ঢাকা, সোমবার, ৬ মাঘ ১৪২৬, ২০ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সাত বছর আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১৪ ৩:২৫:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১৪ ৫:৪২:০০ পিএম
নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুল, আজিজুর রহমান, ফুলজার হোসেন, শরিফুল ইসলাম খোকন ও শফিকুল ইসলাম। সর্বশেষে আটক দালাল রাজু

দীর্ঘ প্রায় সাত বছর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তারা, তারপর আর ফিরে আসেননি পরিবারে। কোনো খোঁজও নেই তাদের।

যশোরের চৌগাছায় দালালের খপ্পরে পড়ে এভাবে সাত বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছে একই পরিবারের চারজনসহ সাত জন।

আর কত অপেক্ষা? অবশেষে ঘটনার প্রায় সাত বছর পর রোববার রাতে এক দালালকে চৌগাছা শহর থেকে ধরে পুলিশে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সেদিন রাতেই নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুলের পিতা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭ ধারায় একটি মামলা করেছেন। পুলিশ এ মামলায় আটক দালাল ফজলুর রহমান রাজুকে (৪৮) গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

চৌগাছা থানায় দায়েরকৃত মামলা সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মুক্তদহ গ্রামের একই পরিবারের অমিত হাসান মুকুল (৩০), আজিজুর রহমান (৪০), ফুলজার হোসেন (৪৬), শরিফুল ইসলাম খোকন (৪০) ও একই গ্রামের শফিকুল ইসলাম (২৭), রোস্তমপুর গ্রামের রমজান আলী (৪৫) ও দুর্গাবরকাটি গ্রামের লিটন হোসেন (২৭) ২০১৩ সালের ১ জুন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছেন।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা না ফেরায় নিখোঁজদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ ও হতাশা। উৎসব-পার্বণ এলেই কান্নার রোল পড়ে যায় বাড়িগুলোতে। মানবেতর জীবনযাপন করছে কোন কোন পরিবার। এক পর্যায়ে নিখোঁজ ফুলজার হোসেনে স্ত্রী রূপভান দুই মেয়ের এবং শরিফুলের স্ত্রী রেশমা বেগম তিন মেয়ের ভরণপোষণের জন্য স্থানীয় গার্মেন্টসে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

জানা যায়, সে সময়ে জনপ্রতি ৩ লাখ টাকায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রলোভনে দরিদ্র পরিবারের এসব ব্যক্তিরা আদম ব্যাপারির খপ্পড়ে পড়েন। মুক্তদহ গ্রামে বিয়ে সূত্রে বসবাসকারী সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার গোয়ালপোতা গ্রামের ফজলুর রহমান রাজু তাদেরকে ফুসলিয়ে পানিপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানোর পর থেকে আজও তারা নিখোঁজ রয়েছেন।

২০১৩ সালের ১ জুন বাড়ি থেকে একযোগে বের হন তারা। ১২ জুন অমিত হাসান মুকুল বাড়িতে ফোন করে বলেন, ‘আমরা সবাই পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেব।’ ওই কথাই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাদের শেষ কথা।

মুকুলের স্ত্রী চামেলী খাতুন বলেন, ‘যে নাম্বার থেকে ফোন দিয়েছিল সেই নাম্বার বন্ধ পেয়েছি। বারবার চেষ্টা করেও ফোনে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর ছয়টি বছর কেটে গেলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অতিকষ্টে দিন কাটছে আমাদের।’

নিখোঁজ শরিফুল ইসলাম খোকনের স্ত্রী রেশমা বেগম তার তিন মেয়ে এবং ফুলজার রহমানের স্ত্রী রূপভান বেগম দুই মেয়ের লালন পালনের জন্য স্থানীয় ডিভাইন গার্মেন্টসে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আজিজুর রহমানের মা মনোয়ারা বেগম (৬০) হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও তাদের খোঁজ পাইনি।’

এদিকে নিখোঁজ আজিজুর রহমানের স্ত্রী দুটি সন্তান ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। দাদীর কাছে থেকেই তারা অতি কষ্টে জীবন পার করছে। তাদের পিতা আদৌ বেঁচে আছে না-কি মারা গেছে তাও জানেন না অবুঝ এই শিশুরা।

নিখোঁজের তিন মাস পর তারা মুক্তদহ গ্রামের ঘরজামাই আদম ব্যাপারি রাজুর কাছে যান। স্বজনদের ফেরত পেতে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় রাজু তার সহযোগী চট্টগ্রামের টেকনাফের অপর আদম ব্যাপারি রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন। টেকনাফের দালাল রাশিদুল তাদেরকে বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, তারা দুই-এক দিনের মধ্যেই মালয়েশিয়ায় পৌঁছে যাবেন।

কিছুদিন পরই মুক্তদহ গ্রামের ঘরজামাই দালাল রাজু তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে রাতের আঁধারে আত্মগোপনে চলে যান। পরে টেকনাফ ও মুক্তদহ গ্রামের দালালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর রাজু একই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের মেয়ে রনি বেগমকে বিয়ে করে। সেখানে যাতায়াত করলেও নিখোঁজদের পরিবারগুলো তা জানতো না। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর রোববার রাতে রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে ওইসব পরিবারের সদস্যরা তাকে ধরে মুক্তদহ গ্রামে নিয়ে যায়। পরে তাকে চৌগাছা থানায় সোপর্দ করে।

নিখোঁজ মুকুলের পিতা আতিয়ার বলেন, ‘আমার ছেলেসহ চৌগাছার সাতজন ছাড়াও ঝিকরগাছা উপজেলার আরো আটজন এই দালালদের খপ্পরে পড়ে পানিপথে মালয়েশিয়ায় রওনা দেন। প্রায় সাত বছর পার হতে চললেও কারো কোনো সন্ধান পাইনি।’

চৌগাছা থানার ওসি রিফাত খান রাজীব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আটক দালাল রাজুকে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।



রিটন/টিপু

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : যশোর, খুলনা বিভাগ