RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৩ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

খাল অবমুক্ত: এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা দিলেন দখলদার

বরগুনা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:১৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০  
খাল অবমুক্ত: এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা দিলেন দখলদার

বরগুনার তালতলীতে অবৈধ বাঁধ কেটে ‘শিকারীপাড়া খাল’ দখলমুক্ত করে দিয়েছেন তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে মামলায় দায়ের করেছেন দখলদার আনোয়ার হোসেন মাওলানা। 

জেলা প্রশাসন থেকে লিজ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আনোয়ার হোসেন প্রবাহমান খালটিতে একাধিক বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করে আসছিলেন। 

সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ করার পর তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাঁধ কেটে খালটি অবমুক্ত করে দেন।  

স্থানীয়রা জানান, বরগুনার তালতলী উপজেলার ৫নং বড়বগী ইউনিয়নের শিকারীপাড়া নামের খালটি পায়রা নদী থেকে গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আন্ধারমানিক নদীতে সংযুক্ত। উভয় পাড়ের বাসিন্দাদের জমি চাষাবাদসহ নিত্য নৈমত্তিক কাজে এই খালের পানি ব্যবহৃত হয়। 
প্রায় একযুগ সামাজিক মৎস্য চাষ কর্মসূচির আওতায় জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে জেলা মৎস্য বিভাগ এলাকার উপকারভোগী হিসেবে আনোয়ার হোসেনের কাছে খালটি বন্দোবস্ত (লিজ) দেয়। 

এর পরপরই তিনি খালটির উভয় প্রান্তে ব্যক্তিগত খরচায় দুটি কালভার্ট নির্মাণ করেন। পুরো খালটিতে পাঁচটি বাঁধ দিয়ে প্লট তৈরি করে সুবিধামত লবণ পানি উঠিয়ে মাছ চাষ করতে থাকেন। 

শর্ত মোতাবেক উভয় পাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় করে মাছ চাষের কথা থাকলেও এলাকার কাউকেই তিনি আশপাশেও ভিড়তে দেননি। সবশেষ বিগত ১২ জুলাই ২০১৭ তারিখে তিনি সবশেষ ওই খালটি মাছ চাষের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। 

এতে বিপাকে পড়েন কৃষিজীবী বাসিন্দারা। উভয় পাড়ের হাজার হাজার একর ফসলী জমি চাষাবাদের জন্য খালটির নির্ভরযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত ফসলী জমিতে পানি সরবরাহ ও অপসারণ তো দূরে থাক, দৈনন্দিন কাজে খালের পানি ব্যবহারেও  তিনি স্থানীয়দের বঞ্চিত করেছেন। 

ওই এলাকার মালি পাড়ার বাসিন্দা নুরু মিয়া বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা খালটি ব্যবহার করা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আনোয়ার মাওলানা নিজেই ওই খালটির মালিক এমন আচরণ করেছেন। আমরা কৃষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, গবাদিপশুর গোসল এমনকি পানি খাওয়ানো পর্যন্ত বন্ধ ছিলো।’ 

একই এলাকার বাসিন্দা আনছার বলেন, ‘খালের পাড় ধরে কেউ হাঁটলেও আনোয়ারের লোকজন মাছ চোর সাব্যস্ত করে গালিগালাজ করতো। খালটি তার দখলে তাকায় আমাদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিলো।’ 

এ অবস্থায় আলাউদ্দীন মোল্লা নামের এক ব্যক্তি এলাকাবাসীর পক্ষে গত ১৭মে খালটি দখলদারের কবল থেকে অবমুক্ত করতে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে আবেদন করেন। 

এরপর গত আগস্ট ফের জেলা প্রশাসকের বরাবরেও একই ব্যক্তি একই দাবিতে আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তের দায়িত্বে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্তের শেষে গত ১৫ সেপ্টম্বর স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে অবৈধ বাঁধ কেটে খালটি উম্মুক্ত করে দেন। 

আলাউদ্দীন মোল্লা বলেন, ‘আনোয়ার হোসেন মাওলানা ধূর্ত প্রকৃতির লোক। এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে খালটি ব্যক্তিগতভাবে দখলে নিয়ে মাছ চাষ করছিলেন। জনগণের সম্পত্তিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এলাকার হাজার হাজার কৃষকের ক্ষতিসাধন করে নিজে লাভবান হওয়ার সুযোগ কারো নেই। আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন উল্টো আমাদেরকে মিথ্যে মাছ চুরির মামলা দিয়ে হয়রানী করছে আনোয়ার।’ 

এ ঘটনার পর আনোয়ার হোসেন মাওলানা বাদি হয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৪০-৫০ জনকে আসামি করে মাছ চুরির অভিযোগে আমতলী জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় খাল অবৈধ দখলমুক্তকরণের জন্য যেসব ব্যক্তিরা দাবি করে আসছিলেন, তাদেরকে আসামি করা হয়। 

মামলার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মুঠোফোনে আনোয়ার হোসেন মাওলানা বলেন, ‘ইউএনও অবৈধভাবে খাল অবমুক্ত করেছেন। আমার লিজ বাতিল করে মাছ ধরার সময় দেবে। তিনি আমাকে স্থিতিতাবস্থার চিঠি দিয়েছিলেন, কিন্ত মাছ ধরার বা লিজ বাতিলের কোনো তথ্য না দিয়ে অবৈধভাবে খাল অবমুক্ত করে দিয়েছেন। আমার বাঁধ যারা কেটেছে, আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছি।’ 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্দেশে আমি ঘটনাস্থল তদন্ত করে ও কাগজপত্র পর্যালোচনায় লিজের শর্ত ভঙ্গ ও অবৈধ বাঁধ দেওয়ার সত্যতা পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমন মৌসুমে কৃষকদের পানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ 

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘প্রবাহমান খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করাটা বৈধ নয়। এছাড়াও এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠির অসুবিধা সৃষ্টি করে ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে আনোয়ার হোসেন খালটি দখল করে রেখেছিলেন। এলাকাবাসীর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আমরা আইনগতভাবে খাল অবমুক্ত করে দিয়েছি।’

রুদ্র রোহান/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়