ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৮ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বন্ধনমুক্ত আজাদ রহমান: আপনাকে প্রণাম

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৭ ৪:৩৮:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৮ ১০:০৭:২২ এএম

অনেকে হয়তো জানেন না, অনেক পিছিয়ে থাকা তখনকার সমাজ আর সময়ে আজাদ রহমান এমন একটা ছায়াছবি নির্মাণ করেছিলেন যা আজকের দিনেও কেউ নির্মাণ করার কথা ভাবতে পারেন। আমাদের যৌবনের শুরুতে দেহমনে সাড়া জাগানো এই ছবির নাম ছিলো ‘গোপন কথা’। আমাদের সিনেমার ইতিহাসে প্রথম নির্মিত শরীর বিষয়ক বিজ্ঞানভিত্তিক ছায়াছবি। যৌনতা না-বলে আমি বলবো, এটি ছিলো শরীর  ও মনকে জানার একটি বাস্তবসম্মত চলচ্চিত্র। তখনই আমরা জানতাম তিনি আধুনিক এবং ব্যতিক্রমী।

সিডনি পুরোদমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে। তাই এখন সপ্তাহে আবার মাত্র দু’দিন নিজের। যাকে বলে উইকেন্ড। শনিবার রাতে সোফায় শরীর এলিয়ে ‘গণ্ডি’ ছবিটা দেখছিলাম। দেখা শেষেও রেশ ছিলো কিছুটা। রাতদুপুরে ঘুমাতে গিয়েই পেলাম দুঃসংবাদ। আমার এক অনুজ লিখেছে: ‘দাদা আপনি কি আজাদ রহমানকে নিয়ে লিখবেন না?’ আমি তখনই ধরে নিয়েছি নির্ঘাৎ আরেকটি দুঃসংবাদ আমার জন্য। এবং তাই হলো!  স্বপ্নেও ভাবিনি হঠাৎ করে এমন একটা খবর পাবো।

গুণী মানুষ, দেশখ্যাত মানুষের চলে যাওয়া সবসময় বেদনার। তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের গুণ নিয়ে, কর্ম নিয়ে বলার বা লেখার জন্য আছেন হাজার মানুষ। কিন্তু কিছু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় মনের গভীরে। এই সম্পর্কগুলো হয়তো গড়ে ওঠে সে কারণেই; একসময় যা হয়ে ওঠে বাঁচার প্রেরণা। এই প্রেরণা থাকবে আজীবন অনুগামী ছায়ার মতো। আমি গান জানি না। গান ভালোবাসি; নিজে নিজে শৈশব থেকে গাই-ও। মা আমাকে বাড়িতে মাস্টার রেখে গান শেখানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু  আমার মন ছিলো অন্যদিকে। আমি ভালোবাসতাম ছড়া, কবিতা লিখতে। ফলে গান গুণগুণ করে নিজেই বাসা বেঁধে বেঁচে রইলো মনের গোপনে। কিন্তু কেন জানি না সংগীতের প্রতি ভালোবাসা কিংবা আমার অনুরাগ সরস্বতী বোঝেন। তা না-হলে কি মান্না দে'র মতো কিংবদন্তী শিল্পীকে উপস্থাপন করার সুযোগ পেতাম আমি? সুযোগ মিলতো কি জগজিৎ সিংকে কাছ থেকে দেখার? এর বাইরেও আমাদের দেশের প্রচুর গুণী শিল্পী আমার সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে বাঁধা। আমি বরাবর মেনেছি, এগুলো  আমার শিরোধার্য কোনো আর্শীবাদ। আজ যাঁর কথা লিখছি তাঁর সাথে আমার ভালোবাসা বা স্মেহাশ্রিত হবার খুব কোনো কারণ ছিলো না।

অনেক বছর আগে একুশে বইমেলা সিডনি'র উদ্যেক্তারা তাঁকে নিয়ে একটা সেমিনার করেছিলেন। সেখানে আমাকেও আলোচক হিসেবে রাখেন তাঁরা। মাঝে মাঝে তাদের দয়ার শরীর বলে এমনটা হয়। সেদিন খুব বেশীক্ষণ থাকতেও পারিনি। তেমন করে ছবিও তোলা হয়নি। আমি আমার কথাগুলো বলে এবং আজাদ রহমান ও সেলিনা আজাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাড়াতাড়ি চলেও এসেছিলাম। মনে আছে আমি এটা বলতে ভুলিনি জীবনে কিংবদন্তী বা কালজয়ী হতে খুব বেশী কাজের দরকার পড়ে না। সময় উত্তীর্ণ একটি কাজই যথেষ্ট। তেমন কয়েকটি কাজ আছে আজাদ রহমানের। আর সেলিনা আজাদ এক গানেই বাজিমাত করেছেন বাংলাদেশে।

চলে আসার পর অনেকেই বলেছিলেন, তিনি আমার কথার প্রশংসা করে  আমাকে খুঁজেছেন। ধরে নিয়েছিলাম বড় মানুষদের সৌজন্য। কিন্তু না, এরপর যখনই আসতেন ফোনে কথা হতো, নয়তো-বা দেখা হয়ে গল্প  আর আড্ডা হতো। অনেক না-বলা কথা ছিলো তাঁর। আমি জানি না তিনি সে সব লিখে রেখে যেতে পেরেছেন কিনা। না পারলে আমাদের গানের জগত বিশেষত বাংলা খেয়াল গানের জগত মূল্যবান এক উপহার হারিয়েছে। যা আমাদের আজকের বাস্তবতায় ছিলো জরুরি। মিতভাষী মানুষ, মুখে এক টুকরো হাসি লেগেই থাকতো। আধুনিক গানের আকাল আর সর্বনাশের কথা উঠলে কখনো হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়তেন না। মৃদুকণ্ঠে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন সর্বনাশ কোথায় হচ্ছে বা কারা করছে। তাঁর ভেতর একটা প্রচ্ছন্ন অভিমান থাকলেও তিনি নাখোশ নাদান টাইপের ছিলেন না। এখন যেমন ‘আমার পদক চাই’ ‘আমার স্বীকৃতি চাই’ ‘টাকা চাই’ ‘সম্মান চাই’ বলে বড় বড় নামধারীদের আহাজারি তেমন কিছু দেখিনি কখনো। বরং কেমন একটা প্রসন্নতা ছিলো চোখে-মুখে। তৃপ্ত মানুষের এক অসাধারণ মুখচ্ছবি ছিলেন তিনি। কত বড় মাপের সংগীত পরিচালক ও সুরস্রষ্টা তা তাঁর গানগুলো শুনলেই বোঝা সম্ভব।

‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’ ‘ভালোবাসার মূল্য কত’ ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ ‘মনেরও রঙে রাঙাব’ ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’ ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি’সহ বহু গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আজাদ রহমান। কোনোটির সুরকার তিনি, কোনোটির সংগীত পরিচালক। রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম ছবি ‘অনন্ত প্রেম’-এ ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ গানটি ব্যবহৃত হয়। খুরশিদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে আজাদ রহমানের সুর করা এই গানের কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেয়ালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মিস প্রিয়ংবদা’র সংগীত পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে তাঁর পথচলা শুরু। এই ছবিতে তাঁর পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়। বাংলাদেশে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবিতে। এরপর ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘এপার ওপার’, ‘পাগলা রাজা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘আমার সংসার’, ‘মায়ার সংসার’, ‘দস্যু বনহুর’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘মাসুদ রানা’সহ বহু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।

বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আজাদ রহমানের লেখা সংগীতবিষয়ক বই ‘বাংলা খেয়াল’। তিনি কেবল নিজে বলতেন না, শুনতেনও। কি করে যেন তাঁর ধারণা হয়েছিল আমি ভালো লিখতে পারি। গান বাজনা বা সংস্কৃতি বিষয়ে আমার হালকা লেখাগুলোও ভালো লাগতো তাঁর। তিনি গল্প করেছিলেন অতীতের। কীভাবে একটা মাত্র অর্কেস্ট্রা দিয়ে ঢাকায় আধুনিকায়নের শুরু করেছিলেন। কেমন করে জন্ম দিয়েছিলেন, ‘মনের রঙে রাঙাবো’ কিংবা ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ এমন সব গানের।

বছরও পেরোয়নি; একদিন দুপুরে অচেনা ফোন নম্বর থেকে ফোন এলো মোবাইলে। ফোন ধরে অবাক হয়েছিলাম। অনেকদিন পর তিনি আমাকে ফোন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি যখন দেশে থাকেন তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। গুণী মানুষ, নামী মানুষ- কতো কাজ তাঁর! যোগাযোগ ও স্বভাবতই থিতিয়ে আসে। যদিও মনে থাকেন, মনজুড়ে থাকেন। জানলাম  তিনি আমাকে খুঁজছেন। পরদিন তাঁকে ঘিরে বাংলা একাডেমি নামে সিডনির প্রতিষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল সেমিনার ও গান শেখার  আসর। তাঁর অনুরোধ অথবা আবদার- আমাকে যেতেই হবে। আমি তা আদেশ বলে ধরে নিয়েই সেখানে গিয়েছিলাম। আমার খুব একটা ইচ্ছে ছিলো না। কারণ জায়গাটা দূরে। তাছাড়া দীপা না থাকলেই আমি রাস্তা গুলিয়ে ফেলি। সেবারও তাই হয়েছিল। কাছাকাছি গিয়ে গাড়ি নিয়ে একবার এদিকে যাই, আরেকবার ওদিকে। জিপিএ নামের যন্ত্রের সব আদেশ মেনে একটু বিলম্বে হলেও পৌঁছেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে ভাগ্যিস আমি গিয়েছিলাম সেই পড়ন্ত দুপুরে। তা না হলে আজ আমার কষ্ট আর গ্লানির সীমা থাকতো না। আর কোনোদিন তাঁর সান্নিধ্য পাবারও সুযোগ নেই আর।

যাবার পর অনুষ্ঠানের ফাঁকে আমাদের গল্প চললো অবিরল। যতোক্ষণ ছিলাম তাঁর পাণ্ডুলিপি, ওপার বাংলায় সমাদৃত তাঁর খেয়াল বিষয়ক গবেষণার কথা হলো। তারপর গান। যেখানে সেলিনা আজাদ গাইবেন, সঙ্গে তাঁর গুণী দুই কন্যা; সেখানে আমাদের কণ্ঠ মেলানো স্পর্ধা জেনেও তাই করতে হয়েছিল। শেষটা ওখানে হতে দিলেন না। চলে আসার  আগে কিছু বলতেই হবে। আমার বলার সময় সেলিনা আজাদের হাসি মুখ আর আজাদ রহমানের তৃপ্তিমাখা মুখ মনে করিয়ে দেয় কতোটা ভালোবাসতেন। কথা ছিলো আবার দেখা হবে। আবার আসবেন সিডনিতে। সত্যি বলছি, এমন সুখী চমৎকার দম্পতি বিরল। সাধারণত শিল্পী বা গুণী দম্পতিদের ভেতর ফারাক থাকে বেশি। কিন্তু যারা তাঁদের চেনেন সবাই জানেন কতটা মনোময় ছিলো তাঁদের বন্ধন। আজ সে বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। সেলিনা আজাদের জন্য মনটা বিষাদে ভরে আছে।

আজাদ রহমান বাংলাদেশে নানা কারণে পাইওনিয়ার অগ্রদূত। তাঁকে সময় মূল্যায়ন করবেই। মনে রাখবে লাখো কোটি মানুষ। মনে রাখবে আগামী দিনের গায়ক-গায়িকা সংগীতপ্রেমীরা। প্রয়াত সুরকার গায়ক  আজাদ রহমানকে ভোলা অসম্ভব আমার।

ভালো থাকবেন আপনি। প্রণাম।

লেখক: প্রাবন্ধিক, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী


ঢাকা/তারা