ঢাকা, বুধবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘কেউ চাইলেই জনপ্রিয় লেখক হতে পারবেন না’ (ভিডিও)

স্বরলিপি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৮ ১০:০১:২০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৮ ৬:০১:২০ পিএম

সময়ের পাঠকপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন। আলোকচিত্রী, নির্মাতা হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। তার দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস ‘আরশিনগর’ এবং ‘অন্দরমহল’ পাঠকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। একুশে গ্রন্থমেলায় তার উপন্যাসগুলো বরাবরই বেস্ট সেলার তালিকায় জায়গা করে নেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সাদাত হোসাইনের লেখক হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা, সাহিত্য ভাবনা, দর্শন জানতে তার মুখোমুখি হয়েছেন তরুণ কবি স্বরলিপি।

স্বরলিপি: প্রথমেই জানতে চাই, আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের নিবিড় সান্নিধ্য কীভাবে পেয়েছিলেন এবং আলোকচিত্রী আজিজুর রহিম পিউ আপনার লেখালেখিতে কীভাবে আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছেন?

সাদাত হোসাইন: এটা খুব দীর্ঘ গল্প। গল্পের শেষটুকু বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে লেখালেখি নিয়ে এক ধরনের দ্বিধায় ভুগছিলাম। গ্রামের স্কুল কিংবা কলেজে লেখালেখির যে ব্যক্তিগত চর্চার মধ্য দিয়ে আমি এসেছি, সেটিকে আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি। আমি যে পারিপার্শ্বিকতায় বেড়ে উঠেছি, সেখানে এটি খুবই গুরুত্বহীন; ‘বালখিল্যসূলভ’ কর্মকাণ্ড ধরা হতো! ফলে আমার ভেতরে অবচেতনেই লেখালেখি সম্পর্কে এমন ‘তুচ্ছাতিতুচ্ছ’ একটি ধারণা গেড়ে বসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে কিছু ঘটনায় সেটি আরও প্রবল হলো। লেখালেখি ছেড়ে দিলাম। আক্ষরিক অর্থেই ছেড়ে দেয়া। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দীর্ঘ ছয় বছর এবং এর পরের দুই বছর, মোট আট বছর আমি একটা অক্ষরও লিখিনি। ফলে আমার আশেপাশের প্রায় কেউই জানতো না যে আমি লিখি। কবি পিয়াস মজিদ, নওশাদ জামিল এরা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ব্যাচমেট, অথচ ওরাও জানতো না- আমি লিখতাম! তবে শৈশব থেকে গল্প বলার এক তীব্র আগ্রহ ছিলো আমার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিকে এসে আমি হঠাৎ করেই ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। হয়তো ফটোগ্রাফিতে আমার আগ্রহ ছিল। খুব দ্রুত কিছু এক্সিবিশনে আমার ছবি স্থান পায়, ছোটখাটো কিছু সম্মাননাও জোটে। পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হতে থাকে। ওই সময় পরিচয় আনোয়ার হোসেনের সাথে। তিনি কিংবদন্তী আলোকচিত্রী। ফেইসবুকে আমার কিছু ছবি দেখে তিনি মেসেজ করেন। প্রথম দিন দেখা করতে গিয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়। ছবির পেছনের গল্প শুনে তিনি মুগ্ধ হন। তারপর আমরা নিয়মিত ঢাকার রাস্তায় একসঙ্গে ছবি তুলতে বের হতাম। তিনি গল্পচ্ছলে আমাকে নানান কিছু শেখাতেন। এই সময় পরিচয় সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের সাথে। তার সূত্রে পরিচয় পিউ ভাইয়ের সাথে। পিউ ভাই তখন ‘সকালের খবর’ পত্রিকার ফটো এডিটর। ইমরান একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতো। সেখানে আমার তোলা ছবি ছাপা হতো। ছবির সঙ্গে পেছনের গল্প- ‘গল্পছবি’ নামে। সেটি তখন ফেইসবুকের কল্যাণে পাঠক-দর্শক খুব পছন্দও করছে। পিউ ভাইও ছবি ও লেখাগুলো দেখলেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন,  তোমার লেখাগুলো আমি পড়েছি। ছবিগুলো দেখেছি। দারুণ! একটা কথা বলি- আমাদের দেশে একসঙ্গে ভালো ফটোগ্রাফি করে এবং ভালো লেখে এমন লোকের সংখ্যা বিরল। বাট, ইউ হ্যাভ বোথ। তোমার ছবি তোলা ও লেখার হাত ভালো। তুমি দুটোই করবে!

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমি ততদিনে লিটারেলি ভুলেই গেছি- আমি কখনো লিখতাম। তিনি একের পর এক এসাইনমেন্ট দেয়া শুরু করলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিখ্যাত মানুষদের সাক্ষাৎকার এবং তাদের পোর্ট্রেট তোলার সুযোগ হলো আমার। সাক্ষাৎকারটা তাদের বয়ানে গেলেও আমার অনুলিখনে প্রকাশ হতো। বিষয়টি পিউ ভাই পছন্দ করলেন। তিনি আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। তখন ‘সকালের খবর’-এ ওই পাতাতেই আমার জন্য একটা কর্নার ছেড়ে দেয়া হয়। সেখানেও ছাপা হতে থাকল সাদাত হোসাইনের ‘গল্পছবি’। সেই ছবির গল্প নিয়েই মূলত দীর্ঘ অবসর ভেঙে আবার আমার লেখালেখিতে আসা। আমার কাছে এটি এখন অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমি বিশ্বাসী মানুষ। মনে হয়ে, ইট ওয়াজ ডিফাইনড। না হলে কোনোভাবেই সেই আট-দশ বছর আগে ‘এগুলো করে কী হবে’ ভেবে স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেয়া লেখালেখিতে পুনরায় ফিরে আসাটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য, অভাবনীয়! এর পেছনে আরও এতো এতো বিস্ময়কর গল্প আছে যে বলে শেষ করা যাবে না!

স্বরলিপি: প্রকাশক কি লেখকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন?

সাদাত হোসাইন: এটি নির্ভর করে প্রকাশক হিসেবে তিনি কেমন তার ওপর। আজকাল আমরা যেভাবে লেখকের পরিচয়, সক্ষমতা, পড়াশোনা, প্রস্তুতি, দায়বদ্ধতা নিয়ে হরহামেশা প্রশ্ন তুলি, প্রকাশকের ক্ষেত্রে কিন্তু সেটি তুলি না। যেন প্রকাশনীর কোনো একটা কঠিন-কাব্যিক-অপ্রচলিত নাম, একটা বাহারি লোগো, একটা গালভরা ট্যাগলাইন আর ট্রেড লাইসেন্স হলেই কেউ প্রকাশক হয়ে গেল! এখন এমন প্রকাশক হলে তিনি কার প্রতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবেন? কারো ওপরই নয়। এমনকী নিজের প্রতিও নয়। যেহেতু এই ধরনের প্রকাশকের সংখ্যাই বেশি, সেহেতু লেখকের লেখক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় প্রকাশকের আক্ষরিক অর্থেই যে ভূমিকা থাকা উচিত, তা নেই বললেই চলে। হয়তো কারো কারো আছে। তবে তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। প্রকাশক অবশ্যই ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু সেটি সম্ভবত আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় হয়নি, এমন কোনো বাস্তবতায়। প্রকাশককে আসলে জহুরী হতে হয়। তার চারপাশে অসংখ্য চকমকি জিনিস ঘুরে বেড়াবে, সেখান থেকে তাকে কাচ এবং হীরা আলাদা করতে জানতে হবে। শুধু তাই নয়, হীরার যত্নও নিতে হবে। প্রকাশক যদি এমন হন, তাহলে তিনি নিঃসন্দেহে লেখকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন।

স্বরলিপি: লিও তলস্তয় লেখক জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তুমুল জনপ্রিয়আবার অনেক জনপ্রিয় লেখক জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেনজনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য কী করছেন, যদি দেখেন জনপ্রিয়তা পড়ে গেছে তাহলে বিষয়টি কীভাবে গ্রহণ করবেন?

সাদাত হোসাইন: জনপ্রিয়তা খুবই অদ্ভুত রহস্যময় ব্যাপার। এর কোনো প্রতিষ্ঠিত সূত্র বা তত্ত্ব নেই। যদি থাকতো, তবে আমার ধারণা জগতের সকল সৃষ্টিশীল মানুষই সেটি আয়ত্ব করার চেষ্টা করতো। এটি সহজাত। দেখবেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন, আপনি কি পাঠকের চাহিদা মাথায় রেখে লিখছেন? কিংবা আপনি কি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য মাথায় রেখে লিখছেন? আমি এ ধরনের ভাবনা বা প্রশ্নকে অপরিপক্ক ও চিন্তাহীন মনে করি। কারণ পাঠকের চাহিদা মাথায় রেখে যদি লেখা যেত, তাহলে পৃথিবীর সব লেখকই তেমন লিখতেন। মানে পাঠককে সন্তুষ্ট করে জনপ্রিয় কিংবা বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার জন্য লিখতেন। কিন্তু বিষয়টি এতো সহজ নয়। আপনি চাইলেই পারবেন- পাঠক চাহিদা অনুযায়ী লিখতে? কোন পাঠক কী চান, সেভাবে লেখা কি আদৌ সম্ভব? কী লিখলে সেই লেখা বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে, এটি কি আদৌ কারো পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্যানুসারে বোঝা সম্ভব? কিংবা সম্ভব হলেও সে অনুযায়ী ‘ডেলিভারি’ দেয়া সম্ভব? সম্ভব নয়। যদি সম্ভব হতো, তাহলে দেশে অসংখ্য বাণিজ্যিকভাবে সফল লেখক থাকতেন, হাজার হাজার তুমুল পাঠকপ্রিয় লেখক থাকতেন। বইমেলায় দুইশ, তিনশ, পাঁচশ কপি বই বিক্রি হলেই হইহই কাণ্ড ঘটে যেত না। তখন একেকজনের লাখ লাখ কপি বই বিক্রি হতো। লেখকরা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো না- ‘নয়টা-পাঁচটা চাকরি করে কি আর লেখালেখি হয়!’ কিংবা ‘এই দেশে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ নেই।’ তখন বরং সবাই অন্য কাজ বাদ দিয়ে কেবল লেখালেখিই করতেন। আমি যেটি বলতে চাইছি, কেউ চাইলেই জনপ্রিয় কিংবা বাণিজ্যিকভাবে সফল লেখক হতে পারবেন না। কোনো তত্ত্ব অনুসরণ করে জনপ্রিয় হতেও পারবেন না। আবার সেই জনপ্রিয়তা ধরেও রাখতে পারবেন না। এটা সহজাত বৈশিষ্ট্য। লেখককে মূলত স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে হবে, আনন্দ পেতে হবে তার লেখার মাধ্যমে। জোর করে, আরোপিত কিছু করার দরকার নেই। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য বা ধরে রাখার জন্য আলাদা করে কিছু করার দরকার নেই। আবার অজনপ্রিয় হয়ে তথাকথিত ‘মৃত্যুর পরে কালজয়ী হবো’ ভাবনা ভেবে গলা চড়ানোরও দরকার নেই। তাকে তার সহজাত অনুভূতি, ভাবনা, প্রকাশ ক্ষমতায় স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে হবে। যা হবার তা ওই স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে, সহজাত ক্ষমতার কারণে আপনা-আপনিই হবে।

স্বরলিপি: এক বাক্যে আপনার জীবনের ফিলোসফি জানতে চাই

সাদাত হোসাইন: বি হ্যাপি। ডু হোয়াটেভার ইউ লাভ টু ডু, বাট ডোন্ট বি হার্মফুল ফর আদারস।

স্বরলিপি: আপনার প্রিয় লেখক, প্রিয় লেখা সম্পর্কে বলবেন...

সাদাত হোসাইন: আমি প্রথমত শীর্ষেন্দুর লেখার অসম্ভব ভক্ত। তারপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। হুমায়ূন আহমেদের লেখাও ভালো লাগে। বিদেশি সাহিত্যে এরিখ মারিয়া রেমার্ক আমার অসম্ভব প্রিয়। তাঁর ‘থ্রি কমরেডস’ আমি কতবার পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই! মানিকের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ তো আছেই, তবে ‘চতুষ্কোণ’ আমার বেশি প্রিয়, এতো দারুণ মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ বাংলা সাহিত্যে খুব কম আছে। এই সময়ে শাহাদুজ্জামানে মুগ্ধ আমি। তাঁর ‘ক্রাচের কর্নেল’ বা ‘একজন কমলালেবু’ খুব আলোচিত বা বিখ্যাত হলেও, আমি মুগ্ধ হয়েছি ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ পড়ে- অসাধারণ! অনেকদিন লিখতে পারছিলাম না। ভেতরটা যেন শান্ত, স্থির এক পুকুর। তাঁর এই বইয়ের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল সেই নিস্তরঙ্গ পুকুরের স্থীর জলে টুপটাপ ঢিল পড়ছে আর অসংখ্য গল্পের ঢেউ ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে। হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প পড়লেও এমন হয়। কী অসাধারণ! চার্লস ডিকেন্সের ‘আ টেল অফ টু সিটিজ’ আমার স্বপ্নের বইগুলোর একটি। আসলে কত অসংখ্য লেখা ও লেখক যে প্রিয়, সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

স্বরলিপি: আপনি বেশি স্বাধীন নাকি আপনার গল্প? আপনার তৈরি চরিত্র কি কখনো আপনার কাছে ফেরে, কোন অনুরোধ কিংবা অনুরাগ নিয়ে যে চরিত্র সৃষ্টি হয়ে যায়, সে চরিত্রের সঙ্গে কথোপকথন হয় কি? যেমন ধরুন পথে যেতে যেতে কখনো দেখা হয়?

সাদাত হোসাইন: আমার চেয়ে আমার চরিত্ররা বেশি স্বাধীন। বরং তাদের কাছে আমি পরাধীন। আমার মনে হয়, আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেশ ভালো। কেন বলছি, ব্যখ্যা করছি- আমি সাধারণত কোথাও গেলে, এমনকি রাস্তাঘাটেও, খুব ক্যাজুয়াল থাকি। আলাদা করে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখি না, ভাবি না। খুব সহজ, স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত চলন। কিন্তু আমি যখন লিখতে বসি, তখন লিখতে লিখতেই যখন কোনো কিছুর বর্ণনা বা ব্যখ্যা করছি, তখন অবচেতনভাবেই মনে হতে থাকে যে, এটা আমি কোথাও খুব সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে দেখেছি। সেটি তখন কল্পনায় ভিজ্যুয়ালাইজ হতে থাকে। যেনো আমি দেখে দেখে লিখছি- এটা খুব ইন্টারেস্টিং। আর এ কারণেই লেখার প্রথম কয়েক অধ্যায় পরে, যখন আমি গল্পে ঢুকে যাই, তখন চরিত্র কিংবা ঘটনার ওপর আমার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বরং এমনও হয়- যে চরিত্রটা প্রধান ধরে লিখতে শুরু করেছি, যে গল্পটাকে মূল ধরে শুরু করেছি, সেখানে অন্যকোনো চরিত্র প্রধান হয়ে উঠেছে, অন্যকোনো গল্প প্রমিনেন্ট হয়ে উঠেছে! আর হ্যাঁ, লেখার পরও দীর্ঘদিন এই চরিত্রগুলো মাথার ভেতর থেকে যায়। ভাবনায় যখন তখন এসে হাজির হয়। হয়তো সেই চরিত্রের সঙ্গে আমার কথোপকথনও হয়। আর সেই কথোপকথন থেকেই শুরু হয় অন্য কোনো চরিত্র, অনকোনো গল্প...।

স্বরলিপি: লেখকের দায় কার কাছে, মানুষ নাকি শিল্প- মানুষ কি শিল্প?

সাদাত হোসাইন: আমার ভাবনা খুব সিম্পল। যেটা প্রথমেই বলেছি, আমি স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে চাই, সেটি আমার অনুভূতির কাছে, সংবেদনশীলতার কাছে। আমার মনে হয় এটা জরুরি। কেনো বলছি- আপনি যে দায়-এর কথা বললেন, এটা এক ধরনের সূক্ষ্ম কিন্তু তীক্ষ্ম সংকট তৈরি করে বলে আমার মনে হয়। লেখক যখন নানাবিধ দায় কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে সাহিত্য চর্চা করতে বসেন, তখন সেটি কতটা দায় আর কতটা স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি থাকে, সেটি গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আমার কেন যেন মনে হয়, এটা আমরা বেশিরভাগই বুঝতে বা আলাদা করতে পারি না। আমাদের ভাবতে হয়, আমাকে শিল্প চর্চা করতে হবে, নন্দনতত্ত্বের চর্চা করতে হবে, এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে, যেহেতু আমি শিল্পী, সাহিত্যিক, সেহেতু আমাকে এর প্রতি দায় পালন করতে হবে, তার প্রতি দায় পালন করতে হবে। এমন কি আমি সেটির সাথে একাত্ম অনুভব না করলেও করতে হবে। এই যে আমি অনুভব করছি না, কিন্তু তারপরও করতে চাইছি, এই ফারাকটুকু এতোই সূক্ষ্ম যে বেশিরভাগ সময়ই তা বুঝতে পারি না। অথচ ওটা বুঝতে পারা জরুরি। ফলে আমরা যেটা করি, তা হলো দায়টাকে অনুভবে ভাবতে শুরু করি। এতে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। শিল্প চর্চায় যেটা সবচেয়ে জরুরি বলে আমি মনে করি। আমরা তখন কেবল পারিপার্শ্বিক কিংবা প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত ‘আদর্শিক’ ধারণা মতে তৈরি দায় মেটাতে থাকি। সেটা হতে পারে ঐক্যমত কিংবা দ্বিমত প্রদর্শনের মাধ্যমে। এ কারণেই আমার মনে হয়, লেখক ঠিক দায় নয়, ভাবুক তার অনুভব নিয়ে। তিনি নিজের অনুভবের কাছে দায়বদ্ধ থাকুন। স্বতঃস্ফূর্ত থাকুন।

স্বরলিপি: ‘আরশিনগর’ এবং ‘অন্দরমহল’ পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পর আপনি যা লিখতে চান তা লিখে যেতে পারছেন- নাকি প্রকাশকদের চাহিদা অনুযায়ী অনেক বেশি লিখতে হচ্ছে?

সাদাত হোসাইন: এখনো পর্যন্ত তেমন হয়নি। আমি আমার মতো করেই লিখে যাচ্ছি। প্রকাশকদের চাহিদা, প্রত্যাশা বিপুল। সেটি কখনো কখনো বিচলিত করে, দ্বিধান্বিতও। তবে এখনো অবধি সম্ভবত আমি আমার জায়গাতেই আছি।

স্বরলিপি: জনপ্রিয় হওয়ার আগের বইমেলা নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ

সাদাত হোসাইন: ছোট্ট করে বলি, তখন বইমেলার পরিসর ছিলো ছোট- বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তেমন একটা ঘোরাফেরার সুযোগ ছিলো না। অথচ তারপরও ভিড়ের মধ্যেই ঘুরতাম। অথচ গত পাঁচ বছর বইমেলা প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে সুন্দর হয়েছে, অথচ এই পাঁচ বছরে সম্ভবত একদিনও স্বাধীনভাবে বইমেলায় ঘুরতে পারিনি। এই যে এবার- কী দারুণ বইমেলা! বিশেষ করে লেকের দিকটা, খুব মনে হয় ওখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় চুপচাপ যদি বসে থাকতে পারতাম! কিন্তু হয় না। মন খারাপ হয়। আবার বইমেলায় অটোগ্রাফের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাঠকের উৎসুক চোখে-মুখে যে প্রবল ভালোবাসা দেখি, সেটি ভালো লাগায়ও পরিপূর্ণ করে দেয়।

স্বরলিপি: আপনার লেখার সময়, লেখার অভ্যাস সম্পর্কে জানতে চাই

সাদাত হোসাইন: তেমন কোনো রুটিন নেই। যখন লিখতে ইচ্ছে হয়; লিখি। তবে ভোর রাতের দিকে সবচেয়ে ভালো সময় মনে হয়।

স্বরলিপি: পরিবারে আপনি যেমন?

সাদাত হোসাইন: অলস। আরামপ্রিয়। তবে ডিসিশন মেকার। আর দায়িত্বশীল।

স্বরলিপি: ‘অর্ধবৃত্ত’র মূল গল্প কী?

সাদাত হোসাইন: এটি মূলত একটি একান্নবর্তী পরিবারের গল্প। সেই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যের জীবনের গল্প। সম্পর্কের সংযোগ ও সংকটের গল্প। এক চল্লিশোর্ধ্ব নারীর সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের ছোট এক তরুণের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কে চমকে যাওয়ার মতো নানাবিধ মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ যেমন আছে, তেমনি প্যারালালি এগিয়েছে আরও অনেকগুলো গল্প।

 

ঢাকা/তারা