ঢাকা     বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭ ||  ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ঈদেও ফাঁকা সাতছড়ি-কালেঙ্গা

মামুন চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০০, ২ আগস্ট ২০২০  
ঈদেও ফাঁকা সাতছড়ি-কালেঙ্গা

হবিগঞ্জ জেলার এক পাশে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত চা বাগান। আছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও কালেঙ্গা অভয়ারণ্য। চা বাগানের মধ‌্যে আছে পাহাড়ি ছড়া।

এসব মনোরম স্থান পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়েছে। ছুটিছাটা বা ঈদ-পার্বণে মানুষ ছুটে আসতো এসব মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পট গুলোতে। 
তবে এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতেও হবিগঞ্জের বৃষ্টিস্নাত সাতছড়ি ও কালেঙ্গা ফাঁকা পড়ে আছে। করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশনায় এসব স্থানে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। প্রকৃতির ছোঁয়ায় প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটা উপভোগ করা থেকে বিরত থাকতে হয়েছে পর্যটকদের।

অথচ অন‌্যান‌্যবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব পর্যটন স্থানগুলোয় পর্যটকদের ভরপুর উপস্থিতি থাকে। বর্তমানে পর্যটক সমাগম বন্ধে কর্তৃপক্ষ যেমনি সজাগ, তেমনি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রকৃতির সৌন্দর্যমণ্ডিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গার অভয়ারণ্য। এসব বনের ভেতরে এঁকেবেঁকে চলেছে বালুময় কয়েকটি ছড়া। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের উন্নয়নে বন বিভাগ, প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ও সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা ও সিলেট থেকে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার পথ। জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্ত্বর এলাকায় নেমে মাত্র ৩০ মিনিটে অথবা শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজে নেমে সেখান থেকে ৫০ মিনিটে যাওয়া সম্ভব সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে।

তেলিয়াপাড়া রেল গেইট পার হলেই চোখে পড়বে যেন নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া সবুজ চা বাগান। তবে রেমা-কালেঙ্গা যেতে সময় আরো বেশি লাগবে।

সাতছড়ি বন্যপ্রাণি সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন জানান, সাতছড়ি উদ্যানের ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯১২ সালে। ওই বছর প্রায় ১০ হাজার একর দুর্গম পাহাড়ি জমি নিয়ে গঠিত রঘুনন্দন হিলস্ রিজার্ভই কালের পরিক্রমায় আজকের উদ্যান। অবশ্য জাতীয় উদ্যান হওয়ার ইতিহাস বেশিদিনের নয়।

২০০৫ সালে ৬০০ একর জমিতে জাতীয় উদ্যান করা হয়। এ উদ্যানের ভেতরে রয়েছে অন্তত ২৪টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস। রয়েছে বন বিভাগের লোকজন।

রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘‘পর্যটকদের জন্য তৈরি প্রজাপতি বাগান, ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার ট্রেইল, খাবার হোটেল, রেস্ট হাউস, মসজিদ, রাত যাপনে স্টুডেন্ট ডরমিটরি—সবই এখন নিস্তব্ধ।

‘উদ্যানে দুই শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধা জারুল, আওয়াল, মালেকাস, আকাশমনি, বাঁশ, বেত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭ প্রজাতির জীব-জন্তুর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ছয় প্রজাতির উভচর। আরও আছে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি।

‘রয়েছে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, শিয়াল, কুলু বানর, মেছো বাঘ, মায়া হরিণের বিচরণ। সরীসৃপের মধ্যে আছে কয়েক জাতের সাপ। কাও ধনেশ, বন মোরগ, লাল মাথা ট্রগন, কাঠঠোকরা, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলদে পাখি, টিয়া প্রভৃতির আবাসস্থল এই উদ্যান।

‘এসব থাকায় সাতছড়িতে দিন দিন পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে উদ্যান বন্ধ আছে। তবে উদ্যানের নিরাপত্তায় আমরা কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করছি।”

কালেঙ্গার রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আলা উদ্দিন জানান, রেমা-কালেঙ্গার অভয়ারণ্য মূলত তরফ পাহাড় সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশ। যা দেশের প্রাকৃতিক পার্বত্য বনভূমির মধ্যে সর্ববৃহৎ। অভয়ারণ্যটি এ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ও রানীগাও ইউনিয়নে অবস্থিত। এ বনাঞ্চলটি ঢাকা থেকে আনুমানিক ১৪০ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে এবং সিলেট থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বনাঞ্চলটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত।

অপেক্ষাকৃত দুর্গম স্থানে অবস্থিত বলে এই সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ বনটি এখনও টিকে আছে। অভয়ারণ্যটির আশেপাশে রয়েছে তিনটি চা-বাগান। এটি বিভিন্ন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও পশুপাখির আবাসস্থল এবং বিশেষ করে পাখি দর্শনে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান।

পূর্ববতী জরিপ মতে, এখানে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি,  সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। 

আদিবাসী সম্প্রদায় ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও উড়াং এই বনভূমির আশেপাশে এবং ভেতরে বসবাস করছে। বিরল প্রজাতির বাঘের বিচরণও রয়েছে এ জঙ্গলে।


হবিগঞ্জ/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়