ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৯ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৯ ||  ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

রাজা রামমোহন রায় চৌধুরির জমিদারি

বেলাল রিজভী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৫, ২৬ মার্চ ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
রাজা রামমোহন রায় চৌধুরির জমিদারি

সামনে থেকে খালিয়া রাজারাম মন্দিরের মূল ভবন (ছবি : বেলাল রিজভী)

অনেক অনেক বছর আগের কথা। তখন রাজা রামমোহন রায়ের বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। তারা দুজনেই উজানী রাজার বাড়িতে দাস-দাসি হিসেবে কাজ করতেন। উজানীর রাজা ছিলেন অনেক ধনী। তার সাতটি জমিদারি ছিল।

 

রাজা রাম মোহন রায় তখন খুবই ছোট। তাকে উজানী রাজার বাড়ির বারান্দায় রেখে দুজনে কাজে যেতেন। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে থাকতে হত রাজা রামমোহনকে। এ সময় ফনিমনসা এসে রাজারাম মোহনকে ছায়া দিয়ে রাখত। বিষয়টি কেউ দেখতে পেত না।

 

এক দিন উজানীর রাজা এসব দেখেন। এভাবে একাধিক দিন উজানীর রাজা দেখেন রোদের মাঝে ফনিমনসা শিশু রামমোহনকে ছায়া দিচ্ছে। বিষয়টি একদিন রানীকে দেখান। পরে রানী দেখেন রামমোহনের গায়ে রাজতিলক। যাদের গায়ে রাজতিলক থাকে তারা একদিন রাজা হয়। উজানীর রাজার এসব দেখে তার সাতটি জমিদারি থেকে একটি জমিদারি দান করেন রামমোহনকে। আর দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন তার মা-বাবাকে।এমনই মিথ প্রচলিত আছে রাজা রাম মোহন রায়ের জমিদারি প্রাপ্তি নিয়ে।

 

রাজারামের মন্দিরের সামনের অংশে অপূর্ব কারুকাজ (ছবি : বেলাল রিজভী)

 

রাজারাম রায়ের এই জমিদারির গোড়াপত্তন কবে হয় সে সস্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা কারো নেই। তবে রাজারাম রায়ের নামে সপ্তদশ শতাব্দীতে একটি মন্দির নির্মিত হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হয় সপ্তদশ শতাব্দীতেই এই জমিদারির গোড়া পত্তন হয়। এ ছাড়াও এ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১১৭ বছর আগে।

 

প্রায় ২৫০ একর জমির ওপর অবস্থিত রাজারামের খালিয়া জমিদার বাড়িটি। জমিদার আমলে এখানে গড়ে তোলা হয় আকর্ষণীয় দোতলা-তিনতলা বিশিষ্ট দালান-কোঠা ও বাগানবাড়ি। এখানকার সারিবদ্ধ দালান-কোঠা, বাগানবাড়ি, পূজা মন্ডপ ও শানবাঁধানো পুকুর ঘাট আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে টিকে আছে। এখানকার জমিদাররা ছিলেন প্রচণ্ড প্রতাপশালী। ওই সময়ে জমিদারদের বাড়ির কাছ ঘেঁষে জনসাধারণের চলা চল নিষিদ্ধ ছিল।

 

মন্দিরের জানালার উপরের অংশে বাহারি কারুকাজ (ছবি : বেলাল রিজভী)

 

জমিদারদের আচার আচরণ নিয়ে বহু জনশ্রুতি রয়েছে। জমিদার বংশের লোকেরা শুস্কমৌসুমে বিলাস বহুল ঘোড়ার গাড়ি, বর্ষাকালে আর্কষণীয় পানসি নৌকা, গয়না নৌকা এবং সুজ্জিত পালকি ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতেন না। রাজা রাম মোহন রায় অন্য জমিদারের তুলনায় একটু প্রজাবৎসল ছিলেন। তাই তো এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে শত বছর পূর্বে নির্মাণ করেছিলেন জেলার অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয় খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউশন। জমিদার রাজারাম রায় চৌধুরীর নাম অনুসারে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত।

 

এ ছাড়া কারুশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে এখনো টিকে আছে খালিয়া রাজারাম মন্দির। জমিদার রাজা রাম চৌধুরির বসত ভিটার চিহ্নটুকু বহু আগেই মুছে গেছে। শুধু স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজারাম মন্দির ও খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউশন। বর্তমানে রাজা রাম মন্দিরের দ্বিতল একটি দালান প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন। জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত আছে এই মন্দিরটি ছয় তলা বিশিষ্ট ছিল। কালের পরিক্রমায় কিংবা কোনো প্রাকৃতিক কারণে চার তলা মাটির নিচে দেবে গেছে।

 

রাজারাম মন্দিরের পাশে আরেকটি মন্দিরের দসে যাওয়া স্থাপনার অংশবিশেষ (ছবি : বেলাল রিজভী)

 

ঐতিহ্যবাহী খালিয়া জমিদারবাড়ির ঔজ্জ্বল্য অযত্নে অবহেলায় আজ লোপ পেতে বসেছে। এখানে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেগড়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বে ও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে জমিদারবাড়ির অতীত ঐতিহ্যও গৌরব।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/মাদারীপুর/২৬ মার্চ ২০১৪/বেলাল রিজভী/সনি

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়