ঢাকা     সোমবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

আমাদের হিরো : ২য় পর্ব

মুম রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৩, ১০ জুন ২০১৬   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
আমাদের হিরো : ২য় পর্ব

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

বড়দের সিরিজ

 

মাসুদ রানার মতো বাংলা ভাষায় সিরিজ উপন্যাসের ধারাটা খুব সুবেদিত নয়। একটা কথা মনে রাখতে হবে, এ দেশে লেখালেখিকে সে অর্থে এখনো পেশা হিসাবে তেমন কেউ গ্রহণ করেননি।

 

ফলে পাশ্চাত্যের মতো করে একাধিক সিরিজ কাহিনী লেখার সিরিয়াসনেস আমাদের পোষায় না। বাংলা সাহিত্যে সিরিজ উপন্যাস সে অর্থে নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল নাচের ইতিকথা, ইতিকথার পরের কথা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপুকে পাই পথের পাঁচালি, অপরাজিতা উপন্যাসে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কাজল উপন্যাসে অপু ও তার ছেলে কাজল নিয়ে লিখেছেন। সে অর্থে বিশ্বসাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্যেও গোয়েন্দা কাহিনীগুলোই সিরিজ আকারে জনপ্রিয় হয়েছে।

 

সিরিজ গোয়েন্দা কাহিনীর মধ্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বোমকেশ বক্সি সবার আগে উল্লেখযোগ্য। ১৯৩২ সালে পথের কাঁটা উপন্যাস দিয়ে এ সিরিজের যাত্রা শুরু হয়। তারপর বেনীসংহার (১৯৬৮) নাগাদ ষোলটি ব্যোমকেশের উপন্যাস আমরা পাই। সত্যন্বেষী ব্যোমকেশ বক্সি ছাড়াও শরদিন্দুর ‘বরদা সিরিজ’ও জনপ্রিয় ছিলো। বরদা সিরিজ মূলত অতিপ্রাকৃত গল্প নিয়েই রচিত। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার পুরো নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্তির। ফেলুদাকে নিয়ে ১৯৬৫ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রথম লেখা হয় গল্প ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি। তারপর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় নিয়ম করে প্রতি বছর ফেলুদাকে নিয়ে একটি গল্প বা উপন্যাস লিখেছেন। ফেলুদাকে নিয়ে ৩৫টি গল্প আছে। এরমধ্যে সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, কৈলাসে কেলেঙ্কারি, যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে উল্লেখযোগ্য। নীহার রঞ্জন গুপ্তের লেখা কিরীটি সিরিজও জনপ্রিয় ছিল।

 

বিশ্বখ্যাত রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখিকা আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে লন্ডনে গিয়ে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস কালো ভ্রমণ লেখেন যার প্রধাণ চরিত্র কিরীটি রায়। কিরীটিকে নিয়ে প্রায় দুইশ গল্প উপন্যাস লেখা হয়েছে। বাংলাদেশে রবিন হুডের আদলে রোমেনা আফাজ লেখনে দস্যু বনহুর সিরিজ। মাসুদ রানার আগে বাঙালি পাঠকের প্রিয় একটি চরিত্র ছিল দস্যু বনহুর।

 

মাসুদ রানার সৃষ্টি কিরীটি, দস্যু বনহুরকে ম্লান করে দেয়। গতিময় কাহিনী, ঘটনার বৈচিত্র এবং সবচেয়ে বড় কথা বড়দের উপযোগী গল্প দিয়ে মাসুদ রানা যেন একছত্র অধিপতি হয়ে ওঠে। সমকালের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলি, শুভ্র ও হিমুকে নিয়ে একাধিক সিরিজ লিখেছেন। মিসির আলিকে নিয়ে ২১টি উপন্যাস, ১টি গল্পগ্রন্থ এবং হিমুকে নিয়ে ২১টি উপন্যাস একটি হিমু জীবনীকেন্দ্রিক বই (হিমুর বাবার কথামালা) এবং একটি হিমুর গল্প আছে। কিন্তু শরদিন্দু, নীহার রঞ্জন, রোমেনা আফাজ থেকে হুমায়ূন আহমেদ সবার লেখা সিরিজ কাহিনীগুলো কিশোর পাঠ্য, চাইলে বড়রাও পড়তে পারেন। কিন্তু যে অর্থে বিশ্বব্যাপী স্পাই থ্রিলার হয়, তেমন এডাল্ট বা প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী কাহিনী তারা বুনেননি। নারী পুরুষের জৈবিক সম্পর্ক তারা এড়িয়ে গেছেন।

 

এ প্রসঙ্গে ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম উপন্যাস ধ্বংস পাহাড়ের ভূমিকাংশটুকু উদ্ধৃতিযোগ্য : ‘প্রথমেই বলে রাখি, এই বই বড়দের জন্য লেখা। বাংলা সাহিত্যে রহস্য উপন্যাস বলতে বোঝায় কেবল ছোট ছেলে-মেয়েদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কেনা এক ধরনের উদ্ভট গল্পের বই, যা হাতে দেখলে বাবা, কাকা, ভাইয়া এবং মাস্টার মশাই প্রবল তর্জন গর্জন করে কেড়ে নিয়ে নিজেরাই পড়তে লেগে যান, গোপনে। কেন পড়েন? কারণ এর মধ্যে এমন এক বিশেষ রস আছে যা প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা সুসাহিত্য বলি তার মধ্যে সাধারণত পাওয়া যায় না। তাই ছোটদের বই থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে, আংশিক হলেও, আনন্দ লাভ করেন বড়রা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশেষ করে ছোটদের জন্যে লেখা বলে এসব বইয়ে ছেলেমানুষির এতই ছড়াছড়ি থাকে যে আমরা বড়রা এই বই পড়ি, এবং এ থেকে আনন্দ পাই তা স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করি। তাই ছেলেমিটাকে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে বড়দের উপভোগ্য রোমাঞ্চকর রহস্যোপন্যাস রচনা করবার চেষ্টা করলাম।’

 

কাজেই বলা যায় বাংলা সাহিত্যে তথা বাংলা ভাষায় সচেতনভাবেই প্রথম এডাল্ট উপন্যাস হিসেবে মাসুদ রানার সৃষ্টি হয়েছে। ‘‘শুধু শুধুই পুড়তে থাকল সিগারেটটা। পুড়তে পুড়তে ছোট হয়ে যখন আঙুলে আঁচ লাগল তখন চোখ মেলে দেখল উগ্র লাল রঙের একখানা খাটাউ প্রিন্ট শাড়ি সাদাসিধে একহারা করে গায়ে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছে সুলথা। বক্ষাবরণ পরেনি। তাউ উন্নত স্তন যুগল আর শাসন মানছে না। প্রতি পদক্ষেপেই দুলে উঠে দোলাচ্ছে একমাত্র দর্শকের মন।’’- (ধ্বংস পাহাড়)। ‘‘বুঁচে দেয়া পেটিকোটে ঢাকা একখানা চমৎকার সুডৌল নিতম্বের উপর চোখ পড়ল রানার মিত্রা ঘুরে দাঁড়াতেই। এঁটে বাঁধা ব্রেসিয়ারের ফিতেগুলো পিঠের নরম-মাংসের উপর চেপে বসে আছে। (ভারতনাট্যম) ‘‘কাছে সরে এসে রানার গাঁ ঘেষে বসল জিনাত। কাঁধে একটা হাত রাখল রানা। পিচ্ছিল আঁচল খসে পড়ল কোলের ওপর।’’... ‘‘এই দুপুর রোদে আর টৈ-টৈ করে ঘুরতে ভাল্লাগছে না। বিকেলে তো অনেক দেরি আছে।’ আবার হাসল জিনাত। রাঙা হয়ে উঠল গাল দুটো। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘চলো না, তোমার ঘরে যাই?’ (স্বর্ণমৃগ) ধ্বংস পাহাড়, ভারতনাট্যম আর স্বর্ণমৃগ- মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম তিনটি উপন্যাস থেকেই আসলে বাংলা সাহিত্যে নায়িকার শরীর, আঁচল, ব্রেসিয়ার, পেটিকোট ঢুকে গেলো!

 

মাসুদ রানা পড়েই প্রথম জানলাম ‘স্ট্রিপটিজ’, ‘বিকিনি’, ‘ব্রা’, ‘প্যান্টি’, ‘ড্রেসিং গাউন’, ‘ডার্লিং’-এর মতো কতো অজানা জিনিসই পৃথিবীতে আছে। মনে রাখতে হবে, সেটা ইন্টারনেটের যুগ ছিল না। এখন যেমন ব্রাউজার খুললেই চাইলেই বা না চাইলেও কতো পর্ণোগ্রফির ওয়েবসাইট চলে আসে। ছেলেমেয়েরা মায়ের পেট থেকে পড়েই ডেটিং-এ যায়, তখন বাংলাদেশটা অতো দ্রুত ছিল না, অতো গোলও ছিল না। আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে ‘বিকিনি’, ‘ব্রা’, ‘প্যান্টি’ স্রেফ কাপড় আমাদের কাছে তা রহস্যময় যৌন উত্তেজনা।

 

কেবল কিছু যৌন শব্দ নয়, প্রাপ্তবয়স্ক, পরিণত ভাবনার খোরাক দিয়েছে মাসুদ রানা। স্পাই থ্রিলার মানেই পরিণত কাহিনী, প্রাপ্ত বয়স্কদের বিষয়। মদ, জুয়া, অত্যাধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন সবই উঠে এসেছে মাসুদ রানার সিরিজগুলোতে। বিশ্বাসঘাতকতা, গুপ্তহত্যা, মেয়ে পটানো, ছলনা- কী নেই মাসুদ রানাতে।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুন ২০১৬/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়