Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৬ ১৪২৮ ||  ০৬ জিলক্বদ ১৪৪২

ছোটগল্প || গদাই লস্করি 

মাহবুব আলী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৪, ১৮ মে ২০২১  
ছোটগল্প || গদাই লস্করি 

সময় নেই। হাতে সময় থাকে না। মানুষজন এর মধ্যে আসে। দু’চারজন গ্রাহক। কেউ খাতা, কেউ কলম; একজন এসে পটেটো চিপস চান, অন্যজন পানির বোতল। এসবের মধ্যে কেউ কেউ ফ্লেক্সিলোড-আইটপ কিংবা বিকাশ-নগদ। এভাবেই দিন চলে যায়। সময় কোথায়? এরপর নেশা- ফেসবুক। একদিন লগইন না করলে পেট গুড়গুড় করে। এখন অন্য নেশা নেই। স্কুল-কলেজ জীবনে ভরদুপুরে মাতাসাগর যাওয়া হতো। তালের রসের লম্বা কলসের মুখ বেয়ে গ্যাঁজানো ফেনা গড়িয়ে পড়ে। শুকনো মুখ আর গলা শিরশির করে ভিজে ওঠে। এক-দুই গ্লাস মেরে বাড়ি ফেরা। চোখ-মুখ লাল। কেউ যাতে টের না পায় সে-জন্যে ছোট এলাচ বা দারুচিনির দু’এক টুকরো চিবিয়ে নেয়া।

এখন সে-সব কালেভদ্রে হয়। আজকাল দোকান খুলে বসে থাকাই কাজ। সঙ্গ দেয় মোবাইল। বাম হাতের তালুতে রেখে গভীরভাবে দেখতে হয়। ফেসবুকে কে কী লিখেছে? কখনো বাংলা ছায়াছবির ক্লিপ। অন্যকিছু আর ভালো লাগে না। দোকানদারিও। আলম হাতের মোবাইল একপাশে রেখে খাতা খোলে। স্মার্ট মোবাইল। সাড়ে চার ইঞ্চি ডিসপ্লে। পুরাতন। সেটাই দিনে কুড়িবার স্যাভলন দিয়ে মোছে। একটু উজ্জ্বল হয়। এখন যেমন দুধের বলক ওঠার মতো একঝলক আলো ছড়িয়ে নিভে যায়। আলম এবার ফুরসত পায় গ্রাহকের দিকে তাকাবার। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘কত?’
‘কুড়ি টাকা।’
‘উনিশ টাকা পাবেন।’
‘এক টাকা কম কেন?’
‘সমিতির সিদ্ধান্ত।’
‘তা হলে উনত্রিশ দেন। ফ্রি ইন্টারনেট প্যাকেজ আছে।’
‘ত্রিশ টাকা দেন।’
‘এবারও এক টাকা বেশি!’
‘ভাংতি নেই। ত্রিশের উপরে নেন বেশি লাগবে না।’

আলম ড্রয়ার থেকে ফিচার মোবাইল বের করে। গতরাতে কিছু ব্যালেন্স রেখেছিল, সেখান থেকেই ফ্লেক্সিলোড করা যায়। তার আঙুল চলে। মুখে বিড়বিড় শব্দ। জিরো ওয়ান সেভেন ওয়ান এইট...। রাস্তায় মানুষজনের কথাবার্তা। অস্থির দ্রুত যাতায়াত। আজ সকাল সকাল ভিড়। এখানে-ওখানে চার্জার রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীর সঙ্গে দরদাম। আলম একটি রিকশার আবদার করেছিল। ব্যবসার যা অবস্থা! এভাবে জীবন চলে? কুলসুম অবশ্য ‘না’ বলেনি। ঋণ পরিশোধ হলেই এনজিওতে আবার লোন অ্যাপ্লিকেশন করবে।

আবুদস সালাম, লোন সুপাভাইজার সপ্তাহ দুয়েক আগে এসেছিল। মাঠকর্মী বেবির অভিযোগ- এই সমিতিতে নাকি কিস্তি ঠিকমতো কালেকশন হয় না। কয়েকজন খেলাপি। কয়েকজন মহল্লা ছেড়ে পালিয়েছে। তার মধ্যে কুলসুমের নামও গত সপ্তাহে খেলাপির তালিকায় উঠে গেছে। আবদুস সালাম ঘোড়ামুখো মানুষ। মোটিভেশনাল কথাবার্তায় অনেক চৌকস। পরিশেষে সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহ সময়। অগত্যা আলমের সঙ্গে পরামর্শ শেষে কুলসুম পরদিন ঠাকুরগাঁও রওয়ানা দেয়। বড় ভাইয়ের কাছে থেকে অন্তত হাজার পাঁচেক আনতে পারলে লোন অ্যাডজাস্ট করা যায়। একটি ছোট্ট আবদারও আছে আলমের। একটি ইলিশ মাছ- কত যুগ খাওয়া হয় না!
কুলসুম টপাস করে বলে বসে, ‘তোমার মুখের স্বাদ দেখতে গেলে তো কিস্তি আদায় হয় না। এত যে টাকা এনে দিলাম, সমিতি থেকে লোন নিয়ে দিচ্ছি, কিছু তো করতে পারছ না। বড় বড় গল্প করেই দিন পার। দোকানে আড্ডাবাজি বন্ধ করো বুঝলে। সংসার দেখো।’
‘সে-সব উঠিয়ে দিয়েছি। দুটো টুল ছিল, ভেতরে তুলে রেখেছি। বসার জায়গা কোথায়? আড্ডা হবে কোত্থেকে?’
‘তারপরও তো সেদিন দেখলাম, কে যেন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এসব কী?’
‘আ রে তিনি হলেন জব্বার স্যার, কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল, মানি লোক। কথা বলছেন। নিষেধ করা যায়?’

কুলসুম অন্য কাজে চলে যায় নাকি তাকে মুক্তি দেয়, সে-সব আর ভাবে না আলম। সে গল্পবাজ মানুষ। গল্প করতে, আড্ডা দিতে ভালো লাগে। অবশ্য কখনো কখনো একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। কেউ কেউ তাই অপছন্দ করে। আলম সব বোঝে। তার গল্পের কোনটি যে সত্য আর কোনটি যে গুলতাপ্পি সে ছাড়া আর জানে কে? কেউ আড়ালে-আবডালে তাকে চাপাবাজ, চাপাড়ু আলম, অনেককিছু বলে ডাকে। সবই বোঝে সে। মানুষের মুখ তো বন্ধ করা যায় না। মুখ হলো কামান, সেখান থেকে গোলা বেরিয়ে গেলে, কোথায় ধ্বসে যাবে, কোথায় আগুন লাগিয়ে দেবে কে জানে। কুলসুম অবশ্য ঠাট্টা নাকি সিরিয়াস, এক সন্ধ্যায় মন্তব্য করে, ‘তোমার মুখ হলো গিয়ে পায়ুপথ। ফুসফুস করে পাদতে পাদতে বিকট শব্দে দুপুর কাঁপিয়ে দাও।’
‘এমন কথা বলছ কেন কুলসুম? কোথায় আর কী বললাম?’
‘কেন মনে নাই, সেদিন শাহিন ভাই এলো, তুমি তাকে কাতারের গল্প শোনালে। তিনি নিজেই তো মধ্যপ্রাচ্যে সাত-আট বছর কাজ করছেন, তার কাছে এসব গল্প করা কেন? ফুপাতো ভাইটা কী মনে করল! তোমার আন্ডারে নাকি বিশাল এক অফিস। পচিশ-ত্রিশটা কম্পিউটার, ওয়াইফাই-ইন্টারনেট, ত্রিশজন কর্মচারী, তোমার সই ছাড়া বেতন হয় না কত কি! সব জায়গায় চাপা চলে না বুঝেছ। তুমি ছিলে শ্রমিক। শহর থেকে পিকআপ ভ্যানে ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যেত পাথর ভাঙার জন্য। বেতন ভালো ছিল। সেও তো টিকতে পারলে না। বড়ভাই কত তদবির আর টাকা খরচ করে পাঠিয়েছিল।’
‘এসব তোমায় কে বলল? বড়ভাবী? একজন বাজে মহিলা। ভাইকে দাস বানিয়ে রেখেছে।’
‘নিজের দোষে সকল আত্মীয়স্বজন হারিয়েছ তুমি। অন্যের দোষ দিয়ে কী হবে? আড্ডা আর কল্পনায় বাতাসা খাওয়ার দুনিয়া থেকে বাস্তবে নেমে আসো। দোকানদারি ঠিকমতো করো।'

আলমের চেহারায় কেউ বুঝি ঝামা ঘষে দেয়। মনের মধ্যে অসম্ভব রাগ। কেউ বোঝে না তাকে। পরিচিত মানুষজন-বন্ধুবান্ধব কেউ আপন নয়। আজকাল কুলসুম অনেক দূরের মানুষ। সেও অনায়াসে উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে বসে। এমন মন খারাপ নিয়েই দোকানে আসে আলম। পৈতৃকসূত্রে ভাড়া নেওয়া পত্রিকার দোকান। ব্যবসা ভালো চলছিল। শহরের মানুষজনের আগমন, নিয়মিত গ্রাহক, দিনশেষে ভালো মুনাফা; বাবা চলে যাওয়ার পর সব ভেসে গেল। সেও এক কাহিনি বটে। আলম এখন সে-সব দিনের ছবি ভাবতে ভাবতে কখনো ক্লান্তি কখনো বিরক্তি বোধ করে। ভালো লাগে না আর। বন্ধুবান্ধবদের কেউ কেউ তরতরিয়ে উপরে উঠে গেল। তাদের বাঘ-ভাল্লুক মারার কোনো গল্প নেই। ডার্কহর্সের মতো এগিয়ে চলা। আলম কী করল? এখন একটি চার্জার রিকশা কিনতে পারলে হাতে কিছু টাকা আসতো। সে ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিচার মোবাইল ডিসপ্লেতে মনোযোগী হয়। 
‘নম্বর মিলিয়ে নেন। জিরো ওয়ান সেভেন ওয়ান এইট...।’
‘ঠিক আছে। উনত্রিশ কিন্তু।’
‘হ্যাঁ...হ্যাঁ, বুঝলেন নম্বর কনফার্ম করে নিলে আমার দায় থাকে না। একবার এক মহিলার তিনশ টাকা ফ্লেক্সি করে দণ্ডি দিতে হয়েছে। সেই মহিলা নম্বর ভুল করল, আর আমার খেসারত।’
‘সাবধান থাকা ভালো।’

আলমের মোবাইল টুং শব্দে বেজে উঠল। স্মার্ট ফোন। একঝলক আলো তুলে জানিয়ে দিল বার্তা এসেছে। সে সেদিকে তাকিয়ে অস্থির প্রায়। ক্যাশে ত্রিশ টাকা রেখে হাতের তালুতে তুলে নিল মোবাইল। মিজানুর মেসেঞ্জারে রিপ্লাই দিয়েছে মনে হয়। একটা চাঞ্চ দিলে কেল্লা ফতে। আলমের চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। চশমার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি হামলে পড়ে। এখন তো নায়ক হওয়ার বয়স নেই। দেখতে দেখতে চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন হয়ে গেল। সার্টিফিকেটে অবশ্য আটচল্লিশ। আজরাইলের খাতায় কত কে জানে! বয়স চুরির দায় তো টানতে হবে। সেখানে জারিজুরি চলে না। জেলখানা মসজিদের ঈমাম, আমিনুল হক, নোয়াখালির মানুষ। এখানে মাঝে মধ্যে আড্ডা দিতে আসে। রাস্তার ওপারে মঞ্জুরুলের চা-স্টল। প্লাস্টিকের প্যাকেটে কেক ঝোলে। সেইসঙ্গে কলা। কতদিনের কেক কে জানে! কলা কার্বাইডে পাকা, পেকে পেকে বাইরে বাহারি হলুদ; ভেতরে গজগজ শক্ত আর বিস্বাদ। আলম চা খাওয়ায়। চিনিছাড়া চা কষাটে, তবু খেতে হয়; ডায়াবেটিস। ব্লাড সুগার প্রায়শ বারো-চোদ্দো-আঠারো ওঠানামা করে। কোনোদিন দোকানে আসতে ইচ্ছে করে না। কুলসুমও নিষেধ করে। স্কুল খোলা থাকলে কোনো নিষেধ শোনে না আলম। শোনার উপায় এবং সুযোগ নেই। একদিন আমিনুল থুতনির একগোছা দাড়ি নড়িয়ে বলে উঠে, ‘বুইচচেননি, আল্লার আরসের নিচে এক গাছ আছে। হের নাম হইল গিয়া হায়াতের গাছ, মানে বুইচচেননি; আয়ুর গাছ। সেই গাছের পাতায় দুইন্যার সকল আদমের নাম-ঠিকানা লেখা। একডা করি পাতা ফড়ি যাইব, বাতাসে ভাইসতে ভাইসতে উইড়া গিয়া পড়ব আযরাইলের হাতে, পাতায় নাম-ঠিকানা দেওয়া আছে; ব্যস খেল খতম। আযরাইল হেই মাইনষের জান কবজ কইরা লইব। ভাই তো জানেন, আযরাইলের কোনো দয়ামায়া নাই।’
‘জানি তো। আরও একজনের বুকে কোনো দয়ামায়া নাই, জানেন?’
‘সে ব্যাডা আবার কেডা?’
‘কেন? সীমার? আপনি মীর মোশারফের বিষাদ সিন্ধু পড়েন নাই? ইয়া মোটা বই। এক হাজার পৃষ্ঠা। আমি এক ঘণ্টায় শেষ করেছি। আপনি পড়েন নাই? হুজুর মানুষদের তো পড়া উচিত।’
‘সীমার তো কাফের। সে বই পইড়ছি। এক হাজার পৃষ্ঠার তো না, তিন সাড়ে তিনশ পাতা হইব।’
‘আপনি অরিজিনাল পড়েন নাই। অরিজিনালটা একহাজার পৃষ্ঠার মতো।’
‘ও আইচ্ছা। তয় ভাইজান উডি।’

আলম তাকিয়ে থাকে। খেলা ঠিক জমল না। কোথায় একটু গল্পগুজব করবে, বাঘ শিকারের দু-একটি বোম; সে সুযোগ মাটি হয়ে গেল। সে হাতের কাছে রাখা সাপ্তাহিক পত্রিকায় আরও একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। সালমান শাহর মৃত্যু নাকি আত্মহত্যা প্রচ্ছদকাহিনি। একটি বই লিখবে। সালমান খানের মৃত্যু রহস্য। সে আর সময় করে বসা হয় না। শীতকাল এলে লেপমুড়ি দিয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে গুমোট গরম। শেষ কবে ছবি দেখেছিল? মনে পড়ে না। আজকাল এমনই হয়। কিছু ভালো লাগে না। বয়স হচ্ছে। স্মৃতি কখনো ড্রপ করে। শৈশব আর কৈশোরের দিনকাল জেগে ওঠে সহসা। অথচ একটু আগে কত টাকা ফ্লেক্সিলোড দিল মনে থাকে না। মনের পরতে পরতে এখন অনলাইন ফেসবুক। বড়ই মজা। কোনোদিন কোনো ভাবনা লিখে দেয়। হোয়াটস্ ইন ইয়োর মাইন্ড। কোনোদিন নাথিং। পারিবারিক গ্রুপছবির দু-একটি পোস্ট মেরে লিখে দেয়: আমাদের জন্য দোয়া করবেন, অথবা আজ বড়বোনের মেয়ের বিবাহের দাওয়াত খেয়ে আসলাম। বিরিয়ানি আর বোরহানির গন্ধ হাতে-মুখে লেগে আছে। আমিন...সুম্মা আমিন।

আলম আজও যথারীতি ঘুম থেকে জেগে লগইন করে। গ্রামীণ ফোনের সতেরো টাকায় এক জিবি অফার। ইউটিউবে হারানো দিনের ছবি দেখা হয়। ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’। রিমঝিম বরষাতে কত কথা মনে পড়ে। কত না স্মৃতি বুক উথাল-পাথাল করে দেয়। চোখের দৃষ্টি ভিজে উঠে। সে একহাতে মোবাইল নিয়ে সামনে এগোয়। কুলসুমকে দেখিয়ে আসা যাক। সে ভোর-সকালে ওঠে। ফযরের নামাজ পড়ে নাশতা তৈরি করতে লেগে যায়। ছেলেমেয়ের স্কুল-কলেজ। কুলসুম আটার মণ্ড ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করে, ‘কী?’
‘দেখ এই সেই ছবি, মডার্ণ সিনেমায় দেখেছিলাম। আমরা তিন বন্ধু মিলে। প্রথম শো-তেই প্রথম মার বুঝলে। শাবানা-অলিভিয়ার ফাটাফাটি অ্যাকটিং।’
‘বিশাল কাজ করেছ। সেই বন্ধুরা এখন কোথায়? তোমার মতো এই ডাল আর ওই ডাল ধরে ঝুলে আছে? বান্দর কোথাকার!’

আলম কিছু বলে না। সকাল সকাল এ-সব আদিখ্যেতা না দেখানোই ভালো। কেন যে মন এমন হয়। এমন হয়, মাঝে মধ্যে মুখে রা থাকে না; নিশ্চুপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে। সকাল এগারোটায় দোকানে এসে আশপাশ-সামনে পানি ছিটিয়ে যুতমতো বসে। ফেসবুক-এ ভাবগম্ভীর পোস্ট লেখে: ‘বিদায় বন্ধুগণ। ইন্টারনেট জগৎ থেকে বিদায়।’ রাস্তার ওপারে চা-স্টলের দিকে তাকায়। পুব দেয়াল ঘেঁষে একটি বেঞ্চ। সেখানে শারাফত আর হাসানাত বসে আছে। মঞ্জুরুল গরম পানিতে কাপ ধোয়। চা-এর লিকারে কনডেন্সড্ দুধ ঢেলে চামচ নাড়ে। বাতাসে টুন টুন শব্দ ঝংকার কারও অবহেলা হয়ে ভেসে আসে। কোথায় কেউ তো ডাকল না। তারপর কী ভেবে আবার ফেসবুক লগইন। একটিও লাইক-কমেন্ট নোটিফিকেশন নেই। সহসা চোখের সামনে অন্ধকার। কেউ আলো ঘিরে দাঁড়ায়।
‘কি বে আলম, তখন থেকে তোকে ডাকছি, আয় চা খাবি, শুধু ফেসবুক নিয়ে পড়ে আছিস?’
‘আ রে না, আমি এখন ফেবুতে নাই। ওটা শালা অলস লোকের আড্ডা। ফালতু জিনিস।’
‘এখন তো ওসব বলবিই। প্রতিদিন তো বাঙ্গি ফাটাস। সেখানেও ফাটাবি।’
‘বাঙ্গি তো আপনিই ফাটে। আমার ফাটানোর দরকার পড়ে? চল চল চা খেয়ে কথা হবে।’
‘শারাফত ভাই বসে আছে। চায়ের সাথে সামুচা।’
‘গ্রেট!’

তখন একজন মহিলা এসে দাঁড়ায়। একটি ছোট মেয়ে। সে জুলজুল চোখে ঝুলে থাকা পটেটো চিপসের দিকে বারকয়েক তাকায়। আলম চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, ‘কী নেবেন বলেন? চিপস্ দেব?’
‘আপনার বিকাশ এজেন্ট নম্বরে টাকা তোলা যাবে? আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট নেই। পাঠাতে বলব?’
‘কত?’
‘দুই হাজার।’
‘এখন নেই। এজেন্ট আসেনি। দুপুর একটায় আসেন।’

আলম টেবিলের কোনা ওপরে তুলে দরজা খুলে বের হয়। হাসানাত ফিরে গেছে চা-স্টলে। সে-সময় মোবাইলে নোটিফিকেশন আওয়াজ। আলো ঝলকে উঠে। আলম কোথায় যায়? সময় হাতে নেই। চা আর সামুচার সঙ্গে একটি-দুটি কাহিনি না বললে মনে শান্তি আসে না। সে থমকে দাঁড়ায়। কুলসুম কী যেন বলে। ‘তোমার মুখ, মুখ তো নয়, পায়ুপথ, পেটের ভুটভুটি যতক্ষণ না বেরোচ্ছে, শান্তি নাই।’ 

কথা অসত্য নয়। এ হলো তার রোগ। সুভাষবাবু ভুটিবাবুর মোড়ে পান দোকান চালাতেন। তার মুখেও কত গল্প ছিল। একদা শহরে নাকি বাঘ হেঁটে বেড়াত। তার ঠাকুরদাদারা গাদাবন্দুক দিয়ে বাঘ শিকার করতেন। আলম আর দাঁড়ায় না। রাস্তা ক্রস করতে করতে ফেসবুকের নোটিফিকেশন পড়ে নেয়। রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে দু’জন। প্রথমজন কুমারি রেখা বসু। প্রোপিক: একজোড়া হলুদ ফুল। কী ফুল কে জানে। দ্বিতীয়জন জিনের বাদশা। আরবীয় বেদুঈন হাতে লাল পতাকা। ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত আগুয়ান। মুখবইয়ে মুখছবি নেই। বিমূর্ত ছবি। এসব কি ফেক আইডি? আলম ছবিতে তর্জনী স্পর্শ করে দিলে একটি ট্রান্সপারেন্ট বৃত্ত ঘুরতে শুরু করে। সার্ভার সময় নেয়...নিতে থাকে। অফারের নেট স্পিড স্লো। বৃত্ত ঘোরে...ঘুরতে থাক। কাউকে কি ছবি দেখে চেনা যায়? কেমন চরিত্র হতে পারে এই দু’জন মানুষ? একজন আবার মহিলা, সঠিক কি না কে জানে; নিশ্চয় কবি। দেশে কাকের তুলনায় কবির সংখ্যা বেশি। কে বলেছিল? মনে পড়ে না। রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। প্রোফাইল দেখা দরকার, কিন্তু নেট যে চলে না। আলম চার্জার রিকশা বাঁচিয়ে রাস্তা পেরোয়। স্টলের বেঞ্চে বসে। হাসানাত চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তারপর কেমন চলছে দিনকাল? আমাদের বসার টুল-বেঞ্চ তুলে দিলি। আড্ডাও বন্ধ।’
‘আ রে ভাই দেখছিস তো, ফ্রিজ বসিয়েছি। কোল্ডড্রিংক্স চলছে।’
‘মালপানি তবে বেশ করছিস, যা হোক তোর ব্যবসা ভালো হোক; শুভকামনা।’
‘ওয়েলকাম। আমার সমুন্ধির কর্পোরেট থেকে লোন নিয়েছি। তোদের দরকার হলে বলিস।’
‘সে-সবে তো অনেক শর্ত। ইন্টারেস্ট কত? কালেকশন ফ্রিকোয়েন্সি?’
‘অতসব বুঝি না। তোর কত লাগবে বল? পাঁচলাখ দশলাখ কোনো ব্যাপারই না। মোবাইলে একটা কল দেব, ব্যস তিনদিনের মধ্যে ক্যাশ।’
‘বলিস কী!’
‘আ রে আমি হলাম উপদেষ্টা। যে এগারোজন সদস্য, তার একজন। হুহ্ হুহ্!’
‘ওরা এগোরো জন।’
‘হা হা হা! ছবিটা এগারো দ্বিগুনে বাইশবার দেখেছি। কি ছবি মাইরি!’

এর মধ্যে তিনদিন কেটে গেছে। আলম খুব নিবিষ্ট মনে টিভি দেখতে থাকে। কুলসুম চা হাতে ঘরে এলে মুখ তুলে তাকায়। আজ হলো কী? কোনোদিন তো নিজ গরজে চা তৈরি করে না। আলম খুব আগ্রহ নিয়ে কাপে চুমুক দেয়। একটু কি কষা লাগে? তার হাতে মোবাইল। সেখানে নেট চলছে ধীরস্থির। সেদিন কে যেন বলছিল- গদাই লস্করি। এর অর্থ জানা নেই। তখন ঠিক করেছিল, কোনো অভিধান দেখে জেনে নেবে; মনে নেই। কুলসুম বলে, ‘তুমি আট-দশ লাখ টাকা লোন করিয়ে দিতে পারবে বলেছিলে কাউকে?’
‘কে বলল?’
‘কে আবার! শারাফাত ভাইয়ের বউ। ভাবী কাল দুপুরে এসেছিল। তুমি নাকি এনজিও-র উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। তোমার সুপারিশ ছাড়া লোন হয় না। ইত্যাদি।’
‘তেমন তো বলি নাই। আমি বলেছি, আমার সমুন্ধির সেখান থেকে লোন নিয়েছি। ওরা দোকানের ফ্রিজ আর মালামাল দেখে জিজ্ঞেস করল, তাই বলা।’
‘বুঝেছি। শোনো যেখানে-সেখানে লম্বা লম্বা গল্প করো না। এসব করে লাভ কি? বিপদ বাড়ে। আকতারভাই হলেন আমাদের দূর-সম্পর্কের আত্মীয়। তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না। আজ তার এনজিও আছে। তোমার পুজি নেই। তাই হাত পেতে একলাখ টাকা লোন করে দিয়েছি। সেই লোন ঠিকমতো পরিশোধ করলে কথা রক্ষা হয়, মানও থাকে। এখন গুলতাপ্পি ছেড়ে মন দিয়ে দোকানদারি করো।’

আলম নিশ্চুপ। একটিও কথা নেই। চায়ের কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উপরে উঠে যায়। বড় বিস্বাদ লাগে চা। নিজেকে তার লুকোনোর কোনো ফাঁকফোকর নেই। সে কী করে? অন্ধকারে মাথা নিচু অকারণ কিছু হাতড়ে চলে? তখন মোবাইলের ফেসবুক আসে আর যায়। নেট স্পিড অনেক স্লো। গদাই লস্করি চাল। একটি বৃত্ত ঘুরছে...ঘুরতে থাকে। আলমের মাথা ঘোরে। এই বৃত্ত থেকে সে বেরোবে কবে? বেরোতে পারবে? কে জানে?

 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়