ঢাকা, সোমবার, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘৩ দিন চুলাত আগুন জ্বলেনি, শশা খ্যায়ে আচি’

শামীম কাদির : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৫ ৯:২৫:৪৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৫ ৬:০৭:৩৫ পিএম

‘পাল্লাত (পাতিলে) চাল নাই। কী দিয়ে ভাত আন্দিমু? তিন দিন হচে কোনো কেছু আন্দার (রান্নার) নাই। চোকাও (চুলা) জ্বলেনি। হামরা শশা খায়ে কোনোরকম আচি।’

রোববার (৫ এপ্রিল) ভোরে না খেতে পেয়ে কষ্টের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন জয়পুরহাট পৌর শহরের তাঁতীপাড়া বস্তির বাসিন্দা আয়েনা বেগম।

এই বস্তিতে ১৫ বছর ধরে বাস করছেন জিয়ারুল হোসেন ও আয়না বেগম দম্পতি পরিবার। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শহরে এখন অঘোষিত লকডাউন চলছে। আর এতে কাজ হারিয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন এই দম্পতি। তাদের ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে। টাকার অভাবে বড় ছেলেকে পড়াশোনা করাতে পারেননি তারা। যেখানে কাজে দিয়েছেন, সেখানে তার খাওয়া পড়া চলতো। কিন্তু সেখানেও এখন কাজ বন্ধ। অগত্যা সেই ছেলেও এখন বাসায় বসে আছে। দুই সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন পার কররেছন তারা। দুজন উপার্জন করলেও বর্তমানেই দুইজনই বেকার।

জিয়ারুল হোসেন দিনমজুরের কাজ করতেন। প্রতিদিন কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়ে তাদের সংসার চলতো না।  বাধ্য হয়ে সংসার চালিয়ে নিতে আমেনা বেগমকে শহরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে রান্নার কাজ করতে হতো। কিন্তু হঠাৎ মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এখন শহরের ছাত্রাবাসও বন্ধ।

করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট দুর্যোগে রোববার সকাল পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি তারা। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে সকালে ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে ত্রাণের জন্য বের হয়েছেন আয়না বেগম।

ক্ষুধার্থ আয়েনা বেগম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে ঘরবন্দী হয়ে আছি আমরা। কোনো কাজ নাই। ঘরে যেটুকু চাল ছিল তার শেষ হয়ে গেছে। হাতেও কোনো টাকা নাই। তাই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে বলতে গেলে প্রায় না খেয়েই আছি। ছোট মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায় না। মা ক্ষিদা লাগছে বলে বলে কান্দে। এখন আমি চাল কই পাবো? খাবার কই পাবো? গত তিন দিন থেকেই চুলায় আগুন জ্বলেনি। বাধ্য হয়ে ছেলেমেয়েদের শশা দিয়েছি। এই শশা খেয়ে তিন দিন হলো আছি।’

আমেনা বেগম কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের জন্য সবাই শুধু হাত ধুতে বলে। আমরা হাত ধুয়ে কী করবো? পেটে ভাত না থাকলে হাত ধুয়ে কী হবে? আমরা করোনাতে মরবো না, ওটার জন্য আমাদের ভয় নাই। কিন্তু আমরা তো ক্ষুধার জন্য মরতেছি। ক্ষুধার জ্বালা তো সহ্য হয় না। ছোট মেয়েটার কান্না আর সহ্য হয় না।’

জিয়ারুল হোসেন বলেন, ‘দিনমজুরের কাজ করে কোনও রকম দিন পার করতাম। করোনা ভাইরাসের জন্য এলাকাতে কাজ নাই। প্রায় সাতদিন হলো আমি বেকার। এভাবে বেঁচে থাকা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে না খেয়ে থাকলেও কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। এখানকার জন-প্রতিনিধিরা আমাদের খোঁজ নেয়নি। আমরা সরকারিভাবে কোনও সহযোগিতা পাইনি। আপনারা কিছু সাহায্য করেন।’

তাঁতী পাড়া বস্তি উন্নয়ন কমিটির সভাপতি কনিকা খাতুন জানান, এই বস্তিতে জিয়ারুল হোসেন ও আমেনা বেগম দম্পতির মতো অনেকেই রয়েছে। করোনা ভাইরাসের জন্য খেটে খাওয়া এ মানুষগুলো কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে তাদের ঘরে খাবার নাই। রান্না হয় না।  এই অসহায়দের পাশে কেউ দাঁড়ায় না।

এ বিষয়ে জয়পুরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন চন্দ্র রায় বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মহীন মানুষের মাঝে সরকারি খাদ্য সহায়তা দেয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবার মাঝে খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে। খোঁজ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত আমেনা বেগম ও জিয়ারুল হোসেন দম্পতির বাড়ি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে যাবে।

 

জয়পুরহাট/বুলাকী