Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৮ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ৫ ১৪২৮ ||  ০৫ রমজান ১৪৪২

ছড়ার অনিন্দ্যসুন্দর জগতে আমি

লুৎফর রহমান রিটন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৫০, ১ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৩:৫৫, ১ এপ্রিল ২০২১
ছড়ার অনিন্দ্যসুন্দর জগতে আমি

১৯৭২ সালের রোদেলা এক বিকেল।
এইমাত্র একটা ঘুড়ি বাকাট্টা হলো ওয়ারির আকাশে। ছাদ থেকে সেই দৃশ্য দেখামাত্র দ্রুত পায়ে সিঁড়িভাঙা শুরু। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল নেই। সেই অবস্থায়ই দে ছুট ঘুড়ির পেছনে। ওটাকে ধরতেই হবে। ছুটে যাচ্ছি আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে। র‌্যাংকিন স্ট্রিট সিলভারডেল কিন্ডারগার্টেনব স্কুলের সামনে এক লোক খপ করে ধরে ফেললো আমার হাত- এই ছেলে ওরকম ছুটছো যে, অ্যাকসিডেন্ট করবে তো!

মহাবিরক্ত আমি লোকটার দিকে না তাকিয়ে, তাকিয়ে আছি ঘুড়িটার দিকে। ঘুড়িটা তার সাপের মতো লেজ দোলাতে দোলাতে আমার মন খারাপ করে দিয়ে ধরা দিলো একটা ছেলের হাতে। 
লোকটার হাত আমার কব্জি ধরে আছে তো আছেই। ছাড়েই না।
খানিকটা তোতলানো উচ্চারণে লোকটা বলল, তোমাদের বাসা কোনটা?
আমি ঘাড় বাঁকিয়ে খুব বিরক্ত ভঙ্গিতে বললাম, অই যে, ছাড়ুন! 
আমার হাত না ছেড়ে লোকটা বললো, তুমি ছবি আঁকতে পারো?
হ্যাঁ পারি। ফুল আঁকতে পারি পাখি আঁকতে পারি। নৌকা মানুষ টেলিভিশন সব আঁকতে পারি। ছাড়ুন তো!
লোকটা বললো, এই সিলভারডেল স্কুলের ভেতরে সপ্তাহে দুদিন ছবি আঁকার ক্লাস হয়। তোমার বয়েসি অনেক ছেলেমেয়ে আছে ওখানে, ওই যে দেখো। ইচ্ছে হলে তুমি এখানে ছবি আঁকা শিখতে পারো। তুমি শুধু রাবার আর পেন্সিল আনবে। রঙ তুলি কাগজ সবকিছু আমরাই দেবো। কি শিখবে ছবি আঁকা?

ঘুড়িটুড়ির কথা ভুলে আমি তো অবাক! এই লোক বলে কী! রং তুলি কাগজ সব, সব দেবে! এতক্ষণ পর ঘাড় উঁচু করে আমি তাকালাম লোকটার দিকে, খুদে বালক আমার তুলনায় বিশালদেহী লম্বা স্যুটেড-বুটেড সুদর্শন মধ্যবয়স্ক একজন হাস্যজ্জ্বল মানুষ। মোটা কালো ফ্রেমের চশমা চোখে। 
জানতে চাইলাম, কত টাকা লাগবে?
লোকটা বলল, কোনো টাকা পয়সা লাগবে না। তুমি ছবি আঁকতে এলেই আমরা খুশি হবো। আমাদের গানেরও ক্লাস আছে। তুমি ওখানেও আসতে পারো। কি, আসবে? 
খুশিতে টইটম্বুর আমি পিংপং বলের মতো লাফিয়ে উঠলাম, হ্যাঁ আসবো। আমি ছবি আঁকা শিখবো।
লোকটা বলল, তাহলে যাও গায়ে একটা শার্ট চড়িয়ে জুতো অথবা স্যান্ডেল পরে চলে এসো। একটা পেন্সিল আর রাবারও এনো কিন্তু।
আমি এক ছুটে বাড়ি। আরেক ছুটে সিলভারডেল কিন্ডারগার্টেনে। পরম আদরে লোকটা আমাকে বসিয়ে দিলো ছবি আঁকার ক্লাসে।

এভাবেই আমার জীবন-পথের মোড়ে একজন দক্ষ ট্রাফিক সার্জেন্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা পরিবর্তন করে দিলো আমার গতিপথ। 
লোকটার নাম রোকনুজ্জামান খান। তবে ‘দাদাভাই’ নামেই পরিচিত তিনি সারাদেশে। বিখ্যাত শিশুসংগঠক। প্রখ্যাত ছড়াকার। ‘বাক বাকুম পায়রা/মাথায় দিয়ে টায়রা/বউ সাজবে কাল কি?/চড়বে সোনার পালকি’ লিখে অমরত্ব পাওয়া ছড়াকার।

শুরু হলো আমার ছবি আঁকা। টপাটপ কয়েকটা পুরস্কারও পেয়ে গেলাম জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক। দাদাভাই ‘ইত্তেফাক’-এর ছোটদের পাতা ‘কচি-কাঁচার আসর’-এ আমার আঁকা ছবি ছাপালেন অনেকগুলো। ‘ইত্তেফাক’-এর সেই ছোটদের পাতায় আমার আঁকা ছবির পাশে ছাপা হতো অনেকের ছড়া কবিতা গল্প। সেগুলো পড়ে পড়ে একদিন মনে হলো, আমি কেন লিখি না ওদের মতো। যদি আমিও ওরকম মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া বানাতে পারি তাহলে দাদাভাই নিশ্চয়ই সেটা ছাপাবেন।

১৯৭২ সালের স্বর্ণালি এক সন্ধ্যায় জয়কালী মন্দির রোডের কচি-কাঁচা ভবনে দাদাভাইয়ের হাতে লজ্জা আর দ্বিধায় জড়সড়ো হয়ে গুঁজে দিলাম একটা ছড়া- ‘পুতুলের বিয়ে’। আমাকে অবাক করে দিয়ে পরের সপ্তাহেই ছাপা হলো ছড়াটা। দাদাভাই ছড়াটা ছাপলেন এভাবে- পুতুলের বিয়ে, রিটন (বয়স ৯ বছর)। ছড়াটা ছিল এরকম: ‘খুকুর পুতুলের বিয়ে/পোলাও কোরমা খেয়ে/বর আসবে পালকি চড়ে/বকুল তলা দিয়ে।/সঙ্গে আসবে লোকলস্কর ঢোল-ঢক্কর বাজিয়ে।...’ 
সেই থেকে শুরু। 
সেদিন, (উনপঞ্চাশ বছর আগে) দাদাভাই ৯ বছর বয়েসি এক শিশুর অতিশয় দুর্বল পঞ্চম গ্রেডের সেই ছড়াটা ছেপে না দিলে বাংলাদেশে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের জন্ম হতো না।

দুই

কেউ কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করে, আর আমি ধরাকে ছড়া জ্ঞান করি। 
আমার পৃথিবীটা ছড়াময়। আমার সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে সর্বত্র ছড়ানো ছিটানো ছড়া আর ছড়া। আমি জেগে থাকি ছড়া নিয়ে। ছড়াও জেগে থাকে আমার সঙ্গে। আমি ঘুমুতে যাই ছড়া নিয়ে। ছড়াও ঘুমোয় আমার সঙ্গে। ছড়ার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অদ্ভুত। আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাই না। মাঝে মধ্যে খুনসুটি কিংবা অভিমান যে হয় না তা নয়। হয়। আমি কিছুদিন রাগ করে অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে দিই ছড়ার সঙ্গে। ছড়াও আমার সঙ্গে রাগ করে, অভিমান করে। ছড়াও মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তখন আমাদের শুরু হয় বিরহকাল। খুবই ক্ষণকালের এই বিরহকাল, তবে এই সময়টায় আমি সবচে বেশি মিস করি ছড়াকেই। ছড়াও মিস করে আমাকেই। তখন আমাদের মধ্যে এক ধরনের সন্ধি হয়। আর সেই সন্ধি অনুযায়ী আর আমরা ঝগড়া করব না, ভবিষ্যতে আমাদের মধ্যে কথা চালাচালি বন্ধ হবে না ক্ষণকালের জন্যেও, এই রকম একটা বোঝাপড়া হবার কিছুদিনের মধ্যেই যথারীতি আবারো শুরু হয় ঝামেলা। আবারো চুক্তি ভঙ্গ। আবারো অভিমান।

তবে একটা বিষয় এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের এই অভিমানকালে বা বিরহকালে আমাদের পারস্পরিক হৃদয়ের টান যায় বেড়ে। আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ আর প্রেম যায় বেড়ে। আমাদের পারস্পরিক আকর্ষণ যায় বেড়ে। ছড়ার সঙ্গে আমার কিংবা আমার সঙ্গে ছড়ার এই যে সম্পর্কটা, প্রেমিক-প্রেমিকার মতো, এই সম্পর্কটার কি নাম দেয়া যায়? অনেক ভেবেছি, কিন্তু কোনো নাম আমি খুঁজে পাই নি। অবশ্য এটাও ঠিক যে, নামের দরকারটাই বা কি? কোনো রকম নামের তোয়াক্কা না করেই যে সম্পর্কটা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে টিকে আছে তাকে হঠাৎ নাম দেবার জন্যে এতো ব্যাকুল হচ্ছি কেনো?
থাক। নামকরণের জটিলতায় না গিয়ে বরং সম্পর্কটাকে উপভোগ করা যাক।

সারা দিনমান কাজ তো আমার একটাই- ছড়া পড়া, ছড়া লেখা আর ছড়া নিয়ে বিস্তর ভাবনা করা। আমি আর ছড়া হাত ধরাধরি করে হাঁটি। নির্জন কফিশপে ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিতে দিতে ছড়াকে আদর করি আমি। আমাকেও আদর করে ছড়া। আমার পাশের সিটে মুভি-থিয়েটারে ছড়া এসে বসে থাকে। ছড়া আমার সঙ্গে লংড্রাইভে যায়। যেতে যেতে রবীন্দ্র-আধুনিক-ক্যাসিক্যাল-নজরুল কিংবা লালন শোনে। ল্যাপটপ খুললেই মনিটরে ছড়া এসে নাচানাচি করে। বাথটাবে উষ্ণ-শীতল জলে মিলেমিশে স্নান করি ছড়া আর আমি। আমি কখনো বিষণ্ন হলে ছড়াও বিষণ্ন হয়। বিষণ্ন ছড়া এসে শুয়ে থাকে আমার শিয়রের পাশে। পার্কের বেঞ্চিতে বিকেলের মুগ্ধতা আমি আর ছড়া মিলে ভাগাভাগি করি। ঘোর লাগা সন্ধ্যায়, সূর্যাস্তের আবির লেপ্টে থাকে আমার চিবুকে। ছড়ার চিবুকেও আমি সেই আবিরকে অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে গুনগুনিয়ে উঠি, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ!’
ছড়ার কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হয়- ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ!’

তিন

আমি ননস্টপ ছড়াকার। সব সময় লিখতে পারি। যখন তখন লিখতে পারি। ছড়া লিখবার জন্যে আমার রাত্রির নির্জনতার দরকার হয় না। শুনশান নিরবতার দরকার হয় না। কাজের থেকে ছুটি নেবার প্রয়োজন হয় না। উইকেন্ডের জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে হয় না। রাত তিনটা, ভোর পাঁচটা, সকাল সাড়ে দশটা, দুপুর আড়াইটা, বিকেল চারটা কুড়ি, সন্ধ্যে সাতটা, রাত্রি নটা কোনো ব্যাপার নয়। চব্বিশ ঘণ্টার প্রতিটা মুহূর্তই আমার কাছে ‘রাইম টাইম’, ছড়া লেখার উপযুক্ত সময়। ছড়া লিখবার জন্যে নির্দিষ্ট কোনো ঘর বা চেয়ার টেবিল আমার লাগে না। বাংলাদেশে থাকার সময় বেশিরভাগ ছড়াই আমি লিখেছি সোফায় বসে ক্লিপবোর্ডে, ডাইনিং টেবিলের কোণায় বসে অথবা উপুর হয়ে বিছানায় শুয়ে কিংবা ফ্লোরে কার্পেটের ওপর শুয়ে বসে।

ছড়ার প্রতি আমার নিষ্ঠা আর একাগ্রতা দেখে, ছড়া লিখে নামটাম করার পর আমার স্ত্রী শার্লি আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রি ডেকে এনে বিদেশি ক্যাটালগ দেখিয়ে অনেক কায়দা-কানুন সমৃদ্ধ চমৎকার একটি লেখার টেবিল বানিয়ে দিয়েছিল। ওটায় বসে দু’চারদিন কিছু ছড়া আমি লিখেছিলাম বটে কিন্তু ওই টেবিল আমাকে খুব বেশি টানেনি। আমি যথারীতি সোফায় কিংবা বিছানায় অথবা ফ্লোরের কার্পেটে গড়াগড়ি খেতে খেতে ছড়া লিখে গেছি আগের মতো। বন্ধু সুহৃদরা দামি দামি সুন্দর সুন্দর খাতা কলম আর ডায়েরি প্রেজেন্ট করেছে কিন্তু আমি কখনোই ওইসব দামি খাতা কিংবা ডায়েরিতে ছড়া লিখে সুবিধে করতে পারিনি। এই ক্ষেত্রে আমার স্বভাবটা অভাবের কারণে একেবারেই দারিদ্রপীড়িত বলা চলে। আমি সব সময় ছড়া লিখেছি টুকরো কাগজে। বাজারের ফর্দ, দোকানের ঠোঙা, সিগারেটের প্যাকেটের উল্টোপিঠ, সিনেমার টিকিট, বাস টিকিট, পেট্রোল পাম্পের রশিদ, দর্জির রিসিপ্ট কিংবা সস্তা নিউজপ্রিন্টের প্যাডেই লিখেছি বেশিরভাগ ছড়া।

কানাডার বিখ্যাত শপিংমল থেকে খুব চমৎকার বাঁধাই করা দামি কাগজে রুলটানা ‘অভিজাত খাতা’ এবং ‘লেখার ডায়েরি’ কিনে জন্মদিনে উপহার দিয়েছে কোনো কোনো বন্ধু। কিন্তু এইসবে পোষায় না আমার। টুকরো কাগজ জিন্দাবাদ। যদিও এই টুকরো কাগজে লিখি বলে কত কত ছড়া যে হারিয়েছি এই জীবনে তার কোনো হিসেব নেই! 

চার

ছড়া লিখতে বিশেষ কোনো পরিবেশ আমার দরকার পড়ে না। আমি বাড়িতে না গাড়িতে, পার্কে না সমুদ্রে, রাস্তায় না শপিংমলে, বাসস্টপে না ট্রেনে, অ্যারোপ্লেনে না রিকশায়, আকাশে না পাতালে(বেসমেন্টে) সেটা আমার ছড়া লিখবার ক্ষেত্রে কোনো ফ্যাক্টর নয়। নো ম্যাটার হোয়েন অ্যান্ড হয়্যার আয়েম। ছড়া লিখতে আমার কোনো অ্যালকোহল নিতে হয় না। নিকোটিন নিতে হয় না। ওয়াইন কিংবা হুইস্কি বা বিয়ার পান করাটা মোটেও জরুরি নয়। ছড়া লিখতে গাঁজা চরস কিংবা সিগারেট কিছুই ফুঁকতে হয় না আমার। ছড়াতে মগ্ন এবং আচ্ছন্ন থাকবার জন্যে মাদকাশ্রয়ী হতে হয় না আমাকে।

ছড়াটাই তো আমার কাছে চমৎকার এক মাদকবিশেষ। এ এক অপরূপ নেশা। এই নেশার ঘোরে বুঁদ হয়েই তো কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ দিবস আর দীর্ঘ রজনীর প্রায় পঞ্চাশটি বছর! সুন্দরী নারীর পেছনে আমি ছুটি না। আমার সমস্ত ছোটাছুটি ছড়ার পেছনে। সেই ছেলেবেলা থেকে ছড়ার পেছনেই ছুটছি আমি নিরন্তর। নির্বোধ বালকের মতো। মুগ্ধ কিশোরের মতো। পাগল প্রেমিকের মতো। ড্রাগঅ্যাডিক্ট যুবকের মতো। সম্ভবত আমার নাছোরবান্দা টাইপের লেগে থাকা ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়ে ছড়াও আমাকে খানিকটা ভালোবেসে ফেলেছে। ভালোবেসে ছড়াও ধরা দিয়েছে আমার হাতে। আমি যেমন ছড়াকে ছাড়ি না তেমনি ছড়াও ছাড়ে না আমাকে।

জীবনের নানা রকম দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জটিলতার কারণে নিয়তির দাবড়ানি খেয়ে ২০০১-এর মধ্যভাগ থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে প্রবাস জীবন বেছে নেবার পর নিজের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষুব্ধ অভিমানে সবকিছু ছেড়ে দেবার প্ল্যান করেছিলাম। এমনকি ছড়াকেও। কিন্তু আমি ছাড়তে চাইলেও ছড়া তো আমাকে ছাড়ে না। শীত আর তুষারের দেশ কানাডায় হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ফর্টিতে ছড়াকার স্বয়ং প্রায় ফ্রোজেনফিস হয়ে গেলেও ছড়াগুলো বরফের সমুদ্রের মধ্যেও থাকে ফিটফাট। হাড্ডিজমাট শীতেও ছড়াগুলো থাকে ক্রিস্টালের মতোই ঝকঝকে, চকচকে। আমার ছড়ার ফ্যাক্টরি খোলা থাকে টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স। সেভেন ডেজ অ্যা উইক। সপ্তাহে সাতদিন।

ছড়ার পঙ্‌ক্তি এবং মিলগুলো দিবানিশি ঘুরে বেড়ায় আমার আশপাশ দিয়ে। হাত বাড়ালেই ধরা দেয়। কিন্তু সব সময় ওদের ধরি না বা ধরতে পারি না। কখনো কখনো ধরা পড়ার পরেও ওরা পালিয়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়। মধ্যরাতে ঘুমের ঘোরেও অদ্ভুত সব মিল বা অন্ত্যমিল এসে কড়া নাড়ে করোটিতে। আলস্যের কারণে ঘুম থেকে উঠে সেই মিলগুলোকে আর টুকে রাখা হয় না। সকালে ঘুম ভেঙে যাবার পর স্মৃতি হাতড়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা অন্ত্যমিল আর উদ্ধার করা যায় না। মধ্যরাতে নাজিল হওয়া ফাজিল মিলসমূহ নিখোঁজ, চিরতরে।

চলতি পথে বাসে ট্রেনে কর্মস্থলে যখন ওরা হানা দেয় তখন টুকরো কাগজে, বাস ট্রেনের টিকিটে, গ্রোসারির রশিদে ওদের টুকে রাখি। শার্ট-প্যান্ট আর জ্যাকেটের পকেটে কিংবা ওয়ালেটে থাকতে থাকতে বিরক্ত অভিমানী পঙ্ক্তি আর মিলগুলো একদিন হারিয়ে যায়। ডালাস প্রবাসী আমার এক লেখকবন্ধু মুহাম্মদ জুবায়ের একবার আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘টুকরো কাগজে টুকে রাখা ছড়ার টুকরোগুলোকে যেখানে সেখানে ফেলে না রেখে একটি নির্দিষ্ট ড্রয়ারে জমা রাখুন।’ তাঁর পরামর্শও সব সময় অনুসরণ করা হয়নি আলসেমির কারণে। আজ রাখব কাল রাখব করে করে পকেট কিংবা ওয়ালেটেই পড়ে থাকতে থাকতে একসময় অনাবশ্যক কাগজের টুকরো হিসেবে ওরা ড্রয়ারে ঠাঁই না পেয়ে ঠাঁই পেয়েছে আবর্জনার ঝুড়িতে। (চলবে)

 

প্রথম পর্ব: জগতে আনন্দযজ্ঞে ছড়ার নিমন্ত্রণ

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়