Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ০১ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ১৬ ১৪২৭ ||  ১৫ রজব ১৪৪২

ডিসেম্বর ও কাদালেপা মাইক্রোবাস

জাহীদ রেজা নূর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৩১, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৩৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০
ডিসেম্বর ও কাদালেপা মাইক্রোবাস

শহীদ, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন

মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলারে লুকানো মুখগুলো পরস্পরের দিকে তাকায়। না, কারো মুখ চেনা যাবে না। নিশ্চিন্ত হয়ে এবার তারা লাফ দিয়ে উঠে পড়ে কাদালেপা মাইক্রোবাসে। ডিসেম্বরের শীতের রাতে সে মাইক্রোবাস এগিয়ে চলে শান্তিনগরের চামেলীবাগের পথে।

এই ভূখণ্ড তখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময় অতিক্রম করছে। বিমান হামলা, অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখছে মানুষ। বিমানের সাইরেনের পর আতঙ্কিত মানুষ ঢুকে যাচ্ছে মাটিতে খোড়া ট্রেঞ্চে। বিমান চলে গেলে বেরিয়ে আসছে ফের। আর প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করছে সবচেয়ে বড় সংবাদের— স্বাধীনতার।

সিরাজুদ্দীন হোসেন তখন ইত্তেফাকের বার্তা ও নির্বাহী সম্পাদক। ‘এতদিনে’ শিরোনামে তিনি একটি সম্পাদকীয় লিখেছেন। সংবাদ এসেছে: ঘটমান নৃশংসতা যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়, আন্তর্জাতিক বিষয়, এ কথা নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতদিনে বুঝেছে। যে যুদ্ধের সময়টিতে লাখ লাখ মানুষ নিহত হচ্ছে, অথচ মার্কিনীরা যাকে আমলেই নেয়নি এতদিন ধরে—সিরাজুদ্দীন হোসেনের লেখায় ছিল সেই শ্লেষ।

এর আগেও সিরাজুদ্দীন হোসেন কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংবাদ করায় জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ সিরাজুদ্দীন হোসেনকে সতর্ক করে দিয়েছে, দিয়েছে হত্যার হুমকি। কিন্তু সিরাজুদ্দীন হোসেন লিখেই গেছেন ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’, ‘অধূনা রাজনীতির এক অধ্যায়’, ‘থোর বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’সহ অসংখ্য প্রতিবেদন।

চামেলীবাগের বাড়িতে সেদিন সিরাজুদ্দীনের এক বোনও এসে উঠেছেন ছেলে–মেয়েদের নিয়ে। তাঁরা থাকতেন তেজগাঁয়ে, কিন্তু বিমানবন্দরের পাশে মুহুর্মুহু বোমা হামলা আর যুদ্ধ বিমান চলাচলে দিশেহারা হয়ে তিনি এসেছেন ভাইয়ের আশ্রয়ে। সিআইডির এক চেনা ভদ্রলোক এসে সিরাজকে বললেন, ‘আপনার এখানে থাকা নিরাপদ নয়, কয়েকদিন গা–ঢাকা দিয়ে থাকুন।’ এত বড় সংসার রেখে, বোনকে বিপদে ফেলে কোথায় যাবেন সিরাজ? তিনি হয়তো ভাবলেন, যা হবার তা তো হবেই। স্বাধীনতার সুবাস পাওয়া যাচ্ছে চতুর্দিকে। এ সময় কার এত সাহস হবে তাঁকে হত্যা করার? তাই থেকে গেলেন নিজের বাড়িতেই। অন্য দিনের মতো বিছানায় এলিয়ে দিলেন সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীর।

সিরাজুদ্দীন হোসেনের কোলে লেখক জাহীদ রেজা নূর


সেই যে কাদালেপা মাইক্রোবাস, সেটি তখন এগিয়ে আসছিল এই বাড়ির দিকে। ৫ নং চামেলীবাগের একতলা বাড়িটা ছিল তিনভাগে বিভক্ত। বাড়িওয়ালা ডা. শামসুল হুদা থাকতেন বাঁ দিকেরটায়, মাঝের ফ্ল্যাটে থাকতেন অরেকটি পরিবার আর ডান দিকেরটায় সিরাজুদ্দীন হোসেন। ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টার দিকে হঠাৎ ডানদিকের বাড়ির দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো। ড্রইংরুমে ছিলেন সিরাজের মেজ ছেলে শাহীন, পঞ্চম সন্তান সেলিম, বাড়িওয়ালার শ্যালক লুলু এবং ফরিদপুরের গ্রাম থেকে আসা মান্নান নামে এক কিশোর। ভয়ে ভয়ে দরজা খোলার পর দেখা গেল, পাশের দরজায় একটা কুকুর বসে আছে। সিরাজুদ্দীন হোসেন হেসে বললেন, ‘একটা কুকুরকে আমরা এতটা ভয় পেলাম!’

এরপর সবাই ঘুমাতে গেলে রাত তিনটার দিকে আবার করাঘাত। এবার এত জোরে যে মনে হলো, দরজা ভেঙে ফেলবে।
হতভম্ব শাহীন জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’
অস্ফূটে শোনা গেল ডা. শামসুল হুদার কণ্ঠ- ‘শাহীন, দরজা খোলো।’
শাহীন ভাবল, রাতে হয়তো ডাক্তার সাহেব কাউকে জরুরি ফোন করবেন। তাই দরজা খুলে দিলো। আর তখনই বেয়োনেটের মুখে ডাক্তার সাহেব, তাঁর দুই ছেলে ও আর এক শ্যালককে নিয়ে ঘরে ঢুকল মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলারে মুখ ঢাকা একদল পিশাচ। ওই যে সে পিশাচগুলো, যাদের কথা বলা হয়েছে শুরুতে, মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলারে জড়ানো ছিল যারা। ভাঙা উর্দুতে তারা জিজ্ঞেস করল, ‘সিরাজুদ্দীন হোসেন কে?’

এরই মধ্যে ভেতরের দরজা দিয়ে সিরাজুদ্দীন হোসেনের তৃতীয় সন্তান ফাহীম চলে গেছে বাবার ঘরে। ‘আব্বা, আব্বা, মিলিটারি এসেছে!’ আতঙ্কিত গলায় বলল ফাহীম।
লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে এলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। পেছনে নূরজাহান সিরাজী। ঘাতকের দল ততক্ষণে পৌঁছে গেল সিরাজুদ্দীন হোসেনের সামনে। ভাঙা উর্দুতে কথা বলে জেনে নিলো- এই সেই ব্যক্তি, যার হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশের পতাকা। আল-বদর আর পাকিস্তানি সেনারা সিরাজকে নিয়ে যাওয়ার সময় চোখ বাধার জন্য কাপড় চাইল। ফাহীম দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এলো গামছা। সেই গামছায় চোখ বেধে নিয়ে গেল সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। পাঞ্জাবি পরতে গিয়েছিলেন সিরাজ, কিন্তু সে সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেখানে গরম কাপড় আছে। নিজের প্রিয় সিগারেটের প্যাকেট নিতে চেয়েছিলেন, বলা হয়েছে, সেখানে সিগারেটও পাওয়া যাবে। কাদালেপা মাইক্রোবাসটি চলতে শুরু করল...।

ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল পরিবার যখন ঘটনাটা উপলব্ধি করতে পারল, তখনই উঠল কান্নার রোল। সেই কান্নাকাটির সময় আমার ঘুম ভেঙেছিল। সেই রাতটির মতো বিভীষিকাময় রাত খুব কম মানুষের জীবনেই আসে। সিরাজুদ্দীন হোসেন আর ফিরে আসেননি। সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন ডিসেম্বরে পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের প্রথম শিকার। এরপর নজমুল হক, আর ন ম গোলাম মোস্তফা, নিজামুদ্দীন আহমদ, সেলিনা পারভীন, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশীদুল হাসান, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি প্রমুখদের বাড়ির দিকেও যেতে থাকে কাদালেপা মাইক্রোবাস। এবং এই সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীর প্রত্যেকটি পরিবারে রয়েছে এ রকম এক একটি ট্র্যাজিক গল্প।

৩.
আগের কথা একটু বলা যাক। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবুর রহমানের পেছনে এসে দাঁড়ালো গোটা বাঙালি জাতি। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের দেওয়া ৬ দফার ভিত্তিতে চলল আন্দোলন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন ‘বঙ্গবন্ধু’। জনগণের অবিসংবাদিত নেতা। নির্বাচনে গোটা পূর্ব বাংলা রায় দিলো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করলেন। তারপর শুরু করলেন ক্ষমতা নিয়ে টালবাহানা। পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর যোগসাজশে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাবঞ্চিত করতে চাইলেন ইয়াহিয়া। এবং চাইলেন এই ভূখণ্ডের মানুষকে শায়েস্তা করতে। পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষ চায়নি, চেয়েছে এ দেশের মাটি। পোড়ামাটি নীতির কারণেই তারা গণহত্যা চালিয়েছে ১৯৭১ সালের ৯ মাসজুড়ে। অপারেশন সার্চলাইটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল গণহত্যা। জেনোসাইড বলতে আমরা বুঝি:
‘একটি জাতি, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত কিংবা ধর্মীয় গোষ্ঠিকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে নিম্নবর্ণিত যেকোনো কর্মসাধনকে বোঝাবে:
১. গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা
২. গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন
৩. উদ্দেশ্যমূলকভাবে গোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় এমন কিছু আরোপ যা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে এর কাঠামোগত ধ্বংস বয়ে আনবে
৪. গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মধারা রোধ করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা আরোপ
৫. গোষ্ঠীর শিশুদের বলপূর্বক অন্য গোষ্ঠীতে চালান দেওয়া
এগুলো রয়েছে জেনোসাইড কনভেনশনের দ্বিতীয় বিধানে।
[মফিদুল হক: জেনোসাইড কনভেনশনের ষাট বছর ও বাংলাদেশ,/জেনোসাইড নিছক গণহত্যা নয়, পৃষ্ঠা ২৫/বিদ্যাপ্রকাশ, ২০০৯]

 পাকিস্তানিরা আমাদের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই অপরাধগুলোর কোন কোনটি করেছিল, সে কথা আশা করি পাঠকমাত্রেই বুঝতে পারবেন। গণহত্যা তারা চালিয়েছিল তিনটি ধাপে। তারা তাদের শত্রু নির্ধারণ করেছিল এইভাবে:
১. আওয়ামী লীগের যে কোনো স্তরের নেতা-কর্মী
২. হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ
৩. আওয়ামী লীগের প্রতি দূর্বল— এমন প্রতিটি মানুষ

এখন নিশ্চয়ই কারো বুঝতে অসুবিধা হবে না, কী কারণে সে সময় এরা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। সে সময় আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল ছিল না, এ রকম মানুষ কি (অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) কেউ ছিল?

সিরাজুদ্দীন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান সিরাজীর সঙ্গে তাদের ৮ ছেলে


শুধু পাকিস্তানিরা কেন, বারবার বলতে হবে, নরপশুদের সঙ্গে আঁতাত করেছিল এই দেশেরই কিছু হৃদয়হীন ধর্ম–ব্যবসায়ী অপ–মানুষ। এরা শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস, আল বদর বাহিনী গঠন করেছিল। এদের মধ্যে আল বদর বাহিনীর সদস্যরাই বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে ছিল সরাসরি সম্পৃক্ত। ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যরা (এখন যা ইসলামি ছাত্র শিবির) ছিল এর মূল সদস্য। নাটের গুরু মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। অপারেশন ইন চার্জ চৌধুরী মঈনুদ্দীন, মূল জল্লাদ আশরাফুজ্জামান। রাও ফরমান আলী, জেনারেল নিয়াজী ও জেনারেল জামশেদের সঙ্গে মিলে এরা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা তৈরি করেছিল। এদের করা তালিকা ধরেই অপহরণ করা হচ্ছিল এ দেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীদের। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ দিবাগত রাত থেকে অপহরণ শুরু হয়েছিল, বিজয় দিবসের দিনেও তা চলেছে।

৯ ও ১০ ডিসেম্বর ঢাকার ইপিআর সদর দপ্তরে ইস্টার্ন কম্যান্ডের উচ্চপর্যায়ের সভায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি যে আলোচনা হয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় রাও ফরমান আলী, নিয়াজীর লেখায়। সে সভায় উপস্থিত ছিলেন আরেক শয়তান— জেনারেল জামশেদ। প্রস্তুতকৃত তালিকা নিয়ে আল বদররাই গিয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের চিনিয়ে দিতে।  

একটু খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যাবে, এই সময় যে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছে, শুধু একাত্তরের কর্মকাণ্ড দিয়ে তাঁদের তালিকাভূক্ত করা হয়নি, সার্বিক জীবনে মুক্তির আকাঙ্খা যারা লালন করেছেন, তারাই ছিলেন এই পিশাচদের লক্ষ্যবস্তু। তালিকায় আরো অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম ছিল। তাঁরা ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন। কাদালেপা মাইক্রোবাসটি তাঁদের ঠিকানায় পৌঁছে গেলে আরো অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাসে ভারী হতো এই দেশের আকাশ–বাতাস।


একাত্তরের ৩০ লাখ শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁদেরই একজন, এ কথা ভেবে আমি গর্বিত। আমাদের লাল–সবুজ পতাকায় আমার বাবার রক্তও রয়েছে, এই আমার সান্ত্বনা। কাদালেপা মাইক্রোবাসটি আমাদের মতো অনেকগুলো পরিবারকে উপলব্ধি করিয়েছে, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়।’

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়