Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮ ||  ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

ছোটগল্প || পাথরের শব্দ

মোহছেনা ঝর্ণা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০৩, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১  
ছোটগল্প || পাথরের শব্দ

অলঙ্করণ: অপূর্ব খন্দকার

গনগনে রোদে ভরা উত্তপ্ত বিকেলে রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমার মনে হলো, আমার চেয়েও দুঃখী মানুষ আছে এই জগৎ-সংসারে। তা না-হলে, এই অবেলায় রেস্টুরেন্টে একা একা বসে কেউ চোখের পানি মোছে? মানুষ নিজের চেয়ে দুঃখী মানুষ দেখলে দুঃখ অনেকখানি ভুলে থাকতে পারে। সে কারণেই কিনা জানি না, তবে আমার কৌতূহলী দুচোখ তার দিকেই নিবিষ্ট হয়ে ছিল।

কাঠফাটা রোদ থেকে এসে এসি রুমে ঢুকলেই মনে হয় বেহেশতে চলে এসেছি! এসি রুমের হিম হিম পরিবেশে স্বচ্ছ গ্লাসে বরফ টুকরো দেওয়া ঠান্ডা পানি খাওয়ার পর এত প্রশান্তি লাগে।

বিকাল সাড়ে তিনটা কি চারটার দিকে রোদের তেজ তখনও ঠনঠনে ভাব নিয়ে স্থির, তখন বাচ্চাদের জোর আবদারের মুখে বাধ্য হয়েই বাটালি পাহাড় দেখার জন্য বেরিয়েছিলাম। বাটালি পাহাড়ের প্রবেশ পথেই দেখি ক্যামেরা তাক করে লোকজন ভিড় করছে। কৌতূহল হয়। বকের মতো গলা উঁচু করে সামনের পাঁচিল ভেদ করতে চাই। তখনই চোখে পড়ে শাড়ি পরিহিতা কঙ্কনের রিনিঝিনি শব্দে তরুণীদের কিচিরমিচির। পাশে পাঞ্জাবি পরিহিত যুবকত্রয়। সুরঞ্জনা ওইখানে যেও নাকো- জাতীয় একটা আমেজ।

আমার বাচ্চারা ক্যামেরার চাকচিক্য উপেক্ষা করে পিচঢালা পথ ধরে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে থাকে। আমি তাদের কবজা করতে দৌড় দেই মোটা শরীর নিয়ে। একটু দৌড়াতেই হাঁপিয়ে উঠি। মাস্ক থাকায় নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হয়। অনেকদিন লকডাউন থাকায় বাটালি পাহাড়ের দু’ধারে সারি সারি উঁচু গাছপালার পাশাপাশি অনেক ঘাস লতাপাতায় জঙ্গল হয়ে আছে। আমরা মনে হয় একটু বেশিই তাড়াতাড়ি চলে এসেছি। কারণ মানুষজন তেমন নেই বললেই চলে। হঠাৎ হঠাৎ দু’একটা মোটর সাইকেল এত দ্রুত গতিতে সাঁই সাঁই গতিতে ছুটে যাচ্ছিল যে ভয়ই পাচ্ছিলাম! বাচ্চাগুলো অনেকদিন ঘরবন্দি থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। প্রতিদিন বায়না করে- কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাও না মা। প্লিজ! স্কুল বন্ধ সেই মার্চ থেকে। অনলাইনে ক্লাস হয়। কিন্তু সেই ক্লাসে আমার বাচ্চারা কোনো আনন্দ পায় না।

গত কয়েকদিন ধরে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিল বারবার। গতকাল রাতে বলেছিলাম আজ বাটালি পাহাড়ে নিয়ে যাবো। তাই আজ সকাল থেকে তারা রেডি বাটালি পাহাড়ে যাওয়ার জন্য। আমার অবশ্য বাটালি পাহাড়ে আসার অন্য একটা বিশেষ কারণ ছিল। কিন্তু সকালের দিকে হঠাৎ করেই কারণটা রাস্তার ইলেক্ট্রিসিটির তারের মতোই ঝুলে গেল।

বাটালি পাহাড়ের উঁচু গাছের ফাঁক গলে সূর্য বাবা খুব বেশি কাবু করতে পারছে না আমাদের। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বাদামওয়ালা বলে, আফা বাদাম খান। বাদাম খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহই দেখাল না আমার বাচ্চারা। কিছুটা উপরে যেতেই কেমন নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরল। হৈ চৈ আর কোলাহলের মধ্যে থাকতে থাকতে অবস্থা এত খারাপ হয়েছে যে নির্জন পরিবেশ দেখলেই চিন্তা হয়- কোথাও কোনো সমস্যা হলো না তো! আমার বোন তো কানাডায় গিয়ে প্রথম কয়েকমাস খালি কাঁদতো। এই দেশে মানুষ থাকে কেমনে? আশেপাশে কেউ নেই। একটা বাসার চেয়ে আরেকটা বাসার দূরত্ব কত বেশি! এরা তরকারি কেনে কেমন করে? কোনো ফেরিওয়ালার শব্দও তো পাওয়া যায় না। এরা পুরনো পেপার বিক্রি করে কোথায়? বাসার সামনে দিয়ে হকার যাবে, যাওয়ার সময় হাঁক দেবে, সেই হাঁক শুনে ঘরে বসেই কত কাজ করতাম নিজের দেশে। আর এই বিদেশে কেমন করে কী করে- আপা নাকি ভেবেই পেতো না।

আপা কানাডায় যাওয়ার আগে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেই বাসার পাশের বিল্ডিংগুলো এত কাছাকাছি ছিল যে রাতে ফিসফিস করে কথা বললে একটু কান খাড়া রাখলেই অন্য বিল্ডিংয়ের মানুষ সব গোপন কথা শুনে ফেলতে পারত। একবার আমি অনেক রাতে কেন জানি বারান্দায় গিয়ে শুনি পাশের বিল্ডিংয়ের মেয়ে একটা জানালায় দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘ইউছুফ, তুমি বুঝলে না, তুমি আমাকে বুঝলে না, আমি তোমার জন্য কাঁদছি ইউছুফ!’

পাহাড়ের নির্জনতা ভালো লাগছিল খুব। কিন্তু মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্যে স্বস্তিটুকু উবে যাচ্ছিল। আমার মেয়েরা খুব মজা পাচ্ছিল। অনেকদিন পর ঘর থেকে বের হলো। এক বোন আরেক বোনের হাত ধরে কিছুক্ষণ দৌড়ে, কিছুক্ষণ ধীর পায়ে হেঁটে, কিছুক্ষণ আবার আমার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ হঠাৎ আমার হাতের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলে অবশ্য বিরক্তি প্রকাশ করতে সময় নিচ্ছিল না ছোট মেয়ে। বলল, তুমি এত বিজি কেন মা? তুমি যখন আমাদের সঙ্গে থাকো সবাই তোমাকে এত ফোন করে কেন?
দরকারি ফোন মা। এগুলো রিসিভ করতে হয়।
ছোট মেয়ে পাকনা বুড়ির মতো বলে, তোমার অফিস টাইমে কি আমরা তোমাকে সারাক্ষণ ফোন করি?
সেটাও ঠিক- বলে আমি একটু হাসার চেষ্টা করি। কাজের ব্যস্ততাও বেড়েছে ইদানীং। সময় খুব টাই টাই হয়ে যায়।

বাটালি পাহাড়ে আসার কারণটা ছিল মূলত নিধি। আমার নতুন সহকর্মী। মাত্র কয়েকমাস হলো চাকরিতে যোগ দিলো। কিন্তু এই ক’মাসেই অফিসের সবার মন জয় করে নিয়েছে কাজ দিয়ে, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, সুন্দর হাসি দিয়ে।

গত পরশু ওই বলেছিল- আপু চলেন শনিবারে আমরা কোথাও ঘুরে আসি। ওর প্রস্তাবটা আমারও ভালো লাগল। কোভিডের কারণে বাচ্চা দুইটা ঘরবন্দি হয়ে আছে দীর্ঘ সময়। ওদের বাবাও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। কোভিডের কারণে বিশাল ক্ষতি ব্যবসা-বাণিজ্যে। তাছাড়া হঠাৎ করেই আব্বার চলে যাওয়ার ব্যথায় মুষড়ে আছি আমি। কিছু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ মনে হয় এই তো আব্বা আছে। মসজিদে গেছে। নামায শেষে ঠিক ফিরে আসবে। আবার মনে হয় হয়তো বাজারে গেছে। আব্বার বাজার করার নেশা ছিল। কিন্তু কী থেকে যে কী হয়ে গেল চোখের পলকে। খারাপ লাগছে, খারাপ লাগছে বলতে না বলতেই একটা মানুষ নাই হয়ে গেল। আম্মার দিকে তাকালেই বুকটা ভেঙে যায়। কত বছরের সম্পর্ক! কত অনুভব। ছায়াসঙ্গীর মতো পাশে থাকা মানুষোটা চোখের পলকে নাই হয়ে গেল! নিজেদের ভাঙন লুকিয়ে রাখি আমরা। আম্মার ভাঙন দেখেই দুমড়ে মুচড়ে যাই। এই করোনাতে দু’দিন পরপর প্রিয়জন হারানোর বেদনায় স্তব্ধ হয়ে থাকি। সব মিলিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা। তাই নিধির প্রস্তাবটা লুফে নিলাম।
বাচ্চাদের বাবা বললেন, তোমরাই যাও। আমি গেলে তোমাদের আলাপে ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু আজ সকালেই নিধি জানালো, ও আসবে না। নিধি কাঁদছিল। মেয়েটা একটা জটিল সমস্যায় আছে। অল্প বয়সের কিছু অতিরিক্ত সমস্যা থাকে। বয়সের ভারে এই সমস্যাগুলো আপনাতেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এই চাকরিতে জয়েন করার আগে থেকেই হিমেল নামে এক যুবকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। ঘনিষ্ঠতা। কিছুদিন একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে গিয়ে নিধির সঙ্গে আমার বেশ সখ্য হয়ে যায়। নিধি একান্ত নিজের, তার পরিবারের সব কথা অকপটে বলে আমাকে। মেয়েটা একটু অন্যরকম। কিন্তু এত ভালো লাগে আমার! মায়াও লাগে। আমি অবশ্য নিধির এই সম্পর্কটা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু ওর অতিমাত্রায় উচ্ছ্বাস দেখে কিছু বলতেও পারি না। ওর চোখের পানি আমাকে দুর্বল করে দেয়। মাঝে মাঝে ফেইসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস দেখে ওর মনের অবস্থা বুঝতে আমার জন্য আরও সহজ হয়। কিন্তু নিজের ছবি টবি দেয় না ফেইসবুকে। ফুল, লতা-পাতা, পাহাড়, নদী, সমুদ্রের দারুণ সব ছবি ওর প্রোফাইলে। শৌখিন ফটোগ্রাফারও বলা যায় ওকে।

রেস্টুরেন্টে বসে থাকা নারীর দিকে ভালো করে তাকাতেই দেখি সেও আমার দিকে একই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার মাস্ক থাকার জন্য এই বিস্ময়ের প্রাচীর ভেদ করা তার জন্য কঠিন বটে। রেস্টুরেন্টের আধো আলো আধো ছায়া পরিবেশে নাকি আমি গনগনে রোদ থেকে আসার কারণে আমার কাছে সব কিছু কেমন ঝাপসা লাগছিল। বাটালি পাহাড়ের উপরের দিকে উঠতে গিয়ে দেখি উঠতি বয়সী ছেলেদের জটলা। আর মোটর সাইকেলের দুরন্তপনা তো আছেই। তাই কিছুদূর গিয়ে আমি আর যেতে চাইলাম না। এখন আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। উঠতি বয়সী, মধ্য বয়সী যে কোনো বয়সের ছেলেদের জটলা দেখলেই মনের মধ্যে নানা রকম আশঙ্কা কাজ করে। সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে ধর্ষণের খবরে, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো জানার পর তো অসুস্থই হয়েছিলাম অনেকদিন। মেয়েদের বাবা বলে, চলো কানাডায় মাইগ্রেট হওয়ার চেষ্টা করি। ও অবশ্য বিয়ের পর থেকেই দেশ ছাড়ার কথা বলে আসছিল। আমারই মন সায় দেয়নি কোনোদিন।

রুহিকে চিনতেই পারিনি প্রথমে। বেশ অবাক হয়েই বললাম- আরে রুহি তুই! রুহিও খুব অবাক হয়েছে। কেন জানি আমার মনে হচ্ছে বিব্রতও হয়েছে। আমাদের সুন্দরী, সুখী বান্ধবী রুহি। বেশি সুন্দর হওয়ার কারণে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে যায়। পরে পাস কোর্সে ডিগ্রি পাশ করেছে। স্বামী, সংসার, সন্তান নিয়ে পরিতৃপ্ত একজন মানুষ। অন্তত আমাদের বন্ধবীদের তাই মনে হয়। বান্ধবী মহলে কেউ কেউ যে ঈর্ষাও করে না তাও নয়। ফেইসবুকে দু’দিন পরপর বেড়াতে যাওয়ার ছবি। বরের বাহুলগ্না হয়ে বেশ রোমান্টিক সব ছবি  আপলোড করে। সেই ছবিতে বেশির ভাগ কমেন্টই থাকে- হ্যাপি কাপল। স্মার্ট কাপল। দুই ছেলেসহ ওর ফ্যামিলি পিক আমরা বান্ধবীরা বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখি। ওর বাসাটাও রাজপ্রাসাদের মতো। সেই কোন শৈশবে স্কুলে পড়ার সময় ওদের বাসায় গিয়ে কত হৈচৈ করতাম আমরা। ওর মা একটুও বিরক্ত হতো না। শৈশবের দিনগুলোতে আমাদের অনেকেরই নিজের আলাদা বেডরুম বলে কিছু ছিল না। কিন্তু রুহির ছিল। ওর বেডরুমে ওর বিভিন্ন বয়সী বেশ কিছু ছবি ঝোলানো ছিল দেয়ালে। ওদের বাসায় রঙিন টিভি ছিল। আবার ভিসিআরও ছিল। ওর মা আমাদেরকে ইংলিশ কতগুলো ছবি চালিয়ে দিতো টিভিতে। ফ্রিজ থেকে নামিয়ে দিতো পুডিং, পায়েস, সন্দেশ। আবার কখনো কখনো গরুর মাংস দিয়ে বাসমতি চালের বিরিয়ানি। চালের ঘ্রাণটা নাকে লেগে থাকতো অনেকক্ষণ। বাসমতি চাল দিয়ে আম্মা কত বিরিয়ানি রেঁধে খাইয়েছে আমাদের, কিন্তু রুহির মায়ের হাতের বিরিয়ানি ছিল অমৃতসমান!

রুহি এই ভর দুপুরে রেস্টুরেন্টে একা একা বসে কাঁদছে! আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। ও আমার মেয়েদের দেখে বলল, তোমরা বসো আম্মু। কী খাবে বলে মেয়েদের জন্য চিকেন ফ্রাই, কেশোনাট সালাদ আর কোল ড্রিংকস অর্ডার করলো। আমাদের স্কুল বান্ধবীদের একটা ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ আছে। আমাদেরই এক বান্ধবী এই ম্যাসেঞ্জার গ্রুপটা খুলে কীভাবে যেন স্কুলের বেশ  ক’জন বান্ধবীকে খুঁজে বের করে ফেলল। যার সঙ্গে যার পরিচয় সে তাকে অ্যাড করতে করতে দেখা গেল স্কুলের ক্লাসটাই যেন হাজির। শুধু স্কুলের স্যার আর আপাদের অভাব। রুহি আমাদের সেই বান্ধবী গ্রুপেও অ্যাড আছে। তবে ও কথা বলে খুব কম। আজ রুহিকে এভাবে রেস্টুরেন্টে একা বসে চোখের পানি মুছতে দেখে মনটা ভার হয়ে গেল। চোখের পানি মুছে কিছুক্ষণ সৌজন্যমূলক কিছু কথা বলে ও বের হয়ে গেল। ওর নাকি তাড়া আছে। আমার উপস্থিতি কি ওর জন্য বিড়ম্বনার হয়ে গেল?

রাতে দেখি আমার ম্যাসেঞ্জারে নোটিফিকেশন। রুহি লিখেছে রেস্টুরেন্টের কথা যেন বান্ধবীদের গ্রুপে শেয়ার না করি। রুহি নিষেধ না করলেও আমি কিছুই বলতাম না কাউকে। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কিছু দুঃখ থাকে, নিজস্ব কিছু যন্ত্রণা থাকে, সেগুলো কারো সঙ্গে বলতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এগুলো বলার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য মানুষ পাওয়া যায় না। আজ যাকে আপন ভেবে বললাম, কোনোদিন কোনো কারণে তার সঙ্গে ঝামেলা হলে এই কথাগুলোই সে নিলামে তোলে। তখনকার দুর্বিষহ অবস্থা কল্পনাও করা যায় না।

দু’তিনদিন পর আবার রুহির ম্যাসেজ। ও আমার সঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করতে চায়। একটু সময় যেন ওকে দেই। সময় নিয়ে আসলেই খুব টানাটানি হয়ে যায় আমার।
রাতে হোয়াটসঅ্যাপে কানাডা থেকে আপার ফোন। দু’দিন পরপরই কথা হয়। দেশের বাইরে থাকলেই দেশপ্রেম জেগে ওঠে। কিন্তু ওই দেশ ছেড়ে আসতেও রাজি নয় এখন আর। বলে, বাচ্চাদের সুখ দেখলে মন ভরে যায়। শুধু নিজের রক্তের মানুষের অভাব। তা না হলে সুখের কোনো শেষ নেই। আমাকে বলে, তোকে যে বললাম, ইমিগ্র্যান্টের জন্য অ্যাপ্লাই করতে, করেছিস?
আমি হাসি।
করিস নাই! মেয়েগুলার ভবিষ্যতের কথা ভাববি না?
চুপ করে থাকি আমি।
আচ্ছা, বাদ দে। তুই ট্র্যাভেল ভিসায় এসে বেড়িয়ে যা কিছুদিন।
দেখি আপা। জানাবো তোকে।
দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেই আমার কান্না আসে। আপা বলে, প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হয়। কিন্তু পরে এডজাস্ট হয়ে যায়। তা না হলে এত মানুষ দেশ ছাড়ে! আর তোর তো কষ্টই হবে না। আমি আছি না! তুই এলে আম্মাকেও নিয়ে আসব। সজীব আর তিথিকেও নিয়ে আসবো। সজীব, তিথি আমাদের ছোট দুই ভাই-বোন।
আমি হাসি। আপা আপার সংসারের নানান কথা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে তারপরই ফোন রাখে।

অফিসে ঢুকেই দেখি খুব সুন্দর করে সেজে এসেছে নিধি। শাড়ি পরেছে। আমাকে দেখেই লাজুক হাসি দিয়ে বলল, আপু, একটা ভালো খবর আছে।
আমি বলি, তা তো চাঁদমুখ দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু খবরটা কি?
বিয়ে করে ফেলেছি আপু।
সত্যি! কংগ্রাচুলেশন। কিন্তু এরকম হঠাৎ করে!
কিছু ঝামেলা তো থাকেই আপু। আমার যেহেতু এফেয়ার, তাই ঝামেলা আরও বেশি। হিমেলেরও কিছু সমস্যা আছে। কিছুক্ষণ পরপর সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করে। অস্থির প্রকৃতির আপু। গত সপ্তাহে তোমার সঙ্গে বাইরে যাবো ঠিক করেছিলাম না, ওর সঙ্গে রাগারাগি করার কারণেই শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। সেই রাগের ফল হচ্ছে হুট করে এই বিয়ে।
নাটকীয় মনে হচ্ছে!
নাটক তো বটেই। সিনেমাও বলতে পারেন। তবে শান্তি হচ্ছে এই যে, আমার ফ্যামিলি মেনে নিয়েছে।
হিমেলের ফ্যামিলি?
মুখটা বেজার করেই জবাব দেয় নিধি- না, ওর ফ্যামিলি রাজি হয়নি।
ও, কিছু হবে না। মন খারাপ করো না। দেখবে ধীরে ধীরে সবাই মেনে নেবে।

আমার কথায় মনে হয় জোর পায় নিধি। সুন্দর মায়াবী একটা হাসি মুখে ছড়িয়ে কাজে মন দেয়। অফিসে খুব উৎসব উৎসব একটা ভাব। নিধিকে প্রথম দেখে সবাই চোখ বড় করে তাকায়। তারপর নিধির অপকর্মের কথা শুনে সবাই অবাক হয়। অভিনন্দন জানায়। দু’একজন হালকা অভিমানও করে তাদের দাওয়াত দেয়নি বলে। নিধি আমাদের সাধুর মিষ্টি খাওয়ায়। দাওয়াত প্রার্থীদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলে দাওয়াত খাওয়ার জন্য।
আমি কাজের অবসরে ফেইসবুকে ঢুকে দেখি, নিধির প্রোফাইল আপডেট। গট ম্যারিড লেখা। আর তাতে শয়ে শয়ে শুভকামনা। আমিও জানাই।

কিছুটা স্ক্রল করতেই দেখি পার্কি সমুদ্র সৈকতের ঝাউবনে গাছের গুঁড়ির উপর নিধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে একজন। ভদ্রলোককে দেখে আমি চমকে উঠি। আবার কনফিউজডও! আমার কোনো ভুল হচ্ছে না তো! ছবির উপরে কোনো ক্যাপশন নেই। আবার ছবিটা একটু পুরনোই মনে হচ্ছে। কাউকে ট্যাগও দেয়নি।
আমি নিধিকে ডেকে বলি, তুমি হিমেলের ছবি দেখাওনি এখনো!
নিধি প্রথম থেকেই তাদের সম্পর্কটা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা রেখেছে আমাদের মধ্যে।
নিধি বললো, আপু আজ আপলোড দিয়েছি তো হিমেলের ছবি।
উনি হিমেল?
হ্যাঁ আপু। কেন? সুন্দর না বুঝি, বয়সটা একটু বেশি। কিন্তু হিমেল আমাকে খুব বুঝতে পারে। আমকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। আমিও ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমি মৃত মানুষ আপু।
নিধিকে কিছু বলতে গিয়েও থমকে যাই আমি। রুহির কথা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। রুহির বর শাহনেওয়াজ চৌধুরীর ডাক নাম যে ‘হিমেল’ আমার জানা ছিল না।

সে রাতেই ফেইসবুকে ঢুকতে না ঢুকতেই রুহি কল দেয় আমাকে ম্যাসেঞ্জারে। রুহি যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ওর বুকে পাথরের এক পাহাড় জমেছে। সে পাথর খসাতে চায়। পাথরের ভারে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। স্বামীর সঙ্গে নিত্য কলহ, স্বামীর উদাসীনতা, স্বামীর বোহেমিয়ান চঞ্চলতা, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ, নিজের সুখী জীবনের অভিনয় মঞ্চে তার দারুণ পারদর্শীতাও ইদানীং ফিকে হয়ে যাচ্ছে। রুহি খুব কাঁদছিল সেদিন। ম্যাসেঞ্জারে অনেক রাত পর্যন্ত কথা হয়েছে আমাদের। রুহির কান্নায় আমিও সিক্ত হয়েছি। কিন্তু রুহির কাছে নির্মম সত্যটুকু উন্মোচন করার সাহস আমার হয়নি।
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়