RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

আমাদের মনের মিত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

উৎপল দত্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৩৬, ১১ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৯, ১১ নভেম্বর ২০২০
আমাদের মনের মিত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

এই মুখচোরা হেমন্তের অপরাহ্নে রোদও যখন গুটিয়ে নিয়েছে তার কৃপণ উষ্ণতার বিছানো চাদর, তখন মন ভারী করতে তেড়েফুঁড়ে আসে বেতাল বেহালার বিষাদ। কে ওই বেহালা বাজায়? খেয়াতরী অবেলায় দুলে দুলে কোন পারে যায়! এপার-ওপার করে যে খেয়াতরী, সেখানে উঠে গেলেন সৌমিত্র। সবার মনের মিত্র, মননের মিত্র- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একজন অভিনেতা, বাচিক শিল্পী ও লেখক-সম্পাদক, নাট্যকর্মী এবং ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতিকর্মী। এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে কিছু লেখা সংবেদনশীল। খেয়াতরী একবার এপারে আসুক- এই আর্তি, আকুতি সবার মনে। মন খারাপের মেঘ ছড়িয়ে গেছে সবখানে। মনের বিত্ত যাদের একটু বেশি, মেঘ সেখানে আরও ঘনীভূত।

সত্যজিৎ রায় লিজিয়ন অফ অনার পাওয়ার ঠিক ত্রিশ বছর পর তার প্রিয় এবং নিয়মিত অভিনেতা একই পুরস্কার পান ২০১৭ সালে। এর মধ্যে একটি পরম্পরাগত যোগসূত্র অনুসন্ধান করা যেতে পারে। এখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লিজেন্ড হয়ে ওঠার চাবির ছড়াটি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

‘I am happy and it is a great honour I got the letter from the French Embassy yesterday and they said they will be coming over here to give me the award I communicated to them that will be decided on a mutually convenient date.'

গতকাল ফরাসি দূতাবাস থেকে চিঠি পেলাম, বড় সম্মান পেয়ে আমি খুশি। চিঠিতে ওরা বলেছে, উভয়পক্ষের সুবিধামতো তারিখে তারা এখানে আসবে এবং পুরস্কারটি আমার হাতে তুলে দেবে। লিজিয়ন ডি’অনার পেয়ে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে এরকমই বলেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 

সত্যজিৎ রায়ের পরিবার থেকে বলা হয়েছিল, ‘আমরা গতকাল সংবাদটি পেয়েছি। আমাদের জন্য এটা গর্বের, একই সম্মান তিনি পেতে যাচ্ছেন বাবার (সত্যজিৎ রায়) ত্রিশ বছর পর।’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের টুইট- ‘কাকু সত্যি তুমি আমাদের অনুপ্রেরণা। প্রণাম। রায়ের পর তুমিই দ্বিতীয় সম্মানীত ব্যক্তি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে।’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টুইট- ‘আপনি ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের হলমার্ক।’ ডিরেক্টর অতনু ঘোষ তার টুইট বার্তায় বলেছিলেন, ‘আপনার সাথে কাজ ও সাহচার্যের প্রশ্নে আমরাও সম্মানীত। লিজিয়ন অব অনার পাওয়ার জন্য লিভিং লিজেন্ডকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।’ উল্লেখ্য, পরিচালক অতনু ঘোষের একাধিক চলচ্চিত্রে সৌমিত্র অভিনয় করেন।

কালজয়ী চরিত্র ফেলুদার ভূমিকায় সৌমিত্র

উপমহাদেশের একটি রেস্তোরাঁর গল্প খুব মধুর, স্মৃতি-মেদুর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। তার গল্পগাছ কমবেশি সবাই জানে। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস বাংলা সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার ও বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সংলগ্ন ও সমাদৃত। সঙ্গীতেও উঠে এসেছে তার আবেদন- এ কথা কারও অজনা নয়। অনেক আনন্দ-বেদনার কাহিনি আছে, জনশ্রুতিও আছে এই কফি হাউস নিয়ে। একটি বিশেষ কাহিনি চমকিত করে! জনশ্রুতি বা সত্য কাহিনি কিনা জানা নেই, তবুও প্রাসঙ্গিক এবং পরম আনন্দের খোরাক আছে বলেই কাহিনির অল্প-স্বল্প বিবরণ দেওয়া যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সংযোগ রয়েছে এই কাহিনির সঙ্গে। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের একটি কেবিনকে বলা হতো ‘হাউস অব লর্ডস’। সেখানে আড্ডায় বসতেন সত্যজিৎ রায়, কমল কুমার মজুমাদারসহ আরও কয়েকজন যারা শিল্প-সাহিত্য, কলা-কৈবল্যে অশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন পরবর্তী কালে। কী নিয়ে কেবিনে আলোচনা হতো, ঠিক মাথায় আসতো না কারও। কফি হাউসের কয়েকজন তাই রসিকতা করে ওই কেবিনের এমন নাম দিয়েছিলেন। তাদের রসিকতা সত্যি হয়েছিল। নিজ নিজ ক্ষেত্রে লর্ড-এর মতোই কাজ করে গেছেন তারা। সৌমিত্র তরুণ তখন। হাউস অব লর্ডস-এ তিনিও ঢুঁ মারতেন। কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে পড়ে থাকবো এই কাহিনি। আজ আর তার তথ্যসূত্র মনে নেই। সত্যজিৎ রায় তখন ‘পথের পাঁচালি’র কাজ শুরু করেননি। কমল কুমার মজুমদারও সুহাসিনীর পমেটম লেখেননি।

‘তুমি এপার-ওপার করো কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে’- রবীন্দ্রনাথের এই গানে সহজিয়া কথা-সুর ও মরমীবাদের স্পর্শ  মনকে মেঘের মতোই আচ্ছন্ন করে। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে কাজ করার সময় তিনি লালনের ভাবধারায় সূচি-স্নান করে ওঠেন। সেই শিলাইদহের অদূরে সৌমিত্রের জন্ম। মাটির আলাদা ঘ্রাণ থাকে, ভিন্ন ভাষা ও টান থাকে। এই সাদৃশ্য উপেক্ষা করা যায় না। মননশীলতা গড়ে ওঠা বা মননের রূপান্তরের প্রশ্নে তার ভূমিকা থাকতে পারে। ব্যক্তি-মননের স্বাতন্ত্র্য, বলিষ্ঠতা ও একাগ্রতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মাটির এই টান কাজ করে কিনা কে জানে। না হলে এক পর্যায়ে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায় আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়- তিন প্রজন্মের তিন পুরুষ একই সূত্র ও স্রোতে আসেন কী করে!

সবার জানা কথা, রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল থেকেছেন। সত্যজিৎ রায়ও তাই। একই সাদৃশ্য, সঙ্গতি ও সংলগ্নতা পাওয়া যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও। তিনটি প্রজন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পূর্বসুরীদের তিনি কী শিল্পের সিঁড়িতে সতর্ক পা ফেলেই অনুসরণ করছিলেন! ১৯৩৫ সালে জন্ম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। বেলভিউ হাসপাতালে যাওয়ার আগে ছুটি নেওয়া দূরের কথা, কাজে বিরাম নেন নি। কোভিডের থাবা একটু গুটিয়ে আসতেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বায়োপিক ‘অভিযান’-এর শ্যুটিং করতে। তখনই আক্রান্ত হলেন তিনি।

মনে পড়ে, বাইপাস সার্জারি করার পর দেশে ফিরে উড়োজাহাজের সিঁড়ি থেকেই বিমানবন্দরে অপেক্ষমান উদ্বিগ্ন আবেগাপ্লুত জনতাকে তিনি হাত তুলে জানিয়ে ছিলেন- ‘আই অ্যাম ওকে’। তার সেই স্মার্ট ইংরেজি উচ্চারণ ও দেহ ভঙ্গিমায়। তারপর শরীরের স্পন্দন যখন একটু কমে আসে, অপরাহ্ন এখন, বেলা পড়ে গেছে হয়তো টের পান তিনি। চিকিৎসক যথাসম্ভব বিশ্রাম নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। এ সময় সত্যজিৎ রায় কিন্তু ভিন্ন কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। কাজ থেকে তিনি রিটায়্যার করেন নি। চিত্রনাট্য তৈরি করার জন্য এমন কাহিনি বেছে নিলেন যার জন্য বিচ্ছিন্ন লোকেশনে ছুটোছুটি করে গলদঘর্ম হতে হয় না। স্বাস্থ্যের ওপার চাপ কমে। ‘গণশত্রু’ তার উদাহরণ। দর্শক হেনরিক ইবসেনকে পেয়ে যান। হেনরিক ইবসেনের ‘এনিমি অব দ্য পিউপল’ থেকে গণশত্রুর চিত্রনাট্য তৈরি করেন তিনি। লোকেশনের ঝক্কি-ঝামেলার পরিবর্তে অল্প আয়াসে সেটভিত্তিক কাজ করেছেন। অথচ মেসেজ ও নির্মাণশৈলীতে আপোস করেননি।

সত্যজিৎ-সৌমিত্র: পরিচালক অভিনেতার এমন জুটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কমই আছে

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ডেব্যু ফিল্ম সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলোজির তৃতীয় ও শেষ পর্ব ‘অপুর সংসার’। সৌমদর্শন, সুকণ্ঠ ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে এই অভিনেতা শুরু থেকে শুধু সৌরভই ছড়িয়েছেন মানুষের মনে। এরপর ছয় দশক ধরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয়ে তার অবস্থান উপযোগিতা ও শৈলীর ধারাবাহিকতা যেভাবে ধরে রেখেছেন তা আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময় জাগায়। দিনবদলের সঙ্গে নিজের উপযোগিতা ও উৎকর্ষ অপরিবর্তিত রাখা আরেকটি বিস্ময়। ‘অপুর সংসার’ থেকে ‘সাঁঝবাতি’- এই সময়ের মধ্যে শুধু প্রযুক্তি নয়, বদলে গেছে পরম্পরা, সংস্কৃতি, দর্শকের রুচিবোধ। অথচ সৌমিত্র আছেন সব পরিবর্তনের নুড়ি-পাথরকে সাক্ষী করে। নিজেকে ক্রমাগত বদলে নিয়েছেন তার শিল্পসত্তা অক্ষত রেখেই- কম কথা নয় তো! এও তো এক বিস্ময়!

ট্রিলজির তৃতীয় ও শেষ পর্ব ‘অপুর সংসার’-এ সত্যজিৎ-এর সঙ্গে সৌমিত্রর সংযোগ। বলা যায়, সত্যজিৎ-এর সঙ্গে তার ডেব্যু, শুধু চলচ্চিত্র নয় শিল্পযাত্রার পথে। তারপর রায়ের পরিচালিত ১৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। অনেককেই বেছে নিয়েছেন সত্যজিৎ রায় তার চলচ্চিত্রে। বাণিজ্যিক বা সিরিয়াস ছবির অভিনেতা কেউ বাদ পড়েন নি। তারপরও সৌমিত্রের উপস্থিতি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের বেশির ভাগ আয়তন দখল করে আছে। ‘ফেলুদা’ চরিত্রটি সৌমিত্রকে ছাড়া সত্যজিৎ রায় কল্পনাও করতে পারতেন না। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার এই দীর্ঘ সহযাত্রা ও সাহচার্য বিবেচনায় এসে যায়। গ্রেট ডিরেক্টরের পছন্দের ও নিয়মিত অভিনেতা হয়ে ওঠেন সৌমিত্র। সৌমিত্রকে এভাবেও মূল্যায়ন করা যায়।

গত শতকের ষাটের দশকের দারিদ্র্য-পীড়িত মধ্যবিত্তের মন, জীবনযুদ্ধ ও আখ্যান আর একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সাঁঝবাতির কথকতা তো এক নয়। ব্যবধান বিস্তর। প্রযুক্তির ব্যবধান, সংস্কৃতির ব্যবধান, আর্থ-সামাজিক রীতি-প্রথার বড় ব্যবধান। কোনো সাঁকো নেই। অথচ এই সাঁকোবিহীন ধারাবাহিকতায় সৌমিত্র রহস্যময় যোগসূত্র রচনা করে আছেন। এ যেন মেঠোপথ থেকে রাজপথ তারপর উড়াল পথে সওয়ার হওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প । সব পথেই তার একই সচ্ছন্দ গতি;  হোঁচট নেই! লিভিং লিজেন্ড কথাটি আর উচ্চারণ করে প্রতিষ্ঠা করতে হয় না। সময়ই প্রতিষ্ঠা করেছে তাকে এবং সময়ের গাছপাথর তিনি।

চরিত্রকে দ্রুত আত্মস্থ করার সহজাত প্রবণতা সৌমিত্রের আছে। তার অসংখ্য ফ্যানদের একথা অজনা নয়। অনেক সময় মনে হতে পারে তিনি আসলে অভিনয় করছেন। না। চিত্রনাট্যের পরিবেশ ও সহচরিত্রের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া বা ভূমিকার প্রকৃত আদলটি কী হবে তিনি অনায়াসে উপলব্ধি করতে পারতেন। তার জেশ্চার বা সংলাপ উচ্চারণ ও মুখভঙ্গি বা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন থেকে তাই পাওয়া যায়। দেখেশুনে মনে হতেই পারে, যেন ফিকশন নয় ডক্যুমেন্টেশন বা ডক্যুফিকশন দেখছি। চরিত্র কাহিনির অনিবার্য প্রয়োজনেই আসে এবং তা কাহিনির প্রবহমানতা ও পরিণতি দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। সীমা অতিক্রম করলে চরিত্র চিত্রণের মূল আবেদন থেকে অভিনেতা বিচ্যুত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাই শধু চরিত্রকে বোঝা যথেষ্ট নয়। চরিত্রের সঙ্গে সংলগ্ন হওয়া ছাড়াও, কাহিনিতে চরিত্রের যোগসূত্রটি কী ও কোথায়, সে সম্পর্কে একটি মৌল ধারণা ও সম্পৃক্তি ছাড়া সফল অভিনয় সম্ভব নয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই অধরা অথচ অনিবার্য কৌশলটি রপ্ত করেছিলেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। প্রফেশনাল বলতে যা বোঝায়, শুরু বা ডেব্যু পর্ব  থেকে তাকে একই রকম সংহত ও স্বাভাবিক পাওয়া যায় সম্ভবত এ কারণেই।

চরিত্র দ্রুত আত্মস্থ করার সহজাত প্রবণতা সৌমিত্রের আছে

এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এই বয়সেও এতো এনার্জি পান কীভাবে? ‘এনার্জি-টেনার্জি কিছু না, ওটাই তো আমার কাজ।’- এই ছিলো সৌমিত্রের সরল উত্তর। আপাত সরল। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে তলানিতে অনেক কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা বারবার প্রফেশনালিজমের কথা বলি। অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা এক সময় প্রফেশনালিজম তৈরি করে। পরিপক্বতা অর্জনের জন্য সময় খরচের বিকল্প নেই। দেখ, শেখ, চর্চা করো এবং অর্জন করো। এ পর্যন্ত ভেবেই আমরা আশ্বস্ত হই; ইতি টানি। বিষয়টিকে সময়ের ওপর ছেড়ে দেই। সময়ে গড়ে উঠবে বা পরিপক্বতা আসবে। এই সরল সমীকরণটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে পুরোপুরি যায় না। প্রফেশনালিজম বা পেশাদারিত্ব সৌমিত্রের গোড়া থেকেই ছিলো। প্রস্তুতিপর্বটি তিনি আগেই সেরে নিয়েছেন। নাহলে অপু ট্রিলজির তৃতীয় পর্বে সত্যজিৎ-এর নির্বাচন ও অভিনয়ে অতো সহজে তিনি উতরে যেতে পারতেন না। অনায়াসলব্ধ দক্ষতায় তিনি কাজটি সম্পন্ন করেন পরিচালকের মনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় সৌমিত্রকে পরিচয় করে দেওয়ার সময় নিরাবেগে একটি কথাই বলেছেন- ও সৌমিত্র আমার অপুর সংসারের অপু।

সহজাত প্রবণতা যে কোনো শিল্পীর একটি বাড়তি পাওনা। কিন্তু ক্রমাগত অনুশীলন ও অনুরাগ না থাকলে তা অঙ্কুরে বিনষ্ট হতে পারে। সৌমিত্রের বাড়তি পাওনা, তার শুরুর দিকের পরিবেশ ও পরিচালক যারা তার মেধাকে বুঝতে পেরেছেন। সৌমিত্রও গোড়াতেই শিখে গেছেন- কাজাটি কী করে করতে হয়। অডিয়েন্সের কাছে তা পেশাদারিত্ব ও নন্দনতত্বের মোড়কে পৌঁছে দেওয়া যায়। ভিত্তিভূমিটি আগেই তার মানসলোকে শিলালিপি হয়ে গেছে। বাকিটা ছিলো সামনে অগ্রসর হওয়ার পর্যায়। সেই অগ্রযাত্রায় বৃত্ত বা পরিধি থেকে পা কখনও হড়কে যায়নি তার।

ভোকাল আর্ট বা বাচিক শিল্পও তার সহজাত। শুধু তার ওপর নির্ভর করেই স্থিত থাকেননি তিনি। পর্যায়ক্রমিক অনুশীলনে খুব দ্রুত তা চৌকষ করে তুলেছেন। ফলে কণ্ঠ মাধুর্য শুধু নয়, কবিতা অস্থি-কাঠামো, ভাবাদর্শ আবেগের উত্থান-পতনসহ তার কণ্ঠে ধরা দেয়। প্রতিটি সৃজনশিল্পীর একটি প্রস্তুতি পর্ব থাকে। সৌমিত্র এই প্রস্তুতি পর্বটি সম্পূর্ণ করেছেন অত্যন্ত দ্রুততায়। কালক্ষেপণ করেননি। পাশে ছিলো বিদগ্ধ পূর্বসুরী, তাদের ডাকে ও সংস্পর্শ নিজেকে শানিয়ে নিয়েছেন। ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কী পাও’ তার কণ্ঠ থেকে যখন উচ্চারিত হয়, তখন তা সম্পূর্ণ আলাদা। কণ্ঠ মাধুর্য নয় শুধু, কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রযুক্ত আবেগ ও দর্শন নিয়ে তা বাজে দর্শকের কানে। আবৃত্তি তখন কবিতার ভাবসম্পদকে অক্ষুণ্ন রেখে তা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বকীয় শোনায়। আবৃত্তি শুধু কণ্ঠশৈলী বা সুমিষ্ট ভরাট কণ্ঠের বিষয় নয়। কবিতা কবির ভাবাদর্শ নিয়ে নতুন করে বাচিক শিল্পীর কণ্ঠে অনূদিত হতে পারে। ভোকাল বা কণ্ঠস্বরকে তিনি অযথা মড্যুলেশন করেননি। ইমোশনাল ম্যাপিং বা আবেগের বিস্তারকেও তিনি পরিমিতিবোধের চাবুক দিয়ে সংহত রেখেছেন। আবৃত্তি শোনার সময় একজন মননশীল শ্রোতা সুললিত ভরাট কণ্ঠের হেলদোল শুনতে চাইবেন না। কবিতার নির্যাস খুঁজে বেড়াবেন। কবিতাকে বাচিক শিল্পীর কণ্ঠে নতুন করে বুঝতে চাইবেন। সৌমিত্রের স্বকীয়তা এখানেই। কণ্ঠের ওঠা-পড়া ও আবেগ প্রক্ষেপনের পরিমিতিবোধ তাকে স্বতন্ত্র করেছে।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলা যায়। পারিবারিক ও কর্মসূত্রে আমি তখন কলকাতায়। দেরি করে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ লিকার চা হাতে নিয়ে ‘আনন্দবাজার’ পড়ছি। দেখি রিপোর্ট- সৌমিত্রের বাসায় চুরি। রিপোর্ট পড়ে মাথায় এলো, শাড়ি-গহনা কী চুরি হলো, সম্পদ কতোটা খোয়া গেল তা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। বাসভবনে চোর ঢুকেছিল, আইনি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে তিনি চটজলদি শ্যুটিংয়ে বেরিয়ে গেলেন। সময় নষ্ট করার সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ শ্যুটিং। সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি জানার আগ্রহও নেই। ইচ্ছে হয়েছিল তার সঙ্গে দেখা করার। অত বড় মাপের অভিনেতা! ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ কথাটা তার সঙ্গেই যায়। তার জীবনযাপনের ধরন কী? কাজ নিয়ে কী ভাবেন? কাজ আর প্রতিদিনের জীবনকে কীভাবে মিলিয়ে দেখেন? জানতে চেয়েছিলঅম। হয়ে ওঠেনি। ইচ্ছেপূরণ হয়নি। অল্পকাল পরই আমাকে দেশে ফিরতে হয়।

সতর্কতা মেনেই কাজে ফিরেছিলেন। এখন হাসপাতালে। লক্ষ প্রাণের প্রার্থনা পুনরায় কাজে ফিরবেন সৌমিত্র 

অভিনয়ে ছয় দশকের যাত্রাপথ। পদ্মভূষণ পেয়েছিলেন আগেই ২০০৪ সালে। দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার, ভারতীয় চলচ্চিত্রে সবচেয়ে সম্মানজনক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পুরস্কারটি সৌমিত্র পেয়েছিলেন ২০১২ সালে। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে বঙ্গভূষণ পুরস্কার দিলেও ২০১৩ সালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আজ স্বীকৃতি, পুরস্কার পেছনে পড়ে গেছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কী পুরস্কার পেলেন, কী পেলেন না, তা নিয়ে কেউ খুব খানাতল্লাশি করেন না। সবাই দেখেন তার কাজ। এই কাজেই আনত বা সন্নিহিত থেকেছেন তিনি আজ পর্যন্ত। আর কাজই হয়ে উঠেছে তার পরিচয়, পুরস্কার, অলঙ্কার বা মাথার মুকুট। অভিনয়ের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের জন্য তিনি প্রকৃত প্রস্তাবেই একটি লাইট হাউস বা বাতিঘর।

৬ অক্টোবর করোনা পজিটিভ নিয়ে বেলভিউ হাসপাতালে আসেন সৌমিত্র। করোনা নেগেটিভ হওয়ার পরও বার্ধক্যজনিত মর্বিডিটির কারণে একের পর এক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন তিনি। চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন না। চিকিৎসকদের কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আশার বাণী পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, উপমহাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ফিরে আসুন সৌমিত্র। খেয়াতরী কিছুকাল এপারে থাক। তার কণ্ঠস্বর, যাত্রাপথ আমরা আরো কিছুকাল প্রত্যক্ষ করি। কালের যাত্রার ধ্বনি কী- আমরা জানি। সৌমিত্রও জানেন। তাই ‘শেষের কবিতা’র প্রকৃত আবেগ ধরা পড়েছে তারই কণ্ঠে। এও পরিহাস! কালের যাত্রার ধ্বনি আমাদের কানে আজ অন্য অর্থে বাজে। আর মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি অমোঘ সত্য উচ্চারণ, ‘... তোমার হাতে নেই ভুবনের ভার।’  আজ এ কথাই মনে পড়ে বারবার। আমাদের হাতে নেই ভুবনের ভার।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়