ঢাকা, সোমবার, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অন্ধকার থেকে আলোর পথের যাত্রী ওরা

শাহীন রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২১ ৮:২৬:৩৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২১ ১২:৩৫:৫৪ পিএম

ছেলেবেলা থেকে খেলাধূলা, গানপাগল ও সংস্কৃতিপ্রেমি ছিলেন কল্লোল। স্কুলজীবন পার হতে না হতে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকে জড়িয়ে পড়েন। ১০/১১ বছর মাদকে এতটাই বুঁদ হয়েছিলেন যে এমন কোনো নেশাদ্রব্য নেই যা তিনি গ্রহণ করেনি।

নেশাগ্রস্ত ছেলের কারণে প্রতিবেশী ও সমাজের কাছে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে পড়ে তার স্বচ্ছল পরিবারটি। এর মধ্যে তার এক বন্ধু মাদকে জড়িয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তখন থেকে যেন হুশ ফিরে আসে কল্লোলের। ছেড়ে দেন মাদক। কাজ শুরু করেন মাদকের বিরুদ্ধে। হয়ে ওঠেন একজন ব্যবসায়ী।

শুধু কল্লোল নিজে নন, মাদক থেকে অন্তত অর্ধশতাধিক তরুণকে সুপথে ফিরিয়ে এনে  সৃষ্টি করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। গঠন করেছেন মাদকবিরোধী ‘মানাব’ নামের সংগঠন। এখন তিনি মাদক নির্মূল আন্দোলনের অগ্রনায়ক।

অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর পথে ফিরে আসা এই যুবকের পুরো নাম মাসুম পারভেজ কল্লোল। তিনি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার স্কুলপাড়া শিশুবাগান এলাকার প্রয়াত ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের ছেলে। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের পাশপাশি তিনি ঈশ্বরদী বাজারের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ঈশ্বরদীর সামাজিক অঙ্গনেও তিনি পরিচিত মুখ।

আলোর পথে ফিরে আসার গল্প জানতে চাইলে মাসুম পারভেজ কল্লোল বলেন, বাল্যকালে স্কুলজীবনে ফুটবল খেলা, গিটার বাজানো ও গান শেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ১৯৯৪ সালে কয়েকজন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মাদকের আড্ডায় যাওয়া-আসা থেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। টানা ১০/১১ বছর তাকে কোনোভাবেই মাদক থেকে ফেরানো যায়নি।

কল্লোল জানান, ২০০৪ সালে শিলু নামে তার এক বন্ধু যিনি স্থানীয়ভাবে খুব ভালো সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন, তিনি মাদকাসক্ত হয়ে করুণভাবে মারা যান। প্রিয় বন্ধুর অকালে মারা যাওয়া দেখে তিনি সম্বিত ফিরে পান। নিজের জীবন অকাল প্রয়াত বন্ধুর জীবনের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে মাদকদ্রব্য থেকে আলোর পথে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপরের গল্প অন্য এক জীবনের।

আলাপকালে কল্লোল জানান, মাদকের পথ থেকে ফিরে আসার পর প্রথম প্রথম তাকে অনেকে বিশ্বাস করতেন না, নিজেও এ নিয়ে কষ্ট পেতেন। মাদকবিরোধী কথাবার্তা বললে তাকে অনেকে হেয় করে কথা বলতেও ছাড়তেন না। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু দেখে ‘ও পথে আর না’- এই মন্ত্র সংকল্প হিসেবে নিয়ে লোকলজ্জা, পেছনের কথা, অন্ধকার জগতের স্মৃতি সব মুছে ফেলে নতুন করে এগিয়ে যান আলোর পথে।

 

 

এক পর্যায়ে প্রিয় বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় খেলাধূলা ও সঙ্গীত চর্চায় মনোনিবেশ করতে গিয়ে মাদকবিরোধী গানের প্রতি ঝোঁক অনুভব করেন কল্লোল। তার ভাবনায় আসে  গানের মাধ্যমে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাদকের জগৎ কতটা ভয়ানক তা তরুণ প্রজন্মকে জানানো গেলে মন্দ হয় না। তার ডাকে সাড়া দিয়ে একে একে প্রায় অর্ধশত তরুণ-যুবকরা এগিয়ে আসে। এভাবে গঠন করা হয় মাদককে না-বলি ‘মানাব’ নামের সংগঠন।

মানাব গত ১৫ বছর ধরে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে সফল হয়েছে। মানাব-এর আন্দোলনের কারণে এখন ঈশ্বরদীতে মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে কমেছে। ‘মানাব’ এর সদস্যরা প্রতিনিয়ত মাদক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তুলে ধরে মাদক থেকে দূরে থাকার জন্য তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ঈশ্বরদীকে মাদকমুক্ত করার এই আন্দোলনে পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন পেয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে বলে জানান মাসুম পারভেজ কল্লোল।

মাদকবিরোধী এই সংগঠনটি এখন দুই জন নারী সদস্যসহ ২১ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠনের সদস্যরা কেউ মাদক দুরে থাক, ধূমপানও করেন না। মানাবের উদ্যোগে শহরের রেলওয়ে গেট এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সঙ্গীত চর্চা করা হয়। সেখানে সদস্যরা ছাড়াও অনেকে আসেন ‘ভালো কাজের’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সামিল হতে।

ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধা-খেলোয়াড় হাবিবুর রহমান হবি ও ঈশ্বরদী ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের নির্বাহী সদস্য জাফরুল ইসলাম রতন বলেন, এই তরুণ যুবকদের মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখে তারা আশাবাদী, ঈশ্বরদী একদিন মাদকমুক্ত হবে। তারা বলেন, মানাব ঈশ্বরদীতে মাদকের বিরুদ্ধে যে ভূমিকা পালন করে চলেছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে আরো বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে।

স্কুল শিক্ষিকা শারমিন সুলতানা কাকলী বলেন, তার বড় ভাই মাসুদ পারভেজ সজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন হার্ট এ্যাটাকে মারা যায়। এরপর ছোট ভাই মাসুম পারভেজ কল্লোল যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তখন পিতৃহীন সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। কিন্তু সেই আঁধার দূর করে ছোট ভাইটি ঈশ্বরদীকে মাদকমুক্ত করতে যে আন্দোলন গত ১৫ বছর ধরে করে আসছে, তাতে তারা গর্বিত।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহাউদ্দিন ফারুকী বলেন, আগে ঈশ্বরদীকে মাদকের অভয়ারণ্য মনে করা হতো, কিন্তু পুলিশের অভিযানের পাশপাশি ‘মানাব’র যুবকদের মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে মাদকব্যবসা ও সেবনকারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব রায়হান বলেন, ঈশ্বরদীতে মাদকবিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ‘মানাব’র ভূমিকা প্রশংসনীয়। তাদের যেকোনো ভালো কাজে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।


পাবনা/বকুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন