RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২০ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৬ ১৪২৭ ||  ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মৃত্যুর পরও কি স্বীকৃতি পাবেন না বীরাঙ্গনা জানকী

মো. মামুন চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৪৫, ৩ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৪:৫১, ৩ ডিসেম্বর ২০২০
মৃত্যুর পরও কি স্বীকৃতি পাবেন না বীরাঙ্গনা জানকী

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আমু চা বাগানের বীরাঙ্গনা জানকী বাড়াইক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি না পাওয়ার অতৃপ্তি নিয়ে মারা গেছেন এ বছরের ৮ জানুয়ারি। এ বাগানের বাসিন্দা জানকী বাড়াইকের আত্মীয় আকাশ মুন্ডার প্রশ্ন, মরার পরও কি তিনি স্বীকৃতিটুকু পাবেন না।

আকাশ মুন্ডা বলেন, মনে অতৃপ্তি নিয়েই চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি দুপুরে চির বিদায় নেন এই বীরাঙ্গনা।  সেদিন রাতে এ বাগানেই তাকে সমাহিত করা হয়।

তিনি বলেন, দেশের জন্য তাকে বীরাঙ্গনা হতে হয়।  এ কারণে তার বিয়ে হয়নি। এ ত্যাগের বিনিময়ে কিছুই পাননি তিনি। অর্থাভাবে তার সুচিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়নি। তিনি জীবিত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পেয়ে হতাশ ছিলেন। সে অবস্থায়ই মৃত্যু হয় তার।

বর্তমানে তাকে ভেবে কষ্ট পাচ্ছি আমরা স্বজনরা। ভেবেছিলাম মৃত্যুর পর হয়তো তিনি স্বীকৃতি পাবেন।  দেশের ইতিহাসে তার নাম থাকবে। কিন্তু আজও তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এটা মেনে নিতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সীমান্তবর্তী আমু চা বাগানের পুরান লেনের বাড়িতে ‘জানকী’ পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। সেনা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন তিনি। এরপর থেকে চা বাগানেই বাস করে আসছিলেন জানকী।

মৃত্যুর পূর্বে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আমু চা বাগানে গিয়ে বীরাঙ্গনা চা শ্রমিক জানকী বাড়াইকের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। সে সময়ে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা আট ভাই-বোন ও তাদের মা-বাবা চিমটিবিল সীমান্তের কাংড়াবাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন। একদিন তিনি ও তার বাবা-ভাই মিলে বাড়িতে আসেন খাবার নেওয়ার জন্য। এ সময় প্রায় ১২ জন পাকিস্তানি সেনা তাদের পাকড়াও করে।  সেনারা তাদের চোখ বেঁধে ফেলে। তার ভাই কৌশলে পালিয়ে গেলেও তারা পালাতে পারেননি। পাকিস্তানি সেনারা তার ওপর পাশবিক নির্যাতন শুরু করে। পরে তাদেরকে চুনারুঘাট ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখা হয়।  সেখানেও সেনারা তার ওপর নির্যাতন চালায়। ২০ দিন পর গুইবিল সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের তুমুল লড়াই শুরু হয়। এ সময় ক্যাম্পে কেউ না থাকায় তিনি ও তার বাবা পালিয়ে যান। দেশ স্বাধীন হলে তারা বাড়ি ফিরে আসেন।

তিনি আরো জানান, লোকজন তাকে দেখে নানা ধরনের অপমানজনক কথা বলত। এ কারণে তার বিয়ে হয়নি। তার মা-বাবা, ভাই-বোনরা মারা গেছেন।  শুধু বেঁচে ছিলেন তিনি। শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় চা বাগানের কাজ ছেড়ে দেন। স্বজনদের সঙ্গে বসবাস করে আসছিলেন। কুমারী হওয়ায় বিধবা ভাতা পাননি।  বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে এ ভাতা দেওয়া হয়নি।

জানকী বাড়াইক বলেছিলেন, ‘লোকজনের কাছ থেকে শুনেছি, বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাচ্ছেন।  স্থানীয় সাবেক এমপি কেয়া চৌধুরীর চেষ্টায় হবিগঞ্জের চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকার পাঁচ বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ কথা শোনার পর চুনারুঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলে গিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন, ‘বিয়ে হলো না।  এ কারণে আমার কোনো উত্তরাধিকারী নেই।  বাকি জীবনে আমার চলার পথে কী হবে?’

মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো এই নারী জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন।  তা আর পাওয়া হলোনা তার।  এক বিশাল অতৃপ্তি নিয়েই চিরদিনের জন্য চলে যান এই বীরাঙ্গানা।

হবিগঞ্জ/টিপু

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়