RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৬ ১৪২৭ ||  ১৩ সফর ১৪৪২

যশোরে ৩ কিশোর নিহত, চুল কাটা নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত

সাকিরুল কবীর রিটন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:০০, ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
যশোরে ৩ কিশোর নিহত, চুল কাটা নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত

যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩ কিশোর নিহতের ঘটনার সূত্রপাত চুলকাটা নিয়ে। কিশোর বন্দিদের বক্তব্য থেকে এ তথ্যই জনসম্মুখে এসেছে।

বৃহস্পতিবার ৩ কিশোর নিহত হওয়ার পর রাতে যশোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যান। গভীররাত পর্যন্ত তারা সেখানে থেকে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে খুলনা রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি-এ কে এম নাহিদুল ইসলামও আসেন। রাত ৩ টার দিকে তিনি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হন।

বৃহস্পতিবার রাত ৩ টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, গত ৩ আগস্ট কেন্দ্রের হেড গার্ড (আনসার সদস্য) নূর ইসলাম তার চুল কেটে দিতে বলে। সেদিন কেন্দ্রের প্রায় ২শ জনের চুল কেটে দেওয়ায় আমার হাত ব্যথা ছিল। সে কারণে তার চুল পরে কেটে দেওয়া হবে জানালে সে ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করতে থাকে। একপর্যায়ে কয়েক কিশোর তাকে মারধর করে। বিষয়টি হেড গার্ড অফিসে জানায়। সেখানে নূর ইসলাম অভিযোগ করেন, কিশোররা মাদক সেবন করে তাকে মারধর করেছে। কিন্তু কিশোররা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে, তারা মাদক সেবন করেনি।

পাভেলের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে তাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তারা ঘটনার আদ্যোপান্ত জানানোর এক পর্যায়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্যরা  তাদের বেধড়ক পেটায়।

আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর 'বন্দি' জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করে। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছতলায় ফেলে আসে। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করে।’

যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈশান বলছে, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার (রাসেলের) জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’ সে অভিযোগ করে বলে, ‘প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলে, ‘তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।’

আহতরা জানায়, মারধর করে তাদের এখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়। পরে একজন করে মারা গেলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর রাত আটটা থেকে ১১টার মধ্যে চার দফায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়। 

তবে উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রবেশন অফিসার মুশফিক আহমেদ দাবি করেন, কেন্দ্রে বন্দি কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরই জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। রড ও লাঠির আঘাতে মারাত্মক জখম হয় ১৭ কিশোর। প্রাথমিকভাবে উন্নয়ন কেন্দ্রে তাদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা চলে। তবে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে নাইম, পারভেজ ও রাসেলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

এই প্রসঙ্গে খুলনা রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সংবাদকর্মীদের বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। মত্যু পথযাত্রীরা কেউ মিথ্য কথা বলে না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমরা যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করি, তারা ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে বিষয়টি অবহিত হয়েছি। যে কারণে মূল ঘটনা জানা জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ 

বৃহস্পতিবার যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের মারপিটের ঘটনায় নিহতরা হলো, খুলনার দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮), বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার তালিপপুর পূর্বপাড়ার নানু প্রামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭)। 

যশোর/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়