RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মেহেরপুরের তাঁতের সেই দিন আর নেই

মহাসিন আলী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৩২, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৩, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
মেহেরপুরের তাঁতের সেই দিন আর নেই

এক সময়ের তাঁতে সমৃদ্ধ ছিলো মেহেরপুর।  সেই জনপদে আগের মতো তাঁতের খটখট শুনতে পাওয়া যায় না।  মেহেরপুরের তাঁতের সেই দিন আর নেই। 

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর পুজিঁর অভাবে ধ্বংসের পথে মেহেরপুরের তাঁত শিল্প।  যেটুকু টিকে আছে, তাও প্রায় বন্ধের পথে।

মেহেরপুর জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, ২০০৩ সালের শুমারি অনুযায়ী জেলায় ৮৩৫টি পরিবারে ৯৩২টি তাঁত ছিল।  ২০১৯ সালের শুমারিতে দেখা যায়, জেলায় ২০৪টি পরিবারে ২২৫টি তাঁত রয়েছে।  অর্থাৎ টিকে আছে মাত্র চার ভাগের এক ভাগ।

এক সময় এই তাঁত শিল্পের উপর নির্ভর করে এখানে ভালোই চলতো কারিগরদের সংসার, কিন্তু এখন আর চলে না।  অর্থের অভাবে বন্ধ হয়েছে অনেক পরিবারে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া।  অনেকে বাপ-দাদার পেশা বদল করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।

এদিকে বিলুপ্ত প্রায় তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মেহেরপুরের কর্মকর্তা আশরাফুল হক।

মেহেরপুরের গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হারুন-অর-রশিদ রবি জানান, এক সময় গাংনী উপজেলার রাজাপুর গ্রামের ৪ শতাধিক পরিবার যুক্ত ছিল তাঁত শিল্পের সাথে।  ভোর রাত থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত হয়ে থাকতো গ্রামের পরিবেশ।  নানা সমস্যায় বিলুপ্ত হতে হতে এখন তাঁত শিল্পে টিকে আছে এখানের মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার।

রাজাপুর গ্রামের শাফিনা খাতুন দীর্ঘ ৩৫ বছর তাঁতের কাজ করেছেন।  কিন্তু এখন তিনি তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন।  চাহিদা না থাকায় বিক্রি হচ্ছে না তৈরি তাঁতের কাপড়।  সেইসাথে বেড়েছে সুতার দাম।  ফলে বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে তাঁত।

একই গ্রামের রুস্তম আলী কারিগর জানালেন, এক দশক আগেও বেশ ভালোই কাজ চলতো তাদের।  আয় রোজগারও হয়েছে ভালো।  কিন্তু এখন সুতার দাম বেশি হয়ে যাওয়ায় এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভাটা পড়েছে এই শিল্পে।

তিনি বলেন, এক সময় রাজাপুর গ্রামে প্রায় পাঁচশ পরিবার শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, বুননে ব্যস্ত থাকতেন।  তা আজ প্রায় বন্ধের পথে।  সুতার দাম বাড়াসহ গামছা বানিয়ে লাভ না হওয়ায় এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন কারিগররা।

মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর দাখিল মাদ্রাসার সহকারি শিক্ষক রোকনুজ্জামান মানিক জানান, এক সময় পিরোজপুর গ্রামের প্রায় দুই শ পরিবার তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত ছিলো।  এখন তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত আছেন মাত্র ১০-১৫ টি পরিবার। 

তিনি জানান- এ গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান বাপ-দাদার পেশা তাঁত শিল্প ছেড়ে এখন পিরোজপুর বাজারে চায়ের দোকান করেছেন।  একই গ্রামের আমজাদ হোসেন বর্তমানে ভ্যান চালায়, হামজার আলী ও রফিকুল ইসলাম ফেরিওয়ালার এবং সেলিম হোসেন দর্জির কাজ করছেন।

পিরোজপুর গ্রামের তাঁতের কারিগর ছোট ও আরজিনা জানান- প্রতিটি সুতার বান্ডিলে ৪ শ টাকা থেকে ৫ শ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।  বর্তমানে সুতা কিনতে হচ্ছে ১৪ শ টাকা থেকে ১৫ শ  টাকা বান্ডিল।  এছাড়া পুঁজির অভাবসহ নানা সমস্যার কারণে এ গ্রামের শতকরা ৯০ ভাগ কারিগর পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা সংসারের কাজ শেষ করে যে সময়টুকু পাই, সেই সময়টুকু বসে না থেকে গামছা তৈরি করি।  এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই সংসারের কিছুটা সহযোগিতা হয়।  একই অবস্থা টিকে থাকা অন্য তাঁতিদেরও।  তাঁতের পাশাপাশি দিনমজুরের কাজসহ অন্য কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তারা।

মেহেরপুর জেলা বিসিক কর্মকর্তা আশরাফুল হক বলেন, বড় শিল্পগুলোর সাথে ছোট শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।  তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য আর্থিক সহায়তাসহ স্বল্প সুদে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।  এ জেলায় কোন তাঁত বোর্ড নেই।  তাই এর দায়িত্ব আমাদের উপর পড়েছে।  কোন তাঁতি আমাদের কাছে ঋণ সহযোগিতার আবেদন করলে আমরা তার প্রকৃত অবস্থা যাচাই-বাছাই শেষে কর্তৃপক্ষকে অবগত করব।  এতে আবেদনকারীরা সহজ শর্তে ঋণ ও অন্যান্য সহযোগিতা পেতে পারেন।

মেহেরপুর/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়