ঢাকা     বুধবার   ১৭ আগস্ট ২০২২ ||  ভাদ্র ২ ১৪২৯ ||  ১৮ মহরম ১৪৪৪

ইটভাটায় জ্বলছে কাঠ-টায়ার, পুড়ছে ভবিষ‌্যৎ 

ফরহাদ হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ১৬ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৮, ১৬ জানুয়ারি ২০২১
ইটভাটায় জ্বলছে কাঠ-টায়ার, পুড়ছে ভবিষ‌্যৎ 

লক্ষ্মীপুরের হিরামন বাজার এলাকায় ‘সংসার ব্রিক্স’

লক্ষ্মীপুরের ৫ উপজেলায় ২ শতাধিক ইটভাটার বেশির ভাগেরই নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এসব ইটভাটায় ব‌্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি। আর ইট পোড়াতে কয়লার পরিবর্তে  নির্বিচারে জ্বলছে কাঠ ও যানবাহনের পুরনো টায়ার। ইট ভাটাগুলোর কোনোটিতেই নির্দিষ্ট  উচ্চতার  (১২০ ফুট উঁচু) পাকা চিমনি নেই। ফলে কম উচ্চতার এসব চিমনি দিয়ে বের হয়ে কাঠ ও টায়ারের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বাতাসে। পরিবেশবাদী ও চিকিৎকসদের মতে, এতে পরিবেশ দূষিত হয়ে স্থানীয়দের মধ‌্যে বিভিন্ন রকমের রোগ আক্রান্তের হার বাড়ছে। 

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র বলছে, জেলার ২ শতাধিক ইটভাটার মধ্যে ৩৩টি বাংলা ইটভাটা (ড্রাম চিমনি)। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৮৯টির। অভিযোগ রয়েছে,  ইটভাটার মালিকরা গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের নগদ টাকা দেওয়ার কথা বলে দালালদের মাধ্যমে জমির মাটি সংগ্রহ করেন।    

ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, জনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি জমিতে কোনো ইটভাটা তৈরি করা যাবে না। ইটভাটায় থাকতে হবে ন‌্যূনতম ১২০ ফুট উচ্চতার পাকা চিমনি। এছাড়া, জ্বালানি হিসেবে ব‌্যবহার করতে হবে কয়লা। কোনোভাবেই কাঠ কিংবা টায়ার পোড়ানো যাবে না। 

অথচ, জেলা সদরের বেশকিছু  ইটভাটা ঘুরে দেখা গেছে, পরিবেশবান্ধব চিমনির পরিবর্তে ‘ড্রাম চিমনি’ ব্যবহার করা হয়েছে। চারিদিকে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাঠ। এসব কাঠ ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার করছেন। আর  শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে শিশুরা। ভাটায় ট্রাক্টর (পাওয়ার ট্রলি) দিয়ে জমি থেকে মাটি আনা হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে শিশু-বৃদ্ধ, ও স্থানীয়দের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ইটভাটা কৃষি জমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে। এছাড়া, কোনো ইটভাটাতেই ১২০ ফুট উচ্চতার পাকা চিমনি দেখা যায়নি। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকার কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। আবার, প্রকাশ্যেই পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করলেও তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। 

জেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, ‘ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) চলে যায় ইটভাটায়। সেই মাটি পুড়িয়ে ভাটা মালিকরা তৈরি করছেন ইট। এতে কাঙ্ক্ষিত ফসলি জমির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদেরও কৃষি কাজে অনীহা চলে এসেছে।  এজন্য প্রতিবছরই কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। 

কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে কাঁচা ইটের স্তূপ

শিশু শ্রমিক সুমন হোসেন বলেন, ‘ইটভাটায় কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়। কাজে ভুল হলে গালি শুনতে হয়। মাঝেমাঝে চড়-থাপ্পড়ও দেন মালিকের লোক। তবু কাজ করে যাচ্ছি। কারণ, অগ্রিম টাকা নিয়েছি। সে টাকা দিয়ে বাবা একখণ্ড ফসলি জমি কিনেছেন। কিন্তু এখন কাজ থেকে চলে গেলে, সে টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার চরমনশা গ্রামের এক যুবক বলেন,‘হিরামন বাজার এলাকায় ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ‘সংসার ব্রিক্স’। তার কয়েকগজ দূরে পূর্ব চরমনশা কমিউনিটি ক্লিনিক। ইটভাটার ট্রাক্টরগুলোর চলাচলের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে ক্লিনিকের সামনের রাস্তাটি। এর ফলে জরুরি প্রয়োজনে ও স্বাস্থ্যসেবা নিতে ক্লিনিকে আসা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।  

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ‘সংসার ব্রিক্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তহিদ উদ্দিন সুফল বলেন, ‘ক্লিনিকের সামনের রাস্তা দিয়ে অন্য ভাটার ট্রলি যাতায়াত করছে। আমরা অনুমতি নিয়েই ইটভাটা চালাচ্ছি।’ তবে কার অনুমোদন নিয়েছেন, জানতে চাইলে কিছুই বলতে পারেননি তিনি।

এদিকে, একাধিক মালিকের দাবি, তারা  স্থানীয়ভাবে একটি ট্রেড লাইসেন্স ও হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে ইটভাটা চালাচ্ছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। 

সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক‌্যাল অফিসার (আরএমও) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে ফুসফুসের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশিসহ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষতি হয় বেশি।’ 

পরিবেশ অধিদপ্তর  (নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর)  উপ-পরিচালক মো. সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি আইন অমান্য করে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর বিষয়ে  লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসককে জানাতে হবে। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’
 
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ বলেন,  ‘লক্ষ্মীপুরে ২ শতাধিক ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৮৯ টির।’ দ্র্রুত অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। 

লক্ষ্মীপুর/এনই

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়