরণ করতে বলে শেষবারের মতো আরেকবার ফিশ পিয়ারে চক্কর দিলেন চিফ। সেখানে একজন বুড়োকে জঞ্জালের ড্রামে বোতল আর ক্যান খুঁজতে দেখে তাকে গাড়িতে তুলে নিলেন। তারপর মেইন স্ট্রিটে এসে আর কাউকে না পেয়ে সোজা ছুটলেন হিল স্ট্রিটের চূড়ার দিকে।

পাহাড়ের ওপর কয়েকজন লোক দাঁড়ানো। সকালের ঠান্ডায় কাঁপছে। চিফকে দেখে চিৎকার করে কিছু বলল। ওদের বাঁকা কথা গায়ে না মেখে, গাড়ি থেকে নেমে, খাড়াই বেয়ে এসে দাঁড়ালেন বন্দরে যাওয়ার রাস্তাটার ওপর। প্রচন্ড উত্তেজনার চাপ কমে যেতেই, দুর্বল লাগল তাঁর, দুই হাঁটুতে জোর পাচ্ছেন না। জলোচ্ছ্বাসের অপেক্ষা করতে লাগলেন।

কিছুই ঘটছে না।

ঘড়ি দেখলেন।

পাঁচ মিনিট পার হলো। সেই সঙ্গে উধাও হয়ে গেল তাঁর মন থেকে দীর্ঘকালের পুলিশের চাকরি থেকে স্বস্তির অবসর, আর পেনশনের টাকায় শান্তিতে জীবন কাটানোর স্বপ্ন। ঠান্ডার মধ্যেও ঘামতে লাগলেন।

শহীদুজ্জামানকে ফোন করে কয়েকটা কড়া কথা বলবেন কি না ভাবছেন, হঠাৎ দিগন্তের কাছে সমুদ্র ফুলে উঠতে দেখলেন। কানে এল দূরাগত বজ্রের শব্দের মতো শব্দ। হট্টগোল থামিয়ে দিয়েছে শহরবাসী। প্রণালীর প্রবেশ মুখে অন্ধকার ছায়া পড়ল, বন্দরের পানি শুঁষে নিয়ে গেল যেন কোনো দানব। তলাটা দেখতে পাচ্ছেন তিনি। মাত্র কয়েক সেকেন্ড থাকল এই অবস্থা। তারপর বিকট গর্জন তুলে ছুটে এল আবার পানি। নোঙর করা জাহাজ আর বড় বড় বোটগুলোকে এমনভাবে ধাক্কা দিয়ে উঁচু করে ফেলল, যেন ওগুলো খেলনা। পরপর আরো দুটো ঢেউ প্রথমটাকে অনুসরণ করল, প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টা বড়। তীর ভাসিয়ে দিল। ডাঙার বিশাল একটা অংশ প্লাবিত করে ঢেউয়ের পানি যখন আবার সাগরে ফিরে গেল, মোটেল আর ফিশ পিয়ারটা অদৃশ্য হয়েছে।

 

তিন

সকালে যে রকি কোভ দেখে গিয়েছিলেন শহীদুজ্জামান, বিকেলে ফিরে সেটাকে একেবারে অন্যরকম দেখলেন। বন্দরে নোঙর করা বোটগুলো সব তালগোল পাকানো, কাঠ আর ফাইবারগ্লাসের স্তূপ হয়ে আছে। ছোট বোটগুলোকে তুলে দেয়া হয়েছে মেইন স্ট্রিটে, রাস্তার ওপর। দোকানপাটের জানালার কাঁচ ভেঙে তছনছ করে রেখে গেছে যেন একদল সন্ত্রাসী। জঞ্জাল আর শৈবালে ভর্তি সাগরের পানি, আর কাদার টোকো গন্ধের সঙ্গে মিশে রয়েছে পচা মাছের দুর্গন্ধ। মোটেলটা উধাও। ফিশ পিয়ারের শুধু থামগুলো অবশিষ্ট রয়েছে। আর রয়েছে পানির কিনারে ঢেউ ঠেকানোর মজবুত কংক্রিটের দেয়ালটা। তার ওপর দাঁড়ানো একটা মূর্তিকে হাত নেড়ে ডাকতে দেখে সেদিকে বোটের নাক ঘোরালেন শহীদুজ্জামান। কাছে পৌঁছে বোট বাঁধার দড়িগুলো ছুঁড়ে দিতেই এক এক করে সেগুলো লুফে নিয়ে খুঁটিতে বাঁধলেন চিফ। তারপর উঠে এলেন বোটে।

‘কেউ জখম হয়েছে?’ বন্দর আর শহরের দিকে চোখ বোলালেন শহীদুজ্জামান।

‘জেকব ওরাম মারা গেছে। এখন পর্যন্ত যতদূর জানি, মৃতদের তালিকায় একমাত্র সে-ই। বাকি সবাইকে মোটেল থেকে বের করে নিয়ে গেছি আমরা।’

‘আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। তোমাকে হাঁদা বলে গালি দেয়াটা ঠিক হয়নি আমার।’

গাল ফুলিয়ে ফুস করে বাতাস ছাড়লেন চিফ। ‘তবে গালিটা না দিলে হাঁদার চেয়েও খারাপ কিছু হতো এখন।’

‘কী দেখেছ বলো এখন।’

‘হিল স্ট্রিটের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আমরা। মেঘ ডাকার মতো গুমগুম শব্দ শুনলাম প্রথমে। মনে হলো বজ্রসহ ঝড় আসছে। তারপর বন্দরের পানি সরে গেল এমনভাবে, যেন চুমুক দিয়ে শুষে নিল কেউ। সাগরের তলাটা পরিষ্কার দেখতে পেয়েছি। তারপর, কয়েক সেকেন্ড পর এক ঝাঁক জেট বিমানের শব্দ তুলে ধেয়ে এলো আবার পানি।’

‘একেবারে নিখুঁত বর্ণনা দিলে। খোলা সাগরে, ঘণ্টায় ছয়শো মাইল গতিতে ছুটে যায় সুনামি।’

‘এত দ্রুত!’

‘ভাগ্য ভালো, ডাঙার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে এর গতি অনেক কমে যায়, কিন্তু ঢেউয়ের শক্তি কিন্তু ঠিকই থাকে।’

‘যা দেখেছি, এ রকম দৃশ্য দেখার কথা কোনোদিন কল্পনাই করতে পারিনি। মনে হলো, পঞ্চাশ ফুট উঁচু একটা পানির দেয়াল বিপুল গতিতে ছুটে এলো। তারপর এলো আরেকটা, প্রথমটার চেয়ে বড়। তৃতীয় ও শেষটা আরো বড়, প্রথমটার চেয়ে অন্তত ত্রিশ ফুট উঁচু। পিয়ার আর মোটেলটাতে আঘাত হানল, মেইন স্ট্রিট ভাসিয়ে দিল।’ শ্রাগ করলেন চিফ। ‘আমি জানি তুমি একজন বিজ্ঞানী, শহীদ, কিন্তু এ রকম একটা ঘটনা ঘটবে আগে থেকে টের পেলে কী করে?’

‘একই জিনিস নিউগিনিতে ঘটতে দেখেছি। সাগর নিয়ে ওখানে গবেষণা করছিলাম, সাগরতলের একটা স্লাইড পিছলে গিয়ে সুনামির সৃষ্টি করেছিল। ঢেউ উঠেছিল ত্রিশ থেকে ষাট ফুট উঁচু। তার আগে এমন কিছু ঢেউ উঠেছিল, আমাদের বোটটাকে ওপরে তুলে ফেলেছিল, ঠিক আজকের মতো। মানুষকে সাবধান করে দেয়া হয়েছিল। বেশির ভাগই উঁচু জায়গায় চলে গিয়েছিল। তবে সবাই যেতে পারেনি, আর তার ফলে দু’হাজার লোক ঢেউয়ে ভেসে গিয়েছিল।’

ঢোক গিললেন চিফ। ‘আমাদের পুরো শহরেও এত লোক নেই।’ প্রফেসরের কথাগুলো ভেবে দেখলেন তিনি। ‘তার মানে তুমি বলতে চাও সাগরতলের ভূমিকম্প এ ঘটনা ঘটিয়েছে? আমি ভেবেছিলাম প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো ঘটনা আজকের এই সুনামির জন্ম দিয়েছে।’

‘এ রকম কিছুই ঘটেছে।’ ভুরু কুঁচকে সাগরের দিকে তাকালেন শহীদুজ্জামান। ‘তবে এটা নিয়ে গবেষণা করতে হবে।’

‘আমি এখন আরেক দুশ্চিন্তায় পড়েছি। মোটেলে বোমা পেতে রাখা হয়েছে বলে যে মিথ্যে কথা বললাম, তার কী জবাব দেব?’

‘জবাব কি আর চাইবে কেউ?’

শহরের দিকে ফিরে তাকালেন চিফ। সাবধানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে অনেকে, বন্দরের দিকে এগোচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, ‘উঁহু, তা বোধহয় চাইবে না। হাজার হোক, মিথ্যে কথা বলে ওদের প্রাণ তো বাঁচানো হয়েছে।’

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন