ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শূন্য পুঁজি থেকে সেরা নারী উদ্যোক্তা

শাহীন রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৩ ৮:১৬:৩৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৩ ১২:০৯:৩৯ পিএম

শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি দেশসেরা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। সুঁই-সুতায় যিনি বদলে ফেলেছেন নিজের জীবনের গল্প, তেমনি স্বাবলম্বী করে তুলেছেন তার মতো আরো সাত শতাধিক নারীকে।

বলছিলাম পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাটুলীপাড়া গ্রামের সুমনা সুলতানা সাথীর কথা। তিনি এখন সবার কাছে ‘সাথী আপা’ হিসেবে পরিচিত। তার হ্যান্ডিক্রাফট কারখানার সুনাম এখন দেশের সেরা ফ্যাশন হাউজগুলোর কাছে। চলতি বছরই পেয়েছেন ‘বর্ষসেরা জাতীয় এসএমই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা’র পুরস্কার।

যেভাবে শুরু

২০০৪ সালে অনার্সে পড়া অবস্থায় পরিবারের অমতে ভালোবেসে বিয়ে করেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাটুলীপাড়া গ্রামের সুমনা সুলতানা সাথী। স্বামী মনোয়ার হোসেন তখন বেকার। একদিকে নিজের পড়ার খরচ, অন্যদিকে সংসারের খরচ সবমিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। জানতেন সেলাইয়ের কাজ। সেটাকে সম্বল করে মেধা ও সাহস দিয়ে শুরু করেন। ঘরে থাকা কাপড় দিয়ে চারটি কুশন কাভার তৈরি করে জমা দিলেন আড়ংয়ে। দুটি কাভার মনোনীত হওয়ায় ৮০টি কুশন কাভার তৈরির অর্ডার পান। ধার দেনা করে সেগুলো তৈরি করে জমা দেয়ার পরের মাসেই ৮০ হাজার টাকা কাজ পান সাথী।

এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। গ্রামের নারীদের দিয়ে তৈরি হয় কুশন কাভার, বিছানার চাঁদর, সোফার কাভার, নকশিকাঁথা, পর্দা, টেবিল ক্লথ, কিডস ক্যারিয়ার, মেয়েদের কুর্তি, ছেলেদের ফতুয়া, পাঞ্জাবি ও শিশুদের নানা পোশাক তৈরি করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি খ্যাতনামা ফ্যাশন হাউজ আড়ং, অঞ্জনস, স্মার্টেক্স, লারিব এ তার তৈরি পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

আলাপকালে সাথী জানালেন, পাটুলিপাড়া গ্রাম ছাড়াও পাবনা জেলা সদর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও চাটমোহর উপজেলার ১০-১২টি গ্রামে তার কাজ চলছে। সুমনা বলেন, ‘অতীত না থাকলে ভবিষ্যৎ হয় না। আমি আমার অতীতকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছি। শুরু থেকে মনোবল নিয়ে পরিশ্রম করেছি, পণ্যের গুণগত মান ঠিক রেখেছি, সময়ের মূল্য দিয়েছি। এখনো তাই করছি। আমার মনে হয় পুঁজি কিছু নয়। মনোবল, একাগ্রতা, সততা ও পরিশ্রম থাকলেই সফল হওয়া যায়।’

প্রথম মাসে কত টাকার কাজ করেছেন জানতে চাইলে সুমনা জানান, ৮০ হাজার টাকা। এরপর থেকে এক লাখ, দুই লাখ করে এখন কোনো কোনো মাসে ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার কাজও করছেন তিনি। কাজের পাশাপাশি নিজের পড়াটাও চালিয়ে গেছেন। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে প্রাণিবিদ্যা থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি।

তার হাত ধরে স্বাবলম্বী ৭০০ নারী:

স্বামী-স্ত্রী মিলে ব্যবসা দেখভাল করেন। এই কাজ দিয়েই স্বামীর বসতভিটায় দোতলা বাড়ি করেছেন। নিচতলায় দিয়েছেন কারখানা। নাম দিয়েছেন ‘এসআর হ্যান্ডিক্রাফটস’। পাশাপাশি পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায় করেছেন আরেকটি কারখানা। গ্রাম থেকে নকশার কাজ শেষে কারখানায় চলে যায় কাপড়। সেখানে সেলাই, ধোয়া ও ইস্ত্রির কাজ চলে। শুধু নিজের জীবনের গল্পই নয়, সুঁই সুতার কাজে বদলে দিয়েছেন বিভিন্ন গ্রামের আরো সাত শতাধিক নারীর জীবন। সংসারের পাশাপাশি বুননের কাজ করে বাড়তি আয় করছেন তারা। সাথীর কারখানায় কার্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৩৫ জন বেকার যুবকের।

আলাপকালে ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাটুলীপাড়া গ্রামের গৃহবধু চুমকী খাতুন, তাহমিনা খাতুন, ঝরনা বেগম, জমিরন খাতুন, শেফালী খাতুন সহ অন্যরা জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাথী আপার কাছে সেলাইয়ের কাজ শিখেছেন তারা। এখন তারা অবসর সময়ে বসে না থেকে সেলাইয়ের কাজ করেন। এতে করে তাদের সংসারে কিছু বাড়তি আয় হয়। যা দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটে অনেকখানি।

সুমনা সুলতানা সাথীর কারখানা দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সুমন হোসেন জানান, লেখাপড়া শেষ করে বেকার ছিলাম। সাথী আপার সাথে পরিচয় হওয়ার পর তিনি তার কারখানায় কাজ দিয়েছেন। অভাবী সংসারে আমার এখন হাসি ফুটেছে। আমার মতো ৩৫ জন বেকার যুবককে কাজ দিয়েছেন সাথী আপা।

পুরস্কার অর্জন

চলতি বছর ‘বর্ষসেরা জাতীয় এসএমই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা’র পুরস্কার পেয়েছেন সুমনা সুলতানা সাথী। সাথীর এ অর্জনে তার পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন তার স্বামী মনোয়ার হোসেন। আগামীতে কারখানার পরিসর বৃদ্ধি করে বেশি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়ার স্বপ্ন দেখছেন এই দম্পতি।

সাথীর স্বামী মনোয়ার হোসেন জানান, যেসব এলাকায় আমাদের সেলাইয়ের কাজ হয় সেখানে একজন দলনেত্রী আছেন। তিনি তার দলের ৫০ জন কর্মীকে পরিচালনা করেন। এভাবে প্রত্যেক দলনেত্রীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য সরকার যদি আমাদের পৃষ্টপোষকতা দেয় তাহলে আরো উদ্যোক্তা বেরিয়ে আসবে।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজর সভাপতি সাইফুল আলম স্বপন চৌধুরী বলেন, সুমনা শুধু নিজে কাজ করছেন না, বেকার যুব নারী-পুরুষদের উৎসাহ জোগাচ্ছেন। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বহু নারীকে স্বাবলম্বী করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি পাবনার নারীদের আদর্শ। সাথীকে অনুসরণ অনুকরণ করে অন্য নারীরাও উদ্যোক্ত হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার জিতে আনবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

>> উদ্যোক্তাদের নিয়ে লিখুন রাইজিংবিডিতে

 

পাবনা/শাহীন/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন