RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৭ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৩ ১৪২৭ ||  ০১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যে জেলার প্রায় শতভাগ ইটভাটাই অবৈধ

এনাম আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৩, ২০ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১০:৫৩, ২০ নভেম্বর ২০২০
যে জেলার প্রায় শতভাগ ইটভাটাই অবৈধ

প্রায় শতভাগ অবৈধ ইটভাটার জেলা বগুড়া। ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না- এমন এলাকায় স্থাপিত এই ইটভাটাগুলো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। 

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘনকারী এসব ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন। 

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে হাইকোর্টে রিট থাকায় এগুলোর বিরুদ্ধে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। রায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে পাওয়ায় পর্যায় ক্রমে এগুলোর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় বগুড়া কার্যালয়ের হিসেব অনুযায়ী জেলায় মোট ইটভাটা রয়েছে ২১৮টি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইটভাটার সংখ্যা মাত্র ১৭টি। বাকি ২০১টি ইটভাটাই অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫টি অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই ভাটাগুলো লাইসেন্স নিয়েই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের আইনের কারণে এগুলো অবৈধ হয়ে যায়। সে সময় তাদেরকে ২ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল ভাটা উপযুক্ত স্থানে এবং পরিবেশ সম্মত আধুনিক পদ্ধতিতে স্থাপন করার জন্য। কিন্তু তারা আইন না মেনে নিজেদের মতো ভাটা পরিচালনা করছিল। 

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে যেসব ভাটা অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত- এগুলোর আর বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ইটভাটা থেকে দূষণ কমানোর লক্ষ্যে পুরাতন পদ্ধতির ইটভাটার পরিবর্তে জ্বালানী সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপনের লক্ষ্যে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত) ২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে সনাতন প্রযুক্তির ১২০ ফুট চিমনি বিশিষ্ট ইটভাটায় ইট উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আরো জানানো হয়েছে, অবৈধ এসব ইটভাটার মধ্যে ২৫-৩০টি ভাটা সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। এই ইটভাটার কালো ধোয়া ১২০ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন চিমনির মাধ্যমে নির্গত হচ্ছে। এছাড়া বাকিগুলো জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে পরিচালিত।  জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে ইট প্রস্তুত করলে চিমনির উচ্চতা ৬০ ফুট হলেও কোন সমস্যা নেই। সেটি পরিবেশের ক্ষতি করে না। কারণ ধোয়া পরিশোধন হয়ে ক্ষতিকারক পদার্থ কার্বন ধোয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়।

বগুড়া জেলার অবৈধ ইটভাটাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বগুড়া সদরে ১২টি, শাজাহানপুরে ৩২টি, সোনাতলায় ৪টি, আদমদীঘিতে ৮টি, কাহালুতে ১০টি, দুপচাঁচিয়ায় ৮টি, ধুনটে ১৯টি, গাবতলীতে ৩৭টি, শিবগঞ্জে ৩১টি এবং শেরপুরে ২৬টি। 

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ২০১টি ইটভাটার বাইরেও জেলায় আরো অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা।

সরেজমিনে শাজাহানপুর, গাবতলী এবং সারিয়াকান্দি উপজেলার ইটভাটাগুলোয় গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ইটভাটাই ফসলি জমির মাঝখানে স্থাপন করা। প্রতিটি ইটভাটার ১ কিলোমিটার এলাকার মাঝে জনবসতি রয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ইটভাটার ১ কিলোমিটারের মাঝে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টাপাড়ায় স্থাপিত আরএইচবি ইটভাটার স্বত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম বলেন- আমার ভাটার ২০১২-১৩ পর্যন্ত ক্লিয়ারেন্স আছে। তবে নতুন আইনের সাথে শুধু তো আমারটা না আরো অসংখ্য ভাটা সাংঘর্ষিক, যে কারণে নবায়ন ছাড়পত্র দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে।

একই এলাকার এআরএন ব্রিকস ফিল্ড এর প্রোপ্রাইটর নজরুল ইসলাম জানান, ৫ বছর আগে তারা ভাটা চালু করেছেন। কিন্তু ২০১৭ সালের পর আর নবায়ন করে দেয়নি।

মেসার্স এআরএস ব্রিকস এর স্বত্ত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান জানান, জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে তার ইটভাটা পরিচালিত। পরিবেশ থেকে ছাড়পত্র না দেওয়ায় ইটভাটা মালিক সমিতির মাধ্যমে তারা পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করছেন পুনরায় ভাটার বৈধতার জন্য।

বগুড়া জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের যে প্রেক্ষাপট, এই প্রেক্ষাপটে কোন ইটভাটার লাইসেন্স পাওয়া যাবে না। কারণ, ভাটার আশপাশে কোন আবাদী জমি ঘরবাড়ি স্কুল-কলেজ থাকা যাবেনা, পঞ্চাশটির বেশি গাছ থাকা যাবে না। এরকম জায়গা তো বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি না পাওয়া যায় তাহলে যে ১৭টির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে আমি বলবো সেগুলো ঘুষ খেয়ে লাইসেন্স দিয়েছে। আর বাকি যে ২০১টি অবৈধ ভাটার কথা বলছেন সেগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে বলে ভেঙে দিতে বলুন। সরকার যদি এগুলো ভেঙে দিতে চায়, দিক।

বগুড়া জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল মালেক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়। যে সকল ইটভাটা অবৈধ, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি জটিলতা নেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করবো।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় বগুড়া’র পরিচালক মোঃ আশরাফুজ্জামান জানান, অধিকাংশ ভাটাগুলোকে ১ কিলোমিটারের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে ছাড়পত্র নবায়ন করা হচ্ছে না। তবে আইন বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হয়েছে।  যেমন- এক সময় ১২০ফুট চিমনি বৈধ ছিলো। ২০১৩ সালের আইনে এটি অবৈধ হয়ে গেছে। এটাকে জিগজ্যাগ পদ্ধতি করতে হবে।  আগের আইনে এলজিইডির রাস্তা আধা কিলোমিটারের মধ্যে থাকা যাবে না। এখন এলজিইডির রাস্তা থাকলে সমস্যা নেই। আইন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ইটভাটাগুলোকে অনেক আগে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। এগুলোর ছাড়পত্র দেওয়া হয় শুধুমাত্র এক বছরের জন্য। আইন ঠিক থাকলে সেটা নবায়ন করা হয়। ২০১৩ সালের আইনের পর যে সকল ভাটা ১২০ ফুট চিমনি বিশিষ্ট তাদেরকে একটি গ্রহণযোগ্য স্থানে ভাটা সরিয়ে নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে ভাটা গড়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল ২ বছর। তবে অধিকাংশ ভাটাই এখন জিগজ্যাগ করা হয়েছে। কিন্তু ভাটা সরিয়ে না নেওয়ায় ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের কারণে ২০১৬ সালের পরে অনেকেই নবায়ন পাচ্ছে না। ভাটাগুলো নিয়ে ২০১৮ এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত হাইকোর্টে রিট ছিলো। গত বছর এর রায় হয়েছে। অধিকাংশ রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। ইতোমধ্যে আমরা ২৫টির মতো ভাটা ভেঙে ফেলেছি। অবৈধ ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে আমরা এখন পর্যায়ক্রমে আইনি ব্যবস্থা নেবো।

বগুড়া/টিপু

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়