RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাসন্তীর কলাবাগান কেটে উজাড়, ‘দোষ দেখছে না’ বনবিভাগ

শাহরিয়ার সিফাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১১, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ২২:৪২, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
বাসন্তীর কলাবাগান কেটে উজাড়, ‘দোষ দেখছে না’ বনবিভাগ

টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে (বনাঞ্চল) গারো নারী বাসন্তী রেমার ৪০ শতাংশ জমির ৫ শতাধিক কলাগাছ কেটে সাবাড় করার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে।

বাসন্তী রেমার অভিযোগ, তারা কয়েকযুগ ধরে বংশ পরম্পরায় এই ভূমি ভোগ দখল করে আসছেন। কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই বনবিভাগ তার বাগানের কলাগাছ কেটে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতির মুখে ফেলেছে। তবে, এই ঘটনা কোনো দোষ দেখছেন না বনবিভাগ।

তারা বলছেন, এই জমি-বাগান শোলাকুড়ি ফকিরাকুলির শহিদ আলীর কাছে বাসন্তী লিজ দিয়েছেন। তাই এই বাগানের লিজি শহিদ আলী। ফলে, বাসন্তীর কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করে বনবিভাগ। 

এদিকে, কলা বাগান কেটে উজাড় করার প্রতিবাদের উত্তাল হয়ে উঠেছে ফেসবুক। তারা বন কর্মকর্তাদের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি বাসন্তীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, বন বিভাগের রেঞ্জ অফিস ও ডাক বাংলোর বুক চিরে চলে গেছে ইট বিছানো শুরু রাস্তা। সেই রাস্তার দুই পাশে প্রথমে ঘন বন। এরপর রাস্তার উভয়পাশে কলা, আনারস, পেঁপে, হলুদের মাঠ। এরমধ‌্যে ৪০ শতাংশ জমিতে ৫ শতাধিক কলাগাছ লাগিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বাসন্তী রেমা।

তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে কলাগাছের চারা লাগানো হয়েছে। আর মাত্র তিন মাস পরই ফল দেওয়া শুরু হতো। ইতোমধ্যেই কলাগাছ রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রায় ৭০ হাজার খরচ করেছি। এখান থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার কলা বিক্রি করা যেতো। কিন্তু বন বিভাগ সেই গাছ কেটে ফেলায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। ’

বাসন্তী রেমা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমার মা হেরনী রেমার কাছ থেকে এই জমি পেয়েছি। তার আগে আমার নানি খিপ্রি রেমা এই জমি চাষাবাদ করতেন। তবে, কোনো কাগজপত্র না থাকলেও এই জমি আমাদের নিজেদের বলেই জানি।’ তিনি বলেন, ‘আমার যে ক্ষতি হয়েছে, বনবিভাগের কাছে সেই ক্ষতিপূরণ চাই। পাশাপাশি জমিও ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাই।’

জমি লিজ দেওয়ার ব‌্যাপারে জানতে চাইলে বাসন্তীর স্বামী গিটিশ বলেন, ‘২০১৩ সালে রবি খান নামের একজনের কাছে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ৭ বছরের জন্য লিজ দিয়েছিলাম। তখন রবি খান এই জমিতে ঔষধি গাছের চাষ করেছিলেন। ২০১৯ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় রবিখান আমাদের জমি ফিরিয়ে দেন। এরপর থেকে আমরা কলা বাগান করছি। ’

রবি খানের মতো অন্য কারোর কাছে সরকারি জমি লিজ দিয়ে দেয়েছেন কি না—জানতে চাইলে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে গিটিশ বলেন, ‘এবার আমরা কলা বাগান করেছি।’

এদিকে, বনবিভাগ বলছে, গত ২৯ এপ্রিল বাসন্তী রেমা এই জমিটি ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ফকিরাকুলি গ্রামের শহিদ আলীর কাছে লিজ দিয়েছিলেন। 

চুক্তিপত্র-সূত্রে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মো. শহিদ আলীর কাছে গত ২৯ এপ্রিল ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ৪০ শতাংশ জমি লিজ দেন বাসন্তী। লিজের মেয়াদ ২০২০ সালের ১৫ মে থেকে ২০২৩ সালের ১৫ মে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।  

এই বিষয়ে শহিদ আলী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি বাসন্তীর কাছ থেকে ৩ বছরের জন্য এই জমিটি লিজ নিয়েছি। এরপর এখানে কলাগাছ লাগিয়েছি। বন বিভাগের অভিযানে কলা গাছ কাটার সময় আমি সেখানে ছিলাম না। খবর পেয়ে এসে দেখি, আমার ৫০০ গাছই কেটে ফেলা হয়েছে। ’ 

শহিদ আলী আরও বলেন, ‘জমি লিজ নেওয়ার সময় বাসন্তী বলেছিলেন, এই জমি গত ১০০ বছর ধরে তাদের ভোগ দখলে আছেন। বন বিভাগ তাদের কাছ থেকে নিতে পারেনি। আমি আগে কখনো বন বিভাগের জমি কারও কাছ থেকে লিজ নেইনি। বাসন্তীর পরামর্শেই জমি লিজ নেওয়ার বিষয়টি এতদিন গোপন রেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কলাবাগান কেটে উজড়া করায় বাসন্তীর কোনো ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি যা হওয়ার, তা আমারই হয়েছে। ’

গারো সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে জানা গেছে, যুগ যুগ ধরে বনা জমিতে তারা বসবাস করে আসছেন। বংশ পরম্পরায় তারা এই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে, বন বিভাগের দাবি, এই জমি সরকারি। কিন্তু গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা উত্তরাধিকার-সূত্রে রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়াই এই জমি দখল করে আসছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে দোখলা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ বলেন, ‘বাসন্তী রেমা দির্ঘদিন ধরে বন বিভাগের জমি দখল করে চাষাবাদ করছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি শহিদ নামের একজনের কাছে সেই জমি লিজ দেন। শহিদই সেখানে কলার আবাদ করেন। ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় আমরা ওই জমি উদ্ধার করতে যাই। জমি উদ্ধারের অংশ হিসেবে কলা গাছ কেটে ফেলি। এই সময় বাসন্তী গারো সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়ে আমাদের ওপরে চড়াও হন। ’

আব্দুল আহাদ আরও বলেন, ‘বাধা পেয়ে আমরা বাংলোয় চলে আসি। সেখানে এসে তারা আমাদের অবরোধ করে রাখে। এ সময় তারা আমার অফিস ও সরকারি বাসভবনে ভাঙচুর চালায়। ’

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল আহাদ বলেন, ‘বন আইন অনুযায়ী সরকারি জমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের। কারও দখল থেকে এই জমি উদ্ধারের অভিযানের আগে অনুমতি নিতে হয় না। এমনকী কোনো নোটিশেরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাসন্তী রেমা আমাদের কমিউিনিটি ফরেস্ট ওয়ার্কার (সিএফডব্লিউ)-এর সদস্য। তবে, এখানে ক্ষতি হলেও বাসন্তী রেমার কোনো ক্ষতি হয়নি। আর এভাবে অভিযান না চালালে বনের জমি উদ্ধারের কোনো সুযোগ নেই।’ 

এই বিষয়ে টাঙ্গাইল বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘মধুপুর বনাঞ্চলের যে ২০ হাজার ৮৩৭ একর ভূমি রয়েছে, তার ভেতরেও বেশ কিছু অংশ অনেকের দখলে চলে গেছে। ’ 

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে বনভূমি উদ্ধারের কাজ হাতে নিয়েছি। এরই অংশ হিসেবে বাসন্তীর দখলে থাকা ৪০ শতাংশ জমি উদ্ধারে গেলে গারোরা বাধা দেন। তারা বলেন, এই জমি তাদের।’ তিনি বলেন, ‘বাসন্তী নিজেকে এই জমির মালিক বলে দাবি করে ক্ষতিপূরণ চাইলে সেখানে তার কোনো বিনিয়োগ নেই। এ্ই কলা বাগান ছিল শহিদের। ’

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘সরকারি জমি ভোগ দখল করে যারা কলাবাগান করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। পাশাপাশি বনের জমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলবে।’

শহিদ আলীর লিজ নেওয়ার দাবি ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তার মন্তব‌্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাসন্তীর বক্তব‌্য জানতে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়নি।

টাঙ্গাইল/এনই

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়