ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

করোনা পরিস্থিতিতে লোকসানের আশঙ্কায় গোপালগঞ্জের খামারিরা

বাদল সাহা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:২২, ১৩ জুলাই ২০২০  

গোপালগঞ্জের সোনাখালী গ্রামের বাসিন্দা হালিম গাজী। বয়স প্রায় ৬৮। কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে চলত সংসার। এবারের কোরবানির ঈদকে মাথায় রেখে ছয়টি দেশি গরু কিনে ৮/১০ মাস লালন পালন করে মোটাতাজা করেছেন। কিন্তু এবার তার কপালে দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ। করোনা পরিস্থিতিতে গরুগুলো বিক্রি করতে পারবেন কি না, সেই চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটছে তার। শুধু তিনিই নন, এমন চিন্তা জেলার সাড়ে চার হাজার খামারির।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় রয়েছে সাড়ে চার হাজার খামারি। এবারের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে লাভের আশায় গোপালগঞ্জ জেলায় ৩৪ হাজার পশু মোটাতাজা করা হয়েছে। এর মধ্যে খামারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে ২০ হাজার গরু ও ১৪ হাজার ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করে মোটাতাজা করা হয়েছে।

শুক্রবার ট্রালারে করে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী সোনাখালী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সোনাখালি গ্রামটি গড়ে উঠেছে সোনাখালি বিলের মধ্যে। নিন্ম আয়ের কৃষক পরিবারগুলো সামান্য মাটি কেটে ভিটা তৈরী করে সেখানে বসতি গড়েছেন কয়েক দশক আগে। বছরের প্রায় ৯ মাস এই গ্রামটি জলমগ্ন থাকে। শীত মৌসুমে একবার ফসল ফলে। তাই দশকের পর দশক ধরে এখানকার মানুষ পশু পালন করে তাদের জীবিকা চালিয়ে আসছেন।

কোরবানির পশুর চাহিদা মেটানোর জন্য গত প্রায় তিন দশক ধরে এই গ্রামবাসীরা গরু পালন করে আসছেন। গ্রামটিতে বসবাস প্রায় ৫০০ পরিবারের। সকল পরিবারই বাড়ির আঙ্গিনায় গরু পালন করে। ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত গরু পালন করে এক একটি পরিবার। দেশি প্রজাতির এড়ে গরুর বাচ্চা অপেক্ষাকৃত কম দামে কিনে তারা সেগুলোকে পালন করেন। আর তাদের এই গরু পালনে প্রকৃতিও যেন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিল ভরা অবারিত প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঘাস কৃষক গরুর খাবার হিসাবে ব্যবহার করেন। সঙ্গে সামান্য খইল-ভুষি। তাতেই চার মাসে গরুগুলো হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে।

দেশি জাতের হওয়ায় এবং হরমোন ইনজেকশন ব্যবহার না করায় প্বার্শবর্তী জেলা বরিশাল ও বাগেরহাটের হাট ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন হাটেও এখানকার গরুর চাহিদা থাকে। তবে এবছর করোনার কারণে কোন ক্রেতাই এখন পযর্ন্ত আসেনি।

এমনকি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ ও দাদন নিয়ে এসব পশু পালন করেছে খামারিরা। করোনার প্রভাবে দফায় দফায় পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় এবার খামারিদের খরচও বেড়েছে দ্বিগুণ। এসব গবাদি পশু বিক্রি নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন খামারিরা। ফলে কোরবানির ঈদে শেষ পযর্ন্ত গরুগুলো বিক্রি করতে পারবেন কি না তা নিয়ে দিন-রাত দুশ্চিন্তায় আছেন খামারিরা। পাশাপাশি ভারতীয় গরু দেশে আসার আশঙ্কায় রয়েছেন খামারিরা। ভারতীয় গরু দেশে আসলে লোকসান গুনতে হবে খামারিদের।

সোনাখালী গ্রামের মিলন গাজী, মনিরুজ্জামান গাজী, জানান, অধিক লাভের আশায় এবার গরু মোটাতাজা করেছি। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সবসময় আমাদের পাশে থাকায় এবার কোন গরু খোড়া রোগে আক্রান্ত হননি। বিক্রি করে লাভের আশাও করেছিলাম। কিন্তু করোনা আসায় লাভ তো দূরের কথা, গরু বিক্রি করতে পারবো কি না সেই চিন্তায় রয়েছি।

বিকাশ মন্ডল, প্রভাস মন্ডল জানান, সোনাখালি গ্রামের শতভাগ পরিবার গরু পালন করে। খইল, ভুষি আর বিলের ঘাস খাইয়ে আমরা গরু পালন করি। কোন রাসায়নিক, ট্যাবলেট, হরমন ইনজেকশন ব্যবহার না করার কারণে সোনাখালির গরুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এখন পযর্ন্ত একটি গরু বিক্রি করতে পারিনি।

সবুর গাজী বলেন, করোনার জন্য আমরা গরু বিক্রি করতে পারছি না। হাটবাজারও বসেনি। ভুষি ও কুড়ার যে দাম, তাতে বাঁচতে পারতেছি না। কোরবানিতে যদি বেচতে না পারি, তাহলে মরণ ছাড়া আমাদের গতি নাই।

গোপালগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আজিজ আল মামুন বলেন, এ বছর জেলায় ৩৪ হাজার পশু মোটাতাজা করা হয়েছে। কোন প্রকার ক্ষতিকারক ঔষধ ছাড়াই ঘাসের সঙ্গে খড় ও ভুষি খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে। গরু মোটাতাজা করতে কোন অপদ্রব্য ও ঔষধ ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা হচ্ছে। এখানকার গরু দিয়ে জেলার চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও রপ্তানি করা যাবে। করোনার কারণে এবছর গোপালগঞ্জের খামারিদের একটু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে হাটগুলো ঠিকভাবে বসলে ও ভারতীয় গরু বাজারে না আসলে গোপালগঞ্জের খামারিরা লাভবান হবে।

 

গোপালগঞ্জ/বাদল সাহা/সাজেদ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়