RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৯ ১৪২৭ ||  ০৮ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিদায় গ্যালিলিও

ড. তানভীর আহমেদ সিডনী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৫৭, ২৮ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৩:১৪, ২৮ নভেম্বর ২০২০
বিদায় গ্যালিলিও

মঞ্চে গ্যালিলিও চরিত্রে আলী যাকের

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ২৭ বছরের এক তরুণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ সংগ্রহের জন্য বেনাপোল থেকে যশোরের দিকে হাঁটছিলেন। নিজ দেশের মাটিতে পা রেখে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজছিলেন বাঙালির জয়ের খবর। এমন সময় একটি জিপ তাঁর পাশ দিয়ে যায়। জিপে থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাঁকে চিৎকার করে বললেন, ‘ইউ আর ফ্রি’। চমকে যান তিনি- এও কি সত্য! তাঁর ভিনদেশে থাকা তবে সমাপ্ত হলো। এই মাটির জন্যই তো লড়েছেন তিনি। শুনেই আত্মহারা হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। আহা! প্রিয় জন্মভূমির মাটি।

এই মাটিতেই ২৭ নভেম্বর ২০২০ তারিখে সমাহিত হলেন সেই মানুষটি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে আলী যাকের নামে পরিচিতি এক অসামান্য অভিনেতা, শব্দসৈনিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সংগঠক। বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্দোলনের পুরোধা এই মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে সব ছাপিয়ে এদেশের মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি ছিল অভিনেতা হিসেবে। যারা টেলিভিশনে তাঁর অভিনয় দেখেছেন, তারা অভিনেতা আলী যাকেরকে স্মরণে রেখেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাটক পুনঃপ্রচারের সূত্রে তাঁর অভিনয় দেখার অভিজ্ঞতাকে ঝালিয়ে নিয়েছেন অনেকে।

থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর যোগ সন্ধান করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি ছাত্রজীবনে প্রায়ই তিনি কলকাতা যেতেন। কলকাতায় তাঁর নাটকপ্রেমী খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে নাটক দেখতে যেতেন। নাটকের সঙ্গে তাঁর যোগ হয় দর্শক হিসেবে। যদিও পুরনো ঢাকায় থাকার সুবাদে সেখানকার পূজার নাটক দেখার সুযোগ হয়েছিল আলী যাকেরের। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সে সময় মা অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘসময় থাকতে হয়েছিল কলকাতা। সে সময় তিনি বেশ কিছু নাটক দেখেছেন সে অভিজ্ঞতার কথা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: ‘১৯৬৪ সালে। তখন বহুরূপীর অনেক নাটক আমি দেখেছি। ইডিপাস, রক্তকরবী, চারঅধ্যায়, রাজা- মানে ঐ সময়ে যা যা করেছে, প্রায় সবই আমি দেখেছি। আর উৎপল দত্তের নাটক দেখতাম- অঙ্গার, কল্লোল এগুলো তো সাংঘাতিক লেগেছিল, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখেছি।’

নাটক দেখতে দেখতেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। চাকরিসূত্রে কিছু সময় করাচিতে ছিলেন, সেখানকার থিয়েটারও মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। সেখানে অভিনয় করেছেন, তবে সেটাকে তিনি অভিনয় বা থিয়েটারের সাথে যুক্ত থাকা মনে করেননি। স্বাধীনতার পর যখন দেশে ফিরে এলেন তখন নতুন স্বপ্ন তাঁর মনে। সে স্বপ্নের সূত্রে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে অভিনয় করলেন। নির্দেশনা দিলেন মামুনুর রশীদ। নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। থিয়েটারের প্রতি তাঁর গভীর আবেগ দেখি ‘নাগরিক’ প্রতিষ্ঠিত হলে। সে দলে যোগ দেন। অবশ্য তার আগে প্রথম নাটকের নির্দেশক মামুনুর রশীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সে সময়ে ‘আরণ্যক’ নিয়মিত কাজ করছে না। কিন্তু তাঁর ভেতরে নাটক করার ক্ষুধা, তাই নাগরিকে যোগ দিলেন। এখানে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’-তে অভিনয় করেন। মঞ্চের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল গভীর। ১৫টি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন। অভিনয়সূত্রে দেড় হাজার বারের বেশি মঞ্চে দর্শক তাঁকে দেখেছেন। সে কারণে অন্য মাধ্যমে খ্যাতি এলেও মনোযোগ রেখেছেন মঞ্চে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সিনেমায় অভিনয়ে সময় দেননি।
দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চায় ভূমিকা রাখার কারণে বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিহাসে তাঁর নাম অনিবার্য থাকবে। বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সে নাটকটি দর্শক দর্শনীর বিনিময়ে দেখেছেন। তারপর শিল্পের সাধনায় নিরত ছিলেন। বাংলাদেশের মঞ্চে অভিনয়ের ইতিহাসে আলী যাকের অভিনীত নুরুলদীন, দেওয়ান গাজী এবং গ্যালিলিও এর চরিত্র দর্শকের মনে বেঁচে থাকবে অভিনয়ের গুণে। যারা তাঁর ‘গ্যালিলিও’ দেখেছেন তারা সন্দেহ ছাড়াই বলবেন যে, তিনি যখন মঞ্চে অভিনয় করতেন তখন দর্শক ব্রেখটের গ্যালিলিও নয়, আলী যাকেরের গ্যালিলিওকে দেখতো।

তিনি বলছেন, ‘দুর্ভাগা সে দেশ, যেখানে শুধু বীরেরই প্রয়োজন হয়।’ বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বাঁকে আমরা দেখেছি হত্যা আর ষড়যন্ত্র সঙ্গী ছিল। আর ছিল আদর্শ থেকে সরে যাওয়া। তিনি জার্মান এই বিজ্ঞানীর চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে এই সংকটকেই তুলে ধরেছেন। বাবার বদলির চাকরির কারণে পুরো দেশ দেখার সুযোগ হয়েছে। ফলে তাঁর চরিত্রে বাংলাদেশের মুখ নির্মিত হবে তাই তো স্বাভাবিক। গ্যালিলিও আর আরজ আলী এক হয়ে যাবে তার অভিনয়গুণে। তাঁর জীবনের অপ্রাপ্তির কথা বলেছেন শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়র’ চরিত্রে অভিনয় করতে না পারা। না, তিনি শেষ পর্যন্ত কিং লিয়র চরিত্রে অভিনয় করতে পারেননি। তাহলে হয়তো আমরা বাঙালির কিং লিয়রকে দেখতে পেতাম।

আলী যাকের অভিনীত নাটক থেকে একথা বলা যায়, তিনি বাচিকাভিনয়ে যত্নবান ছিলেন। মহিলা সমিতি মিলনায়তনে তাঁর অভিনীত নাটকে উচ্চারণ ও স্বরের ওঠানামার কারণে দর্শক ঘটনার সঙ্গে লীন হয়ে যেতেন। তিনি বলেছেন যে, গ্যালিলিও নাটকটি তাঁর পরিচয়। গির্জা বনাম গ্যালিলিওর দ্বন্দ্বকে ধ্রুপদী মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলেন জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট। সে নাটকটি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চে নিয়ে আসে সামরিক শাসনামলে। যখন দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে। আর অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান মসজিদসমূহে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানুষের চিন্তায় আঘাত হানে এই নাটক, যারা দর্শক হিসেবে গিয়েছেন তাদের মস্তিষ্কে কাজ করেছে এই প্রযোজনা। গ্যালিলিও তাঁর সময়ে বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে লড়াই করেছে। আবার একই সঙ্গে ক্ষমতার রূপকেও চিত্রায়িত করেছে নাটকটি। ব্রেখটের সে ভাবনাকে নিয়েই আলী যাকের এই প্রযোজনায় অভিনয় করেন।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ২০১৮ সালে আবার নাটকটি মঞ্চে নিয়ে আসে। কর্কট রোগে আক্রান্ত যাকের অভিনয় করেন। যারা নাটকের সঙ্গে যুক্ত তারা নিশ্চয়ই জানেন, একটি নাটকের মহড়ায় কতটা শ্রম দিতে হয় অভিনেতাকে। মহড়াকক্ষে তাঁর বিশ্রামের সুযোগ ও সময় কম থাকে। অসুস্থ এ অভিনেতা শ্রম দিয়েছেন চরিত্র নির্মাণের প্রয়োজনে, কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিয়েছেন। এমনই অভিনয় অন্তঃপ্রাণ ছিলেন আলী যাকের। নাট্যনির্দেশনা, রূপান্তরের ক্ষেত্রেও তাঁর মেধার পরিচয় পেয়েছে বাংলাদেশের থিয়েটার। তিনি আপন মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগ করেছিলেন বাংলাদেশের নাট্যচর্চায়। এদেশের থিয়েটার আজ প্রাণ সন্ধান করছে। যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতার পর গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। সে বিষয়েও আলী যাকের তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন:

‘থিয়েটার কিন্তু একটা মেধা সংক্রান্ত ব্যাপার। দর্শককে থিয়েটারে আসতে হবে নিজের জীবন দেখতেই কেবল নয়, জীবন কেমন হওয়া উচিত এবং অন্যদের জীবন কেমন- এ সব কিছু নিয়ে তাকে ভাববার প্রস্তুতি থাকতে হবে। আর মিডিয়াগত কারণেই মঞ্চের প্রেজেন্টেশন এক রকম আর টেলিভিশনের এক রকম। দু’জায়গায় একই জিনিস চাইলে বিপদ আছে। যেমন আশির দশকে আমাদের থিয়েটারে একটা ধ্বস নেমেছিল। নামার কারণটা হচ্ছে, অকিঞ্চিৎকর কিছু নাট্যজন ভেবেছিল যে টেলিভিশনে যা করা হয় সেটা যদি স্টেজে তুলে ধরা যায় তাহলে দর্শক ভিড় করবে। কিন্তু ব্যাপারটা ফেল করেছে। এদিকেও হয়নি, ওদিকেও হয়নি।’

তাঁর কথার সঙ্গে একমত হয়েই বলা যায়, বাংলাদেশের থিয়েটার দর্শক হারিয়েছে, হারিয়েছে তাঁর শিল্প নির্মাণের শক্তি। সে কারণেই নিরীক্ষায় মুক্তি খুঁজেছে। আমাদের থিয়েটারের শক্তি সন্ধানে তাঁর পথকে গ্রহণ করা যায়। তাই বলা যায়, আমাদের থিয়েটারের স্বর্ণদিন ফিরবে আমাদের প্রয়াসে। যদিও আলী যাকেরকে বলছি ‘বিদায় গ্যালিলিও’ কিন্তু মনে চলছে আপনার পথ যেন ধরতে পারি।

লেখক: নাট্যকার

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়