ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

সায়েন্স ফিকশন || দেজা ভু

দীপু মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪৫, ২৪ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৭:১০, ২৮ আগস্ট ২০২০
সায়েন্স ফিকশন || দেজা ভু

শীতকাল। গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার শীত পড়েছে বেশি। এত বেশি শীত যে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের আবহাওয়া জটিল হয়ে উঠেছে। এখানকার আবহাওয়ার ভাবগতিক ভালো না। এখন অবস্থা শীতল নাকি উত্তপ্ত বোঝা যাচ্ছে না। কনস্টেবল রহমতউল্লাহ পড়ে গেছে বিরাট সংকটে। তার তিনদিনের ছুটি দরকার। স্ত্রী বাড়ি যেতে বলেছে। হঠাৎ কেন বাড়ি যেতে হবে তা বলেনি। তার স্ত্রী কঠিন ধাঁচের মানুষ। ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ না হলে তাকে বাড়ি যেতে বলত না। রহমতউল্লাহর সাহস হয়নি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে- কেন বাড়ি যেতে হবে?

রহমতউল্লাহর বাড়ি যেতে হয় নদী পথে। সড়ক পথে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। যেতে লাগে একদিন। আসতে একদিন। স্ত্রী কেন ডেকেছে সেটা শুনতে লাগবে একদিন। সে ছুটির দরখাস্ত দিয়েছিল। ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। এখন বলছে যাওয়া যাবে না, ছুটি ক্যানসেল।

নিজ ফ্ল্যাটে সাংবাদিক তানজিলা হোসেন খুন হয়েছেন। তার বয়স ৩২ বছর। ফ্ল্যাটে তিনি একা থাকতেন। বিয়ে করেননি। মাঝেমধ্যে বাবা-মা এসে তার সঙ্গে কয়েকদিন থেকে যেতেন। তানজিলা যখন খুন হন তখন ফ্ল্যাটে তিনি একা ছিলেন। কেন তাকে খুন করা হয়েছে সেই রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তানজিলার খুনি সন্দেহে এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অ্যাপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা আছে। খুনের সময়ের আগে ও পরের ফুটেজে দেখা গেছে ঝিরঝিরে অবস্থা। আচমকা ছবি ঝিরঝির করতে শুরু করেছে। এখনো ঝিরঝির করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের আবহাওয়া জটিল হয়ে ওঠার কারণ আছে। মধ্য দুপুরে খুন হয়েছেন সাংবাদিক তানজিলা হোসেন তরুণ। তার লাশ পাওয়া গেছে মরা বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে নির্জন জায়গায়। তানজিলা হোসেন আর রফিকুলকে একই পিস্তল দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুদিন আগে এক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার খুন হয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো খুনের কুলকিনারা করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষজন পুলিশের ব্যর্থতা নিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে। মামলা এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে।
তানজিলা হোসেন যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন সেই অ্যাপার্টমেন্টের সিকিউরিটি গার্ড আর কেয়ারটেকারকে সিআইডি অফিসে নিয়ে আসা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এখানে আসার পর থেকে মনে হচ্ছে দুইজন পানি খাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। তারা ঘন ঘন পানি খাচ্ছে আর টয়লেটে যাচ্ছে পেশাব করতে। ভয়ঙ্কর শীতেও তারা কুলকুল করে ঘামছে। তাদের কপালে, গালে, থুতনিতে ঘাম চিকচিক করছে। সিকিউরিটি গার্ডের নাম উত্তম। বয়স ২০-২২ বছর। শুকনো লিকলিকে শরীর। কেয়ারটেকারের নাম তোজাম্মেল। তার বয়স ৬২ বছর। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি আর মাংস জমে থলথল করছে।

জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে অদ্ভুতভাবে তাদের দুজনের পানি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ড উত্তম বলল, স্যার, আমি এই জায়গায় নতুন। আমার বাড়ি কুড়িগ্রামের বেহুলার চরে। কাকার সঙ্গে ঢাকায় এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিতে ঢুকেছি। যেদিন চাকরিতে ঢুকেছি ঘটনা সেইদিনই ঘটেছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ মুনির, রাদি হাসান আর আঞ্জুমান রশীদ বসে আছে শান্তভাবে। তাদের ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে। কিন্তু তারা অস্থিরতা প্রকাশ করছে না। এদের ভেতর রাদি হাসান আর আঞ্জুমান রশীদ সাহসিকতা আর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক পেয়েছে। সাজ্জাদ মুনির পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ পদক। সাজ্জাদ আর আঞ্জুমান ব্যাচমেট। রাদি এদের চেয়ে দুই ব্যাচ আগের। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এদের ওপর ভরসা রাখে।
শীতল গলায় রাদি বলল, আপনাদের অ্যাপার্টমেন্টে কোনো রেজিস্টার মেইনটেন করা হয় না- এটা দুঃখজনক। কোন ফ্ল্যাটে কে এলো তার কোনো রেকর্ড থাকে না।
উত্তম বলল, স্যার, আমি লেখাপড়া জানি না। বেহুলার চরে লেখাপড়ার খুব বেহাল অবস্থা। একটা মাদ্রাসা আছে। সেখানে আমার যাওয়ার অনুমতি নেই।
রাদি বলল, ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরায় কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। মনিটর ঝিরঝির করছে।
উত্তম বলল, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, স্যার। আমি কোনো ক্যামেরা দেখি নাই।
আঞ্জুমান ঘাড় ঘুরিয়ে তোজাম্মেলের দিকে তাকিয়েছে। তোজাম্মেল মনোযোগ দিয়ে উত্তমের কথা শুনছে। আঞ্জুমান তার দিকে তাকাতে সেও কেন জানি মাথা ঘুরিয়ে এদিকেই তাকিয়েছে। আঞ্জুমান জিজ্ঞেস করল- ঘটনার সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
তোজাম্মেল বলল, ইলেকট্রিক বিল দিতে গিয়েছিলাম। অনেকগুলো ফ্ল্যাটের ইলেক্ট্রিক বিল একসঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি জমা দিয়ে আসি। তানজিলা আপার ইলেক্ট্রিক বিলও ছিল। তিনি নিজে আমাকে দিয়েছেন।
সাজ্জাদ বলল, ঘটনার আগে ও পরে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরের কোনো লোক এসেছিল?
প্রশ্ন কাকে করা হয়েছে তা উত্তম বা তোজাম্মেল বুঝতে পারছে না। সাজ্জাদের চোখে সানগ্লাস। তার চোখ দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে না বলে সে কার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছে সেটা বুঝতে তাদের মুশকিল হচ্ছে।
তোজাম্মেল বলল, আমি ফেরার পর ঘটনা জানাজানি হয়েছে। বাড়ির কাজের বুয়ারা ছাড়া সকাল থেকে বাইরের কেউ অ্যাপার্টমেন্টে আসেনি।
উত্তম বলল, একজন এসেছিল খবরের কাগজ দিতে।
তোজাম্মেল বলল, সে প্রতিদিন আসে।
সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করল, আর কেউ?
উত্তম বলল, এক হুজুর এসেছিল। বলল পাঁচ তলায় যাব। সাহেব নাকি তাকে ডেকেছে।
কত নম্বর ফ্ল্যাটে যাবে জিজ্ঞেস করেছিলে?
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। এখানকার কোনো বাড়ির কাউকে আমি চিনি না। নতুন এসেছি, স্যার।
তোজাম্মেল বলল, তানজিলা আপা থাকত তিনতলার ফ্ল্যাটে। তিনি খুন হয়েছেন তিন তলায়।
সাজ্জাদ বলল, আর কেউ এসেছিল?
উত্তম বলল, এক লোক এসেছিল ডিসের বিল নিতে। সেই লোক আসার প্রায় সাথে সাথেই চলে গেছে।
রাদি জিগ্যেস করল, ঘটনা জানা গেল কীভাবে?
তোজাম্মেল বলল, ইলেক্ট্রিক বিল দিয়ে ফিরে এসে আমি গেছি তানজিলা আপাকে বিলের কপি দিতে। দরজা দিয়ে রক্তের স্রোত বের হয়ে আসছে খেয়াল করিনি। বেলে চাপ দিয়েছি। বেল বাজে। কেউ দরজা খোলে না। আচমকা দেখি পায়ের পাশে রক্ত। তানজিলা ম্যাডামের ফ্ল্যাট থেকে দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে আসছে। আমি অ্যাপার্টমেন্টের সভাপতি আর সেক্রেটারি সাহেবকে খবর দিলাম। তারা পুলিশে খবর দিলো। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে পড়ে আছে তানজিলা আপা। রক্তে তার শরীর ভেসে যাচ্ছে।
দরজা বন্ধ ছিল?
দরজা টেনে বন্ধ করা ছিল। রক্ত দেখে আমি ধাক্কা দিইনি। পুলিশ এসে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলেছে।

মডেল নামে একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে সিআইডি অফিসে। পুলিশ তাকে খুঁজতে গিয়েছিল। নদীর ধারে রফিকুল নামে যার লাশ পাওয়া গেছে তার পকেটে একটা নোটবুক ছিল। নোটবুকে সবশেষ তারিখে মডেলকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা লেখা আছে। মডেল আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবে সেটাও সেখানে উল্লেখ আছে। পুলিশের রেকর্ডে মডেল একজন দাগি আসামি। তার নামে ছিনতাই, গুম, মাদক, ধর্ষণ আর হত্যার অনেকগুলো মামলা আছে। ক্ষমতাবান প্রভাবশালী মানুষজনের সঙ্গে তার সখ্য। সে সব কয়টি মামলায় জামিনে আছে। মডেলকে নিয়ে আসা হয়েছে রফিকুলের কাছ থেকে সে কেন টাকা নিয়েছে সেটা জানতে। তাকে পাশের একটা ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
কনস্টেবল রহমতউল্লাহর ডাক পড়েছে। সে ছুটে এসেছে। তার ধারণা ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে। সন্ধ্যার লঞ্চে বাড়ি যেতে পারবে।
আঞ্জুমান পকেট থেকে টাকা বের করে রহমতউল্লাহর দিকে বাড়িয়ে দিলো। শান্ত গলায় বলল, তাদের শিঙ্গাড়া আর চা খাওয়ার ব্যবস্থা করো।
চুপসে গেছে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ। সে টাকা নিয়ে মন খারাপ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
মডেল উদাস ভঙ্গিতে বসে আসে। তার ভেতর কোনো ভাবান্তর নেই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাঝেমধ্যে সিআইডি অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সিআইডি অফিস তার কাছে পরিচিত জায়গা।
সাজ্জাদ বলল, রফিকুলের কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছিলেন?
মডেল একবার ডান দিকের আর একবার বাম দিকের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ব্যায়াম করার ভঙ্গি করে বলল, কোন রফিকুল?
নদীর ধারে যার লাশ পাওয়া গেছে।
বুঝেছি, বার্মা! সে বার্মা থেকে ইয়াবা নিয়ে এসে এখানে বিক্রি করত। আমাকে এসে বলল, ভাই এই ব্যবসা খারাপ। এই ব্যবসা আর করতাম না। কাঁচা বাজারে সবজি বিক্রি করব। এই কথা বলে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল দেড় লাখ টাকা। তার এক লাখ টাকা শোধ দিয়েছে। আর পঞ্চাশ হাজার টাকা শোধ দেওয়ার আগেই খালাস হয়ে গেল। মানুষের উপকার করতে গিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা লস হলো আমার।
টাকার অঙ্ক মিলে গেছে। মডেলের কাছে এই তিন পুলিশ অফিসারের কারো কিছু জানার নেই। তারা মডেলকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
পাশের ঘরের দরজার সামনে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ আর উত্তম দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তাদের হাতে শিঙ্গাড়া। মডেলকে দেখে উত্তম মুখের ভেতরের শিঙ্গাড়া গিলে নিয়ে বলল, স্যার এই লোক গিয়েছিল ডিসের বিল নিতে।
মডেলকে আবার সিআইডি অফিসের রুমে ঢোকানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে ডাকা হবে এই শর্তে উত্তম আর তোজাম্মেল ফিরে গেছে।
মডেল ঘটনা স্বীকার করেছে। ঘটনা সে একবারে স্বীকার করেনি। তাকে বিশেষ কায়দায় ঘটনা স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে।
মডেল বলল, ওই সাংবাদিক মহিলা তানজিলাকে খুন করার জন্য রফিকুল আমাকে দেড় লাখ টাকায় কন্ট্যাক করে। এক লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার কথা।
আঞ্জুমান বলল, তানজিলা হোসেনকে তাহলে আপনি খুন করেছেন?
মডেল বলল, খুন করতে গিয়েছিলাম। দরজায় বেল বাজালাম। দেখি কেউ দরজা খোলে না। চাপ দিলাম। দরজা খুলে গেল। লোডেড পিস্তল তাক করে ঘরে ঢুকেছি। দেখি দরজার সামনে রক্তের ভেতর মুখ থুবড়ে মহিলা পড়ে আছে। খুন বেশিক্ষণ আগে হয়নি। তখনো রক্ত গড়িয়ে বাইরের দরজার দিকে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে এসেছি। খুন কে করেছে আমি জানি না।
রফিকুল কেন তানজিলা হোসেনকে খুন করতে চাইল?
সে চায় না। সে হচ্ছে দালাল। ধরেন রফিকুল ওই মহিলাকে খুন করার জন্য কন্ট্যাক নিয়েছিল দুই লাখ টাকার। আমাকে দিলো দেড় লাখ টাকা। এক মার্ডারে পঞ্চাশ হাজার টাকা তার রোজগার।
কে তাকে কনট্রাক্ট দিয়েছিল তানজিলা হোসেনকে খুন করার?
সেকথা তাকে জিজ্ঞেস করিনি। আমার কাজ খুন করা, বিনিময়ে টাকা পাই। কে কাকে খুন করতে বলল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আর এখন জানাও যাবে না বার্মা কার কাছ থেকে ওই মহিলাকে মার্ডারের কন্ট্যাক নিয়েছিল। বার্মা নিজেই তো খরচ হয়ে গেছে।
মডেলকে তানজিলা হোসেন হত্যা মামলার সন্দেহজনক আসামি হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

২.
সাজ্জাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কনস্টেবল রহমতউল্লাহ দাঁড়িয়ে আছে। সে কখন ঘরে ঢুকেছে খেয়াল করেনি।
সাজ্জাদ বলল, কমিশনার স্যার বলেছেন এখন কাউকে ছুটি না দিতে। আমরা তো ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছি। কমিশনার স্যার না করলে কী করা যাবে?
আঞ্জুমান বলল, তুমি কি চাইছ যে আমরা তোমার ছুটির ব্যাপারে স্যারের কাছে সুপারিশ করি? আমার মনে হয় তোমার যদি অতি জরুরি কাজ থাকে তুমি চলে যাও। স্যার জিজ্ঞেস করলে পরে আমরা ম্যানেজ করে নেব।
রহমতউল্লাহ বলল, ছুটি লাগবে না। বৌকে বলেছি জটিল অবস্থায় আছি। ওদিকে কী হয়েছে তা বৌ সামাল দেবে বলেছে। আমাকে বলেছে এদিককার জটিল অবস্থা সামাল দিতে।
আঞ্জুমান বলল, তাহলে তো প্রবলেম সলভড। তুমি ডিউটি করো।
রহমতউল্লাহ বলল, সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের ল্যাপটপটা খুঁজে বের করা দরকার।
রাদি বলল, নিশ্চয় সেটা খোঁজা হবে।
রহমতউল্লাহ বলল, সাংবাদিক তানজিলা খুন হওয়ার আগে নওরিন ফার্মার ওপর একটা রিপোর্ট করেছেন। ধারাবাহিক রিপোর্টের প্রথম কিস্তি প্রকাশের পরেই তিনি খুন হয়েছেন।
রাদি বলল, রিপোর্ট আমরাও দেখেছি। সেখানে নওরিন ফার্মায় কী কী ওষুধ তৈরি হয় সেই কথা লেখা আছে।
পরের রিপোর্টে হয়তো সেসব ওষুধের ভেজাল কারবারের কথা ছিল।
নওরিন ফার্মা কার ওষুধ কোম্পানি জানো?
জি স্যার, দেওয়ান হাবীব সাহেবের। উনার মেয়ের নাম নওরিন। আমেরিকায় থাকে। প্রথম বিয়ে টেকে নাই। দ্বিতীয় বরের সঙ্গে আমেরিকায় বসবাস করছে।
তুমি এসব জেনেছ কীভাবে?
দেওয়ান সাহেবের ঘনিষ্ঠজন হচ্ছে আলম। আমাদের গ্রামে তার বাড়ি। গত দশ বছর সে বাড়িতে যায় নাই। গ্রামে তার মা ভিক্ষা করে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খায়। বাপ-মায়ের সে একটায় ছেলে। বাপ মারা গেছে। ঢাকা শহরে আলমের দুটো অ্যাপার্টমেন্ট আছে। জমি কিনে বানানো বাড়ি। এত টাকা সে পায় কোথায়?
তুমি তার এত খবর জানো কেমন করে?
আমার সঙ্গে জানাশোনা আছে। খারাপ লোক পুলিশের সঙ্গে খাতির রাখে। সে খারাপ লোক। তানজিলা ম্যাডাম দেওয়ান হাবীব সাহেবের ওষুধ কোম্পানি নিয়ে লিখেছে। তিনি নিশ্চয় দেওয়ান হাবীব সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলার একমাত্র চ্যানেল হচ্ছে আলম। আমার ধারণা আলমের কাছে খবর আছে।
রাদি অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, পুলিশ তানজিলা হোসেনের ল্যাপটপ জমা দেয়নি।
রহমতউল্লাহ বলল, সিআইডি সেখানে গেছে পরে। প্রথমে গেছে পুলিশ। তারা লাশের ছবি তুলেছে। ছবি আমি দেখেছি স্যার। ফ্ল্যাটের বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকে ড্রয়িংরুম। সেখানে দেয়ালের সঙ্গে লাগানো সোফা। সোফার রং সবুজ। ছবিতে দেখবেন স্যার সবুজ সোফার ওপর ল্যাপটপে চার্জ দেওয়ার তার আছে। তারের মাথায় ল্যাপটপ নেই।
রাদি, আঞ্জুমান আর সাজ্জাদ একসঙ্গে চমকে উঠেছে। তারা পরস্পর নিজেদের ভেতর দৃষ্টি বিনিময় করল। ছবি তারাও দেখেছে। এই কথা তাদের মাথায় আসেনি।   
রহমতউল্লাহ তখনো বলে যাচ্ছে, তানজিলা ম্যাডাম হয়তো ল্যাপটপ চার্জে দিয়ে সেখানে বসে কাজ করছিলেন। বেল বাজলে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই তিনি খুন হয়েছেন। যে খুন করতে এসেছিল সে ল্যাপটপ নিয়ে চলে গেছে। ল্যাপটপের ভেতর আছে তানজিলা ম্যাডামের পরের লেখাগুলো। ল্যাপটপ এখন সবচেয়ে বেশি দরকার দেওয়ান হাবীব সাহেবের। তার নওরিন ফার্মা নিয়ে পত্রিকায় ধারাবাহিক খবর বেরুতে শুরু করেছে।
রাদি বলল, পত্রিকা বলেছে দেশীয় ওষুধ কোম্পানি নিয়ে তারা ধারাবাহিক রিপোর্ট করছে। নওরিন ফার্মার রিপোর্ট এখানেই শেষ।
রহমতউল্লাহ বলল, নওরিন ফার্মার বানানো প্যারাসিটামল ওষুধ খেয়ে ৪০জন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাদের ছয়জন মারা গেছে।
রাদি বলল, পরে তো জানা গেল নওরিন ফার্মার প্যারাসিটামলে কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল অন্যকিছুতে।
রহমতউল্লাহ বিড়বিড় করে বলল, টাকা দিলে স্যার সব সমস্যাই কাটানো যায়। বার্থ সার্টিফিকেটে পিতার নামও বদলে দেওয়া যেতে পারে।
সাজ্জাদ বলল, হুট করে দেওয়ান হাবীব সাহেবকে কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। তিনি উল্টো আমাদের ঝামেলায় ফেলে দিতে পারেন।
আঞ্জুমান বলল, ছাই উড়িয়ে দেখা যাক। আলমকে দিয়ে শুরু করি। থ্যাংক ইউ রহমতউল্লাহ। তোমাকে ধন্যবাদ।

৩.
আলমের ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। চোখমুখ গম্ভীর। মনে মনে ভেবে নিচ্ছে তাকে কী প্রশ্ন করা হতে পারে। সে তার কী উত্তর দেবে।
আলম বসে আছে সিআইডি সদর দপ্তরে। তার সামনে বসে আছে সিআইডির তিনজন অফিসার। আঞ্জুমান, রাদি আর সাজ্জাদ। আলম এখানে এসে কনস্টেবল রহমতউল্লাহর খোঁজ করেছিল। তাকে বলা হয়েছে রহমতউল্লাহ ছুটিতে গেছে। রহমতউল্লাহ ছুটিতে যায়নি। সে রহমতউল্লাহর সঙ্গে এখন দেখা করতে চাচ্ছে না।
আঞ্জুমান বলল, আপনি কী করেন?
আলম বলল, আমার একটা রেস্টুরেন্ট আছে চায়নিজ আর থাই খাবারের।
রেস্টুরেন্ট কোথায়?
ফার্মগেট আর কারওয়ান বাজারের মাঝামাঝি। রেস্টুরেন্টের নাম দিলশাদ।
দিলশাদ কার নাম?
দিলশাদ মানে হচ্ছে এখানকার খাবারের স্বাদ দিলে লেগে যাবে। দিলশাদ কারো নাম না।
রাদি বলল, খবরের কাগজে নওরিন ফার্মার রিপোর্ট দেখলেন। তারপর দেওয়ান হাবীব সাহেবের সঙ্গে এই রিপোর্ট নিয়ে আপনার কী কথা হয়েছে?
আলম বলল, তিনি রিপোর্ট পড়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। বললেন, বাহ্ মেয়েটি তো বেশ লিখেছে।
সাজ্জাদ উঠে আচমকা চটাস করে আলমের কানের নিচে থাপ্পড় মেরেছে। তাল সামলাতে না পেরে চেয়ার নিয়ে আলম মেঝতে ঝুঁকে পড়ে গেল।  
এই পর্যায়ে আলমের ওপর টর্চার শুরু হয়েছে। টর্চার শুরু করেছে সাজ্জাদ। আলম সহজে মুখ খোলেনি। তাকে বিশেষ ইঞ্জেকশন দিতে হয়েছে। এই ইঞ্জেকশনের রি-অ্যাকশন ভয়াবহ। তাকে যা বলা হয় সে তাই দেখে। আপনজনদের নির্মমভাবে হত্যা করার দৃশ্য মনে হয় চোখের সামনে ঘটছে।
আলমের দুই চোখ ফুলে আছে। ঠোঁটের কোণায় কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। আলম ক্ষীণ স্বরে বলল, স্যারকে বললাম এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা ওষুধের। সব কয়টি ওষুধে ভেজাল আছে। নওরিন ফার্মার ওষুধ চলে মোড়কে আর ডাক্তার, রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়ে। বছরে তাদের মোটা টাকার গিফট দেওয়া হয়। রিপোর্ট বের হলে শুধু নওরিন ফার্মা বন্ধ হবে না। নওরিন ফার্মার সাথে জড়িত সবাইকে জেল খাটতে হবে।
সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করল, দেওয়ান হাবীব সাহেব কী বললেন?
আলম বলল, তিনি বললেন, তুমি যাও। আমি চলে এলাম।
দ্বিতীয় দফায় টর্চার শুরু হলো। তাতে নতুন কিছু জানা গেল না। আলমকে বলা হলো সিআইডি অফিসের এই ঘটনা সে যেন দেওয়ান হাবীব বা অন্য কাউকে না জানায়। যদি জানায় তাহলে তাকে কোনো একদিন কালো মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। তুলে নিয়ে গিয়ে বালুর মাঠে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।
আলম ঘটনা কাউকে জানাবে না বলেছে। তাকে একটা সানগ্লাস দেওয়া হয়েছে। সানগ্লাস পরলে চোখের ফোলা কম দেখা যাচ্ছে। সানগ্লাস পরে আলম সিআইডি অফিস থেকে বের হয়ে গেল।

৪.
চা দেওয়া হয়েছে। দুধ চিনি দিয়ে বানানো ঘন চা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সদর দপ্তরের একটা ঘরে তিন অফিসার বসে আছে। সাজ্জাদ চায়ে চুমুক দিয়েছে। রাদি আর আঞ্জুমানের চায়ের ওপর খয়েরি সর পড়েছে। তারা দুজন চায়ে চুমুক দেয়নি।
রাদির দিকে তাকিয়ে আঞ্জুমান বলল, ধরুন আপনি কোনো একটা নদীর ধারে বেড়াতে গেছেন। আগে সেখানে কখনো যাননি। সেই প্রথম। সুনসান চারপাশ। নদীর ধারে বটগাছ। গাছ থেকে ঝুরি নেমে এসেছে। বটের ঝুরি পানি ছুঁইছুঁই করছে। নদীর ওপর দিয়ে শীতল বাতাস বয়ে আসছে। আপনার ভীষণ ভালো লাগছে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ১০/১১ বছর বয়সের এক কন্যা। তার মাথায় লালচে ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল। গায়ে লাল জামা। অবাক হয়ে আপনাকে দেখছে। আপনার মনে হতে পারে এখানে আপনি আগেও এসেছেন। সেদিনও ঠিক এরকম একজন কিশোরী এসে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আপনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা অসম্ভব। কারণ আপনি এর আগে কোনোদিন এমন কোথাও যাননি। এই ঝুরিনামা বটগাছ। এই নদী আপনার কাছে সবটায় নতুন।
উত্তেজনা দেখা দিয়েছে রাদির ভেতর। সে বলল, আমি যখন সুদানের দার্ফুরে মিশনে ছিলাম। তখন মাঝমধ্যে এরকম ঘটনা ঘটত। রাস্তার ধারের কোনো রেস্তোরাঁয় হয়তো খেতে গেছি। একজন এসে বলল, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার মনে হতো এইখানে, এর আগে এরকম রাস্তার ধারে জমজমাট একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁয় ঠিক এভাবেই একজন এসে আমাকে বলেছে, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? এটা অসম্ভব। আগে আমি কখনো দার্ফুরে যাইনি। দার্ফুরে কি সুদানেই যাইনি। অথচ মনে হলো এই ঘটনা আগেও ঘটেছে। এরকম কোনো রেস্তোরাঁয় ঘটেছে। কিংবা ধরো যে আমাকে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি’ তার সঙ্গে আগে কখনো দেখা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ আমার মনে হলো হয়েছে। আমার মনে হলো এরপর কী কী ঘটনা ঘটবে তা যেন আমার জানা। কী অদ্ভুত একটা অনুভূতি বলো।

আঞ্জুমান বলল, বিজ্ঞানীরা বলেন, এর নাম দেজা ভু। এটা ফরাসি শব্দ। যার অর্থ হলো অলরেডি সিন বা ইতোমধ্যে দেখা। এটা এমন এক অতিপ্রাকৃতিক অনুভূতি, যাতে আপনার মনে হবে এখনকার এই দৃশ্য আপনি আগেও দেখেছেন বা এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে আপনার জীবনে। অথচ আপনি নিশ্চিত যে এমনটা হতে পারে না। ১০০ জনের ভেতর ৬০ থেকে ৮০ জন মানুষের জীবনে এমন ঘটনা কখনো না কখনো ঘটেছে।
সাজ্জাদের চা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সে আর চায়ের কাপে চুমুক দেয়নি। মনোযোগ দিয়ে আঞ্জুমানের কথা শুনছিল। সাজ্জাদ বলল, এর সঙ্গে আমাদের কেসের কী সম্পর্ক?
আঞ্জুমান বলল, দেওয়ান হাবীব গুরুতরভাবে সন্দেহের তালিকায় আছেন। এর আগেও বেশ কয়েকটা খুন আর গুমের সঙ্গে তার নাম এসেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে সেগুলো প্রমাণ করা যায়নি। শুনেছি খুন আর গুমের ঘটনায় তিনি নিজে সরাসরি জড়িত থাকেন। তার ভেতর সিনেমাটিক হিরোইজম কাজ করে। নিজে হাতে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে সেটা চাপা দিয়ে তিনি বিকৃত উল্লাস বোধ করেন।
রাদি বলল, তোমার প্ল্যানটা কি শুনতে পারি?
আঞ্জুমান বলল, খবর নিয়েছি দেওয়ান হাবীব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সেদিন রাতে যেদিন মার্ডার দুটো হয়েছে। এখনো তিনি হাসপাতালেই আছেন।
সাজ্জাদ বলল, কী করতে চাইছ?
আঞ্জুমান বলল, ওই হাসপাতালে ডাক্তার শরিফ আছেন। তিনি এপিলেপসিতে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে দেজা ভু প্রয়োগ করেছেন। আমি পড়াশোনা করে এবং ডাক্তার শরিফের কাজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যতদূর জেনেছি মস্তিষ্কের টেমপোরাল লোবের রাইনাল কর্টেক্সে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে এটা করা হয়ে থাকে। ধারণা করা হয়, এই এলাকা নিউরনের বৈদ্যুতিক ডিসচার্জের অস্বাভাবিকতাই দেজা ভুর জন্য দায়ী।
সাজ্জাদ বলল, তুমি ফার্মেসিতে পড়ছ। তুমি যত পরিষ্কারভাবে ঘটনাটা বুঝবে আমরা বুঝব না।
রাদি বলল, দেজা ভু বুঝেছি। এখন কী করতে হবে তাই বলো।
আঞ্জুমান বলল, দেওয়ান হাবীবের মস্তিষ্কে ইলেকট্রিক চার্জ দিয়ে তার দেজা ভু করাতে হবে। সেটার স্থায়ীত্ব নির্ধারণ করতে হবে। দেওয়ান হাবীব সাহেব থাকবেন দেজা ভু অবস্থায়। তার মস্তিষ্ক সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলবে। আলম তাকে গিয়ে বলবে, ‘স্যার এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে।’ যা যা সে বলেছিল সেদিন। তারপর আমরা দেখব দেওয়ান হাবীব কী করেন।
সাজ্জাদ বলল, যদি তিনি কিছু না করেন? তার সাথে যদি এই খুন সম্পর্কিত না হয়?
আঞ্জুমান বলল, বিজ্ঞানের একটা বিশাল উপকার হবে। মৃগীরোগীর বাইরে সাধারণ মানুষের ওপর দেজা ভুর প্রভাব দেখতে পারবে।
সাজ্জাদ বলল, ডাক্তার শরিফ যদি রাজি না হন?
আঞ্জুমান বলল, ডাক্তার শরিফ কমিশনার স্যারের পরিচিত। তার সাহায্য লাগবে। আমি ম্যানেজ করব। পরে দরকার হবে ডিআইজি স্যারকে। দেওয়ান হাবীব আর আমাদের ডিআইজি আকরাম স্যার একই ক্যাডেট কলেজে এক ক্লাসে পড়াশোনা করেছেন। তারা দুজন বন্ধু।

৫.
ডাক্তার শরিফ রোগীর অনুমতি ছাড়া তার মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক ইলেকট্রিক স্টিমুলেশন দিয়ে দেজা ভু করতে রাজি হলেন না। ডিআইজি বললেন, আপনি পেপার রেডি করুন। আমি অনুমতি নিয়ে আসছি।
ডাক্তার শরিফ কাগজপত্র তৈরি করলেন। দেওয়ান হাবীবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এলেন ডিআইজি আকরাম।
দেওয়ান হাবীবের মস্তিষ্কে টেমপোরাল লোবের রাইনাল কর্টেক্সে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে দেজা ভু করানো হলো। এই দেজা ভুর স্থায়ীত্ব হবে ৭২ ঘণ্টা। হাসপাতাল তাকে ছুটি দিয়েছে। দেওয়ান হাবীবকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে।

৬.
দেওয়ান হাবীব বসে আছেন নিজ বাড়ির ড্রয়িংরুমে। তার পরনে ট্রাউজার। গায়ে টি-শার্ট। বাড়িতে তিনি একা আছেন। স্ত্রী এবং দুই কন্যা থাকে দেশের বাইরে। তারা মাঝেমধ্যে দেশে আসে। মাঝেমধ্যে দেওয়ান হাবীব স্ত্রী-কন্যাদের কাছে যান।
আলম এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের মাঝখানে। তার হাতে খবরের কাগজ। আলমের চোখমুখ শুকনো। দেওয়ান হাবীব মুখ তুলে আলমের দিকে তাকালেন। সিআইডি অফিসার যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেইভাবে আলম আগে বলা কথাগুলো বলে গেল, স্যার এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। তার কাছে নওরিন ফার্মার সব খবর আছে। সে ওষুধের কাঁচামালের স্যাম্পল নিয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা ওষুধের। সব কয়টি ওষুধে ভেজাল আছে। নওরিন ফার্মার ওষুধ চলে মোড়কে আর ডাক্তার, রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়ে। বছরে তাদের মোটা টাকার গিফট দেওয়া হয়। রিপোর্ট বের হলে শুধু নওরিন ফার্মা বন্ধ হবে না। নওরিন ফার্মার সাথে জড়িত সবাইকে জেল খাটতে হবে।
দেওয়ান হাবীব শীতল গলায় বললেন, তুমি যাও।
আলম মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে এলো।

সাজ্জাদ, রাদি আর আঞ্জুমান অপেক্ষা করছে দেওয়ান হাবীবের জন্য। তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে কোনদিকে যান সেটা তারা দেখতে চায়। একঘণ্টা আগে আলমকে তার কাছে পাঠানো হয়েছে। দেওয়ান হাবীব এখনো বাড়ি থেকে বের হননি। আলমের পকেটে মাইক্রোফোন দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে কী বলে তা যাতে শোনা যায়। আলম বাড়তি কোনো কথা বলেনি। সে দেওয়ান হাবীব সাহেবের ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন আছে বাড়ির ছাদের ওপর। তাকে সেখানে থাকতে বলা হয়েছে। সিআইডির তিন অফিসার আলমকে নজরের ভেতর রেখেছে।
তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর দেওয়ান হাবীব সাহেবের বাড়ি থেকে কালো কাচে ঢাকা একটা গাড়ি বের হলো। দেওয়ান হাবীব সাহেব সচরাচর এ গাড়িতে চড়েন না। এটা অন্য গাড়ি।
দেওয়ান হাবীব সাহেবের বাড়ির বাইরে অনেকটা দূরে দুই প্লাটুন পুলিশ আছে। এক প্লাটুন পুলিশ সেখানে থেকে গেল। আর এক প্লাটুন পুলিশ সিআইডি অফিসারদের সঙ্গে দেওয়ান হাবীব সাহেবের বাড়ি থেকে বেরুনো গাড়ি ফলো করে এগুতে থাকল।

সাংবাদিক তানজিলা হোসেনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেশ খানিকটা দূরে রাস্তার পাশে এসে দেওয়ান হাবীব সাহেবের বাড়ি থেকে বেরুনো সেই গাড়ি থেমেছে। গাড়ি থেকে নামলেন গায়ে চাদর জড়ানো, লম্বা জোব্বা পরা এক হুজুর। তার মাথায় বেশ বড়ো পাগড়ি। পাগড়ির সামনে গাঢ় সবুজ পাথর। পান্না হতে পারে বা ক্রিস্টাল। বেশ উজ্জ¦ল।
হুজুর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলেন। সিকিউরিটি গার্ড উত্তম দাঁড়িয়ে আছে গেটে। তাকে অস্থির দেখাচ্ছে। সিআইডি অফিসার তাকে বলে দিয়েছে সেই হুজুর আবার এলে তার সঙ্গে আগের মতোই আচরণ করতে হবে। উত্তম আগে কী আচরণ করেছিল তার মনে পড়েছে না। হুজুরকে দেখে সে সালাম দিয়েছিল কি না মনে নেই। এবার সালাম দেবে নাকি বুঝতে পারছে না। তার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
হুজুর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে বললেন, পাঁচ তলায় যাব। সাহেব আমাকে আসতে বলেছে।
উত্তম কিছু বলল না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। হুজুর লিফট দিয়ে ওপরে চলে গেলেন।
তানজিলা হোসেনের ফ্ল্যাটে এসে হুজুর ডোর বেল বাজালেন। তিনি দেয়ালের দিকে একটু সরে গেলেন যেন তাকে পিপ হোল দিয়ে দেখা না যায়। ভেতর থেকে নারী কণ্ঠ শোনা গেল, কে?
হুজুর বললেন, পেপারের বিল নিতে এসেছি।
দরজা খুলে গেছে।
হুজুর সামনে এগিয়ে গিয়ে তানজিলা হোসেনকে দেখলেন। এক হাত বাড়িয়ে তাকে জোরে ধাক্কা দিয়েছেন। তানজিলা উল্টে মেঝেতে পড়ে গেছেন। হুজুর তখন পা দিয়ে দরজা বন্ধ করে চাদরের নিচ থেকে সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল বের করেছেন। পরপর দুবার গুলি করেছেন তানজিলাকে। তানজিলা পড়ে আছেন মেঝেতে।
ঘরের চারদিকে তাকালেন হুজুর। খেয়াল করলেন না ঘরের ভেতর সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। তাতে পুরো ঘটনা রেকর্ড হচ্ছে। তিনি দেখলেন না মেঝেতে মানুষের একটা ডামি পড়ে আছে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে না। ড্রয়িংরুমের পাশে আড়ালে সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন সিআইডি কর্মকর্তা। তাদের ভেতর দুজন নারী। ডোর বেল বাজার পর এদের একজন ভেতর থেকে বলেছিল, কে?
হুজুর বাম দিকে তাকিয়ে দেখেন সোফার ওপর খোলা ল্যাপটপ। তিনি ক্যাবল থেকে ল্যাপটপ খুলে চাদরের নিচে নিয়ে নিলেন। পিস্তল গুঁজে রাখলেন কোমরে। দরজার দিকে ঘুরতেই দেখেন তিনজন সিআইডি অফিসার তার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি পেছনে তাকালেন। পেছনে আরো কয়েকজন অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো।
হুজুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাদি এগিয়ে গিয়ে তার কোমর থেকে পিস্তল নিয়ে নিলো। সাজ্জাদ নিয়েছে ল্যাপটপ। এই ল্যাপটপ অফিস থেকে আনা হয়েছে।
আঞ্জুমান এগিয়ে এসে বলল, আমি কি আপনার দাড়ি খুলে নিতে পারি?
হুজুর কিছু বললেন না। আঞ্জুমান হুজুরের মুখ থেকে নকল দাড়ি আর পাগড়ি খুলে নিলো। হুজুরের ছদ্মবেশ থেকে বেরিয়ে এলেন দেওয়ান হাবীব।
রাদি বলল, আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
দেওয়ান হাবীব কিছু বললেন না। তিনি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকলেন।

৭.
ডিআইজি আকরাম বললেন, হাবীব বরাবরই চঞ্চল প্রকৃতির। ওর ডাক নাম ‘রিন্টু’। আমরা সেই নামেই ওকে ডাকতাম। অপরাধপ্রবণতা ছিল ওর ভেতর। তবে রিন্টুর একটা ব্যাপার ছিল। কোনো অপরাধ করলে ছটফট করত। কাউকে বলতে চাইত। আমাদের ক্যাডেট কলেজের বাউন্ডারির বাইরে গাঁজা চাষ হতো। রিন্টুর উদ্যোগে সেই গাঁজা চাষ করা হয়েছিল। একদিন সেই গাঁজা বাগানে একজনকে পাওয়া গেল অজ্ঞান অবস্থায়। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। রাতে দেখি রিন্টু বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। তার পরদিন আমাদের ম্যাথ ক্লাসটেস্ট ছিল। বললাম, আগামীকাল ম্যাথের ক্লাসটেস্ট। অনুশীলনী সাত আরেকবার ভালো করে দেখে নে।
রিন্টু হাই তুলে বলল, ঘুম পাচ্ছে খুব।
তারপর উঠে পানি খেয়েছে। আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তখনো সে খুব ছটফট করছিল।
আমি বললাম, এবার কী করেছিস, মার্ডার?
রিন্টু বলল, হ্যাঁ। লোকটা গাঁজার সবগুলো জট খুলে নিয়েছে। খবর পেয়ে আমি গেলাম। দেখি অন্ধকারে তখনো সে গাছ থেকে গাঁজার জট ছাড়াচ্ছে। আমাকে দেখেনি। পেছন থেকে পাকা বাঁশ দিয়ে লোকটার মাথায় জোরে বাড়ি দিয়েছি। লোকটা ঠাস করে পড়ে মরে গেছে।
বললাম, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সে মরেনি। বেঁচে আছে।
রিন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
আঞ্জুমান বলল, স্যার আমরা ঠিক এটাই করতে চাই। এখানে ক্যাডেট কলেজ হোস্টেলের আপনাদের সেই রুম বানানো হবে। ঘটনা ঘটবে রাতে। আপনি তাকে জিগ্যেস করবেন, এবার কী করেছিস, মার্ডার?
সাজ্জাদ আর রাদি একসঙ্গে বলল, দেজা ভু।
তাদের মুখ হাসিহাসি। আঞ্জুমান বলল, ঘরে ক্যামেরা বসানো থাকবে। পুরো ঘটনা সাউন্ডসহ ভিডিও হবে। আমরা বাইরে থেকে মনিটরে দেখব। আশা করি আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।

৮.
দেওয়ান হাবীবের মনে হলো সে শুয়ে আছে তার ছোটবেলার ক্যাডেট কলেজের রুমে। আকরাম পাশের টেবিলে আলো জ্বালিয়ে পড়ছে। ঠিক এরকম ঘটনা তার জীবনে আগে ঘটেছে।
আকরাম বললেন, শুয়ে পড়লি? আগামীকাল ম্যাথের ক্লাসটেস্ট। অনুশীলনী সাত আরেকবার ভালো করে দেখে নে।
দেওয়ান হাবীব মুখ বিরাট হা করে হাই তুলে বললেন, ঘুম পাচ্ছে খুব।
তিনি উঠে পানি খেলেন। আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ছটফট করছেন।
আকরাম বললেন, এবার কী করেছিস, মার্ডার?
দেওয়ান হাবীব বিছানায় উঠে স্থির হয়ে বসলেন। তার চোখমুখ ফ্যাকাসে। রাদি তাকিয়েছে আঞ্জুমানের দিকে। আঞ্জুমান তখনই রাদির দিকে তাকিয়েছে। সাজ্জাদ বলল, দেজা ভু!
দেওয়ান হাবীব বললেন, আমার মানি এক্সচেঞ্জের দোকান আছে। সেটা দেখত ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন। কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়া থেকে এক লোককে দিয়ে ২ কেজি সোনা আনালাম। সেই লোক সোনা পৌঁছে দিলো বিমানের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার ওমর ফারুকের কাছে। সোনাসহ ওমর ফারুক ধরা পড়ে গেল। সিআইডি মামলা তদন্ত করছিল। সিআইডির কাছে ওমর ফারুক ঘটনা ফাঁস করে দিলো। আমার মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার আড়ালে সোনা চোরাচালানের কথা সিআইডি জেনে গেল। গত পাঁচ বছর ধরে ঘটনা ঘটছে। টাকার বিনিময়ে সোনার চালান বিমানবন্দর পার করে আনোয়ার হোসেনের হাতে তুলে দিত এই কথা ওমর ফারুক বলে দিলো। সিআইডি তখন আনোয়ারকে খুঁজছে। আনোয়ার ধরা পড়া মানে আমি ধরা পড়ে যাওয়া। আনোয়ার ধরা পড়ার আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। এক রাতে তাকে রাস্তার মাঝখানে হাত-পা আর মুখ বেঁধে ফেলে দিলাম। আনোয়ার তখন গোঙাচ্ছিল। আমি তার গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিলাম। সে মারা গেলে তার শরীর আর মুখ থেকে বাঁধন খুলে নেওয়া হয়েছে। গভীর রাতে আনোয়ারের রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার খবর জানা গেল পরদিন সকালে।  
সাজ্জাদ আর রাদি একসঙ্গে বলল, দেজা ভু!
আকরাম বললেন, রফিকুলকে মারলি কেন?
দেওয়ান হাবীব বললেন, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বিরাট চালান এসেছিল। সেই চালান থেকে রফিকুল নিজে বড় ব্যবসা করতে চেয়েছিল। সে আমার সঙ্গে বেইমানি করেছে। ওদের রেষারেষিতে ধরা পড়ে গেল ইয়াবার চালান। পুলিশ তখন রফিকুলকে খুঁজছে। তানজিলাকে মার্ডার করার জন্য লোক ঠিক করেছিল রফিকুল। আমার সব খবর তার কাছে। রাতে রফিকুল দেখা করতে এলো আমার সঙ্গে। বলল ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর সে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। ঘটনা কতদূর গড়িয়েছে খোঁজ করার চেষ্টা করছিল। পুলিশ যাতে তাকে ট্র্যাক করতে না পারে সেজন্য মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমার কাছে এসেছে শেল্টার নিতে। রফিকুলকে বললাম, খুব গরম। চলো নদীর ধারে যাই। শীতল বাতাসে মাথা ঠান্ডা করে কথা বলি। এখন কাজ করতে হবে ভেবেচিন্তে। রফিকুল আমার সাথে গেল। মরা বুড়িগঙ্গার ধারে জনমানবহীন এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাকে গুলি করে মারলাম। গুলির শব্দ হয়নি। পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো ছিল।
আকরাম বললেন, তানজিলা হোসেনকে খুন করার জন্য রফিকুলকে দিয়ে তুই লোক ভাড়া করিয়েছিলি। তাহলে রিন্টু, তুই নিজে কেন গেলি তানজিলাকে খুন করতে?

দেওয়ান হাবীব ঢকঢক করে পানি খেলেন। তাকে অত্যধিক শান্ত ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার ভীষণ ঘুম পেয়েছে। তিনি বললেন, রফিকুল টাকা আর তানজিলার বাসার ঠিকানা নিয়ে চলে গেল। সে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর ইয়াবার চালান ধরা পড়ার খবর পেলাম। রফিকুলকে ফোন করি। দেখি তার ফোন বন্ধ। বারবার ফোন করলাম। প্রতিবার তার ফোন বন্ধ পেলাম। আমার মনে হলো গ্রেপ্তার এড়াতে সে বর্ডার পার হয়ে চলে যাচ্ছে। বর্ডারে সেরকম ব্যবস্থা করা আছে। আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। একদিকে ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে, অন্যদিকে তানজিলাকে মারার ব্যাপারে রফিকুল কী ব্যবস্থা নিয়েছে কিছুই জানা যাচ্ছে না। সবকিছু আমার কাছে অসহ্য বোধ হতে লাগল। আমার মনে হলো তানজিলাকে দ্রুত শেষ করে দেওয়া দরকার। সে বেঁচে থাকলে নওরিন ফার্মার রিপোর্ট প্রকাশ হবেই। পেপারে না হোক অন্য কোথাও। মানুষ হত্যা করার ভেতর আনন্দ আছে। হত্যা করে কোনো নিশানা না রাখা। কেউ ধরতে পারবে না। এই আনন্দ আমি সব সময় নিতে চেয়েছি। এরকম হত্যা করতে গিয়ে আগেও ছদ্মবেশ নিয়েছি। ভালোই লাগে। অন্যের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার ভেতর সুখ আছে। অন্যকে বোকা বানানোর সুখ। এবার হুজুর সাজলাম। মাথায় পাগড়িতে হাই রেজলেশন ম্যাগনেট লাগালাম। দেখলে মনে হয় খাঁজকাঁটা সবুজ পান্না। সেটা আসলে ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে। যেকোনো ক্যামেরার সামনে গেলে ক্যামেরা অকেজো হয়ে যায়। ছবি ঝিরঝির করে। তখন আর আমাকে দেখা যায় না। নিজেকে আড়াল করার এটা একটা আধুনিক পদ্ধতি। তানজিলাকে পরপর দুটো গুলি করেছি। মারা যাওয়ার আগে সে ওয়াক করে উঠেছিল। মনে হলো আমাকে থুতু দিচ্ছে। মেয়েটা কিছুই করতে পারল না। সে মরে গেল।
দেওয়ান হাবীব আর কিছু বললেন না। লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ঘুমে তার চোখ বুজে আসছে। পায়ের কাছ থেকে গায়ের ওপর চাদর টেনে নিলেন। বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।
ডিআইজি আকরাম উঠে পড়লেন। তিনি দেওয়ান হাবীবের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার কপালে আলতো করে হাত রাখলেন। দরজায় পায়ের শব্দ হয়েছে। ডিআইজি আকরাম দরজার দিকে তাকালেন। দেখলেন সিআইডি অফিসার তিনজন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বললেন, রিন্টু ঘুমাচ্ছে।

পুনশ্চ: এই ঘটনার আড়াই বছর পর হত্যা মামলায় মাননীয় আদালত দেওয়ান হাবীবকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায় ঘোষণার ছয় মাস পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ান হাবীবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়