RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মুক্তিযুদ্ধের গল্প || জানালা

শাহনেওয়াজ চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মুক্তিযুদ্ধের গল্প || জানালা

লঞ্চঘাটে কয়েকটা চায়ের দোকান আর কলিম মিয়ার ভাতের হোটেল। চারটা বয়েসী টেবিলের দু’দিকে দুটো বেঞ্চ পাতা, এক কোণে কলিম মিয়ার মহাজনী চেয়ার-টেবিল। এইটুকু সাজ-সজ্জার কারণেই ‘হোটেল’ নামটা সেঁটে আছে। না-হলে ঘরটার একেক পাশের মুলিবাঁশের বেড়ার শরীরে এত বড় বড় ফাঁক-ফোকর শোভা পায়, যা কিনা জানালা বলে চালিয়ে দিলে বাড়াবাড়ি হবে না। হলেই বা দোষের কী? লোকে সস্তায় ভাতের হোটেলে খেতে বসে বিনে পয়সায় নদীর শোভা অবলোকন করতে পারে- এই বা কম কীসে? কেবল এলাকার লোকজন কখনো খেতে এলে কলিম মিয়ার হোটেলে বেড়ার করুণ দশা দেখে ঠাট্টার সুরে বলে, ‘ব্যাপার কী কলিম মিয়া, এইটুকুন ঘরের একপাশের ব্যাড়ায় কয়ডা জানলা থাহে?’

মুলিবাঁশের বেড়ায় ক্ষয় ধরার প্রথম দিকে কলিম মিয়া অনিচ্ছার হাসি হেসে লোকের এ ধরনের প্রশ্ন এড়িয়ে যেত। তখন বেড়ায় ক্ষয়ের পরিমাণ কম ছিল, তাই টুকরো হাসিতে লোকের কথা ধামাচাপা দেয়া যেত। কিন্তু যখন ক্ষয় বাড়তে বাড়তে বেড়ায় জানালা আকৃতির ফাঁক-ফোকর তৈরি হতে থাকল, তখন তো আর টুকরো হাসিতে লোক ভোলানো চলে না। তখন লোককে বুঝ দেয়ার জন্য কলিম মিয়া এমন এক মন্তব্য ঠিক করে নিল, যা কিনা সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না টাইপের।

কলিম মিয়া তারপর থেকে বলতে শুরু করল- ‘আমার হোটেলে মাটির চুলায় রান্ধন। তাই কালি-ধোঁয়ায় চাইরপাশ একাকার অইয়া যায়। এর লাইগা বেড়ায় ফাঁক-ফোকরগুলান ইচ্ছা কইরাই পালতেছি। মাটির চুলায় রাঁনতে অয় বইলা মেরামত করাইতেছি না। নতুন বেড়াও লাগাইতেছি না। লাভ কী? মাটির চুলায় রান্ধন যহন লাগবই, তহন কয়দিন পরই তো আবার ক্ষয় ধরব। ক্ষয় না ধরলেও নদীর দিকের বেড়াটায় দুই-চাইরটা ফাঁক কইরা দ্যাওন লাগব, যাতে ধোঁয়া বাইর অইয়া যাইতে পারে। কিন্তুক আমার হোটেলে মাটির চুলায় রান্ধন বন্ধ করতে পারুম না। কাস্টমারের কথা তো মাথায় রাহন লাগব। আমার হোটেলের খাওন দিয়া কাস্টমারের মন না ভরাইতে পারলে হোটেল টিকব? মাটির চুলার রান্ধা খাওনের স্বাদই আলাদা।’

কলিম মিয়ার এমন যুক্তির কাছে লোকজন হার মানে। কেননা তার হোটেলের ভাত-তরকারির স্বাদ লোকের জিভে লেগে থাকে। খাবারের এমন স্বাদের উৎস যদি মাটির চুলা হয়, তাহলে কলিম মিয়ার যুক্তি খণ্ডাবে কে? কিন্তু বর্ষা এলে নদীর দিকের বেড়ার কাছ ঘেঁষে পাতা টেবিলে খেতে বসলে হঠাৎ বৃষ্টির ছাট এসে যখন কাস্টমারকে ভিজিয়ে দেয়, তখন বিরক্ত হয়ে দু’চার কথা না বললে কাস্টমারের বিরক্তি কাটবে কেমন করে?

কোনো কোনো কাস্টমার বলে বসে, ‘না, পাতে আর ডাইল লওন লাগব না। থালে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি জমতে জমতে ডাইলের কাম সাইরা যাইব।’

তবে যুক্তি-তর্ক যা-ই থাকুক কলিম মিয়ারও তো কুলিয়ে উঠতে হবে। এই ভাঙাচোরা ভাতের হোটেলটাই তো সম্বল। এই দিয়ে তাদের তিন বাপ-পুতসহ সংসারের আরো তিন তিনটা পেটের জোগান দিতে হয়। না থাকার মধ্যে কেবল কলিম মিয়ার বউটা নেই। সাপের কামড়ে বউটার মৃত্যুর বয়স বছরখানেক হতে চলল।

রাতে পেশাব করতে ঘরের বাইরে এসেছিল মরিয়ম। রান্নাঘরের পেছনে বুড়ো আমগাছটার গোড়ায় হারিকেন আর লোটাটা রেখে যেই না পেশাবের প্রস্তুতি নিতে যাবে অমনি ‘ও মাগো’ বলে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বউয়ের গলা শুনে কলিমের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের ঘোরে বউয়ের আর্তনাদ কানে গেলেও তা বড় অস্ফুটে। তাই ঘুম ভাঙার পর অন্ধকারে বিছানা হাতড়ে বউকে খুঁজে না পেয়ে বালিশের পাশে রাখা টর্চটা হাতে নিয়ে বাইরে নেমে পড়ল কলিম মিয়া। তার ঘুম জড়ানো মস্তিষ্কে মুহূর্তে কেমন করে চেতনা ভর করল কে জানে! সে  বুঝতে পেরেছিল তার বউ ঘরের বাইরে নেমেছে। দৌড়ে বাইরে এসে বউকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে গলা ছেড়ে দুই ছেলেকে ডাকল কলিম মিয়া। বাপের হেরে গলার ডাক ছেলেদের সাথে সাথে ঘরের অন্যান্যদের কানেও পৌঁছল। কলিম মিয়ার মা-বোনও ছুটে এলো। ঘটনাস্থল থেকে ধরাধরি করে বউকে ঘরে তুলে আনল। দড়ির বাঁধনে শিরায় রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেও কাজ হলো না। অত রাতে ওঁঝা আনতে আনতে ফজর পেরিয়ে ভোর। মরিয়মের সারা দেহ ততক্ষণে নীল হয়ে গেছে। শাশুরি-ননদরা মরিয়মকে ঘিরে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। তিন বাপ-পুত ঘরে ফিরে এই দৃশ্য দেখে তারাও কান্নাকাটিতে যোগ দিল। নিরুপায় দাঁড়িয়ে থাকা ওঁঝা কর্তব্যের খাতিরে টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মৃতের শরীরটা দেখে নিল বার কয়েক। মরিয়মের পায়ে সাপের কামড় পরখ করতে করতে মৃতের কব্জি টিপে নাড়ির স্পন্দন টের না পেয়ে ঠোঁট কামড়ে কলিম মিয়ার মুখের দিকে তাকাল।

বউ মরাতে একটা পেটের সংখ্যা কমলেও আরেক দিকের খরচ বেড়েছে কলিম মিয়ার। দুই ছেলেকে নিয়ে ভাতের হোটেল চালাত সে, রান্নার কাজটা করত বউ। হোটেলের পেছন দিকের খুপরি ঘরের মতো জায়গাটাতে বসে রান্না করত কলিমের বউ। সবাই তার হাতের রান্না খেত ঠিকই, কিন্তু একটিবারের জন্যও তার মুখটা দেখতে পায়নি। বউয়ের জায়গায় একটা মেয়েকে রেখেছে কলিম মিয়া। মেয়েটাকে মাস শেষে মাইনে দিতে হয়। বউকে তো আর মাইনে দিতে হয়নি! এই খরচ বাড়লেও একটা ব্যাপারে কলিম মিয়ার তৃপ্তি- মেয়েটার রান্নার হাত ভালো। এই ব্যাপারটা নিয়ে সে বেশ চিন্তিত ছিল। লঞ্চঘাটের একমাত্র ভাতের হোটেল হলেও, রান্নার গুণেও তার হোটেলে কাস্টমার আসে। শুধু লঞ্চের যাত্রীই না, তার হোটেলে খাওয়ার উদ্দেশে দূর থেকেও লোকজন আসে। তাই রান্নার সুনামে ভাটা পড়লে কী ঘটতে পারত! মেয়েটি তেমন ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেছে কলিম মিয়াকে। তবে কিছুটা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। মেয়েটা একটু যেন লাফাঙ্গা টাইপের। লাজ-লজ্জা কম। ছেলে দুটোর সঙ্গে সারাক্ষণ ঠাট্টা-তামাশায় মেতে থাকে। ছেলে দুটোরও গায়েপড়া স্বভাব হয়েছে। দুটোতেই একটিকে নিয়ে মেতে থাকে! ওদেরও লাজ-লজ্জা থাকলে না-হয় কথা ছিল। বাপের সামনেই মেয়েটার সঙ্গে রঙ্গরসে মেতে থাকে। কলিম মিয়া প্রথমে আকার-ইঙ্গিতে তারপর নমিত কণ্ঠে মেয়েটিকে ধমকেছে- ‘ওই মাইয়া, তুই কি আমার হোটেলের কাস্টমার কমাইতে চাস নাকি! এমুন খুইলা খুইলা পড়স ক্যান?’

শুধু কি ধমকেছে কলিম মিয়া? শান্ত স্বরে বোঝাতেও চেষ্টা করেছে- ‘দ্যাখ রোজিনা, তুই একটা যুবতী মাইয়া। এইভাবে যহন-তহন কাস্টমারের সামনে আইলে আমার বদনাম অইব।’

রোজিনা কি এসব গায়ে মাখে? কলিম মিয়ার মুখের ওপর উল্টো বলে দ্যায়- ‘আরে ধ্যাৎ, আপনে দেহি উল্ডা কথা কন! আমার লাইগা বরং আপনের কাস্টমার বাড়ব।’ বলে খলবল করে হাসতে হাসতে দেয়ালের পালেস্তারের মতো খসে খসে পড়ে রোজিনা। ওর এমন মাদক মেশানো হাসি লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখে কলিম মিয়া। সে টের পায়- রোজিনা কোন অর্থে কথাটা বলেছে। ওর কারণে কেন কাস্টমার বাড়বে!

শুধু মেয়েটাকে দুষে লাভ কী? ছেলে দুটোও কি কম যায়? আর ছেলে দুটোকেই বা দুষে কী হবে? তার নিজের মনের অবস্থাও তো নড়বড়ে হয়ে যায় মাঝে মাঝে। রোজিনার খলবলানি তার ভেতরের ঘুমন্ত পুকুরের জলে ঢেউ তোলে!

কলিম মিয়ার মনের অবস্থা রোজিনা টের পায় কিনা কে জানে! ওকে খুব সহজে চেনা দায়। একই সময়ে ওর নজর সবাইকে স্পর্শ করে যায়। সেদিন লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে দূরে লঞ্চের আবছা ছায়া দেখে দৌড়ে হোটেলের রান্নাঘরে এসে ঢুকল সানু। রোজিনার দিকে তাকিয়ে আক্রোশে ফেটে পড়ল সে- ‘কী রে, অহনও তোর ডাইল রান্ধন শ্যাষ অয় নাই? দুপুইরা লঞ্চ ঘাটে আইয়া পড়ল বইলা।’

রোজিনা পানি ডাল নাড়ছিল। হঠাৎ ডাল নাড়া বন্ধ করে সানুর সামনে দাঁড়িয়ে ছোট বাচ্চার মতো ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘এত মাথা গরম করস ক্যান? ঘাটে লঞ্চ আইতে আইতে ডাইলে বাগার দেওয়া অইয়া যাইব।’ বলতে বলতে সানুর বুক ঘেঁষে দাঁড়াল রোজিনা।

কলিম মিয়ার নজর এদিকেই ছিল। কেননা সানু লঞ্চের খবর নিয়ে আসায় সে-ও তাড়া অনুভব করল। সানুর প্রশ্নে রোজিনা কী জবাব দেয়, তা তারও জানা প্রয়োজন। লঞ্চ থেকে নেমে খেতে বসে ডাল না পেলে কাস্টমার কথা শোনাবে। শুধু কথা শোনানো কেন? তারও তো ব্যবসায়িক ক্ষতি। কিন্তু রোজিনার বুঝ দেয়ার ঢংটা ভালো ঠেকল না কলিম মিয়ার। মনের ভেতরের মন কোনো নির্দেশনা দিল কিনা কে জানে! সানু আর রোজিনার দিক থেকে তার দৃষ্টি গেল বদির দিকে। সে দেখল- বড় ভাইয়ের সঙ্গে রোজিনার এমন রোমান্স দেখে ছোট ভাইয়ের মুখে চৈত্রের খড় দুপুরের রোদে মাথার ওপর একখণ্ড মেঘের ছায়ার মতো ছায়া নেমে এসেছে। মাথার ওপর ছায়া নিয়ে দীর্ঘপথ চলার মতো, বদির মুখের ওপরকার ছায়াটা আর সরে না। সে হোটেল থেকে বেরিয়ে লঞ্চঘাটের দিকে হেঁটে গেল।

সানুর গলায় সেই আক্রোশের ঝাঁজ আর নেই। তার কণ্ঠে এখন কাঠফাঁটা রোদের গরমের পরে একপশলা বৃষ্টির শীতলতা। নরম গলায় রোজিনাকে সে বলে, ‘জলদি কর রোজিনা। লঞ্চ ঘাটে আইয়া ভিড়ল বইলা।’

কলিম মিয়ার ভেতরটা যেন মুহূর্তে বদলে গেল! তার মস্তিষ্কে অগোছালো কীসব ঘটে গেল! ডালে বাগার দেয়ার রসুনের তেলেপোড়া গন্ধ মস্তিষ্কের অস্থির পরিস্থিতিকে আরো অস্থির করে তুলল যে, ঘাটে লঞ্চ ভেড়ার ভেঁপুও কলিম মিয়াকে বাস্তবে টেনে আনতে পারল না সহজে। বদি যখন হোটেলের সামনে এসে ‘আহেন, গরম ভাত খাইয়া যান। তাজা মাছ আছে। কম খরচে মন ভইরা খাইয়া যান।’ বলে যখন হাঁকতে থাকে, তখনই কেবল বাস্তবের পথ ধরে কলিম মিয়ার ভাবনা। তারপরই তার ভাবনা বাঁক ধরে লঞ্চযাত্রীদের চোখে দৃষ্টি পড়লে। ইদানীং লঞ্চযাত্রীদের দৃষ্টিতে এলোমেলো কীসব ঘুরপাক খায়! ভেতরে কী এক অস্থিরতা শেষ বিকেলের উদাস হাওয়ার মতো গা ছেড়ে ভেসে বেড়ায়! যাত্রীদের উদাস চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করে কলিম মিয়া, ঠিক ততটা মনোযোগ দিয়ে যতটা মনোযোগ দিয়ে রোজিনার চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করে। কিছুটা হলেও কাস্টমারের চোখের ভাষা বুঝতে পারে কলিম মিয়া। এত বছর ধরে এই ভাতের হোটেলের ব্যবসা তার। হোটেলের সামনে দিয়ে যাতায়াতকারীর চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে কে তার কাস্টমার হবে। কিন্তু আজকাল লঞ্চযাত্রীদের দৃষ্টিতে যে কী মিশে থাকে, কলিম মিয়া বুঝে উঠতে পারে না!

দুপুরের কাস্টমারদের ভিড় কমে গেলে খাবারের সময় পেরিয়ে যাবার পর হুট করে অবেলায় খেতে আসা কোনো কাস্টমারকে দেবার মতো ভাত-তরকারি যখন হাড়িতে থাকে না, কাজের ফুরসতে সানু কিংবা বদিও যখন লঞ্চঘাটে ওদের বয়সী ছেলেদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত; তখন নিশ্চিত অবসরপ্রাপ্ত রোজিনা হোটেলের এককোণে বেঞ্চির ওপরে এক পা তুলে হাঁটুতে থুঁতনি চেপে নিজের চুলে বিলি কাটতে কাটতে কলিম মিয়ার চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করে। এই লোকটাকে তখন বেশ বিরক্তিকর মনে হয় রোজিনার। আবার মায়াও হয়- আহা, বেচারার বউডা মইরা গ্যাছে! অথচ তার বয়সটা অহনো পইড়া যায় নাই। এসব ভাবতে ভাবতে রোজিনার চোখে যখন সানু কিংবা বদির মুখটা ভেসে ওঠে তখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় রোজিনা। কলিম মিয়ার ওপরে বিরক্তি ধরে- এ্যাহ্, মানুষটার এইটুক জ্ঞানও নাই- আমার বয়স তার দুই পোলার বয়সের হমান!

কিন্তু কলিম মিয়ার মনে অন্য কিছু। ইদানীং ঢাকায় লঞ্চ থেকে আগের চেয়ে বেশি যাত্রী নামে। কিন্তু ওঠে কম। অথচ তার হোটেলে কাস্টমার বাড়েনি। আবার কমেওনি। কমেনি বলে মন খারাপ হবার কথা না থাকলেও, এত এত যাত্রীর আনাগোনার পরেও সামান্য সংখ্যক কাস্টমার না বাড়ায় মন খারাপ হতেই পারে।

কলিম মিয়া ভাবে- এটা তার বউ মরার ফারা নয় তো! একথা ভেবে তার আরো মন খারাপ হয়।
মন খারাপ নিয়ে কলিম মিয়া ভীষণ একাকিত্ব অনুভব করে। লঞ্চঘাটের আট-দশটা দোকানে লোকজনের ভিড় আর হৈ-হল্লার মাঝেও এমন একাকিত্ব ভর করার কারণ কী? নিজের মনের অবস্থা মাপতে পারে না কলিম মিয়া। মনের এমন অবস্থার পেছনে রোজিনার প্রভাব আছে কিনা এই বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসেব-নিকেশ করে সে। কিন্তু না, রোজিনার ব্যাপারটি কিছুতেই মিলিয়ে উঠতে পারে না। তাই ভয় জড়িয়ে ধরে মাঝে মাঝে- বউয়ের মতো তারও সময় ফুরিয়ে এলো নাকি! মৃত্যুর আগে মানুষের মনে নাকি উদাসীনতা ভর করে!
গলার কাছে জামার একটা বোতাম খুলে বুকে থু থু ছিটাতে ছিটাতে মনকে প্রবোধ দেয় কলিম মিয়া- নাহ্, এইসব হইলো ভ্রান্তি!

 

দুই

ভ্রান্তিকে হয়তো মনের জোরের কাছে তুচ্ছ করা যায়, কিন্তু সত্যকে কি ভ্রান্তি বলে চালানো যায়?

আজ হাটবার। সানুকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলের সাপ্তাহিক বাজার-সদাই সেরে বেলা পড়ার আগেই ফিরল কলিম মিয়া। বদিকে রেখে গিয়েছিল শেষ বেলার কাস্টমারদের সেবার জন্য।

মাথায় চালের বস্তা নিয়ে আধো দৌড়ে চলায় দুটো ব্যাগ হাতে সানু একটু পেছনে পড়ে গিয়েছিল। হোটেলের মুখে চালের বস্তাটা মাথা থেকে ফেলে তাকাতেই কলিম মিয়া যা দেখল, তাতে অনেকটা পথ মাথায় করে চালের বস্তা টেনে আনায় মাথার ঝিমঝিম ভাব আর চোখে জোনাই ফোটার অনুভূতিও মুহূর্তে উবে গেল যেন! তবে এইটুকু উপলব্ধি করতে পারল- যা দেখেছে ভুল দ্যাখেনি।

কলিম মিয়ার মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। একটু আগেও মাথায় ঝিমঝিম ভাব আর চোখে জোনাই ফোটার উপলব্ধি শূন্য ছিল তার, মুহূর্তে সেই অনুভূতি ফিরে পেল। ঝিমঝিম মাথায় হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল সে। মনে ঘুরপাক খেতে থাকল রোজিনার কথা- ইস্, এই মাইয়ার দ্যাখতাছি যেহানে রাইত সেইখানে কাইত দশা! তাই বইলা হগল ব্যাটাগো লগে ঘেঁষতে হইব? সানুর লগে হেদিন কী মায়াভরা কথাবার্তা! যেন সানুরে ছাড়া কিছু বোঝে না। আর অহন হোটেলের বেঞ্চে লম্বা হইয়া শোয়া বদির মাথার ধারে বইসা অর ঠোঁটে ঠোঁটে ঘঁষাঘষি করতেছিল! নাহ্, এই মাইয়া ঘাটের এমন পরিবেশে একটা অঘটন না ঘটাইয়া ছাড়ব না!

সানু চলে এসেছে ততক্ষণে। আগ বাড়িয়ে ওর হাত থেকে একটা বোঝা নিয়ে দুজন একসঙ্গে ভেতরে ঢুকল।

রোজিনা কিংবা বদির কোনো বিকার নেই। দুজনের মুখে-চোখে সরল অভিব্যক্তি। রোজিনা সদাইপাতি গোছগাছে ব্যস্ত হলো, আর বদি দুজন কাস্টমারের কাছ থেকে উপার্জনের ফিরিস্তি দিতে শুরু করল বাপকে।

এসব দেখে কলিম মিয়ার ভেতরের এলোমেলো ভাবটা আরো ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করল। ডালপালার ভার কদিন যাবত তাকে বেশ ন্যুব্জ করে রেখেছে। সে ভাবে- নাহ্, এই মাইয়ার উপর আস্থা রাহন যায় না। পোলা দুইটাও তো একজন আরেকজনের লগে মনে মনে ঠেলাঠেলি করতেছে!

রোজিনাকে নিয়ে এমন নানান কথা ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুমাতে গিয়ে কলিম মিয়ার মস্তিষ্কে একটা ব্যাপার মাছের ঘাঁইয়ের মতো আলোড়ন তুলল- রোজিনাকে নিয়ে তার মনেও তো ঠেলাঠেলি চলছে! এই যে চারপাশে কেমন হাওয়া বদল পরিস্থিতি, প্রতিদিন ঘাটে লঞ্চ থেকে দলবেধে লোকজন নামে, তবু দোকানে কাস্টমারের সংখ্যা বাড়ে না বরং সে টের পায় দিনকে দিন তার নিয়মিত কাস্টমারের সংখ্যাও এক-দুজন করে কমছে! এসব সংকটের মাঝেও তার মাথায় ঘুরেফিরে রোজিনা এসে ঢোকে বারবার। এর পেছনে অবশ্য এক আতঙ্কও লুকিয়ে আছে। ঘাটের উঠতি বয়সী ছেলেপেলে ভালো না। কখন, কী ঘটে যায় কে জানে!

কলিম মিয়ার আশঙ্কা বোধহয় ভুল হলো না! সন্ধ্যার মুখে কয়েকজন যুবক এসে ঢুকল তার হোটেলে। এদের একজনের বয়স ভাটির টানে। এই লোকটির গায়ে একটা চাদর। তাকে চাদর গায়ে দেখে কলিম মিয়ার মনে খটকা লাগল। চৈত মাসে শইলে চাদর জড়াইয়া রাখছে ক্যান লোকটা!

চাদরের ভেতর থেকে একটা নল বেরিয়ে কলিম মিয়ার কপালে ঠেকল যখন, তার ভেতরে তখন মিশ্র অনুভূতি। নিজের মনের খটকা তো দূর হলোই, সঙ্গে সঙ্গে তার ধারণা জন্মালো- যুবক পোলাগুলো নিশ্চয় রোজিনার কারণে...

নল ঠেকিয়ে ভাটির টানের বয়সী লোকটি বলল, ‘কলিম মিয়া চিৎকার-চেঁচামেচি কইরা নিজের ক্ষতি ডাইকা আইনো না। চুপচাপ আমাগো সবাইরে ভাত খাওয়াও।’

শুধু ভাত খাওয়ানো কেন? এরা যদি এখন কলিম মিয়াকে বলে গুয়ের মধ্যে নেমে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, তাতেও সে রাজি!

সানু আর বদির দিকে তাকিয়ে কলিম মিয়া দ্যাখে- পরিস্থিতি দেখে ওরা দু’ভাই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

‘ওই, তোরা খাড়াইয়া রইলি ক্যান? সবাইরে খাওন দে।’ ছেলেদের নির্দেশ দিল কলিম মিয়া।

সানু আর বদি ব্যস্ত হয়ে উঠল। এক ফাঁকে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে কলিম মিয়া ক্যাশে অল্প কিছু টাকা রেখে বাকি টাকাগুলো মুঠি করে লুঙ্গির কোচরে রাখল। তারপর এসে সবার খাওয়া-দাওয়া তদারক করতে লাগল। তদারক করতে করতে কলিম মিয়া অসহায় বোধ করল- আহারে, এই বেলার রোজগার তার লাটে উঠল! কাস্টমার এলে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় নেই। এসব ভাবতে ভাবতে হোটেলের সামনে চোখ গেল তার। দেখল বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোক ঘোরাফেরা করছে। থেকে থেকে হোটেলের ভেতরে দৃষ্টি ফেলছে। বোধহয় ভিড় দেখে ঢুকছে না!

কলিম মিয়ার কপালে বন্দুকের নল ঠেকানো লোকটি দলবলসহ খাওয়া শেষ করে যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘আমরা যহন-তহন আসতে পারি। কিন্তু এই কথা কাউরে কওন যাইব না।’

কলিম মিয়া ধরেই নিল রোজিনার জন্য এই ভোগান্তি তাকে অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে! আর সকাল থেকে ঘাটের লোকজনের কানাঘুষা, কথাকথিতে তার মান-সম্মানের আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটবে! এসব ভেবে তার মেজাজের তিরিক্ষি অবস্থা।

এমন মুহূর্তে হুড়মুর করে কয়েকজন লোক এসে ঢুকল কলিম মিয়ার হোটেলে। এমনিতেই এ বেলাটা লোকসানে গেল বলে, মান-সম্মান হারানোর কথা ভেবে কলিম মিয়ার মেজাজ তিরিক্ষি। তার ওপর আরেকটি ব্যাপার ভেবে সে শঙ্কিত- এই ঘটনার পেছনে রোজিনা একটা কারণ হতে পারে। আর রোজিনা যদি কারণ হয়ে থাকে তাহলে এই দলটি বারবার ফায়দা লুটতে আসবে। আজ যখন রোজিনার ব্যাপারে কোনো কথাই তুলল না, তখন এমন কথা ভেবে নেয়া যায়- এভাবে যতদিন সম্ভব ফায়দা লুটতে আসবে তারা। কোনোক্রমে যদি কলিম মিয়া বিরক্ত হয়, তখনই রোজিনার প্রসঙ্গ তুলে তার টুটি চেপে ধরবে- এমন আশঙ্কায় বিব্রত কলিম মিয়া হোটেলে হুড়মুর করে ঢোকা লোকগুলোর ওপর চরম বিরক্ত হলো। ঝাঁজ মেশানো কণ্ঠে বলল, ‘যান, যান। হোটেল সাফা। কিচ্ছু নাই। যানগা সবাই।’

এক লোক বলল, ‘কলিম মিয়া, মুক্তিযোদ্ধারা তোমারে ধমক-ধামক দিছে, নাকি শুধু ভাত খাইয়া চইলা গ্যাছে?’

কথাটা শুনে কলিম মিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তার এতক্ষণের ভাবনা-চিন্তায় ঝড় বয়ে গেল। কেবল ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি চট করে অনুধাবন করতে পারল না ।

বিস্ময়ভরা কণ্ঠে কলিম মিয়া বলল, ‘বিষয়ডা একটু খুইলা কন তো?’
লোকের কথা শুনে নিজের ভেতরের এতদিনকার ভাবনাগুলো মিলিয়ে নিতে একমুহূর্ত সময় লাগল কলিম মিয়ার।

 

তিন

একদিকে কলিম মিয়ার মন শান্ত, অন্যদিকে লোকজনের মুখে নানা অরাজকতার কথা শুনে বেশ খানিকটা অশান্ত। কলিম মিয়া বুঝতে পারে আগে ছিল আশঙ্কা, আর আজ থেকে তাকে পেয়ে বসল আতঙ্কে।

কাল রাতে ছোট লঞ্চটা আসেনি ঘাটে। এই নিয়ে অনেক রকম কথা শোনা গেল। সকালবেলা লঞ্চঘাট থেকে এসে সানু বলল, ‘আব্বা, জেলা সদরে একটাও ঢাকার গাড়ি আহে নাই কাইল। ঢাকায় নাহি মহাগণ্ডগোল চলতাছে। আর প্যাসেঞ্জার পায় নাই বইলা রাইতের লঞ্চ আহে নাই।’

কলিম মিয়ার বুক কেঁপে ওঠে। অবলীলায় তার কিছু হিসেব মিলে যায়- লঞ্চে আগের চেয়ে এত প্যাসেঞ্জার বেড়েছে কেন? প্যাসেঞ্জার বাড়লেও তার কাস্টমার বাড়েনি কেন? মানুষের মনে অস্থিরতা থাকলে কি আর পেটে খিদে থাকে?

অনেক অনেক ভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকল কলিম মিয়ার মনে। ক্যাশে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে ক্ষয় ধরা মুলিবাঁশের বেড়ায় প্রাকৃতিকভাবে পয়দা হওয়া জানালা দিয়ে বার বার নদীর দিকে তাকায়। কান খাড়া রাখে- লঞ্চের শব্দ পাওয়া যায় কিনা!

এমনিতে এই জানালা দিয়ে নদীর দিকে বারবার সতর্ক দৃষ্টি যেন, দূরে লঞ্চ দেখলে, লঞ্চের শব্দ পেলে চটজলদি প্রস্তুতি নেয়া যায়। লঞ্চ থেকে নেমে কাস্টমার এলেই যেন তাদের সামনে প্লেট-গেলাস, নুনের বাটি হাজির করা যায়। কিন্তু আজ জানালা গলিয়ে বারবার নদীর দিকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে কলিম মিয়ার। লঞ্চ ভিড়লে কাস্টমার আসবে- এই আশায় নয়, মনের অস্থিরতা মেটানোর আশায়। চরকা যেমন থেমে থেমে বাতাস পেলে ঘোরে তেমনি কলিম মিয়ার মনে কিছু কথা থেকে থেকে বারবার উঁকি দেয়- কী এমন অইলো, তাবৎ দুনিয়াডাই যেন হঠাৎ বদলাইয়া গেল! আকাশে-বাতাসে কেমন অস্থিরতা ভাইসা বেড়াইতেছে! চাইরদিকে কী যে অইলো!

সন্ধ্যার মুখে জেলা সদর থেকে ছোট লঞ্চটা এলো। দূর থেকে লঞ্চের শব্দ পেয়েই ঘাটের দিকে এগোলো কলিম মিয়া। শুধু সে কেন? দূর-দূরান্ত থেকে আরো কত মানুষ ঘাটে এসে জড়ো হয়েছে খবর শোনায় আশায়। মানুষগুলোর চোখে যেন ভয় পাওয়া গৃহপালিত প্রাণীর মতো অসহায় কিন্তু সতর্কদৃষ্টি জড়িয়ে আছে!

ঘাটে লঞ্চ ভিড়লে লোকজন কাছকাছি এসে দাঁড়ায়। কোনো কোনো যাত্রীর হয়তো আত্মীয়-স্বজন কেউ ঘাটে অপেক্ষা করছিল তাদের এগিয়ে নেবার জন্য; লঞ্চ থেকে নেমেই কোনো যাত্রী অপেক্ষারত আত্মীয়ের কাছে যখন শহরের অবস্থা বয়ান করতে শুরু করে তখন অন্যরাও তাদের ঘিরে ধরে। উৎসুক দৃষ্টিতে যাত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ঘটনা শুনতে থাকে।

একজন যাত্রী বলল, ‘বোটে করে আর্মি এসে লঞ্চে উঠে সবাইকে চেক করে নেমে যায়! সারেং জানালো- প্রতিদিনই নাকি এমন হচ্ছে!’
কলিম মিয়া বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। হোটেল খালি পড়ে আছে। সানু আর বদু সেই কখন ঘাটে এসছে! ভিড়ের মধ্যে ওদের দেখাও যাচ্ছে না।

হোটেলে ঢুকে কলিম মিয়া বলল, ‘রোজিনা রে, দিনকাল ভালো যাইতেছে না। পোলা দুইডারও কেমন জানি উসখুস ভাব! একদম হোটেলে থাকতে চায় না। এই যে দ্যাখ, লঞ্চ কহন ঘাটে আইছে; এতক্ষণে অগো দুইজনের হোটেলে আইয়া পড়ার কথা না? কিন্তু কোনো খোঁজ আছে? আগে তো এমন অয় নাই। লঞ্চের শব্দ পাইলে ঘাটে গিয়া কাস্টমার ডাকাডাকি করতে করতে ঠিক হোটেলে আইয়া পড়ত। আর অহন? যাউক গা, অরা হোটেলে না থাকলে আড়ালে না থাইকা বাইর অইয়া কাস্টমাররে তুই খাওন আউগাইয়া দিস।’

রোজিনা বলল, ‘আমার আপত্তি নাইকা। কিন্তুক আপনেই তো কইছেন...’
রোজিনাকে কথা শেষ করতে দেয় না কলিম মিয়া। ওর কথা কেড়ে নিয়ে বলে, ‘অইচে, আগের কতা বাদ।’ বলতে বলতে ক্যাশে বসে উদাস হয়ে যায় কলিম মিয়া। লঞ্চযাত্রীদের কাছে শোনা ঘটনাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথায়। যতই ঘুরপাক খায়, কলিম মিয়ার উদাসীনতা ততই বেড়ে চলে।

রান্নাঘরে থালাবাটির ঝনঝনি শোনা যাচ্ছে একটানা। রোজিনা বোধহয় থালাবাটি ধুচ্ছে! অন্য সময় থালাবাটির ঝনঝনি কানে এলে খেকিয়ে ওঠে কলিম মিয়া- ‘কী রে রোজিনা, থালাবাডি ধোয়ার সময়ও কি এট্টু থির অইতে পারস না? হারাডা সময় উথাল-পাথাল থাকতে অইব? এমুন অইলে তো থালাবাডিগুলা অল্পতে ক্ষয় অইয়া যাইব। তুই তো দ্যখতাছি আমার ব্যবসা লাটে উঠাইবি।’ কিন্তু এখন ওদিকে একদম কান নেই কলিম মিয়ার। তাই বুঝি রোজিনার হাতেও থালাবাটির ঝনঝনি বেড়েই চলেছে। অবশ্য সেদিনের যুবকদের দলটা এসে যাওয়ার পর লোকের মুখে সব শুনে রোজিনার প্রতি কলিম মিয়ার কঠিন ক্ষোভটা ক্রমশ জল হয়ে গেছে।

 

চার

আজ দুপুরে সেদিনের যুবকদের দলটা আবার এসে উঠল কলিম মিয়ার হোটেলে। কিন্তু আজ এদের দেখে কলিম মিয়া সেদিনের মতো বিচলিত হলো না। নিজেই এগিয়ে গিয়ে বদির সঙ্গে গেলাস, থালা, পানির জগ এগিয়ে দিল। তারপর সবাইকে খাবার বেড়ে দিতে লাগল। কেউ এক চামচ ভাত বেশি চাইলে তাকে দুই চামচ ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল, ‘খান, প্যাট ভইরা খান সবাই। কুনো দ্বিধা করবেন না। পয়সা দেওনের কথা ভাবন লাগব না। খাইয়া না-খাইয়া এইখানে-ওইখানে, বনজঙ্গলে যেমনে দিন কাটাইতেছেন আপনেরা! কয় বেলা না-খাইয়া আছেন কে জানে! খান, মনডা ভইরা খান।’ বলতে বলতে যুবকদের খাওয়া তদারকির অভাব বোধ করল কলিম মিয়া। তখনই গলা চড়াল- ‘ওই বদি; সানু কইরে?’

‘ভাইয়ে তো ঘাটে।’ বদি বলল।

‘ঘাটে বইয়া কী হরে?’

তখন ভাটির টানের বয়সী লোকটা বলল, ‘কলিম মিয়া, তোমার পোলা দুইডারে আমাগো লগে দিয়া দ্যাও। এই মুহূর্তে দলে অনেক লোক দরকার।’
কথাটা শুনে চমকে উঠল কলিম মিয়া। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। কাতর চোখে একবার বদির মুখের দিকে তাকাল। তখনই ‘বাজান’ ‘বাজান’ বলতে বলতে দৌড়ে এলো সানু। হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘বাজান বোটে চইড়া লঞ্চঘাটের দিকে মিলিটারি আইতেছে!’

হোটেলসুদ্ধ সবাই চমকে উঠল। খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
জানালা গলিয়ে নদীর দিকে তাকাল কলিম মিয়া। তার সঙ্গে বাকিরাও। সত্যি সত্যি ডিঙি নাওয়ের আকৃতির কতগুলো বোট ছুটে আসতে দেখা গেল। এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
আতঙ্কিত পরিস্থিতিতেও কলিম মিয়ার মনে হলো- নদীর দিকের বেড়ায় বড় বড় জানালা থাকাটা আজ বোধহয় পুরোপুরি সার্থক হলো! না-হলে কি চট করে শত্রুর আগমন নিশ্চিত হওয়া যেত!

ভাটির টানের বয়সী লোকটা সবাইকে বলল, ‘জলদি নাইমা পড়। পজিশন নিতে হবে।’
তারা নেমে যাচ্ছিল। চট করে ভাটির টানের বয়সী লোকটার হাত ধরল কলিম মিয়া। ‘আমার পোলা দুইডারে চাইছিলেন না? অগো লইয়া যান।’
সানু আর বদি বাপের মুখের দিকে তাকাল।
কলিম মিয়া ছেলেদেরকে বুকে জড়িয়ে বলল, ‘বাজান যাও তোমরা। বাঁইচা থাকলে দ্যাহা অইব।’
সবার সঙ্গে কলিম মিয়াও হোটেলের বাইরে নেমে এলো। ঘাটে ততক্ষণে হুলস্থূল পড়ে গেছে।
ভেতর থেকে রোজিনার গলা শুনে হোটেলে ঢুকল কলিম মিয়া। রোজিনা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার কী অইব? আমি কই যামু?’

‘এত ডরাস ক্যান? দ্যাশ আর মায়ের মধ্যে কি কুনো পার্থক্য আছে? এক মায়েরে রক্ষা করতে গিয়া কি আরেক মায়েরে বিপদের মুহে রাহন যায়? আমার জীবন দিয়া হইলেও তোরে রক্ষা করুম।’
কলিম মিয়ার কথায় রোজিনার ভয়-অতঙ্কের রেশলাগা মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠল।

 

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়