ঢাকা, বুধবার, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, ০১ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাসনিম আজ চিত্রশিল্পী

ফরহাদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২১ ৮:৩৪:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২২ ১০:১২:২২ এএম

বৃদ্ধ দাদু ছবি আঁকতেন। পাশে বসে দেখতেন তিনি। তাতেই ভালো লাগা। পরে নিজেই আঁকা শুরু করেন। ভরিয়ে দেন বই-খাতা, ঘরের দেয়াল। যদিও পাখি, মাছ, ফুল ও মানুষের ছবিগুলো দাদুর মতো সুন্দর হতো না, তবু পড়া ও খেলাধুলার ফাঁকে আঁকতেন। এজন্য বকা শুনতেন আম্মুর। তবুও থেমে যাননি।

রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপচারিতায় এভাবে ছোটবেলায় চিত্রকলার প্রেমে পড়ার কাহিনি তুলে ধরেন ফাতেমা তুজ জোহরা তাসনিম।

তাসনিম এখন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের এনজিওকর্মী ফজলুর রহিম ও মাদ্রাসাশিক্ষক নাসিমা আক্তারের মেয়ে তিনি।

ছবি আঁকায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই তাসনিমের। জানা নেই চিত্রাঙ্কনের ব্যাকরণ। নিজের চেষ্টায় শিখেছেন তিনি। নানা বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি আঁকেন তাসনিম। তার শিল্পকর্ম মুগ্ধ করেছে অনেককে। আঁকাআঁকির নেশাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। লক্ষ্মীপুরের একুশে বইমেলায় প্রদর্শিত হবে তার আঁকা ত্রিশটির বেশি ছবি। সেগুলো বিক্রি করা হবে।

একদিন আম্মু রিমোট হাতে নিয়ে বিছানায় বসে টেলিভিশন দেখছেন, এমন দৃশ্য দেখামাত্রই পড়ার টেবিলে বসে তা আঁকেন তাসনিম। এটি ছিল তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্কেচ। ছবিটি দেখার পর সন্তানের প্রতিভায় খুশি হন মা। তবুও নিষেধ ছিল আঁকাআঁকিতে। কয়েক মাস পর তাসনিমের স্কুলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়। পরে মায়ের পরামর্শেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন সেরার পুরস্কার। তাতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। অনেকের সমালোচনা উপেক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছেন চিত্রাঙ্কন।

তাসনিম তার বাসার দেয়াল ভরিয়ে ফেলেছেন নিজের আঁকা ছবিতে। অনেক ছবি উপহার দিয়েছেন বন্ধু, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের। রং-তুলিতে আঁকা প্রথম ছবি উপহার দিয়েছিলেন বন্ধু মাহমুদুল হাসান সাফিনকে। খুশি হয়ে বন্ধু বলেছেন, মনে হচ্ছে, যেন জীবন্ত জয়নুল (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন)। বন্ধুর প্রশংসায় অনুপ্রাণিত তাসনিমের ইচ্ছা বড় চিত্রশিল্পী হওয়ার। 

প্রবল ইচ্ছা ছিল চারুকলায় পড়ালেখা করার। কিন্তু সেটি পূরণ হয়নি। আক্ষেপ করে তাসনিম বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার পর ঢাকায় কোচিং করেছি। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান হওয়ায় চারুকলায় ভর্তি হওয়া হয়নি। কারণ, পরিবারের ধারণা ছিল, সেখানে ভর্তি হলে সন্তান বিপথে চলে যাবে।

তিনি জানান, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে প্রথম ছবি আঁকা শুরু করেন অনার্স প্রথম বর্ষে। ছবিগুলো ফেসবুকে আপলোড করতেন। এসব দেখে অনেকে প্রশংসা করলেও বেশিরভাগ আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠী তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গ করতেন। শুরুতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরে সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছেন মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের। সব সময় সহযোগিতা করেছেন ছোট বোন রুবাইয়া আক্তার। রুবাইয়াও চিত্রশিল্পী।

উজ্জ্বল গাঢ় রং দিয়ে ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করেন ফাতেমা তুজ জোহরা তাসনিম। তিনি বলেন, রং-তুলির এই জগতেই বাকি সময় কাটাতে চাই। নিজে কখনো ছবি আঁকা শিখতে পারিনি। এজন্য একটি আর্ট স্কুল করার ইচ্ছা আমার, যেখানে অন‌্যরা চিত্রাঙ্কনের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

ভাষার প্রদীপ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক ও সংস্কৃতিকর্মী ফাহাদ বিন বেলায়েত রাইজিংবিডিকে বলেন, আমাদের চারপাশে অনেক প্রতিভা লুকিয়ে আছে। অযত্ন-অবহেলায় চাপা পড়ে যায় অনেক প্রতিভা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া শত বাধা ডিঙিয়ে নিজ শিল্পীসত্ত্বাকে লালন করছেন তাসনিম। তার মঙ্গল কামনা করি।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবীদের যত্ন নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফাহাদ বিন বেলায়েত।

 

লক্ষ্মীপুর/ফরহাদ/রফিক